রাজ দর্শন
চেতনা যখন
চৈতন্যে পরিণত হয়,
ভাবনায় ছকে, ঘুমের ঘোরে,
রোজকার জীবনের
চাওয়া পাওয়ার সমীকরণ
নিজের অজান্তেই বদল হয় ।
পাহাড়ের ওপারে, শঙ্খচিলের বুকের শিশিরভেজা পালক ছুঁয়ে, মেঘের ভাঁজে মিলিয়ে যাওয়া ঊষার, আদরমাখা আলোর ওমে, জেগে ওঠে বিচ্ছুরিত, প্রাক্তন, একান্ত অনুগত, কিছু অনাগত মুহূর্ত।
স্বর্গের অমৃত আর মর্তের গরল বাষ্প, এখানে পাল্লার নিক্তিতে, বাজারের একতরফা সামাজিক চাহিদাকে অগ্রাহ্য করে, ফুল বেলপাতা ধূপ দীপ আতর আর সমস্ত উপাচার আয়োজনকে উপেক্ষা করে, অন্তরের গভীর অতলে ওঠানামা করে, চিরশ্বাশ্বত নশ্বর দেহ দেবতার আরাধনায়।
প্রকৃতির কোলে ধ্যানমগ্ন আগ্নেয়গিরির মতো, নিজেকে চিনতে, জানতে, অনুভবে উপলব্ধি করতে, ভালোবাসতে এবং সেই অনুসারে নিজেকে গুরুত্ব দিতে দিতেই জীবন সীমান্ত অতিক্রম করে যায়, অনন্ত অসীমের নিরন্তর সাধনায়।
ভোর হলেই এক একটা ঊষা, প্রতিদিনের নিয়ম মেনে, একটু একটু করে দিনান্তে মিলিয়ে যায়, অতীতের ঊষার অন্তরালে, রাত মুছে আলোর আগমনে, দিনশেষে, সমুদ্রপাড়ের অস্তাচলে, যেখানে শুধুই জেগে থাকে, আগমনের অপেক্ষা, নবাগতা ঊষার।
বর্ষায় স্নাত দীঘির, টলটলে জলের পাশ দিয়ে, বয়ে চলা ছাতিমের সুবাসিত উগ্রতায়, কোনও এক শুচি শুভ্র সন্ধ্যাতারার কোল থেকে, গড়িয়ে নামা আলোক বিন্দুর পিছলে যাওয়া মুহুর্তের স্বাক্ষী হয়ে থাকে, হাস্নুহানা ঝুমকোলতার বুকে অনাগত দিন যাপনের অস্তরাগ।
যেদিন প্রথমবারের মতো, চেনা কারোর হাতের আঙুল না ধরে, অনায়াসেই ঘরের দুয়ার একলা অতিক্রম করা যায়, একা একা চেনা পথ ধরে, একটু একটু করে, অজানা মানুষের দিক নির্দেশনায়, অচেনা পথের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলা যায়, সেদিনের সূর্যের প্রথম আলো, সেদিনের ভোরের প্রথম কিরণ, জাগিয়ে দিয়ে যায় আমাদের আধোঘুম আদিম অন্তর স্বত্ত্বা।
উদীয়মান সূর্যের বিচ্ছুরিত আলোর উত্তাপের মতো, দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে, অজানাকে জানা, অদেখাকে দেখার আমরণ অভীপ্সা। চারপাশের অসংখ্য শব্দ কলরবের কোলাহলে কলতানে, আম জাম কাঁঠালের পাতার ফাঁকে, উঁকি মেরে যাওয়া ভোরের আলোর বিচ্ছুরণে, চড়াই শালিক দোয়েলের ডানার ঝটপটে, ফড়িং আর শ্যামাপোকা ধরে বাসায় তোলার উৎসাহ, উৎসবে উপনীত হয়। অনুসন্ধানী মন তখন বুদ্ধির আশ্রয়ে, যুক্তির নিরিখে বিচার করে ঘটনার পরম্পরা এবং সেই অনুসারী সম্পর্কের গুরুত্ব।
এরই পাশাপাশি আরো খানিকটা ভালো থাকার অভিপ্রায়ে একটু একটু করে উন্মিলিত হয়ে ওঠে অন্তরের আমিত্ববোধ। সবকিছুই তখন 'আমি' কেন্দ্রিক, 'আমার' বলেই ভ্রমের ঘোরে বিভ্রান্ত হয় মন। এই ভ্রান্তি বোধ আরও বেশী মাত্রায় প্রস্তরীভুত হয় চারপাশের অসংখ্য খ্যাত এবং অখ্যাত 'আমি' র ভীড়ে। এই সমস্ত 'আমি' গুলোর প্রভাব মনের গভীরে একটু একটু করে আরো গাঢ়, আরো ঘনীভূত হয়, মনের গভীর থেকে গভীরতম প্রদেশে এই স্বরূপ থেকেই জন্ম নেয় 'অহং' বোধের। হাড় মাংস রক্ত অস্থি মজ্জা শিরায় উপশিরায় এই অহং অনুভূতি স্তরে স্তরে স্তূপাকারে মগজের ভাবনার সাথে একাত্মবোধ অনুভবের মাধ্যমে সম্পৃক্ত হতে থাকে। মানুষ ক্রমশঃ ভুলে যেতে থাকে স্ব-অস্তিত্বের অধিষ্ঠান, হৃদয় দেবতাকে।
অমৃত, সত্যের আধার থেকে যার সৃষ্টি, মনের বিরলতম প্রদেশের, অন্তরতম, শুদ্ধ ও শাশ্বত অবগুন্ঠনে, আবৃত থাকে যেই অনির্বচনীয় জীবন সার, সেই পরমতত্ত্বকে নিরন্তরভাবে অনুসন্ধান করে পথ চলার নামই জীবন।
অন্তরের 'আমিত্ব' ভাবকে এই অমৃত অনুসন্ধানের পথেই পৃথকভাবে উপলব্ধি করে নিতে হয়, নিজের সাথে নিজেকেই একটু একটু করে একাত্ম করে। এই একাত্মীকরণের সময় চারপাশ থেকে ভেসে আসে অগুনতি মুখের অবয়ব আর অযুত কোটি ভাবের ঘোর। এই ভাবেরা যত বেশি গাঢ় হয়, যত বেশি এর সান্দ্রতা বৃদ্ধি পায়, ততই আমাদের মন আমাদের নিজেদের থেকে বিচ্যুত হয়, বিচ্ছিন্নতাবোধ এর শিকার হয় মন, চারপাশের অসংখ্য কোটি মুখের ভীড়েও নিজেকে একলা এবং সম্পূর্ণভাবে অবহেলিত বলে বোধ হয়।
এর থেকে মুক্তি পাওয়ার এক এবং একমাত্র উপায় হল ধ্যান। একমাত্র বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো ধ্যানমগ্ন থেকেই, নিজের কথা নিজের ভাবনাকে প্রশ্রয় দিতে দিতেই, নিজেকে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করতে করতেই, ধীরে ধীরে ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করতে হয়।
আর একটু একটু করে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো করেই নিজের কেন্দ্রে উপনীত হতে হয়। আর তারপর একের পর এক, আসতে থাকে প্রশ্ন। আমি কে? আমি কি করছি? কেন করছি? কোথায় এবং কেন আমার আসা? এই সব ভাবনার পথ ধরেই আত্ম - অনুসন্ধানের পথ উন্মুক্ত হয়। নিজের ভিতরেই সকলের, সমগ্র বিশ্বের ভাব দর্শন হয়।
আমরা যাকে মনসংযোগ বলি, তা আসলে মনের সাথে নিজের সংযোগ। দেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে একসাথে একসময়ে একভাবনায় ভালবেসে স্থির করা। এর জন্যে সবার আগে প্রয়োজন নিজেকে ভালোবাসা। যে নিজেকে ভালবাসতে জানে না, সে কেমন করে নিজের মনের সাথে সময় দেবে, নিজের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করবে, মনের সাথে নিজেকে সংযোজন করবে?
(চলবে)
Comments