বাস্তুঘুঘু
বাস্তুঘুঘু এবং তার বাসা সম্পর্কে _ _ _ _
বাস্তুঘুঘু আসলে একটা বিশেষ্য পদ, যার অর্থ - বহুকাল যাবৎ বাস্তুগৃহে বাস করে, এমন একজন অসৎ বা দুষ্ট প্রকৃতির লোক, যাকে তাড়ানো খুব কঠিন একটি কাজ।
২০১১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত, যেই দপ্তরের মন্ত্রকের হর্তাকর্তা ও দন্ডমুন্ডের বিধাতা, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং, সেই দপ্তর সম্পর্কে যদি তিনিই প্রশাসনিক প্রধান হয়ে আম জনগণকে বলেন, দপ্তরটি প্রকৃত অর্থে বাস্তুঘুঘুর বাসা, এর সম্ভাব্য অর্থ কি হতে পারে?
এই দপ্তরের মানুষজন কেমন, সে সম্পর্কে আম জনগণের মনে একটি ধারণা, সুদীর্ঘকাল ধরেই বদ্ধমূল হয়ে আছে। সেই ধারণা বিশেষটিকেই মাননীয়া সবিশেষ ভাবে জনসমক্ষে অগ্নিতে ঘৃতাহুতির মতো বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন।
তবে কি আর সব দপ্তর __ বিডিও অফিস, খাদ্য দপ্তর, পূর্ত ও আবাসন দপ্তর, স্বাস্থ্য দপ্তর, শিক্ষা দপ্তর, পুলিশ দপ্তর, রেভিনিউ দপ্তর এবং বিচার বিভাগ সহ অন্যান্য বাদবাকি দপ্তরের কাজকর্ম সমূহ কি প্রশ্নচিহ্ণের ঊর্ধ্বে?
সততার প্রতীক হয়ে এত বছর ধরে প্রসাশনের সর্বোচ্চ পদে আসীন থেকেও, তিনি কেন বাস্তুঘুঘুদের বাস্তুহারা করে তুলতে সদিচ্ছা দেখালেন না?
ওনার পূর্বে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধেও ওনার অগণিত অভিযোগ ছিল, সেই নিয়ে উনি বিস্তর বলেছেন, আর তা নিয়ে ফলাও করে লেখালেখিও কম কিছু হয় নি। তবুও ক্ষমতায় আসা অবধি তিনি তেনাদের ষড়যন্ত্র সমূহের বিরুদ্ধে কিছুই করে উঠতে পারলেন না কেন? কোন বিরোধী নেতাকেই জেলের ভাত খাওয়াতে পারলেন না। কেন? সেটা কি ওনার রাজনৈতিক সদিচ্ছারই অভাব নয়? নাকি ওনার সমস্ত অভিযোগই অমূলক ও বিভ্রান্তিকর?
ক্ষমতায় আসা অবধি এযাবৎকালের ইতিহাসে তিনি এমন কোনও বৈপ্লবিক কিছুর পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পেরেছেন কি? তাঁর আমলে নাকি পাহাড় হেসেছে, জংগলের মংগল হয়েছে। কলকাতাও নাকি লন্ডন হয়েছে।
এই রাজ্য নাকি ওনার মমতাময়ী কৃপায় শিক্ষা স্বাস্থ্য আর জীবিকার সম্প্রসারণে সারা দেশের তথা সমগ্র বিশ্বের কাছে একটি অভাবনীয় আদর্শের উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
ওনার সমস্ত বিধায়কদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ যে কতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, আর রাজ্যের সমস্ত কাজের সমস্ত স্তরে কাটমানি আমদানির মাত্রা যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার হিসেব উনি কেমনভাবে, কার মাধ্যমে, আম জনগনকে জানাবেন?
মানছি, আর সব দপ্তরের মতো ভূমি দপ্তরেও কেউ কেউ এমন আছেন, যাঁদের জন্য আমাদের বাদ বাকি সকলকেই অত্যন্ত লজ্জিত বোধ করতে হয়, কিন্তু, সেই সব জনা কয়েকের জন্যে সমগ্র দপ্তরের উপর এইভাবে জনসমক্ষে আক্রমণ ভাবা যায় না।
উনি কি এ ব্যাপারে জানেন না, যে ভূমি দপ্তরে, ওনার নাম করেই, ওনার পেটোয়া নেতা দাদারা এসে দাদাগিরি দেখিয়ে, কাজ আদায় করে নিয়ে যায়, বা আম পাবলিকের কাছ থেকে মূল্যের বিনিময়ে কাজ করিয়ে দেওয়ার অংগীকার করে, দালালি চালিয়ে যায় দিনের পর দিন।
উনি কি এটাও জানেন না যে, দপ্তরের আধিকারিক যখন বে-আইনীভাবে মাটি কাটা, বালি তুলে পাচার করা রোধ করতে যায়, বা সেই সংক্রান্ত কাজের জন্যে ফাইন আদায় করতে যায়, রাজ্যের কোষাগারকে সমৃদ্ধ করার কথা মাথায় রেখে, তখন ওনারই পেটোয়া নেতা দাদারা তাদের পোষ্য লোকজনকে অপব্যবহার করে, ভয় দেখিয়ে, মারধর করে, অধিকারিককে হেনস্থা করে, তাঁদের কাজ কর্তব্য পালন করতে প্রবল পরিমাণে বাধা দেয়?
উনি কি এটাও জানেন না, যে শহরের বুকে বিরাটকায় শপিংমলের উপরে বকেয়া খাজনা আদায়ের জন্যে কোন আধিকারিক কোনো প্রকারের প্রচেষ্টা চালাতে গেলেই ওনার ভাবশিষ্য মন্ত্রী সান্ত্রীগণ, তাকে যে কোন মূল্যে বাধা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে, নিজেদেরকে মাননীয়ার কাছের লোক দেখিয়ে।
দপ্তরের অধিকাংশ মানুষই যদি পরিশ্রম না করতেন, তাহলে কেমন করে প্রতি বছর রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পায়? বরং রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে গিয়ে, কৃষিজমির উপরে খাজনা প্রভৃতি মকুব করতে গিয়ে, রাজ্যের রাজস্ব আদায়ের কাজে যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, বিগত কিছু বছরে, তার প্রভাব এসে প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষভাবে পড়েছে জনগণের উপরে চাপিয়ে দেওয়া অন্যান্য বস্তুর উপরে কর আদায়ে। তা না হলে, পেট্রলের দাম, এই রাজ্যের থেকে ঝাড়খন্ডে কেমন করে কম হয়?
এমন আরো অনেক প্রশ্নই উঠিয়ে আনা যায়, যার উত্তর মাননীয়ার কাছে নেই। অথচ উনি তাদের দিকেই সরাসরিভাবে দুর্নীতির অভিযোগ এনে দিলেন, যাদের পরিশ্রমের বিনিময়ে, ছুটির দিনেও প্রয়োজনে কাজের বিনিময়ে, ওনার রাজনৈতিক অনুগামীরা বিএলআরও অফিসকে নিয়মিতভাবে ব্যবহার করে, দালালির মাধ্যমে প্রভূত অর্থ রোজগার করে, আর ওদের কাজের অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে আম আদমীর কাজের দেরী আর হয়রানি হয়।
একটু ভাবুন, বিনা মহার্ঘভাতায় মাইনে দেওয়ার জন্যে, যেই রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক প্রধান, হাইকোর্ট পর্যন্ত যেতে পারেন তাঁর কর্মচারীদের বিরুদ্ধে, মামলার মাধ্যমে, তাঁর কাছ থেকে এর বেশী আর কীই বা আশা করা যেতে পারে?
জনগনের উপর চাপানো করের টাকায় জন-নেতাদের নির্বাচন, তাদের ক্ষমতালাভ এবং তার দুর্বিষহ অপব্যবহার, বিনা অর্থমূল্যে কোনও কাজ না করা, সরকারি দপ্তরে এসে ক্ষমতা প্রদর্শন করে অগ্রাধিকার দেখিয়ে কাজ হাসিল করা, আর সেইসূত্রে আম পাব্লিকের কাজে বিলম্ব হওয়া __ এইসব জোর যার মুলুক তার সুলভ অরাজকতা, কার প্রশ্রয়ে চলে আসছে? এদের কাজের দায়বদ্ধতার তুল্যমূল্য বিচার, কারা, কবে, কি ভাবে করবেন? এই নিয়ে রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক প্রধান কি বলছেন?
জানি, এই লেখার পরে, আমারও হয়ত বদলীর আদেশনামা চলে আসবে। কিন্তু, যখন সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্যে অবতীর্ণ হয়েছিলাম, সেইদিনেই মনে মনে জানতাম, আধিকারিকদের কোথাও বেশীদিন থাকা চলে না। তাই, বদলার বদলীর আদেশনামা নেমে আসুক, আর অন্যকিছু আসুক, সত্যিটা সত্যিই থাকে, মিথ্যে হয়ে যায় না।
আর তাই, যতদিন ভূমি দপ্তর থাকবে, ততদিনই থাকবে এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের দালালরাজ, আর আম মানুষের থেকে অর্থমূল্যে কাজের খতিয়ান। এটাই সার সত্য। আর এটাই চরম বাস্তব।
আর এই সবকিছুর দায়, স্বয়ং প্রশাসনিক প্রধানও কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারেন না, কিছুতেই না।
বরং হীরক রাজার দেশের মতোই এবার এটা ভাবার সময় এসেছে,
"দড়ি ধরে মারো টান,
____ হবে খান খান"
Comments