হিমাচলের পথে - দুই
এখানে আসার পর থেকে, মাঝে মাঝেই গভীর রাতে আমার বার কয়েক ঘুম ভেঙে গেছে । প্রতিবারেই বেশ শীত শীত ভাব আর গলায় ব্যথা করছিলো । জলতেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিলো । কারণ এই চরম ঠান্ডায় শরীর শুকিয়ে যাওয়াটাই খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ।
আর এমন কনকনে ঠান্ডায় হাল্কা গরম জল খাওয়াটাই খুব জরুরী । সেটা আমরা খুব একটা করতে পারিনি । ঐ ভাবেই সব প্রতিকূল অবস্থা প্রতিনিয়ত মানিয়ে নিতে আর শিখতে চেষ্টা করে চলেছি । কারণ এই ভাবে অবস্থার সাথে প্রতিনিয়ত মানিয়ে চলাটাই হলো জীবনের সব থেকে বড়ো শিক্ষা । সেই ছোটবেলা থেকেই এইভাবে মানিয়ে চলার পাঠ নিয়ে চলেছি ।
আমরা দলে ছয় জন থাকার কথা হয়েছিলো । কিন্তু আমরা এখানে এসেছি মোট পাঁচজন । আর প্রতিবারেই আমাদের ভাগ্যে দুটো করে ঘর বরাদ্দ হয়েছে । সেখানে আমরা তিন জনে মিলে মিশে ডাবল বেড নিয়ে শুয়েছি ।
নগর সভ্যতা থেকে এত দূরে এতখানি উচ্চতায় এসে, সবাই মিলে এভাবে কনকনে ঠান্ডায়, কুকুর বেড়াল ছানাদের মতো করে, গুটিসুটি হয়ে শুয়ে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা, একেবারেই অন্যরকম বলে মনে হয়েছে আমার । এক কথায় বলতে গেলে বেশ ভালোই লেগেছে ।
সারাটা দিন ঘুরে বেড়ানোর পরে, রাতের খাবার সেরে বিছানায় উঠতে না উঠতেই দুই চোখের পাতা ভারী হয়ে না জানি কেমন করে একে অন্যের সাথে জুড়ে যেত । প্রতিটা রাতেই সেটাই হয়েছে ।
চিৎকুল থেকে সাঙলায় ফিরে এসে রাতের খাবার খেয়ে আমরা সকলেই কম বেশী চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়েছিলাম ।
**********
01.04.18 - ( কল্পার পথে )
**********
সকালে যখন ঘুম ভাঙলো, দেখি পর্দা আর কাঁচের জানলা ভেদ করে আসা, বরফের উপর ঠিকরে পড়া, প্রতিফলিত আলো আমাদের ঘরকে কেমন রূপকথার পরীর দেশের মতো সুন্দর, আলোকউজ্জ্বল করে তুলেছে ।
হোটেলে গরম গরম কচুরী আর ছোলার ডাল খেয়ে, বেলা সাড়ে দশটার ভিতর, আমরা বের হয়ে পড়লাম কল্পার পথে । সাঙলা থেকে কল্পা-রেকং-পিও / Kalpa Recong Peo র দূরত্ব চল্লিশ কিলোমিটারের মতো । আনুমানিক সময় লাগে প্রায় দুই ঘন্টার মতো । কিন্তু আমাদের মন চাইছিলো কারছাম বাঁধটা ভালো করে দেখার । আর ওই বাঁধের উপর দিয়ে নদী পার হয়েই আমাদের যেতে হতো ।
শতদ্রু নদীর উপর নির্মিত, এক হাজার ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কারছাম বাঁধ, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছয় হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থান করছে । আমরা বেশ কিছুক্ষণের জন্যে এখানে এসে দাঁড়ালাম । পটাপট কিছু ছবিও তুললাম ।
বাঁধের শান্তশিষ্ট জলে একটা হাল্কা সবুজ আভা ছিলো । আর জলের কাছে না যাওয়ার জন্যে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ ও ছিলো । ক্লাউড বার্স্টিং, ফ্ল্যাশ ফ্লাড আর আচমকা বৃষ্টির কারণে, এখানে মাঝে মাঝেই জল ছেড়ে দিতে হয় । ঐ সময় আচমকা জলের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায় । চারপাশের সবকিছু টেনে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায় ঐ বিশাল পরিমাণ ধরে রাখার অতিরিক্ত জল ।
আমরা কারছাম বাঁধ পার হয়ে NH5 ধরে চলতে চলতে Khwangi Road ধরে নিলাম । কিছুটা পথ চলে Khwangi মন্দির পার করে, জেলা পুলিশ সুপারের অফিস বাঙ্গলোর পাশ ধরে অতীব খাড়াই আর তীক্ষ্ণ টার্ণ ধরে আমরা অনেকটা উচ্চতায় উঠে এলাম । এখানে বিশাল বিশাল পাইনের ছায়ার সাথে উপরিপাওনা ছিলো কনকনে বরফশীতল হাওয়া ।
আমরা মোবাইল জি.পি.এস. এর সাহায্য নিয়ে আমাদের হোটেল খুঁজে বের করলাম অনেক ঘোরাঘুরির পর । আমাদের হোটেল এর অবস্থান ছিলো কিন্নর-কৈলাস পর্বতের একেবারে মুখোমুখি । এখানে প্রচন্ড কড়া রকমের কনকনে ঠান্ডা ছিলো । কানে টুপি আর গলায় মাফলার ছাড়া হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছিলো না ।
হোটেলের বারান্দায় দাঁড়ালেই, পর্বত শিখরের মাথায়, সহজাত ভাবে প্রকৃতি নির্মিত, যোগাসনে উপবিষ্ট জটাধারী, দেবাদিদেব মহাদেবকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিলো । আমরা সকলেই দুই চোখ ভরে, প্রাকৃতিক ভাবে আবহবিকারের ফলে নির্মিত, ধ্যানাসনে উপবিষ্ট, জটাধারী শঙ্কর ভগবানকে দেখতে লাগলাম ।
ঐ বিশেষ শিখরের চারপাশের সমস্ত শিখরগুলো, ঐ শিখরটির থেকে উচ্চতায় কম আর অনেক বেশী তীক্ষ্ণ হয়েও সম্পূর্ণভাবে বরফে ঢাকা ছিলো । অথচ খুব আশ্চর্যজনকভাবে অনেকটা বেশী উঁচু আর কম তীক্ষ্ণ ( খানিকটা চ্যাপ্টা ) কিন্নর-কৈলাশ শিখরের মাথায়, এক ছিটে ফোঁটা কোথাও, কোন বরফের লেশমাত্র ছিলো না ।
সূর্যের আলোয় সোনার মত গলে পড়ছিলো পর্বত শিখরের দেহ আর নাক জ্বলতে থাকা ঠান্ডা কনকনে হাওয়ার বেগে শিরশির করছিলো দেহ । আমরা সাথে করে খানিকটা আপেলের দেশী মদ নিয়ে এসেছিলাম । আরো কিছুটা মদ স্থানীয় বাজার থেকে আনানো হলো । সাথে কলকাতা থেকে আনা আরবের খেজুর কিসমিস কাজু আর পাহাড়ি বাদাম । আমি এক কিলোর মতো খোসাসহ বালিতে ভাজা ছোলা আর চীনা বাদাম নিয়ে গেছিলাম । সেগুলোরও সদ্গতি করা হলো । দুপুরের লাঞ্চে হোটেলের বানানো গরম গরম রুটি, ডিমের ভুজিয়া ও এইসব চাটের সাথে সংযুক্ত হলো ।
আমরা ভরপেট খেয়ে আবার হোটেল থেকে বের হয়ে পাহাড়ি পথে চলতে লাগলাম । বেশ কিছুটা চলার পরে এলো সুইসাইড পয়েন্ট । এখানে চারপাশের পাথরে অনেক ছেলে মেয়ের নাম পেলাম । আমাদের অবস্থান থেকে খাদের ধারে গিয়ে নীচের দিকে তাকাতেই গা-হাত-পা শিরশির করে উঠলো । মাথাটা ঝট্ করে একটু ঘুরে গেলো । এমন গাছপালাহীন অতলস্পর্শী খাদ এর আগে আমি কখনো দেখিনি । খাদের একদম নীচের দিকে কিছু খাড়াই ধারালো লালচে মেটে রঙের পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ভাবে পড়েছিল । অনেকটা দূর দিয়ে দেশলাই বাক্সের চেয়েও ছোট আকারের গাড়ি চলাচলের দৃশ্য নজরে এলো । আমরা ঠিক আন্দাজ করে উঠতে পারলাম না খাদের গভীরতা ।
আমাদের কৃষ্ণদার খুব শখ ছিলো কিন্নরে এসে কিন্নরীদের দেখার । প্রবাদে আছে, ভারতবর্ষের কিন্নরীরা পৃথিবী বিখ্যাত সুন্দরী । সাধারণ অর্থে পুরাণে কথিত দেবলোকের গায়ক জাতিকে 'কিন্নর' ( স্ত্রী লিঙ্গে - কিন্নরী ) নামে অভিহিত করা হত ।
"আমরা জন্ম-জন্মান্তরে মানবের ভালোবাসা পেয়ে যাবো, ভালোবেসে যাবো ... আমরাই নর, আমরাই নারী, তবে কখনো কারো পিতা অথবা মাতা হতে পারবো না ... আমাদের জীবন অনন্ত সুখের জীবন।" - মহাভারতের আদি পর্বে এভাবেই নিজেদের পরিচয় দিয়েছে কিন্নরগন ।
তারা মানুষ, দেবতা অথবা পশু কোনটাই ছিলো না । গ্রীস দেশের সেন্টারদের সাথে তাদের মিল পাওয়া যায়, অর্ধেক ঘোড়া অর্ধেক মানব । কোথাও বলা হয় তাদের মাথা ছিলো ঘোড়ার, কোথাও বলা হয় তাদের দেহের নিম্নাংশ ছিলো ঘোড়ার মতোন । আকৃতি য্যামন কুৎসিতই হোক না কেনো, তারা ছিলো দেব-দেবীদের সুকণ্ঠী গায়ক । তারা প্রজননক্ষম না হলেও কোন এক প্রকারে তাদের বংশবিস্তার হতো । কোন কোন পুরাণে তাদের গন্ধর্বদের উপজাতও বলা হয়েছে ।
প্রাচীন ভারতের পুরাণ অনুসারে ধীমান পুলস্ত্য'র সন্তান কিন্নরদের বাস ছিলো হিমালয়ের গভীর কোন এক অঞ্চলে, দেবতা, অসুর, রাক্ষস, পিশাচ, গন্ধর্বদের সাথে। প্রথমদিকে কিন্নরগন ছিলো ইল নামের এক হতভাগ্য দেবতার সেনা, যিনি চন্দ্রবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। একদিন পার্বতীর নিষিদ্ধ কুঞ্জবনে ঢুকে পরলে অভিশাপে তার লিঙ্গান্তর ঘটে, দেবতা ইল থেকে তিনি হয়ে পরেন ইলাদেবী। এরপর দেবতা বুধ'র সাথে ইলাদেবীর বিয়ে হলে বুধ কিন্নরদের সেনাকুঞ্জ থেকে মুক্তি দিয়ে গায়কে রূপান্তর করেন।
মহাভারত ছাড়াও কিন্নরদের দেখা পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশের পুরাণে, বার্মিজ, থাই, কম্বোডিয়ান, শ্রীলঙ্কান সহ দক্ষিন-পূর্ব ভারতের পুরাণেও । দক্ষিন-পূর্ব ভারতের পুরাণসমূহে কিন্নরদের স্ত্রী-লিঙ্গের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, কিন্নরী । কিন্নরীদের শরীরের ঊর্ধাংশ ছিলো মানবাকৃতির, নিম্নাংশ হাঁস আকৃতির। থাই পুরাণেও কিন্নরীদের এভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে, থাই পুরাণ অনুসারে তাদের হাঁসের মতোন ডানা ছিলো মর্ত্যলোক থেকে স্বর্গলোকে উড়ে যাওয়ার জন্য । তারা নেচে-গেয়ে-কাব্য রচনা করে দেবতাদের মনোরঞ্জন করতো ।
হিন্দু ধর্মীয় পুরাণ ছাড়াও কিন্নর-কিন্নরীদের দ্যাখা মেলে বৌদ্ধধর্মীয় পুরাণেও । কিন্নরদের কথা পাওয়া যায় মহাযান পদ্ম সূত্রে । বার্মিজ পৌরাণিক উপকথা অনুসারে মহামতি বুদ্ধ পূর্বজন্মে যে ১৩৬ টি প্রাণীর বেশে ছিলেন, তার মধ্যে চারটি রূপ ছিলো কিন্নর । আর বুদ্ধের পায়ের ছাপে যে ১০৮টি প্রাণীর চিহ্ন ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে একটি হলো কিন্নরী ।
কিন্নর-কিন্নরীদের কৃতকর্ম অনুসারে কারো কণ্ঠ ভালো হলে তাকে বলা হয় কিন্নরকণ্ঠ, আর ক্ষমা-অনুগ্রহ-সৌন্দর্যের প্রতীক হিশেবে ধরা হয় কিন্নরীদের । প্রাচীন ভারতের এক ধরণের বীণা'র নামকরণও করা হয়েছিলো কিন্নর-বীণা নামে ।
যাই হোক, কিন্নরীদের চাক্ষূষ দেখার লোভ আর সৌভাগ্য অনেকেরই মনে লালায়িত হয়ে উঠেছে সময়ে সময়ে । আর হিমাচলের কিন্নর প্রদেশ এলাকায় এদের অবস্থান নিয়ে বহু আঙ্গিকে তর্ক বিতর্কও হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ।
আমাদের কৃষ্ণদা এক শব্দে রসিক মানুষ । প্রেমিক মানুষ । দেবভূমি কিন্নরে এসে কিন্নরী দেখার সুযোগ আর উৎসাহ তিনি সামলাতে পারলেন না । আমরা একে ওকে তাকে জিজ্ঞাসা করে কিন্নর কিন্নরীদের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে অবহিত হতে চাইলাম । শেষমেষ একটা গ্রামের ( এখানে গ্রামের নাম বলছিনা ) সন্ধান পেলাম । সেই গ্রাম হলো ভারত ও চীনের দখল করা তিব্বত সীমান্তের সর্বশেষ গ্রাম ।
আমরা সুইসাইড পয়েন্ট দেখে এগিয়ে চললাম সেই গ্রামের পথে । আরো কিছুটা পথ চলার পর, পাকা সড়কপথ ফুরিয়ে গেলো । আমরা গাড়ি থেকে নেমে পাথর কাটা খাড়া চড়াই পথে পায়ে চলতে লাগলাম । আমাদের পাহাড়ে চড়বার অভ্যাস নেই । তাই খুব স্বাভাবিক নিয়মেই চিৎকুলের মত এখানেও পায়ের মাসল্ অল্পস্বল্প ব্যথা করছিল । আর কোমরও ধরে ধরে যাচ্ছিলো । তবুও আমরা এগিয়ে চললাম ।
কৃষ্ণদাকে এমনটাও বোঝানো হলো, যে যদি বাইরের কোন অপরিচিত মানুষ ওনার বাড়ির মহিলাদের দেখতে চাওয়ার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে, তখন উনি ব্যাপারটাকে ঠিক কেমন করে গ্রহণ করবেন । তিনি কি তার মা-স্ত্রী-বোন-দিদি-কন্যাকে বাইরের মানুষদের সামনে ঠেলে দেবেন, যাতে তারা মন প্রাণ ভরে, দুই চোখ উজাড় করে, নিজেদের মনের বাসনা চরিতার্থ করতে পারে ? নাকি দরজা জানলা বন্ধ করে বাইরের লোকের নজর থেকে বাড়ির মহিলাদের লুকিয়ে রাখবেন ?
কিন্তু কৃষ্ণদাকে ওইসব কে বোঝাবে ? তিনি তখন আপেলের মদের নেশায় বুঁদ । তার তখন কিন্নরীদের দেখা চাইই চাই । আমি, রূপেশ, স্বপনদা আর এগোলাম না । সাধনদারও খুব একটা ইচ্ছে ছিলো না যাওয়ার । কিন্তু কৃষ্ণদার পীড়াপীড়ির সামনে সাধনদার না যাওয়ার ইচ্ছেটা ফিকে পড়ে গেলো । সাতান্ন বছরের বাঙালী ট্যুরিস্ট কৃষ্ণদা কোথায় ঢুকে কি করে ফেলেন, এই নিয়ে আমরাও একটু টেনশনে ছিলাম ।
ইতিমধ্যে আমরা একটা ছোটখাটো দোকানে ঢুকে পড়েছিলাম । সেখান থেকে কিছু শুকনো খাবার আর সিগারেট কেনা হলো । আর আপেল থেকে তৈরী পাহাড়ী মদের খোঁজ নেওয়া হলো । দোকানদার জানালো ওদের গ্রামের ঘরে ঘরে এই মদ তৈরী করা হয় ।
কৃষ্ণদারা গ্রামের ভিতরের দিকে এগিয়ে গেলো । আমি আরও কিছুক্ষণ দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম । আমার সামনেই অতিকায় কিন্নর-কৈলাস পর্বতমালা তার বিশালকায় দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো । ডুবতে থাকা পড়ন্ত বেলার সূর্যের, লালচে গোলাপী আলোর আভা, বরফের উপর ছড়িয়ে পড়েছিলো ।
এই দোকান সংলগ্ন দিক থেকে ধ্যানাসনে উপবিষ্ট জটাধারী মহাদেবকে আর দেখা না গেলেও ঐ পর্বতমালায় আরো দুই খানা মুখের আকৃতি অস্পষ্টভাবে ফুটে উঠলো । তাদের একটা হলো নারী মুখ আর তার ঠিক পাশেই হাতির শুঁড় বিশিষ্ট একটা মাথার মত কিছু । রূপেশ জানালো ঐ নারী হলেন দেবী পার্বতী আর তাঁর পাশেই অবস্থিত হলেন সিদ্ধিদাতা গণেশ ।
আমি কিছুক্ষণের জন্যে আবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম, বরফ গলতে গলতে পাথরের গা বেয়ে নীরবে নেমে আসার মতো, পুরানের গভীর অতীতে । চারপাশের ঘটে চলা এক একটা মুহূর্তের স্বাক্ষী হয়েছিলাম আমি নিজের অজান্তেই ।
কিন্নর কৈলাসের উচ্চতা ৬০৫০ মিটার । এই পর্বতটি হিন্দু এবং বৌদ্ধ, উভয় কিন্নরবাসীর দ্বারা পবিত্র হিসেবে গণ্য করা হয় । এই পর্বতটিকে মাঝে মাঝে তিব্বতের কৈলাস পর্বতের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয় ।
কিন্নর কৈলাস পর্বত ( ৬০৫০মিটার ), আসলে একটি বিশাল "একশিলা স্তম্ভ" - যা মূলতঃ শিবলিঙ্গ বর্ণনার অনুরূপ এবং দিনের বিভিন্ন সময় হিসাবে লিঙ্গটি রঙ পরিবর্তন করে । একটি ৭৯ ফুট উল্লম্ব শিলা গঠন, যা শিবের প্রতিনিধিত্বের জন্য, ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করে এবং এই অঞ্চলে প্রাধান্য পায় । এটি শিবের পৌরাণিক জগতের অন্যতম একটি বাসস্থান বলে স্বীকৃত । জনশ্রুতি, প্রাচীনকালে শিবভক্ত বাণাসুর একে প্রতিস্থাপিত করেন ।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, এই মন্দির ভস্মাসুরের সময় থেকে রয়েছে । মারাত্মক প্রায়শ্চিত্তের পর এই অসুর (দৈত্য) দেবতা শিবের সিকট থেকে বর লাভ করেছিল যে, - 'সে যদি কোনো ব্যক্তির মাথা স্পর্শ করে তবে তা তৎক্ষণাত ভস্ম বা ছাইয়ে পরিণত হবে' । যেহেতু অসুর পার্বতীকে অধিকার করতে চাচ্ছিলো, তাই সে এই বর প্রাপ্তির পর শিবকে ভস্মে পরিণত করতে চেষ্টা করল । শিব অবস্থান পরিবর্তন করে লুকিয়ে থাকছিলেন । অবশেষে তিনি কিন্নর কৈলাসে আসেন ও কিছুসময় ধ্যানের জন্য এখানে থাকেন । এসময় ঘটনাক্রমে ভগবান বিষ্ণু অসুরকে হত্যা করার জন্য তাঁকে সাহায্য করেন । বিষ্ণু একজন নারী হিসেবে অসুরকে দেখা দেন এবং তাকে তার নিজের মাথায় হাত রাখতে বাধ্য করেন । ফলশ্রুতিতে ভস্মাসুরের মৃত্যু হয় ।
কিন্নর কৈলাস পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট গ্রাম কল্পা । একসময় এই অঞ্চল চিনি নামে পরিচিত ছিল । ৬০৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত কল্পার সৌন্দর্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না । কিন্নর-কৈলাশ শৃঙ্গের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে আছে ৭৯ ফুট উচু খাড়াই এক পাথরখণ্ড । স্থানীয়রা একেই শিবজ্ঞানে পুজা করেন ।
পুরাণ আর বাস্তবের সংমিশ্রিত মানসিকতায় আমার মনে একটাই প্রশ্ন এলো - কেন, একমাত্র কোন জাদুবলে, বা বিজ্ঞানের কোন নিয়ম মেনে, ঐ নির্দিষ্ট শিলাখন্ডেরই রঙ বদলে যায় প্রতিনিয়তঃ ? চারপাশের আর কোন শিলাখন্ডের কেন ঐ বিশেষ বৈশিষ্ট্য কেন দেখা যায় না ? এখানে বিজ্ঞান নীরব কেন ?
আমার কাছে এই সব প্রশ্নের উত্তর ছিলো না । খুব সম্ভবতঃ বস্তুবাদীদের কারো কাছেই নেই । ভাববাদী বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় হয়তো এর উত্তর আছে । যদিও তা তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় । এই নিয়ে ভাবনা চিন্তা এবং গবেষণা করবার বিস্তর পরিসর রয়ে গেছে বলেই আমার মনে হয় ।
নানারকমের ভাবনার ভারে আমার দেহ-মন-প্রাণ ভারী হয়ে উঠেছিলো । আমি চুপচাপ নিস্তরঙ্গ ঢেউ এর মতো, একা একা, হাঁটতে হাঁটতে, আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে চললাম ।
এই পথ অবদি উঠতে উঠতে চারপাশে অনেকবার বাজপাখি আর দাঁড়কাক দেখেছি ।
এখানকার পাহাড়ি বাজপাখি ঈগলপাখির শ্রেণীভুক্ত । আর এরা দেখতেও অনেকটাই ঈগলের মতো । এইসব পাহাড়ি বাজ পুরোপুরি পর্বতসংকুল জঙ্গলের বাসিন্দা । এরা ডালপালা জোগাড় করে গাছে বা পাথরের উপরে বাসা বাঁধে । এরা বেজি, ইঁদুর, খরগোশসহ নানা স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি ও সরীসৃপজাতীয় প্রাণী শিকার করে খায় । আর যে কোন জাতের সাপ এদের খুব প্রিয় খাদ্য ।
আর কাক নিয়ে এমনিতে আলাদা করে আমার আর কিছু বলার নেই । তবুও কিছু কথা এখানে সবিশেষ জানাতে চাই ।
আমরা চেল এ যাবার সময় দুপুরে যেখানে থেমেছিলাম লাঞ্চ করবো ভেবে, সেখানে হাত ধোয়ার সাবানটাকে আমাদের সামনে থেকেই দাঁড়কাকে মুখে করে তুলে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো । আর হিন্দি সিনেমা দেখে দেখে, ভ্রান্ত একটা ধারণা ধারণা, আমাদের মনে গেঁথে ছিলো । তা হলো দাঁড়কাক একটা অশুভ পাখি, যা আসলে একান্তভাবেই একটা ভ্রান্ত ধারণা বিশেষ ।
কাক আমাদের অতি পরিচিত কর্ভিডি জাতীয় পাখি । বৈজ্ঞানিক নাম— Corvus Brachyrhynchos আর আরবিতে কাককে বলা হয় - গোরাবুন । বিশ্বের পাখি গবেষকদের মতে পৃথিবীতে বসবাসকারী পাখিদের মধ্যে কাকের জাতই সবচেয়ে বেশি।
পৌরানিক মহাপ্লাবনের পর নৌকা থেকে সর্বপ্রথম কাককেই জমিনে ছাড়া হয়েছিল। কোরানেও কাককে জ্ঞানী পাখির চরিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে ।
অনেকে মনে করেন, মরা গাছে কাক ডাকলে নাকি কারো মৃত্যু সংবাদ আসে। দিনের চতুর্দশ প্রহরে ঘরের কোণ থেকে কাক ‘কা কা’ শব্দ করলে শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হবেন।
এদিকে কৃষ্ণদারা তো কিন্নরী দর্শনের আশায় আর আপেল থেকে তৈরী দেশী মদের খোঁজে গ্রামের ভিতরে ঢুকে তড়িঘড়ি করে ঢুকে পড়েছিল আর রূপেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো কৈলাস পর্বতের গায়ে ফুটে ওঠা পৌরাণিক পার্বতী আর গনেশের ছবি তোলা নিয়ে ।
আমি এসবের থেকে অনেকটা দূরে এগিয়ে চলে এসেছিলাম নিজের মনে একলা চলতে চলতে । কিছুটা এসে দেখলাম আমাদের গাড়ির দরজা হাঁ করে খোলা । আর ড্রাইভার বেচারা খানিকটা হতভম্ভ, খানিকটা উত্তেজিত আর কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ।
ব্যাপারটা বিশদে জানতে চাইলাম । পাশের গাড়ির একটা ড্রাইভার খুব উত্তেজিত অবস্থায় হিন্দিতে যা জানালো, তার সারমর্ম হলো অনেকটা এই রকম -
এখানে প্রায়ই রাস্তাঘাটে যত্রতত্র, ভোলে বাবার বাহনদের ঘুরে বেড়াতে কিংবা ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ভাবে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় । তাদের কেউ কেউ জাবর কাটেন, কেউ কেউ ঝিমান । কখনো একলা, আবার কখনো বা জনা দুই-তিন একত্রে জটলা করে ।
কিছুক্ষণ আগে এখানেও ঠিক তেমন ভাবেই দুটি ষন্ড চুপচাপ নিবিষ্ট হয়ে চিন্তামগ্ন মনে বসেছিলো । এখানে ঠিক সামনেই রয়েছে সেনাবাহিনীর ছাউনি । সেখান থেকে কিছু শুকিয়ে আসা পরিত্যক্ত সব্জী আর ফলমূল ফেলে দিতে এসেছিলো কোন একজন । আর ওনার সাথে পেছন পেছন চলে এসেছিলো বেশ কয়েকটা পাহাড়ি বাঁদর ।
ঐ বাঁদরের দলের জনা কয়েক আবার ষাঁড় দুটোর থেকে খাবার কেড়ে হাতিয়ে নেওয়ার মতলবে ছিলো । কিন্তু বিশেষ সুবিধে করতে না পেরে ওরা ওদের কান মুলে, লেজ মুচড়ে পালিয়ে পাইনের ডালে চড়ে যায় ।
এরপরেই ষাঁড় দুটো আচমকা ক্ষেপে ওঠে । ওরা ভুলবশতঃ একে অন্যকে পরস্পরের উপর সন্দেহজনিত কারণে শত্রু ভেবে ভয়ানক রকমের মারামারি শুরু করে দেয় ।
তারপর একে অন্যকে গুঁতো আর ধাক্কা মারতে মারতে ওরা ক্রমশঃ খাদের দিকে চলে আসে । এদিকে আবার খাদের ধারে, বেশ কিছু গাড়ি পরপর পার্কিং করে রাখা ছিলো । ওদের পারস্পরিক মারামারি আর ঠেলাঠেলির চোটে, একটা মারুতি অল্টো গাড়ি সোজা খাদের অতলে, একেবারে গভীরে নিমেষের মধ্যে তলিয়ে যায় ।
আর ঐ অল্টোর পাশেই ছিলো আমাদের টয়োটা ইনোভা । আমাদের গাড়িটার পিছনের লাল আলোর ইন্ডিকেটরটাও ওদের একজনের শিং এর গুঁতোয় ফেটে ভেঙে যায় ।
আমাদের ড্রাইভারটাকে আপন মনেই বিড়বিড় করতে দেখলাম - " অগর উস অল্টো কে বদলে ইয়ে ওয়ালা ইনোভা হোতা ! অগর উস গাড়ি কে অন্দর হাম হোতে ! " আমি ড্রাইভারকে বকা দিলাম । খাদের ধারে কি আনন্দে গাড়ি পার্ক করে রেখেছিলো, তা জানতে চাইলাম । আর এটাও বলে দিলাম, ও যেন ভবিষ্যতে আর এমন করে ভুলভাল জায়গা দেখে গাড়ি পার্কিং না করায় ।
Comments