পরকীয়া

রাত অনেক হল।আমার ঘরের দেওয়াল জোড়া মস্ত একটি জানলা।জানলাজোড়া আকাশ।আর আকাশজোড়া প্রেমিকার মুখের মত বিশাল এক স্বর্নালি চাঁদ।আজ কোজাগরি পূর্নিমা।
কোজাগরি শব্দটি কিন্তু দুরপ্রসারী এবং দ্যোতনাময়।কোজাগর শব্দটির মধ্যে নিহিত রয়েছে এক রহস্য,একটি উৎসুক জিজ্ঞাসন।
কঃ অর্থাৎ কে এবং জাগর অর্থাৎ জেগে আছে?
এই পুর্নিমায় কে জেগে আছে?এই হল কোজাগরী পূর্নিমার নিহিত অনুসন্ধিৎসা।
শাস্ত্রে বলা হয়-লক্ষী ঘুমে হন বিরূপা,তিনি তুষ্ট হন জাগরনে।লক্ষী নাকি বলে থাকেন-এই পূর্নিমায় যে জাগবে আমি তাকে ধন দেব।
শাস্ত্রে আছে-এই আশ্বিনী পূর্নিমায় অক্ষক্রীড়া বিহিত।অর্থাৎ এই কোজাগরী পূর্নিমায় জাগলে মালক্ষীর কৃপায় গেরস্তর অবস্থা ফিরতে পারে জুয়ায় জিতে।
কিন্তু আমি ভাবছি কোজাগরী পূর্নিমায় অন্য এক জুয়ার কথা।যার চেয়ে বড় জুয়াখেলা আর কিছুটি নেই।তার নাম পরকীয়া প্রেম।
পৃথিবীর প্রথম পরকীয়া প্রেমকে আমরা কিন্তু আজও আমাদের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছি।আমরা পুজো করি সেই পবিত্র রাধা কৃষ্ণের পরকীয়াকে।রাধাকৃষ্ণের প্রেমই সেই প্রসাদিত পরকীয়া,যার বিভা আশ্বিনের পূর্নিমার আলোর প্লাবনকেও ম্লান করে দেয়।
আমার ভাবতে ইচ্ছা করছে-আকাশ থেকে উৎলে ওঠা ঐচাঁদের আলোর প্লাবন, আসলে অবৈধ প্রেমের,নিষিদ্ধ সাড়ার,গোপন এষনার আলো।
এই অমল আলো ছড়িয়ে রয়েছে বিদ্যাপতিতে,জয়দেবের গীতগোবিন্দে,বঙ্কিমে,শরৎ এ,রবীন্দ্রনাথে,এমনকি সুনীল এ,শক্তি তে,জয় এ,তসলিমায়,বুদ্ধদেব এ।
জয়দেবের লেখার মধ্যে রয়েছে এক প্রবল শারীরিক পরকীয়া।ভাবুন জয়দেব লিখছেন-"রতিসুখসাগরে গতমভীসারে মদনমনোহরবেশম্
ন কুরু নিতম্বিনী গমনবিলম্বনমনুসর তং হৃদয়সম"।ভাবা যায় কি আধুনিক!পরকীয়া যখন বিবাহিতা নারীর সঙ্গে অবিবাহিত তরুণের তখন তা কিন্তু এমনই শরীরি হয়।
রবীন্দ্রনাথ আবার পরকীয়াকে একদম অন্যভাবে দেখেছেন।তিনি খুঁজতে চেয়েছেন সৌন্দর্য।
লিখছেন-"চেয়ে চেয়ে বুকের মাঝে গুঞ্জরিল একতারা যে-
মনোরথের পথে পথে বাজলো বাঁশুরি।
রূপের কোলে ঐ যে দোলে অরূপ মাধুরী।"

পরকীয়া হল বারান্দার মত।ঘরে থাকতে থাকতে যখন মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে তখনই দুদন্ড আকাশ দেখার জন্য সে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।সেখানে সে নিজের কল্পনাকে মেলে ধরতে পারে।যেখানে সে দেখতে পায় নিজের গৌরবান্বিত রূপ কে।সে আবিস্কার করে নুতনকে।জীর্ন খোলোস ছেড়ে সে বেরিয়ে আসে নতুন রূপে।সে বাঁচতে শেখে এক অন্যরকম অনুভবে।কিন্তু বারান্দাতো তার স্থায়ী আশ্রয় নয়।তাই তাকে ফিরতেই হবে ঘরের চেনা গন্ধে।এইবার সে ঘরকে নতুনভাবে চিনতে শিখবে,ভালবাসতে শিখবে।মানুষের পরকীয়া তাই পরস্ত্রী বা পরপুরুষের সাথে নয়।মানুষের পরকীয়া আসলে তার নিজেরই সঙ্গে।আমার ভিতরের অন্য এক আমির সঙ্গে।এ এক ভ্রমন।এ এক পর্যটন।
তাই কোজাগরী রাত যদি জাগতেই হয় ,আমি জাগতে চাই পরকীয়ার জুয়ায়,আমি জাগতে চাই পরকীয়ার উত্তেজনায়।আসুন এই আলোর প্লাবনে আমরা উৎসব পালন করি পরকীয়া প্রেমের অথবা প্রেমের পরকীয়ার।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি