আনন্দবাজারের লেখা
শিমলা-চেইল-সারাহান-সাংলা-ছিটকুল
হিমাচল প্রদেশ, দেবতাদের আপান আবাস। তাই দেবভূমি। পর্বতমালা, আপেল বাগান, বরফ, মন্দির, কুয়াশা আর প্রকৃতির অকৃপণ দানে ভরে থাকা এক অপরূপ ক্যানভাসে স্বপ্নসফর
২৩ অক্টোবর, ২০১৭, ১৯:০১:১৯
কল্পা থেকে দেখা যাচ্ছে কৈলাস শৃঙ্গ
শিমলা
ছবি আঁকা এক শৈলশহর। আদ্যোপান্ত ব্রিটিশদের হাতে গড়া। পাইন আর ধুপির ছায়ার মোড়া। কালকা থেকে চলে আসুন খেলনা রেলে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রেলপথ।
যা দেখবেন: প্রায় ৭০০০ ফুট উচ্চতায় এক শৈলশহর। কালকা হয়ে গোটা যাত্রাপথে আপনার সঙ্গী শুধুই মুগ্ধতা। ৯৭০টি সেতু, ৯৯টি টানেল আর ৯২০টি বাঁকের শেষে শৈলশহর শিমলা। অজস্র দোকানপাট, রেস্তোরাঁ আর পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। শিমলার মূল আকর্ষণ ম্যাল। শেষ প্রান্তে আংলেশিয়ান ক্রাইস্ট চার্চ। হলদেরঙা এই গির্জাটি ১৮৪৪ থেকে ’৫৭ সালের মধ্যে তৈরি হয়েছিল নিয়ো-গথিকশৈলীতে। প্রতি সন্ধ্যেয় অপরূপ আলোকমালায় সেজে ওঠে গির্জা। চলে আসুন শিমলা কালীবাড়ীতে। ডান দিকে মঙ্গলচণ্ডী আর বামে শ্যামলাদেবী। পাখির চোখে শিমলাকে দেখতে হলে আসুন জাখু হিলসে। ম্যাল থেকে ২ কিমি চড়াই ভেঙে অথবা ঘোড়ার পিঠে চেপে চলে আসুন। আর দেখে নিন হিমেল হাওয়া জড়ানো পাহাড়ঘেরা অনবদ্য শিমলা, যেন পিকচার পোস্টকার্ড! দূরে ১৫০ ফুট হনুমান মূর্তিটি চমৎকার। শিমলা থেকে ৪ কিমি দূরে অবজারভেটরি হিলস।
১৮৮৮ সালের লর্ড ডাফরিনের বাংলোটি বর্তমান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স স্টাডিজ ক্যাম্পাস। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ৫ কিমি দূরের সামার হিলসের চুড়োয় চলে আসুন। তবে এর জন্য হাতে একদিন সময় বেশি রাখতে হয়। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়, চ্যাডউইক ঝর্না, তারাদেবী মন্দির, সঙ্কটমোচন মন্দির আর আনানডেল রেসকোর্স দেখতে দেখতে সারা দিন কোথা দিয়ে কেটে যাবে টেরই পাবেন না।
মিথ বলছে: শ্যামলাদেবীর নাম থেকেই শিমলার নামকরণ হয়েছে। এই পাহাড়ি শৈলশহরের ইতিহাস জানতে হলে, অবশ্যই দেখে নিন শিমলা মিউজিয়াম। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
কেনাকাটা: শপিং প্যারাডাইস বললে কম বলা হবে। ম্যালে ছড়ানো ছিটানো নানান দোকানপাট। শীতবস্ত্রের অঢেল সম্ভার। কেনাকাটা সেরে নিতে পারেন। তবে দরদাম করে নিন। কাঠের নানান সামগ্রী কিনতে চলে আসুন লক্কড় বাজার এলাকায়।
যা করবেন না: হিমাচলের সর্বত্র প্রকাশ্যে ধূমপান করলে জরিমানা করা হয়।
চেইল
‘লিটিল মাউন্টেন অব হেভেন।’ বিদেশিরা আদর করে এই নামেই ডেকে থাকেন। উদার, উদাস প্রকৃতির বুকে আরও এক অসাধারণ শৈলশহর। পাইন, দেওদারের ছায়ামাখা পথকে সঙ্গী করে শিমলা থেকে মাত্র ৪৯ কিমি দূরত্বে হিমাচলের এক মৌনী গ্রাম, চেইল।
কী দেখবেন: উপচে পড়া সৌন্দর্যের মাঝে হিমেল বাতাসের অবাধ আনাগোনা। চিরসবুজ বৃক্ষরাজদের আকাশছোঁয়ার চেষ্টা, নীল আকাশের ব্যাকড্রপে ছবি আঁকা হিমালয়ের পরিপাটি সংসারের ফ্যামিলি অ্যালবাম, জাস্ট অসাধারণ। মখমলি সবুজের ঘাসজমিনে নরম রোদ্দুরের কারুকাজ। সামার প্যালেস আজকের চেইল প্যালেস হেরিটেজ হোটেল। দূরে পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে শতদ্রু নদী। চেইলের পাহাড়ের চুড়োয় রয়েছে ক্রিকেট খেলার মাঠ। এক পাহাড়ের মাথায় সামার প্যালেস। আর এক পাহাড়ের মাথায় ক্রিকেট খেলার মাঠ। অন্য পাহাড়ে ‘সিধ বাবা কা মন্দির’, শিখ গুরুদ্বার। দেখে নিতে পারেন ‘চেইল অভয়ারণ্য’। এক সময় পাতিয়ালা মহারাজাদের মৃগয়াক্ষেত্র। ১১০ কিমির এই অভয়ারণ্য অনুমতি নিয়ে, গাইডের সঙ্গে ঘুরে নিতে পারেন। রংবেরঙের পাখি, ভালুক, হরিণ, লেপার্ড সমেত আরও নানা বন্যপ্রাণীর দেখা মিলতে পারে।
প্রেমের কাহিনি: অপরূপ নিসর্গে মোড়া তিন পাহাড়ের কোলে বসানো পাহাড় গ্রাম চেইল-এর সৃষ্টির পেছনে এক প্রেমকাহিনি লুকিয়ে আছে। ভারতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইংরেজ কম্যান্ডার ইন চিফ কিচেন-এর সুন্দরী কন্যার প্রেমে পড়েন পাতিয়ালার মহারাজা ভূপিন্দ্র সিংহ। সেই খবর জানাজানি হতেই মহারাজার শিমলায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। মহারাজা ভূপিন্দ্র সিংহ তখন শিমলার অদূরে চেইলে অপরুপ এক কাঠের প্রাসাদ বানিয়ে ফেলেন। এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৮৯১ সালে প্রাসাদটি পুড়ে যায়। ১৯৫১ সালে তা আবার নতুন করে গড়ে ওঠে।
হঠাৎ দেখা: শিমলা থেকে নারকান্ডা হয়ে সোজা এলেই আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। মাঝে মাঝে উঁকি মারবে কুলফির মতো জমা বরফ। পাখিদের গান শুনতে শুনতে চলে আসুন। মেরেকেটে ১২ কিমির সঙ্কীর্ণ পথের শেষে মনোরম পরিবেশে হাতু মাতার মন্দির। শিমলা থেকে প্রায় ৭২ কিমি। নতুন ভাবে মন্দিরকে সাজানো হয়েছে। মন্দিরে কাঠের কারুকাজ অসাধারণ। হাতুমাতা আসলে দেবী দুর্গার প্রতিরূপ। তবে শীতে এই রাস্তা সম্পূর্ণ বরফে মুড়ে থাকে।
সারাহান: শিমলা থেকে নারকান্ডা হয়ে রাস্তা ভাগ হয়ে গিয়েছে। সোজা রাস্তাটা চলে গিয়েছে হাতু পিকের দিকে। জমজমাট রামপুরের বুশাহার রাজাদের প্যালেস দেখে আরও ৪০ কিমি।
যা দেখবেন: জিয়োরির মোড় ঘুরে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের শেষে হিমাচলের এক দেবলোক, সারাহান। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ছোট ছোট গ্রাম। আর বাক্সবাড়ি। প্রতিটি বাড়ির বাগানে আপেল, অ্যাপ্রিকটের বাহার চোখে পড়বে। শীতে সারাহান মুড়ে থাকে বরফের চাদরে। আর অন্য সময় নীল আকাশের নীচে পাইনের মায়াবী পথ। আর শ্রীখণ্ড পাহাড়ের ঘেরাটোপে তুষারধবল শৃঙ্গরাজদের হাসিমুখ। তারই ব্যাকড্রপে ভিমাকালী মন্দির। হিমাচলের নিজস্ব কাঠকোণা শিল্পে মিশেছে বৌদ্ধ শৈলীর অনবদ্য ছোঁয়া। কাঠের উপর সূক্ষ্ম কারুকাজ নিঃসন্দেহে নজর কাড়বে। মন্দিরে খালি পায়ে প্রবেশ করাই রেওয়াজ। ক্যামেরা, চামড়াজাত কোনও প্রকার জিনিস নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ নিষেধ। গর্ভগৃহে দেবী ভীমাকালীর মূর্তি। দেখে নিন ভিমাকালী মন্দিরের সন্ধ্যারতি। আর পাহাড়ের মাথায় ট্রাগোপ্যান পাখিদের প্রজননকেন্দ্রটি দেখতে ভুলবেন না।
মিথ বলছে: সতীর ডান কান পড়েছিল সারাহানে। পবিত্র মন্দিরে। মন্দির চত্বরে রয়েছে আরও বেশ কিছু দেবদেবীর মূর্তি। মন্দির চত্বরে সুন্দর কেয়ারি করা বাগান। তার অল্প দূরে, বুশাহার রাজাদের কাঠের তৈরি শান্তিকুঞ্জ রাজপ্রাসাদ মনে করিয়ে দেয়, অতীতের শোণিতপুরের ইতিহাস। শীতে বরফে মুড়ে থাকে সারাহান। তবে আপেল দেখতে অগস্ট-সেপ্টেম্বরে আসতে হয়।
সাংলা: হিমাচলের সবচেয়ে নিস্বরগ মোড়া পাহাড় ঘেরা উপত্যকা। কিন্নর জেলার এই উপত্যকাকে অনেকে বাসপা বলেন। কিন্তু, পর্যটকদের কাছে সাংলা নামেই পরিচিত। রুক্ষ পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা পাথর আর তারই বুক চিরেছে ভয়ঙ্কর সুন্দর রাস্তা চলে গিয়েছে। ডানদিকের খাদে বয়ে চলেছে,বাসপা নদীর বহতা। এই পথের শেষে নীল আকাশের নীচে তুষারশুভ্র পাহাড়ের কোলে বসানো সাংলা উপত্যকার বিস্তার। সারাদিন বরফমোড়া শৃঙ্গে অবিরাম রঙবদলের খেলা চলে। ৮,৭০০ ফুট উচ্চতায় সাংলা শীতে বরফের চাদরে মুড়ে থাকে। আবার জুলাই-অগস্টে গ্রামের প্রতিটি বাড়ির বাগানে লাল আপেল আর গোল্ডেন আপেলের বাহার। সাংলার প্রায় এক কিমি উপরেই বুশাহার রাজাদের প্রাচীন দুর্গ কামরু। মাঝে পড়বে কামরু মনাস্ট্রি। এর পর কামরু দুর্গ। তবে দুর্গের অন্দরমহলে সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। এখানে দেবী কামাখ্যার মন্দির দেখে নিন। মন্দিরে চামড়ার জিনিস, প্রবেশ নিষেধ। এখান থেকে চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি আর সাংলা উপত্যকাকে দেখতে অসাধারণ লাগে। বসপা নদীর ধারে রেনবো ও ব্রাউন ট্রাউট ফিশিং-এর খ্যাতি আছে।
সাংলা থেকে ৩ কিমি দূরের আজাদ কাশ্মীর গ্রাম থেকে বসপার জলে পুষ্ট, তাজা রেনবো ট্রাউট কিনে নিতে পারেন।
হঠাৎ দেখা: পাথরের খাঁজ কেটে তৈরি হয়েছে রাস্তা। রোমাঞ্চ মেশা পথের বাঁকে করছাম। আর এখানেই শতদ্রু আর বসপা নদীর মিলনক্ষেত্র। খরস্রোতা নদীর সঙ্গম-ঝঙ্কারে কান পাতা দায়।এখান থেকেই রাস্তা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। ডান দিকে ব্রিজ পেরিয়ে, মাত্র ১৮ কিমি গেলেই সাংলা। আর বাঁ দিকের রাস্তা চলে গিয়েছে কল্পার দিকে।
ছিটকুল: কাছেই তিব্বত সীমান্ত। বসপা নদী বয়ে গিয়েছে তার আপন খেয়ালে। শীতে বরফের চাদরে ঢেকে থাকে। ঠিক যেন বরফের বাগান।
যা দেখবেন: পাহাড়ের ঢালে পাইন, ওক আর দেওদারের আসবুজ বন্ধন। সাংলা থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন। আঁকাবাঁকা পথ। প্রতিটি পথের বাঁকে প্রকৃতির দৃশ্যপটের বদল। পথের সঙ্গী বসপা নদী। প্রায় ১৭ কিমি আসার পর এক মনোরম গ্রামের দেখা মিলবে। গ্রামের নাম, রকছাম। শীতে এই গ্রাম বরফে মুড়ে থাকে। এখান থেকে ডান দিকের রাস্তা ধরে নেমে গেলেই সেতু পেরিয়ে বরফের মুকুট পড়া পর্বতমালার স্তর, বসপা নদী আর উপত্যকার উচ্ছ্বাস। ৩১৫০ মিটার উচ্চতায় এক অনাঘ্রাত সৌন্দর্য। রকছাম থেকে আরও এগিয়ে গেলেই রূপকথার রাজ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। ভারতের শেষ গ্রাম। ৩৪৫০ মিটার উচ্চতার এই গ্রামের নাম ছিটকুল। সামনেই খরস্রোতা বসপা নদী ধারে বেশ কিছু গ্রাম। শীতে পুরু বরফের আস্তরণে ঢেকে যায় এই ছোট্ট গ্রাম। অন্য সময় হিমেল আবহে মুড়ে থাকা এক আপাত নির্জন অনাবিল সৌন্দর্যের সেরা ঠিকানা। গ্রামের চিত্রলেখামাতা মন্দির, শিবমন্দির ও ৫০০ বছরে প্রাচীন দুর্গটি দেখতে ভুলবেন না। ছিটকুল থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরে চিন অধিকৃত তিব্বত সীমান্ত।
Comments