(শরণ্যার ডায়েরী থেকে) কিন্নর দেশে

কিন্নর দেশে

শরণ্যা-র ডায়েরি থেকে

২১/৫/২০১৫

সকাল ১১:০০

আমি বাবা ও মা ২১ শে মে বেড়িয়ে পড়লাম কিন্নর কৈলাস ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। দিল্লী পর্যন্ত বিমানে, তারপর পুরান দিল্লী স্টেশন থেকে কালকা মেল এ চেপে সোজা কালকা ।

২২/৫/২০১৫

সকাল ৬:৩০

ছোট্ট পাহাড়ী স্টেশন কালকা। শিবালিক পর্বতশ্রেণীর পাদদেশে। সেখান থেকে টয়ট্রেনে, নাম শিবালিক এক্সপ্রেস। ছোট্ট লাল টুকটুকে সুন্দর ট্রেনটা। প্রথমে মা’র সঙ্গে খচখচ করে কিছু ছবি তুলে ফেলি। সবাই মিলে ট্রেনে চড়ে বসি। কুউউউউ! ট্রেনের বাঁশি শুনেই মনটা নেচে ওঠে। ঐ ছেড়ে দিল – ঝিক ঝিক ঝিক ……।

সকাল ৮:৩০

বাবা বলল আমাদের নাকি ১০৮ টা সুড়ঙ্গ পেরতে হবে। সবে ২৮টা পেরিয়েছি। শিবালিক পর্বত শ্রেণীর অপরূপ সৌন্দর্য  দেখতে দেখতে চলে এল গুম্পা স্টেশন।

সকাল ১০:৩০

সবে বারোগ পেরলাম। প্রাতরাশ সারলাম। পাউরুটি দুধ ও ডিমভাজা দিয়ে। এক্তু পরেই শিমলা পৌছব। ৯০তা সুড়ঙ্গ পেড়িয়েছি। বড্ড ঘুম পাচ্ছে………।

শিমলা পৌছলাম। সুটকেশ, ব্যাগ সব নামিয়ে তিনজন হাঁটা দিলাম ট্যাক্সির খোঁজে । ভাগ্যজোরে মিলেও গেল একটা। পাড়ি দিলাম পিটার হফ হোটেলের উদ্দেশ্যে।

২২/৫/২০১৫

সন্ধ্যে ৭:৩০

মধ্যাহ্ণ ভোজটা ভাল ভাবেই উপভোগ করলাম। এই হোটেলটা খুব সুন্দর। একটা বিরাট লন আছে। বাবার কথায় ম্যাল ওবধি পাড়ি দি পায়ে হেঁটে । শিমলা শহরটা খুব সুন্দর। কিনি কিছু পাহাড়ি ফলসা, কিছু কিউই। কোথায় লাগে বিরিয়ানি, মাটন, চিকেন। আর খানিকখন হেঁটে পৌছই ম্যালে। তখনও সন্ধ্যা হয়নি। সূর্য ডোবেনি।

ম্যালে পৌছেই একটা ঘোড়ায় চরলাম। নাম জিপসি। কালীবাড়ি গেলাম। খুব ভাল লাগল। ফেরার সময়  বরফে ঢাকা  কিছু পাহাড় দেখে উচ্ছসিত হয়ে উঠলাম। এখানে সূর্য ডোবে অনেক দেরিতে। সেই লাল আভায় গোটা শিমলা শহরটা দারুণ লাগছিল। হোটেলে ফিরে লনে খেলতে খেলতে গোটা দুয়েক বন্ধুও বানিয়ে ফেললাম। পুরো সন্ধ্যে খেললাম ওদের সাথে। তারপর দারুন রাতের খাবার………।

২৩/৫/২০১৫

সকাল ১০:৩০

আজ আমাদের গন্তব্য সারাহান। সবে গাড়ীতে উঠলাম। আমাদের এই বাহনটির নাম ইনোভা এবং তার চালকের নাম দীপক। মা প্রায় তিনশো ছবি তুলে ফেলেছে, আমিও কম নই। আমি তুলেছি প্রায় দেড়শো। এখান থেকে আনেক দূর পথ যেতে হবে। বাইরেটা যেন পটে আঁকা ছবি। এবার একটু শুই…।

বিকেল ৩:৪০

সবে রামপুর পেরলাম। একটু আগে মধ্যাহ্ণ ভোজ সারলাম – মোমো দিয়ে। বরফে ঢাকা পাহাড় যেন আমাদের দিকে হাত বারিয়ে আছে। গাছপালা ক্রমে কমছে। পাইনের জঙ্গল এখন প্রায় নিশ্চিহ্ণ। থরে থরে আপেল বাগান। আমাদের পাশে পঞ্চনদের আন্যতম শতদ্রু। রুক্ষ পাহাড়ের বুকে নেচে নেচে চলেছে ছোট ছোট ঝর্না। শতদ্রুতে মিশছে।

সন্ধ্যে ৭:৩০

এখন আমরা সারাহান পৌছে গেছি। আমাদের হোটেলটা খুব সুন্দর। এখানেও একটা বড় লন আছে। আমাদের ঘর থেকে শ্রীখন্ড ও বিখ্যাত শ্রীখন্ড মহাদেব দেখা যাচ্ছে। মা খুব খুশী। দুঃখের কথা আমরা এখানে একদিন থাকব। একটু আগে আমরা ভীমকালী মন্দির দেখে এলাম। খুব সুন্দর কাঠের মন্দির এটি। কালী ঠাকুরের মূর্তি দেখতে আনেক উচুতে উঠতে হয়। ফেরার পথে একটা কুলফি খেয়ে এখন নারনিয়া পড়ছি। দারুন লাগলো সারাহান।

২৪/৫/২০১৫

সকাল ১১:০০

আজ আমাদের গন্তব্য সাংলা উপত্যকার ছোট্ট গ্রাম রকছাম। বেরিয়েছি আজ সকাল সকাল। অনেক দূর যেতে হবে তো। একটু বাদে পৌঁছব টাপরি বলে একটা জায়গায়। সেখানেই দুপুরের খাবার খাওয়া হবে। শতদ্রু আমাদের পাশে পাশে বয়ে চলেছে। চারিদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়। সবে আমরা কিন্নর-দুয়ার  পেরোলাম। এখানে পাহাড় নিজের হাতে কিন্নর জেলাকে সিমলা জেলা থেকে আলাদা করে দিয়েছে। রাস্তাটা ভয়াবহ সুন্দর। ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ফাটিয়ে রাস্তা বানানো হয়েছে। মাথার ওপর পাহাড়ের ছাদ। কিন্নর-দুয়ার একটি প্রাকৃতিক দরজা।

২৪/৫/২০১৫, বিকেল ৩ঃ০০

আমরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রকছাম পৌঁছব । সাংলা উপত্যকায় ঢুকে গেছি । আসার পথটি অবিশ্বাস্য! অতুলনীয় ! অদ্ভুত!
টাপরি-তে রুটি-সবজি খেয়ে একটু এগোতেই ধসের জন্য রাস্তা ভাঙা । তাই আরও ২৮ কিলোমিটার ঘুরে ঘুরে গ্রামের পথ দিয়ে আসতে হল । পথ কি তাকে বলা যায় ? জানি না ! এখানে ধস, ওখানে ধস – যেমন ধূলো, তেমনি সরু রাস্তা । দুটো গাড়ি পাশাপাশি গেলে খাদে পরে যাওয়ার সম্ভাবনা । কোনক্রমে সে টুকু পেরিয়ে করছাম । গাড়ি থামিয়ে একটু বিশ্রাম । এখানে শতদ্রু নদীর সাথে বাস্পা নদী মিশছে । ঘোলা বাদামি শতদ্রুর সাথে নীলচে সাদা সুন্দরী বাস্পা । পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে কি তার নাচ ! তাকেই সঙ্গে করে সাংলা পেরোলাম । ওই দেখা যায় রকছাম । এ যে স্বর্গ ! কিন্নর কৈলাস পর্বতের পৃষ্ঠদেশ দেখা যাচ্ছে। এ এক শৈল সমুদ্র ।

২৪/৫/২০১৫, সন্ধে ৬ঃ৩০

রকছামে আমাদের নিবাসের নাম হোটেল রুপিন রিভার ভিউ । আমাদের ঘরটা ছোট্ট । তবে খুব সুন্দর । বিছানায় শুয়ে শুয়ে নদী দেখছিলাম । পাহাড়ের কোলে এই ছোট্ট গ্রামটিতে এই একটাই হোটেল । আমাদের হোটেলের ম্যানেজার হলেন শ্রী নরেশ জিতসু । মানুষটি খুব ভালো । এখানকার সব পাহাড়ে তিনি উঠেছেন । হোটেলের ডাইনিং হল থেকে সুন্দরী বাস্পার ভয়ঙ্করী রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি । এখন চারিদিকের শৈলসমুদ্রের দিকে হতবাক হয়ে চেয়ে আছি । মন্ত্রমুগ্ধ …। কাছের বরফের পাহাড়গুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে । ডাকছে পাইনবন, বাস্পা নদী আর রকছাম গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো । আমি ওদের কাছে যাবই ।

সূর্য যখন লুকায় মেঘের পাছে,

আঁধার নামে রকছামের ঐ গ্রামে

পাহাড় চূড়ায় বরফ কাছে কাছে

বাসপা নদী নিজের তালে নাচে।

আঁধারসাজে রকছাম গ্রাম সাজে,

মন্দিরেতে ঘন্টাধ্বনি বাজে

মিটমিটিয়ে আলো ঘরে ঘরে

আঁধার নামে রকছামের পরে।

২৫/৫/২০১৫

সকাল ১১.৩০

আজ চলেছি ছিটকুল। রকছাম থেকে ১০ কিমি হবে। এটি ভারত চীন সিমান্তে শেষ গ্রাম। যাওয়ার রাস্তাটি আপরুপ সুন্দর। এমন সৌন্দর্য আগে দেখেছি বলে মনে হয়না। আসম্ভব সুন্দর। রুক্ষ নগ্ন পাহাড়ের কোলে এঁকে বেঁকে চলে গাছে সরু রাস্তাটি। নীচেই গভীরতম খাদে বয়ে যাচ্ছে আকাশী সবুজ বাস্পা। স্রোত ও অনেক বেশী। কে বলবে একে আটকে রেখে “dam”, “reservoir” বানানো হচ্ছে। পাথরে পাথরে, বরফে বরফে রাস্তা ঢাকা। কখনো বা সবুজের ছোঁয়া – পাইনবনের উঁকি। রাস্তার ডানদিকে ক্রমাগত পর্বত তুষাড়ে লুকোচুরি। ভীষণ ভীষণ সুন্দর। নিঃসঙ্গ কীন্নরের নিস্তব্ধ সঙ্গী……………।

সন্ধে ৮.৩০

ছিটকুল দেখলাম। বাস্পার পাথুরে তীরে হাঁটলাম। থোলাই শৃঙ্গের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করলাম। ছিটকুল দেবীর মন্দির চত্বরে হাঁটলাম। কিন্নর কে নতুন ভাবে চিনলাম………। সবকিছু হয়তো ক্যামেরা বন্দি হলোনা কিন্তু চিরকালের জন্য এই সুখস্মৃতি বন্দী হয়ে রইলো।

২৬/৫/২০১৫

সকাল ৯.৩০

আজ আমরা সাংলা ছেড়ে কল্পার আভিমুখে বেড়িয়েছি। ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। পাহারে তুষারপাত। চারিদিক কুয়াশায় ঢাকা। কাছাকাছি একটা নাগমন্দির আছে। সেটাকে দেখে নিয়ে সাংলা ছাড়ার পালা। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে সাংলাকে ছেড়ে, পাইনবনকে ছেড়ে, বাস্পাকে ছেড়ে, ছিটকুলকে ছেড়ে, গ্রামের মানুষগুলোকে ছেড়ে চলে যেতে।

দুপুর ১.৩০

সবেই মধ্যাহ্ণ ভোজ সেরেছি। আমরা এখন রেকং পিও। পাহাড়ি ভাষায় শুধুই পিও। পার্বতী শৃঙ্গ অসাধারণ। তার সঙ্গে আছে থোলাই আর কিন্নর কৈলাস, গণেশ আর মহাদেব। পিও কল্পার খানিক আগে, তবে দীপক কাকুর বাঁধাকপি কেনার ঠেলায় একটু দেরি হয়ে গেল। … কল্পা।

বিকেল ৪:৩০

পৌঁছলাম কল্পায়। অন্য নাম চিনি। পাহাড়চূড়ায় অপরূপ সূর্যাস্ত। যেন তুষার পর্বতে সোনা। পার্বতী মাতা কে সোনার হার পরিয়ে, মহাদেবের মাথায় চিলতে সোনার মুকুট পরিয়ে, কিন্নর কৈলাসের পদধূলি নিয়ে সূর্যদেব অস্ত গেলেন। সন্ধে হল। তাও কিন্তু অন্যরকম একটা আলো রইল।

২৭/৫/২০১৫

দুপুর ১২:০০

আজ আকাশ ঝকঝকে নীল। চিনি গ্রাম, মন্দির, মঠ সবই দারুণ দেখাচ্ছে। আর মহাদেব-পার্বতী। অভুতপূর্ব। আজ আমরা কাছাকাছি দ্রষ্টব্যগুলো দেখছি। প্রথমেই গেলাম সুইসাইড পয়েণ্ট। বাপরে কি খাড়াই। নীচে শতদ্রু বইছে রুপোলি সুতোর মতো। ওখানে পরে গেলে…! এরপর গেলাম কাছের একটা গ্রামে। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা পার্বতী শৃঙ্গে সকালের রোদ পড়েছে। ঝকমকে সোনালি আভার সেই সৌন্দর্য ভোলার নয়। বাবা-মার হাত ধরে গ্রামের ছায়াবীথি ধরে হাঁটা…। শেষে চিনি গ্রাম। সেখানকার সুন্দর গ্রাম্য পরিবেশ মনটাকে ভিজিয়ে দিল।

সন্ধে ৬:০০

হোটেলে ফিরে মা-বাব-আমি হাঁটতে বেরোলাম আবার। দুপাশে পাইন বন। একটু দূরে দেখা যাচ্ছে আপেল বাগান। নিচে কল্পা গ্রাম। একটা দুটো বাড়িতে জ্বলে উঠছে আলো। সেই পাহাড়ি সময় মনে থেকে যাবে চিরকাল।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি