হিমাচলের পথে

হিমাচলের পথে @ রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য
--------------------------------------------------
26.03.2018

এখন রাত তিনটে বেজে চব্বিশ । আমরা পাঁচ জন বি.টি.রোড ধরে কলকাতা এয়ারপোর্ট এর পথে এগিয়ে চলেছি । আপাতত লক্ষ্যস্থল সকাল ৫.৪৫ এর হায়দ্রাবাদ গামী ফ্লাইট । কাঁচা ঘুম ভেঙে পৌনে তিনটে নাগাদ উঠে পড়েছি । চোখ বেশ জ্বালাপোড়া করছিলো খানিকক্ষণ আগে পর্যন্ত । এখন আমি ড্রাইভারের পাশের সীটে চুপচাপ বসে । গাড়ির গতিবেগ ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটারের ও বেশী । চললাম বন্ধুরা । পরে আবার সময় সুযোগ আর নেটওয়ার্ক পেলে ফিরে এসে আপডেট দিয়ে যাবো । যার যতো প্রশ্ন মাথায় আসছে, চেপে রাখুন । সব উত্তরগুলো সময় মতো পেয়ে যাবেন । এখন আপাতত সকলকে বিদায় জানালাম ।

*****

আমাদের ফ্লাইট চণ্ডীগড় পর্যন্ত ছিলো ভায়া হায়দ্রাবাদ । সেখান থেকে ভায়া গাড়ি সিমলায় এসে রাত্রিবাস । কিন্তু আমরা সকালের হায়দ্রাবাদ গামী ফ্লাইট মিস করি । আমাদের এক সিনিওর দাদা একটু অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন । আমরা ভেবেছিলাম হয়ত আমাদের সবাইকে আবার যার যার ঘরেই ফিরে যেতে হবে । কিন্তু কপালের নাম গোপাল । তাই তেনার মোহন বাঁশি আমাদের কে পথ দেখিয়ে দিলো । আমাদের ভাগ্যে টিকিট অ্যাডজাস্টমেন্ট এর গল্প ধরা ছিল । তাই অতি আশ্চর্য্য জনক ভাবে হলেও আমরা না জানি কেমন করে একসাথে পাঁচ জনেরই টিকিট করিয়ে নিলাম আরো বেশি কিছু টাকায় রফা করে । আমাদের আর হায়দ্রাবাদ ঘুরে চণ্ডীগড় আসা হলনা । আমরা চলে এলাম দিল্লী । দিল্লী থেকে আবার Toyota Innova ধরে চলে এলাম আম্বালা ক্যান্টনমেন্ট । এখান থেকেই আমাদের সিমলার পথে যাত্রা শুরু করা গেলো । এখন ছয়টা বেজে কুড়ি । আমরা রওনা দিলাম সিমলার পথে । আজ ওখানেই আমাদের রাত্রি বাস । কাল থেকে আমাদের পায়ে হেঁটে পথ চলা শুরু ।

*****
27.03.2018 ( সিমলা )
*****

গতকাল রাতে এখানে এসে উঠেছিলাম অবশেষে । আজ গন্তব্যস্থল - চেইল / চেল (  Chail ). আজকের রাতটা চেল - এই কাটাবো আমরা । এখান থেকে সকাল এগারোটার ভিতরে রওনা হয়ে যাব আমরা । আপাততঃ তারই প্রস্তুতি নিচ্ছি এখন । গতকাল আমাদের গাড়ি পাহাড়ে চড়বার পর থেকেই নেটওয়ার্ক খুব ডিসটার্ব করছিলো । সেই সময়কার কিছু গল্প পরে করবো । এখন রাখলাম । সকলকে সুপ্রভাত ।

******

এখন আমাদের গন্তব্যস্থল - চেল । প্রথমে ভেবেছিলাম কুফরি হয়ে চেল যাব । কিন্তু এই সময় কুফরি একেবারেই ন্যাড়া বটতলা । এখানে কিছু খচ্চর আর গাধা-ঘোড়ার মিক্সচার দেখতে পেলাম । আর পেলাম গোটা কয়েক চমরী গাই । এই সব জীবজন্তুগুলোকে ঠিকমত ভাবে পরিস্কার করা হয় না । তাই এদের দেহের বোঁটকা দুর্গন্ধে কাছাকাছিও যেতে মন করে না । তবুও অনেককেই দেখেছি, ওদের পিঠে চড়ে মহা আহ্লাদের সাথে ঘুড়ে বেড়াতে ।

আপাততঃ টিফিন সারব । চারপাশে কিছু চমরী গাই আর বাঁদর দেখতে পাচ্ছি । চারপাশে ঘন পাইনের বনের ভিতর দিয়ে এঁকে বেঁকে আমাদের গাড়ি এতটা চলে এসেছে । এবার একটু বিরতি । টিফিন করে চা পান । আর নো স্মোকিং এনিমোর । পাহাড় চড়তে হবে এর পর । দমের ও ঘাটতি হবে । এখন রাখলাম । পরে আসছি আবার ।

******

টিফিনে এগ চাউমিন অর্ডার করে ছাওয়ার নীচে বসে আছি । এই সময় এখানে মারাত্মক ঝাঁঝালো রোদের তেজ । ওদিকে চারপাশ জুড়ে একটা শিরশির করে ননস্টপ হাওয়াও বয়ে চলেছে । এমন সময় আমাদের সাধনদা একটা প্রশ্ন করে বসলো দোকানদার কে । উনি একমনে নিবিষ্ট চিত্তে এগ চাউমিন বানাচ্ছিলেন আমাদের অর্ডার মাফিক । প্রশ্ন শুনে হাসতে লাগলেন সেই সহজ সিধে মানুষটি ।

সাধনদা বললেন, - "আচ্ছা ! এক সওয়াল থা । ইঁহা পে যো ফরেস্ট এরিয়া দিখ রাহা হ্যায়, ক্যায়া উয়ো জঙ্গলী জানোয়ার সে ভরা হুয়া হ্যায়" ? দোকানদার উত্তরে জানালেন, - "দেখিয়ে ভাইসাব __ ইয়ে জঙ্গল মাসোবরা ( Jangal Mashobra ) হ্যায় । দিন মে তো সব ঠিক ঠাকহি দিখতা হ্যায় । লেকিন অন্ধেরে হোনেকে বাদ ইয়ে এরিয়া বহুত খতরনাক হ্যায় । ইঁহা পে চিতা, ভালু, লেপার্ড, জঙ্গলী বিল্লী, অউর বহুত সারে খারাপ চিজ ভি হ্যায়" ।

আমার তখন মনে পড়ে গেলো রুপেশ এর কথা । কাল রাতে সিমলা আসার পথে চুড়েল ( অপঘাতে মৃত মহিলার অশরিরী আত্মা ) এর প্রসঙ্গ উঠেছিল । অনেক ড্রাইভারের মুখেও আমি এই সব এলাকার রাত্রিকালীন উৎপাতের কথা শুনেছি । অনেক গাড়ি চালকের অনেক রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে এখানে । সে সব আর এখানে তোলার প্রয়োজন বোধ করছি না বন্ধুরা ।

ইতিমধ্যে আমার এগ চাউমিন খাওয়া হয়ে গেলো । একবার ব্যাপক স্বাদের আদা সহ দুধ চা ও খেয়ে নিলাম । অথচ পেটের আগুন নিভলো না । আবার একটা ডবল ডিমের ব্রেড টোস্ট অর্ডার করে দিলাম ।

এখানকার পাহাড়ী ঝরণার জল খুব সুস্বাদু । ঝরণা থেকে আহরণ করা এই জল খেলে খাবারও যেমন হজম হয়, তেমনি শরীরের জেল্লাও বেড়ে যায় অনেকটাই । গ্যাস অম্বলও হওয়ারও কোন প্রশ্ন নেই । এই এলাকার মানুষজন কেউ আমাদের মত জল কিনে খাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না ।

আমরা টিফিন সেরে আবার রওনা দিলাম । গাড়ি কুফরী হয়ে ইন্দিরা টুরিস্ট পার্কে এসে থামলো । আসার পথে কিছু বাঁদরকে সবাই মিলে বিস্কুটও খাওয়ালাম । এখন আমরা টুরিস্ট পার্কের ভিতরে বার এ ঢুকলাম । বীয়ার খাব 😊😊😊

*********

কুফরী হয়েই চেলের পথে - যতদূর নজর পড়ছে - শুধু সারি সারি ঘন পাইন গাছের সারি - সবাই কম বেশী বীয়ার টেনে বম্ - মাঝে মাঝে একটু আধটু অসাংবিধানিক শব্দ আলপটকা ছিটকে ছিটকে বের হচ্ছে এর তার মুখ থেকে । যত চেলের দিকে এগিয়ে চলেছি; ততই যেন জঙ্গলের ঘনত্ব বেড়ে চলেছে । আর গভীর নীরবতায় ক্রমশঃ ডুবে চলেছি । গাড়ির কাঁচ আলতো করে খোলা । বাইরে চরম কড়কড়ে রোদ । তবুও আলোছায়ার লুকোচুরিকে পাশ কাটিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়িখানা । পাইনের ঘন বনের জঙ্গলী ঘ্রাণ, আর নাক জ্বালা করতে থাকা হালকা ঠান্ডা হাওয়া - সব মিলেমিশে জাস্ট বিনদাস !!!

*****

হোটেল Swaran Palace ... আজ এখানেই আমাদের রাত্রিবাস । আর কিছুক্ষণ পরেই এখানে ঢুকে পড়বো আমরা ।

বীয়ার টেনে টেনে সকলেরই কম বেশী খুব জোর টয়লেট লেগেছে । চারপাশে অসংখ্য বাঁদর আর তাদের কাচ্চা বাচ্চার ভীড়ও লেগে আছে ।

এখানকার লোকাল লোকজন গুলো ভারী অদ্ভূত । সঠিক ঠিকানা কেউ দিতে পারছেনা । গতকাল রাতের হোটেল খুঁজে বের করতে আমাদের হাল টাইট হয়ে গেছিলো । সিমলা শহরে ঢুকেও টানা এক ঘন্টা আমরা হোটেল খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেছিলাম । এটাই বোধহয় অনলাইন বুকিং এর সবচেয়ে বড়ো জ্বালা । সবাই কম বেশি আমাদের হাঁদা-গঙ্গারাম বানাতে উদ্যত । পরিস্থিতি একেবারেই যাচ্ছেতাই ।

********
28.03.2018 ( চেল উপত্যকা )
*******

আজ আমরা চেল / Chail হিল স্টেশন থেকে সারাহান যাবো । পথের দৈর্ঘ্য ১৭৭ কিমি এর বেশী । ড্রাইভারের হিসেবমতো প্রায় সাড়ে আট ঘন্টার পথ । ওখানে আমরা Sarahan Tea Palace এ থাকবো । আগামীকাল গোটা দিন রাত ওখানেই কাটাবো ।

গতকাল আমরা এখানে আসতে আসতে প্রায় চারটে বাজিয়ে দিয়েছিলাম । তারপরে গিয়েছিলাম কালীমায়ের মন্দিরে । স্থানীয় ভাষায় এর নাম হলো কালী টিব্বা বা কালী কা টিব্বা ।

এটা চেলের সবথেকে আকর্ষণীয় অংশ এবং সর্বোচ্চ ভিউ পয়েন্ট । গাড়িতে করে অনেকটা খাড়াই পথ ভেঙে আমরা মায়ের মন্দিরে গেলাম । এই পথে কোথাও কোথাও দুই পাশেই অতল গভীর খাদ । আর পুরো পথটাই মাটির ।

একেবারেই জনমানবহীন নির্জনে এই মন্দিরের অবস্থান । গভীর ঘন পাইন আর রডোডেনড্রনের বন অতিক্রম করে আমরা মন্দিরে যখন প্রবেশ করলাম, শরীর মনের ক্লান্তি এক লহমায় দূর হয়ে গেলো ।

উপরে উঠে গোটা চেল উপত্যকাকে সবুজ পাইনের চাদরে ঢাকা একটা ঘুমন্ত শীতকাতুরে ভালুকের মত মনে হলো, যে তার নিজের আমেজে নিজেই নিজের ঘোরে আবিষ্ট । আমরা ছবি আর ভিডিও তুললাম । ঘুরে ঘুরে গোটা চেলের আকর্ষণীয় রূপে ঘন্টাখানেক ডুবে থাকার পরে আবার গাড়িতে চেপে নীচের বাজারের দিকে রওনা দিলাম । বেশ খিদে খিদে পাচ্ছিলো আমাদের ।

ফেরার সময় আবার সেই পাইন আর রডোডেনড্রনের গহন গহীন অরণ্য ভেদ করে চলতে থাকা । গাছগুলো সব সোজা উপরের দিকে উঠে গেছে । আর এক একটা গাছের উচ্চতা ছয় - সাত - আট তলা বাড়ির মত ।

কিছুটা নেমে এসে একটা জায়গায় আমরা গাড়ি থামালাম । যে যার মত বাথরুম আর স্মোকিং করলো । তারপর আমরা পায়ে হেঁটে চড়াই ভেঙে ভেঙে পাইনের বনের একটু গভীরে প্রবেশ করলাম । এখানে বন এত ঘন, যে সূর্যের আলো এসে মাটিতে আছড়ে পড়বারও সুযোগ পায় না ।

সাধনদা পটাপট করে রডোডেনড্রনের লাল রঙা ফুল ছিঁড়ে ফেললো বেশ কয়েকটা । আমিও মাটিতে অবহেলায় শুকিয়ে পড়ে থাকা অসংখ্য পাইন ফুলের থেকে দুই-চারটে কুড়িয়ে নিলাম । কিছু সেল্ফি / নিজস্বী আর গ্রুপ ফটোও নেওয়া হলো ।

এদিকে চারপাশ জুড়ে অন্ধকার নেমে আসছিলো । আমরা আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম । বাজারে এসে একটা দোকানে ঢুকে গরমা গরম সিঙাড়া, পাওভাজি ( পাঁউরুটিকে কোণাকুনি কেটে ব্যাসন গোলায় ডুবিয়ে ভাজা ) আর আলুর পকোড়া খেলাম । তারপরে এলাচ দেওয়া একটা করে অসাধারণ দুধ চা ।

আমার সেই সিমলাতে ঢোকার পর থেকেই গলায় একটা ব্যাথা ব্যাথা ভাব করছিলো । ঢোঁক গিলে কিছু খেতেও কষ্ট পাচ্ছিলাম । সেটা নিয়েই চলছি গোটা পথ । হোটেলে গরম জল জোগাড় করে খাচ্ছি । গার্লগেলও করছি । কিন্তু গলার ঐ অস্বস্তিটা আর যেন ছাড়ছেনা ।

এলাচ দেওয়া গরম দুধ চা খেয়ে খুব তৃপ্তি পেলাম । তারপর হোটেলে ফিরে শুয়ে বসে আড্ডা মেরে গড়িয়ে কাটিয়ে দিলাম ।

আজ সকালে ঘুম ভাঙলো সকাল সাতটার পরে । পর্দা সরিয়ে কাঁচের জানলা দিয়ে ভোরের ঘুম ভাঙা চেল দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো । চারপাশ জুড়ে দুধের সরের মতো ঘন কুয়াশার চাদর দিয়ে গোটা উপত্যকাটাই ঢাকা । গোটা উপত্যকার মানুষজনই এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন । আমি কয়েকটা ছবি তুলবো ভেবে উঠে পড়লাম ।

গলার ব্যাথাটা আর কিছুতেই কাটছে না । গিজার চালিয়ে জল গরম করে গার্লগেল করে একটু আরাম পেলাম । তারপর ব্রাশ করে বের হলাম ।

এখানে অসংখ্য ছোট ছোট গ্রাম । একটা গ্রাম থেকে আরেকটা গ্রামের দূরত্ব সর্বাধিক ছয়-সাত কিলোমিটার । আর এক একটা গ্রামে সর্বাধিক আট থেকে দশটি পরিবার ঘরবাড়ি করে থাকছে ।

এরা চাষবাস করে আর টুকটাক দোকানপাট চালায় রাস্তার ধারে । এখানে মূলতঃ অল্পস্বল্প গম আর হরেক রকমের স্থানীয় পাহাড়ি ফল চাষবাস হয় । জুন জুলাই মাসে ফসল ঘরে ওঠে । জমির দাম এখানে বিরাট কিছু নয় । রাস্তার ধারে এককাঠা জমির দাম একলাখ টাকা ।

কেউ যদি ভেবে নেন এখানে জমি কিনে কোনও ব্যবসা করবেন, তবে তাকে প্রাথমিক পর্যায়ে এখানকার স্থানীয় পুরুষ বা মহিলাকে বিয়ে করতে হবে । তারপর সেই সূত্রে কিছু জমি জমা হয়তো তার ভাগ্যে জুটতে পারে ।

হোটেল থেকে বেরিয়ে মন ভরে কিছু ছবি তুলে নিলাম । তারপর ফিরে এসে আজকের লম্বা সুদীর্ঘ সফরের জন্য তৈরী হয়ে নিলাম ।

আজকের পথ অনেকটা । বেশ চাপ আছে । তাই এখন আপাততঃ সকলকে বিদায় জানাচ্ছি । সকলকে সুপ্রভাত । ভালো থাকুন ।

******

নারকান্ডা থেকে গাড়িতে এখনো তিন ঘন্টার পথ সারাহান ।

যাবার পথে চলন্ত গাড়ি থেকে পাইন আর রডোডেনড্রনের বন ছাড়াও মাঝে মাঝেই ধাপ চাষের জমি দেখতে পেলাম, যেখানে বেশ ভালোই লোকাল শাক-সব্জীর চাষ হয় । আর পেলাম আপেল - ন্যাসপাতি গাছের ভিড় । গাছ গুলো সব মশারির নেটের মত সাদা রঙের অ্যান্টি হেজিং নেট দিয়ে ঢাকা । আপেল গাছগুলো সব পাতাহীন ন্যাড়া হলেও ন্যাসপাতি গাছগুলোতে খুব সুন্দর মোলায়েম সাদা রঙের থোকা থোকা ফুল ফুটে থাকতে দেখলাম । বন কেটে ধাপ চাষ এখানকার এলাকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ।

মাঝে এক জায়গায় চা খেতে নামলাম । গলার ব্যাথাটা খুবই সমস্যা করছিলো । আমি দোকানদারকে খাবার জল গরম করে দিতে বললাম । তারপর চা দিতে বললাম ।

জল আর চা খেয়ে যখন গাড়িতে উঠতে যাব, এমন সময় আমাদের সামনে দিয়ে পর পর গোটা তিরিশেক বা তারও কিছু বেশী ইন্ডিয়ান আর্মির ট্রাক প্রচন্ড গতিতে ছুটে বেরিয়ে গেলো । এমন ধরনের ট্রাক সাধারণতঃ দুই চারটে করে পাচ্ছিলাম পথ চলার মাঝে মাঝে । আর এবারে একসাথে পর পর অতগুলো গাড়ি যেতে দেখে একটু অবাকই হলাম ।

আমাদের ড্রাইভারটির নিজের কাকু স্বয়ং ইন্ডিয়ান আর্মিতে কর্মরত এবং চীনা সীমান্তে পোস্টিং থাকার সুবাদে জানা গেল সীমান্ত এলাকায় চীনা সেনাদের সাথে ভারতীয় সেনা বাহিনীর আজ ভোর রাত থেকেই ঝামেলা লেগে গেছে । তাই এত তৎপরতার সাথে রিসোর্স সাপ্লাই এর কাজ শুরু হয়ে গেছে ।

হাল্কা করে সিগারেট মশলার সাথে চরস টেনে একটু ঝিম ঝিম ভাব পাচ্ছে আমার আর খানিকটা ঘুম ঘুম আমেজও আসছে ।

তাই আপাততঃ একটু ব্রেক নিচ্ছি বন্ধুরা । সকলকে শুভ দ্বিপ্রহর ।

*****

রামপুর ঢোকার আগে - আমদের দুপুরের খাওয়া আজ ওখানেই সেরে নেবো ভাবছি । আমাদের পাশে পাশেই ছুটে চলেছে শতদ্রু নদী ( Sutlej )

*****

[ Rampur falls along the ancient trade route to Afghanistan, Ladakh, China and Tibet. Rampur is famous for its handspun blankets that are popularly known "Rampuri Chaddar" ] - Source from Internet.

শহরটা ভারি সুন্দর । সমুদ্র লেভেল থেকে তিন হাজার ফুট উপরে । অনেকটা সিকিম টাইপের ।

এ হেন রামপুর শহরে ঢুকে মন ভরে গেলো । এত ঘন জনবসতি অনেকক্ষণ নজরেই আসেনি । তবে গাড়ি পার্কিং করতে পারলাম না ।অগত্যা সাময়িকভাবে দুপুরের আহারেও আপাততঃ বিরতি টানতে হলো আমদের ।

এখানে আসতে আসতে পথে নানারকমের গাছ নজরে পড়লো । নতুন মুখগুলোর ভিতরে দেখলাম ইউক্যালিপটাস, থোকা থোকা লাল ফুলের গোছা ঝুলতে থাকা বটলব্রাশ । এমনকি বট আর অশ্বথ গাছও নজরে পড়লো । নজরে এলো ফুটে থাকা কাশফুল ও ।

অনেকক্ষণ ধরেই আমাদের পাশ দিয়ে গায়ে গা ঘেঁষেই ছুটে চলেছে অপরূপ শতদ্রু নদী ( Sutlej ) । এক এক পাহাড়ের ভাঁজে তার এক এক রকমের রূপভেদ তার ।
নদীর সবুজ রঙের জল, নানা রকমের রকমারি পাথরের বিভঙ্গে আর স্রোতের আকর্ষণে আমি যেন ভাসতে ভাসতে ডানা মেলে দিলাম জলের বুকে ।

আর পাহাড়গুলো এখানে দেখলাম অনেকটাই ন্যাড়া গোছের । তার কারণ এখানে প্রচন্ড রকমের বরফপাত হয় । আর সেই সব জায়গা গুলো কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা । তবে মাঝে মাঝে খোঁচা খোঁচা অনেকদিনের না কাটা দাড়ির মত, কিছু পাইন আর ইউক্যালিপটাসকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম ।

এখানে সেনাবাহিনীর ছাউনিও জায়গায় জায়গায় নজরে এলো । আর নজরে এলো মুখে জাল পরে সর্বাঙ্গ ঢেকে কিছু লোক জায়গায় জায়গায় মধুর চাষ করছে । পথের দুই পাশ দিয়ে মৌমাছি পালনের বাক্স সারিবদ্ধ ভাবে সাজানো ।

তবে এই যাত্রাপথের এখনো অবদি সেরা পাওনা উত্তাল শতদ্রু নদীর অবাধ উশ্ছৃঙ্খল উদ্দাম গতিধারা । এ নদী যেন একটা দুরন্ত দামাল অশান্ত ছেলে । ছুটেই চলেছে এক নাগাড়ে বিরামহীন ভাবে ।

যাই হোক । ব্যাপক খিদে পাচ্ছে । এবার একটু পেটপুজো না করলেই নয় । আমাদের গাড়িটা এবার থেমেছে অবশেষে ।

এবার একটু বিরতি নিচ্ছি । আশাকরি বন্ধুদের সকলের পেটপুজো হয়ে গেছে । এবার আমাদের পালা ।

******

শতদ্রু নদীর পাশে বসে দুপুরের খাওয়া - আর এই চড়া রোদেলা দুপুরেও কুলকুলে ঠান্ডা হাওয়া - চরম !!!

******

[ Sarahan, a small village, is the site of the Bhimakali Temple, originally known as Bhimadevi Temple, dedicated to the mother goddess Bhimakali, presiding deity of the rulers of the former Bushahr State.

The temple is situated about 170 kilometres from Shimla and is one of 51 Shakti Peethas.

The village is known as the "gateway of Kinnaur", being near the old Indo-Tibetan Road.

Seven kilometers below (17 km by road) Sarahan is the river Satluj.

Sarahan is identified with the Shonitpur mentioned in Puranas.

Sarahan Bushahr has been the summer capital of Bushahr kingdom, with Rampur Bushahr considered as the winter capital. ] - source Internet.

অবশেষে রাত আটটা বেজে গেলো আমাদের সারাহান পৌঁছাতে । এটা একটা প্রায় জনবসতিহীন গ্রাম । গুটি কয়েক হোটেল আর গোটা গ্রামটা রাতের আঁধারে জুড়ে আছে সৌরবিদ্যুৎ এর আলোয় ।

আজ চারটে নাগাদ দুপুরের খাওয়ার খেয়ে আমরা যখন যাত্রা করলাম, তখন আমরা জানতেও পারিনি, যে কি পরিমাণ দুর্ভোগ আমাদের কপালে অপেক্ষা করে আছে ।

আমাদের গাড়ির স্টিয়ারিং টা একটু সমস্যা করছিল সেই শুরুর থেকেই । আমাদের ড্রাইভারটা 'ঝুরি' / Jhuri - র সবথেকে পুরানো একটা গ্যারেজ এ প্রায় চল্লিশ মিনিটের বেশী সময় নিয়ে নিলো গাড়ির সার্ভিসিং করাতে ।

এই ফাঁকে আমাদের টিমের রুপেশ আর কৃষ্ণদা ছুট লাগালেন বীয়ারের খোঁজে । আমার আর সাধনদার গলায় বেশ ভালোই ব্যথা । আর ঠান্ডা বীয়ার এখন আমার কাছে একেবারেই বিষতুল্য ।

সকালের ব্রেকফাস্টে ডিম পাঁউরুটি কলা সহযোগে গরম চা ও খেয়েছিলাম । গরম চা এর সান্নিধ্য আমাকে অপার্থিব সুখে ভরিয়ে তুলেছিল । এখন বীয়ার টেনে সেই অবস্থার অবনতি করতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিলো না আমার ।

আর দুপুরেও মিক্সড থালি অর্ডার করেছিলাম । সুতরাং পেট প্রায় ভর্তিই ছিলো । সুতরাং নিজের গলা ভেজাতে একমাত্র গরম চা আর জল ছাড়া অন্য কোন আইটেমের ছবি কল্পনাতেও আনতে পারছিলাম না ।

তাই আমিও এই সুযোগে পটাপট কিছু ছবি তুলে নিলাম । যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো ফলে উপচে পড়া পাহাড়ী ডুমুর গাছ আর চুপচাপ একপাশে ঠেস দিয়ে বসে থাকা বাবা ভোলানাথের প্রিয় বাহন ।

গাড়ি ঠিকঠাক করে নিয়ে ড্রাইভার চলে এলো । ইতিমধ্যে বীয়ার টেনে ফিরে এলো আমাদের বাদ বাকী সঙ্গীরাও । আবার গাড়ি ছুটে চললো সারাহান এর পথে ।

এরপর আসল গল্পে আসি ।

সারাহান যেতে হলে সকলকেই একটা ব্রীজ পার হতে হয়, যেটা মাস খানেক আগেই চীনা সৈন্যবাহিনী বোমাবাজি ( মর্টার আর রকেট লঞ্চার সহযোগে ) করে ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলেছিলো, যাতে ভারতীয় সেনাবাহিনী আপৎকালীন প্রয়োজনের সময় ঐ সব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যোগাযোগ রক্ষা করতে সম্পূর্ণভাবে অসমর্থ হয় ।

এই গল্পটা সম্পর্কে আমরা বা আমাদের ড্রাইভারটিও বিশেষ রকম ভাবে অজ্ঞ ছিলো । আমরা আমাদের মত করেই ঐ পথের দিকে এগিয়ে চলে এসেছিলাম অনেকটা । ভেবেছিলাম সন্ধ্যে ছয়টার আগেই আমরা আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাব ।

কিন্তু ভাঙা ব্রীজ অবদি যাওয়ার কিছুটা আগের থেকেই আমরা আবার গাড়িতে ব্যাক গিয়ার দিয়ে দিলাম । স্থানীয় ছেলেরা আমাদেরকে বিষয়টা ভালোরকম ভাবে জানিয়ে দিলো । তাদেরকে ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া তখন আর কীই বা করতে পারতাম জানিনা ।

যাই হোক, আমরা আবার ফিরতি পথে গাড়ি ঘুরিয়ে নিলাম । গাড়ির ভিতরে ব্যাপক সব হিন্দি গান বাজছিলো । আর আমরা সকলেই গল্প-গুজবে মশগুল হয়ে ছিলাম । এর ফলশ্রুতি হিসেবে আবার আমাদের ড্রাইভারটি পথ ভুল করে অন্যপথে চলে গেল ।

এদিকে বেশ খানিকটা পথ চলে আসার পরে না জানি কেন, আবার আমাদের মনে একটু সংশয় দেখা দিলো । একে তাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতে নিজেদের ভুল সম্পর্কে আবার পাকাপাকিভাবে সুনিশ্চিত হলাম ।

এবার গাড়ির ড্রাইভার খুব সিরিয়াসলি গাড়ি চালাতে লাগলো । আমরা আরো খানিকটা খোঁজাখুঁজির পরে আমাদের সর্বশেষতম বিকল্প পথ ধরে সারাহানের দিকে একটু একটু করে অগ্রসর হতে থাকলাম ।

কিন্তু ঐ পথে রাস্তা বলতে প্রায় কিছুই ছিলো না । ছিলো শুধু নুড়ি পাথর বোল্ডার আর খুলে খুলে অতল খাদের গভীরে তলিয়ে যাওয়া মাটির চাঙ্গর । আমাদের ড্রাইভার খুব সতর্কতার সাথে ড্রাইভিং করছিলো । তবুও মাঝে মাঝেই ক্লান্তি জনিত কারণে ওরও হাই উঠছিলো ।

আমাদের রীতিমতন আতঙ্ক বোধ হচ্ছিলো । কারণ ঐ পথে দুটো ছোট চার চাকার গাড়িও পাশাপাশি চলতে নিতান্তভাবে অক্ষম ।

প্রকৃত অর্থে ওই এলাকাটা ছিলো একটা বিশালকায় আপেল বাগান । আমাদের গাড়িটা ঐ বাগানের ভিতর দিয়েই চলতে লাগল, যার একটা দিকে শুধুই গভীর খাদ ।

আর এই এলাকার পাহাড়গুলোতে সুবিশাল পাইন বা রডোডেনড্রনের গাছও নেই, যে ঢাল বেয়ে খাদের দিকে গড়িয়ে নামতে থাকা গাড়িকে অনায়াসে আটকিয়ে দেবে ।

রাস্তা বলতে প্রায় কিছুই ছিলো না । ছিলো এবড়ো খেবড়ো ছোট বড় মাঝারি আকৃতির পাথর । তার উপর দিয়েই লাফাতে লাফাতে হেলতে দুলতে চড়াই এ উৎরাই এর চ্যালেঞ্জ নিচ্ছিলো আমাদের গাড়িখানা । আমরাও মোটামুটি খানিকটা ভয়ে ভয়ে আর অনেকটা বিস্ময়ে বড়ো বড়ো চোখ করে গাড়ির গতিপথের দিকে চেয়েছিলাম ।

আমি বিলক্ষণ টের পাচ্ছিলাম যে সকলেরই কম বেশী বুকের ভিতরে দুরু দুরু শুরু হয়ে গেছে । দুই একজনের টুকটাক ফোনও আসতে শুরু করেছিল এর ভিতর । তারা দেখলাম কেউই কথা বলতে খুব একটা ইচ্ছুক নয় । সকলেই কম বেশী চরম টেনশনে । কারো মুখ দিয়েই আর কোন শব্দ বের হচ্ছেনা । গোটা যাত্রাপথে এই প্রথমবারের মত গাড়ির ভিতরে কোন রকমের গান বাজনাই চলতে দেখলাম না । বেশ অন্যরকম অনুভূতির মিশ্র অভিজ্ঞতার ভারে গাড়ির ভিতরের পরিবেশ সাময়িকভাবেই খানিকটা থমথমে হয়ে গেছিলো ।

ঐ রকমের বিপদজ্জনক সরু উঁচু আঁকা বাঁকা খাড়া এবড়ো খেবড়ো পথে গাড়ি চালানো সত্যিই খুব কঠিন । পথের বাঁক বা টার্ন গুলো ভয়ঙ্কর রকমের তীক্ষ্ণ এবং পাশাপাশি দুটো ছোট গাড়ি চলারও উপযুক্ত নয় । তার উপরে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো একটার পর একটা গাড়ি উল্টো দিকের পথ ধরে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিলো ।

আমাদের গাড়িও বেশ কয়েকবার বেকায়দায় পড়ে গেছিলো । আমরা একটা পাহাড়েই ক্রমাগতঃ উপরের দিকে চড়ছিলাম । পাহাড় কাটা পায়ে চলা পথে এই ভাবে গাড়ি চালানো মানে যে কোন সময়ে একটা চরম খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া । আর সেটা আমাদের সাথে বিক্ষিপ্ত ভাবে হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল ছিলো ।

উল্টো দিক দিয়ে অল্টো, মারুতি ৮০০, ডাম্পার লরি, বাসের মত গাড়ি, মাঝারি আকারের লরি, ট্রাক্টর, এমনকি বাইকও চলে আসছিলো । ১৯৯২ সাল নাগাদ চন্ডীগড় হয়ে সিমলা যাওয়ার পথে একবার চাকার চাপে মাটি আলগা হয়ে একটা যাত্রীবাহী বাসের জনা পঁয়ত্রিশেক মানুষ গভীর খাদের অতলে হারিয়ে গিয়েছিলো । সেই সময়ে ঐ রুটের ও রাস্তা এতখানি খারাপ ছিলো না । আরও টুকটাক ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ঘটনাও ঘটে গেছে এই সব সঙ্কীর্ন এলাকায়, যেগুলো এই পরিসরে বলাটা একেবারেই বেমানান ।

এই সব এলাকায় দুটো গাড়ির মুখোমুখি সাক্ষাৎ হলে, ক্রমাগতঃ উপরের দিকে চড়তে থাকা গাড়িকে সমসময় উপরের দিকেই এগিয়ে আসতে বলা হয় । আর উপর থেকে নীচের দিকে নামতে থাকা গাড়িকে পিছনের দিকে হটতে বলা হয় । আমাদের ক্ষেত্রেও সেটাই করতে হচ্ছিলো । আমরা যতখানি সম্ভব, মানিয়ে গুছিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছিলাম ।

এই আপেল বাগানের পাহাড়গুলো অনেকটাই উঁচু অবস্থানে রয়েছে । এখানে মাটি কেটে ধাপ বানিয়েই চাষাবাদ করবার চল লক্ষ্য করেছি । এই পাহাড়েও সেই রেওয়াজ নজরে পড়লো । আর জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে উপরে বা নীচে, যেদিকেই চাওয়া যায়, শুধুই ধাপে ধাপে সারিবদ্ধভাবে আপেল গাছ দাঁড়িয়ে আছে ।

এরই ভিতরে একবার আমরা সকলে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম । সিগারেটগুলোও একে একে ঠোঁটের চাপে আবদ্ধ হয়ে জ্বলে উঠলো । ধোঁয়ায় বার কয়েক টান দিয়ে আমাদের ড্রাইভারটাও চাঙ্গা হয়ে উঠলো । যতদূর খোলামেলা চোখে দেখা যায়, গোটা পথে একটাও দোকানপাট, মানুষজন নজরে পড়লো না । ইলেকট্রিসিটি তো নয়ই ।

আমাদের পেছনের দিকে অনেকটা নীচ থেকে একটা আলোর ঝলক এগিয়ে আসতে দেখা গেল । আমরা ভাবলাম লরী জাতীয় কিছু একটা হবে । আমরা জলদি জলদি আবার গাড়িতে চেপে গেলাম । কারণ ঐ পথে সামনে একটা বড়ো গাড়ি পড়ে যাওয়ার অর্থ ধূলো উড়ে উড়ে অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে ওঠা । কিন্তু আমাদের ওভারটেক করে সে বের হয়ে গেলো । নাহ, লরী নয়, মারুতি ভ্যান । আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার উপরের দিকে চড়তে লাগলাম ।

এইভাবে নানা রকমের ভয় আর টেনশন বুকে করে আমরা পথ ধরে এগোতে লাগলাম । কোনভাবেই গাড়ির গতিবেগ ঘন্টায় পাঁচ কিলোমিটারের বেশী তোলা সম্ভব হলো না ।

আমাদের পাশের পাহাড়ের জায়গায় জায়গায় আগুন লাগানো হয়েছে বলে আমাদের মনে হলো । কারণ আগুন জ্বলার পাশাপাশি প্রচুর ধোঁয়াও উঠতে দেখা যাচ্ছিলো । এখানে একটা ঘটনা না বললেই নয় । চারপাশের নিকষ কালো অন্ধকার চিরে আমাদের গাড়িটা যখন উপরে উঠছিলো, তখন আচমকা আমাদের মুখোমুখি একটা মারুতি গাড়ি চলে এসেছিলো । ওর ড্রাইভারটা ড্রিংক করে ঢুলে ঢুলে পড়ছিলো । সরু রাস্তার একপাশে বেড়াহীন অতল খাদ । আর একদিকে খাড়া পাথুরে দেওয়াল । অতি কষ্টে কোনও ক্রমে পাশ কাটিয়ে আমরা আরো কিছুটা উঠে প্রধান রাস্তায় উঠলাম ।

ইন্দো টিবেটিয়ান বর্ডার পুলিশ এর বেসক্যাম্পের ভিতর দিয়ে আরও সাত আট কিলোমিটার চলার পরে অবশেষে আমাদের গাড়ি এসে থামলো সারাহানের "ট্রেগোপান হোম স্টে" - তে । এখানে ঢুকেই আরো কিছু টুরিস্ট পেলাম । সকলেই বাঙালী । একটা দলকে দেখলাম নিজেরাই রান্না করে পিকনিক করছে ।

আমরা আমাদের রুমে এসে যে যার মত করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম । এখানকার সব স্টাফ দেখলাম বাঙালী । আর এর মালিকও হাওড়ার লোক । মালিক বছরে একবার এর বেশী আসেন না ।

বিদেশ বিভূঁইএ এই প্রথমবারের মতো বাঙালী রান্নার স্বাদ পেলাম । গরম গরম সুগন্ধী দেরাদুন চালের ভাত-ডাল-আলু-ফুলকফি সব্জীর সাথে ডিমের ডালনা পেয়ে মন ভরে গেলো আমাদের ।

খাওয়ার পরে আমরা একটু রাত্রিকালীন ভ্রমণে যাবো বলে ঠিক করলাম । কিন্তু এখানকার লোকজন আমাদের রাতে বের হতে মানা করলো । এখানে নাকি হিংস্র পাহাড়ী ভালুক, স্নো লেপার্ড আর চিতাও বের হয় । ওদের উপদ্রবে এলাকার গোটা চল্লিশেক নেড়ি কুকুর আর গরু ভেড়া গায়েব হয়ে গেছে ।

আমরাও অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম সেটা । সত্যিই এলাকায় একটাও কুকুর বেড়াল গরু ছাগল নেই । এমনকি আমরা যে ভয়ঙ্কর সরু ও খাড়াই পাহাড়ি কাঁচা রাস্তা দিয়ে এলাম, সেখানেও কোন কিছু নজরে পড়েনি । এমনকি লোকজনও তেমন কাউকে পাইনি ।

ওরা আমাদের সকালেও মর্নিং ওয়াক করতে নিষেধ করে দিলো । কারণ এখানে সকালে হাঁটতে বেরিয়ে এর আগে অনেকেই দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন ।  বিশেষ করে পাহাড়ী চিতাবাঘের পিছন থেকে চুপিসাড়ে এসে আচমকা আক্রমণে পড়বার অভিজ্ঞতা এখানে অনেক টুরিস্টেরই হয়েছে ।

আমাদেরকে এমনটাও বলা হলো, যে রাতের বেলা আমাদের ঘরের দরজায় কেউ খরখর করলে বা ধাক্কা দিলে, আমরা যেন ভুলক্রমেও দরজা না খুলি । আর খুলতে হলে আগে বার বার জেনে নিই - কে ডাকছে, কেনই বা ডাকছে ? এর কারণ হলো পাহাড়ি ভালুকের উপদ্রব । ওরা খুবই ধূর্ত আর প্রচন্ড বলশালী ।

ডিনারের পর আমরা ঘর ভাগাভাগি করে শুয়ে পড়লাম । তবে লেপের তলায় ঢোকার আগে আমার কানে কানে কিছু শব্দ ভেসে এলো । বুঝলাম পাশের ঘরে থাকা আমার বাদ বাকী সঙ্গীদের কেউ কেউ রাতের দিকে বা ভোরের দিকে ভালুক সেজে ভয় দেখাতে পারে, উপদ্রব করতে পারে ।

ঠিক সেটাই হলো । দরজা বন্ধ করে শুতে না শুতেই শুরু হলো ভালুক রূপী মনুষ্য সঙ্গীদের দরজায় চুলকানি । প্রথমে বার কয়েক দরজার উপর খস্ খস্ করে আঁচড়ানির শব্দ । তারপর ধুপধাপ ধাক্কা । আমার ঘরে আমি আর আরেক দাদা ছিলাম । আমি কানে হেডফোন গুঁজে ভলুম বাড়িয়ে গান শুনতে শুনতে শুয়ে পড়লাম । পাশের দাদাও অল্প স্বল্প নাসিকা গর্জন করতে করতে ঘুমিয়ে গেলো ।

২৮ মার্চ, ২০১৮

******
30.03.2018
*******

গতকাল সকালে যখন ঘুম ভাঙলো, বিছানা ছেড়ে উঠে, মুখে ব্রাশ গুঁজে, দরজা খুলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম । সকালের সূর্যের আলো এসে পড়ছিলো দূরের বরফঢাকা পাহাড়ের চূড়ায় । মনে হলো যেন গলন্ত সোনা পাহাড়ের চূড়া বেয়ে ধীরপায়ে নেমে আসছে । মোবাইলে টেম্পারেচার দেখলাম ৫ ডিগ্রী ।

আমি দুই-একটা ছবি তুলে নিলাম মোবাইলে । তারপর ফ্রেশ হয়ে সবাই মিলে চললাম সতীর ৫১ পীঠের এক পীঠ - ভীমা কালী মা এর মন্দির, যা অন্ততঃ এক হাজার বছরের পুরানো ।

মূল মন্দিরে প্রবেশের আগে চামড়ার যাবতীয় যা কিছু - জুতো মোজা বেল্ট জ্যাকেট পার্স এমনকি মোবাইল ও - লকারে জমা দিতে হলো । ডালি নিয়ে পুজো দিয়ে হোটেলে ফিরে ভাত ডাল আলুপোস্ত আর ডিমের অমলেট খেয়ে আমরা রওনা দিলাম সাঙ্গলা / Sangla র পথে ।

আমাদের পাশে পাশে চললো শতদ্রু ওর নিজের ভঙ্গিমায় । যে পথে আমরা সারাহানে এসেছিলাম, আবার সেই ভয়ঙ্কর পথ ধরেই আমরা আবার NH5 এ এসে উঠলাম ।

দেবভূমি কিন্নরে প্রবেশের আগে এক জায়গায় থামলাম আমরা । রাস্তার একপাশে বিশাল গভীর খাড়া খাদ । আরেক দিকে বিশাল উঁচু উঁচু আর মোটা মোটা গুঁড়ির পাইনের বন । আমরা গাড়ি থেকে নেমে যে যার খুশী মত ছবি তুলতে লাগলাম ।

আচমকা একটা গাছের নীচে, আমার নজরে এলো, আলোছায়া মেখে, অবহেলায় ধূলোবালি জমে পড়ে থাকা, একটা বেশ বড়োসড়ো আকারের, শক্তপোক্ত পাইন ফুল, যা আমরা উচ্চমাধ্যমিকের বায়োলজিতে পড়েছিলাম । সেখানে পাইনের ফুলকে কোন / Cone বলেছিলো । আমি ওর একটা ছবি তুলে নিলাম মোবাইলে ।

যা পাবো কুড়িয়ে নিজের সম্পত্তি বানাবো, এই মানসিকতা তেমন একটা নেই আমার । সুতরাং আমি যেখানকার ফুল, যেমন অবস্থায় পড়েছিলো, ঠিক তেমন অবস্থাতেই ওকে রেখে দিলাম ।

এরপরে এলো চেকপোস্ট । সেখানে আমাদের আগেও বেশ কয়েকটা গাড়ি থেমেছিলো । আমরাও থামলাম । পুলিশ এসে ড্রাইভারের কাছ থেকে কাগজপত্র চাইলো । আমাদের গাড়িটা খুব সম্ভবতঃ কমার্শিয়াল ছিলো না । কোন ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব গাড়ি ছিলো । তাই আমাদের গাড়ির নম্বরপ্লেটের রং সাদা ছিলো । গাড়ি কমার্শিয়াল হলে তার নম্বরপ্লেটের রং হলুদ হতো ।

পুলিশটা এই কারণের জন্যে আমাদের ড্রাইভারটিকে ফাইন করে দিলো । সেই ফাইনের টাকা আমরা পাঁচজন শেয়ার করে নিলাম । ওখানে প্রায় আধা-ঘন্টার মতো সময় নষ্ট হলো আমাদের ।

এরপরে আমাদের যাত্রাপথেই পড়লো ব্যাঘ্রবাহিনী তারান্দা /Taranda মাতাদির মন্দির । এখানে আমরা মিনিট দশেকের জন্যে থামলাম । মায়ের মন্দিরের প্রবেশপথের ঘন্টা বাজিয়ে প্রসাদ মুখে নিয়ে আবার আমরা রওনা দিলাম ।

এরপর আর আমাদের গাড়ি অনেকক্ষণ থামানো হয়নি । আমরা ভেবেছিলাম তাপরি / Tapri তে চমরি গাইয়ের দুধের গরম গরম চা খাবো । কিন্তু তখনো আমাদের অনেকটা পথ যেতে হত । আর গাড়ি পার্কিং করবার জন্যে যথেষ্ট জায়গাও ছিলো না । তাই আমরা আরো বেশ খানিকটা পথ পার করে শতদ্রুর উপর তৈরী করা কারছাম ড্যাম / Karchham Dam এর কাছে চলে এলাম । ড্যামের কাজ দেখলাম অসম্পূর্ণ ।

এই সময়কার পথটা ছিলো খুবই খারাপ আর দুর্গম । মারাত্মক সরু পথের চড়াই উৎরাই পার হয়ে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর তৈরী লোহার ব্রীজের উপর দিয়ে আমরা এসে পৌঁছে গেলাম জলাধারের কাছে । আমার একান্ত ইচ্ছে ছিলো জলাধারের পাশে কিছুক্ষণের জন্যে চুপচাপ সময় কাটানো আর ছবি তোলা । কিন্তু ড্রাইভার আর বাকীরা জানালো ফেরার পথে এখানে কিছুটা সময় দেওয়া যাবে । অগত্যা আর গাড়ি থামানো হলো না । আমরা এগিয়ে চললাম ।

এরপর আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব দ্রুত বদলে যেতে লাগলো । পথ আরও রুক্ষ ঊষর আর ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে লাগলো । দেখতে দেখতে আমরা দশ হাজার ফুটেরও বেশী উচ্চতা সম্পন্ন টুকপা / Upper Tukpa Valley উপত্যকায় উঠে এলাম ।

গন্তব্যস্থলে না যাওয়া পর্যন্ত আমাদের গাড়ি থামানোর আর কোন সঙ্কল্পই ছিলো না । দেখতে দেখতে আমরা ১১০০০ ফুট উচ্চতায় চলে এলাম । তারপর সাঙ্গলার হোটেলে এসে ঢুকলাম ।

এখানে চারপাশের পরিবেশ ভারি মনোরম লাগলো । আসার পথে চারপাশের সব পাহাড়ের মাথা বরফে আচ্ছাদিত দেখলাম । আর গোটা উপত্যকা জুড়ে শুধু আপেল এর চাষ হচ্ছে । দেখলাম সব আপেল গাছেই কম বেশী ফুল ফুটে আছে । আমরা দেবভূমি গ্রুপ অফ হোটেলস এ উঠলাম ।

এখানেও পাশে পাশেই রয়েছে দুর্দান্ত খরস্রোতা শতদ্রু । আমাদের সাথে গোটা পথটাই শতদ্রু নদী পাশে পাশে তালে তালে এগিয়ে এলো ।

এখানে তাপমাত্রা পাঁচ ডিগ্রি থেকেও কিছুটা কম দেখলাম । প্রচন্ড জোরে গর্জন করে উল্টোপাল্টা বাতাস বইছিলো । চারপাশে শুধুই শোঁ শোঁ করে বাতাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম ।

এই বরফের মত হিমশীতল হাওয়ার ধাক্কায় ঠোঁট ফেটে চৌচির হয়ে গেলো সকলের ।

কাল আমরা চিৎকুল এর পথে রওনা দেব । চিৎকুলের গড় উচ্চতা ১৪৯৩০ ফুট ।

আমার বাদ বাকী সঙ্গীরা RUM আনতে বের হয়েছিলো । আর আমি হোটেলের ঘরের দরজায় ছিটকিনি দিয়ে চুপচাপ ঘরে বসে ছিলাম । ইতিমধ্যে প্রবল হাওয়ার দাপটে পর পর দুই বার দরজার ছিটকিনি খুলে গেল । কি অদ্ভূত ব্যাপার ! আমার গলায় প্রচন্ড ব্যাথা করছিলো । বেশী কথা বলতে বা শক্ত কিছু গিলে খেতে পারছিলাম না । গীজার অন করে একটু জল গরম করে গার্লগেল করলাম ।

আমাদের সঙ্গীরা ফিরে আসতে না আসতেই আবহাওয়া বদলে গেলো । আমাদের হোটেলের পিছন দিয়ে ছুটে চলছিলো বাপসা / Bapsa ( এই সাঙ্গলা / Sangla উপত্যকার আরেক নাম বাপসা উপত্যকা ) নদী । আমরা রামের বোতল খুলে যে যার মতো করে গরম হতে লাগলাম ।

এই সময়ে আমি একটা প্রস্তাব রাখলাম । সেটা হলো হোটেল থেকে বের হয়ে, নীচে নেমে গিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে বাপসা নদীর পাড় অবদি চলে যাওয়া, সেখানে কিছুটা সময় কাটানো । সকলেই রাজী হয়ে গেলো । আমরা এগিয়ে চললাম ।

আমাদের হোটেলটা উপত্যকার গ্রামের ভিতর । আমরা গ্রামের ঢালু পথ বেয়ে আপেল বাগানের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চললাম নদীর জলের শব্দ লক্ষ্যে রেখে । আপেল বাগানের সব গাছেই ফুল ফুটেছিলো । হাল্কা লালচে গোলাপী ফুলে ফুলে ঢেকে গিয়েছিলো চারপাশ । খুব কাছ থেকেই ভেসে আসছিলো বাপসা নদীর জল বয়ে চলার শব্দ ।

আমরা অনেকটা পথ নেমে এসেও নদীর দেখা পেলাম না । অবশেষে একজন স্থানীয় বাসিন্দাকে দেখতে পেয়ে তার কাছেই পথনির্দেশিকা জানতে চাইলাম । সে তার সাথে আমাদেরকে নিয়ে চললো অন্য আরেকটা পথ ধরে । আরো এক কিলোমিটার হেঁটে আমরা একটা জায়গায় এসে থামলাম ।

সামনের পাশাপাশি অবস্থিত দুটো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে খরস্রোতা নদীর জল বের হয়ে আসছিল হু হু করে । আমরা নদীর পাড় অবদি যেতে পারলাম না । কারণ পথ খুবই খাড়াই আর ঢালু ছিলো । আমরা হয়তো নেমে যেতে পারতাম । তবে নামার পথে পা হড়কে পিছলে যাবার সম্ভাবনা প্রবল ছিলো । কারণ আমরা সকলেই চার পেগেরও বেশী করে রাম আর সিগারেট টেনে নেশায় বুঁদ হয়েছিলাম ।

আমরা আর রিস্ক না নিয়ে হোটেলের পথ ধরলাম । অন্ধকার খুব দ্রুত নেমে এসেছিলো চারপাশ জুড়ে । আর মনের মধ্যে একটু ভয় ভয়ও করছিলো । এই সব এলাকায় সন্ধ্যে নামলেই ভালুক, চিতা, নেকড়ে বা পাহাড়ী কোন হিংস্র জন্তুর আক্রমণের সম্ভাবনা অনেকটা পরিমাণে বেড়ে যায় ।

হোটেলে ফিরে এসে আমরা আর ঘর থেকে বের হলাম না । সকলে বসে গল্পগুজব করেই সময় কাটিয়ে দিলাম । তারপর রুটি আর ভেড়ার মাংস দিয়ে আরো খানিকটা মদ খেয়ে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম ।

*****
31.03.2018

চিৎকুল ( ভারত-চীন সীমান্তের সর্বশেষতম গ্রামে ) উপত্যকায় ____

বেলা সাতটার পরে ঘুম ভাঙলো । আজ আমাদের চিৎকুল যাওয়ার কথা । উঠে চটপট করে ফ্রেশ হয়ে, গরমাগরম আটার লুচি আর ছোলার ডাল দিয়ে টিফিন করে, বের হতে হতে বেলা পৌনে দশটা বেজে গেল ।

ভারত-চীন সীমান্তের সর্বশেষতম গ্রাম চিৎকুলের গড় উচ্চতা ১৪,৯৩০ ফুট । সমস্ত পথটাই খুব সঙ্কীর্ণ আর খাড়া । সারা পথের দুপাশে বরফ জমাট বেঁধে আছে । সাঙ্গলার বাজার এলাকা থেকেই আমরা পথের ধারে একটু আধটু বরফের সন্ধান পেয়েছিলাম । উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে রোদের তীব্রতা, আর হাওয়ার আধিক্য ক্রমশঃ বাড়তেই লাগলো । আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগলো কনকনে হিমেল হাওয়া । তাপমাত্রা হু হু করে নেমে মাইনাস তিন এ চলে গেলো কিছুক্ষণের ভিতর ।

গাড়ির ভিতরে পুরোদমে স্মোকিং চলছিলো । অথচ এখানে এভাবে যেখানে সেখানে স্মোকিং করে হাতেনাতে ধরা পড়লে পাঁচ'শো টাকা ফাইন গুনতে হবে অনিবার্য । গাড়ির ভেতরে জমতে থাকা সিগারেট বিড়ির ধোঁয়ায় আমার চোখ জ্বালা করছিলো । আমি জানলার কাঁচ নামাতে বাধ্য হচ্ছিলাম । আর কাঁচ নামালেই ঠান্ডা কনকনে হাওয়ার ঝাপটা এসে চোখে মুখে লাগছিল ।

আমরা মাঝপথে একবার পাইনের বনের ভিতরে গাড়ি থামালাম । আমাদের খুব জোরে টয়লেট পেয়ে গেছিলো সকলের । রাস্তার দুপাশ জুড়েই অনেকটা করে বরফ পড়ে আছে । পাইন গাছের চারপাশে শুধু বরফ আর বরফ ।

আমরা টয়লেট করে বরফ তুলে হাতে ঘষে নিলাম । মুহূর্তের ভিতরে আঙুল গুলো লাল টকটকে হয়ে গেলো । আর অবশ অবশ বোধ করতে লাগলাম । এর ভিতরেই বেশ কিছু সেল্ফিও তোলা হলো আমাদের সকলের ।

রাস্তার বাম পাশ ঘেঁষে আমাদের গাড়ি রাখা ছিল, আর ডানপাশে ছিলো অতল গভীর খাদ । যদিও খাদের সব জায়গায় বিশাল বিশাল পাইনগাছ আর বড়ো বড়ো বোল্ডার পাথর বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলো । খাদের একদম শেষ পর্যায়ে পর্বতের সানুদেশ উপত্যকা বরাবর বয়ে চলেছিলো দুর্দান্ত খরস্রোতা নদী । এ সেই নদী, যে সাঙ্গলার হোটেলের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ।

চারপাশ থেকে ইতস্ততঃ ও বিক্ষিপ্ত ভাবে অনেক রকমের পাখির ডাক ভেসে ভেসে আসছিল । আমরা আবার চারপাশের নিস্বর্গশোভা দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম চিৎকুলের পথে ।

অবশেষে আমাদের গাড়িখানা ভারত-চীন সীমানার সর্বশেষতম গ্রামের চেকপোস্টে এসে থামলো । আরো বিশদে আলোচনা করলে বলবো, আমাদেরকে থামানো হলো । এবার আমিই গাড়ি থেকে নামলাম । নিজের সরকারী পরিচয়পত্র বের করে কথা বললাম ।

ওরা জানালো সরকারী আধিকারিক আর ভি.আই.পি ছাড়া ঐ দুর্গম, কম অক্সিজেন বিশিষ্ট, অতি সংকীর্ণ আর ক্রমাগতঃ পাথর গড়িয়ে পড়তে থাকা পথে সাধারণ আম পাবলিককে আর যেতে দেওয়া হয় না । এটাই সাধারণ টুরিস্টদের জন্যে সর্বশেষতম অবস্থান ।

আমার সঙ্গীরা চাইছিলো আরো কিছুটা সামনে এগিয়ে দেখে আসবে । সে কথা আমি নিরাপত্তারক্ষীকে জানালাম । ওরা বললো, আমার সরকারী পরিচয়পত্রেই ওদের সকলের এন্ট্রি করানো যাবে । কিন্তু সামনের দিকে রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ ও বরফপাতের ফলে পিচ্ছিল । ফলে যে কোন সময়ে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে আমাদের সকলের ।

আমরা আর রিস্ক নিলাম না । ওখানেই নেমে কিছু ছবি তুলে নিলাম । তারপর আবার নিকটবর্তী হোটেলে টিফিন করে সামনের বিস্তীর্ণ ঢালু উপত্যকার দিকে নেমে গেলাম । এখানে প্রকৃতি যেন উজাড় করে দিয়েছিলো তার সবটুকু । আর প্রকৃতি ছিলো চরম বৈচিত্র্যপূর্ণ ।

কখনো নীল আকাশ, কখনো হাল্কা সাদা মেঘ । পাহাড়গুলোর মাথা কমবেশী বরফে আচ্ছাদিত । ঐ বরফের স্তর পাইনের বন ভেদ করে নীচের উপত্যকা এমনকি নদীর পাড় অবদি চলে এসেছিলো অবাধে ।

আমরা উপত্যকায় নেমে এসে প্রথমেই নদীর পাড়ে চলে গেলাম । কাঁচের মত স্বচ্ছ, প্রচন্ড খরস্রোতা, বরফের মতো হিমশীতল জলে, নীচের রঙিন পাথরগুলো পরিস্কার দেখা যাচ্ছিলো । একটা অদ্ভুত রকমের কনকনে, ক্রমাগতঃ কামড় দিতে থাকা ঠান্ডা হাওয়া কানের দুই পাশ দিয়ে, শিরদাঁড়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছিলো ।

আমরা কিছুক্ষণ নদীর পাশে পাথরের পাশে বসে রইলাম চুপচাপ । চারপাশ জুড়ে শুধুই জলের শব্দ । আমরা আবার উঠে পড়লাম । নদীর পাড় ধরে হাঁটতে লাগলাম । পায়ের আশেপাশে নানা আকারের রঙবেরঙের পাথর ইতস্তত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো ।

আমরা চলতে চলতে নদীর ওপারে যাওয়ার লোহার ব্রীজ অবদি পৌঁছে গেলাম । নদীর ওপারটা পুরোপুরিভাবে বরফে ঢাকা ছিলো । শুধু কিছু বড়ো বড়ো পাথর আর পাইন গাছ গুলো জেগে ছিল মুখ তুলে ।

আমরা বেশ খানিকটা খাড়া পথ বেয়ে ব্রীজে উঠলাম । ব্রীজের উপরে আর নদীর ওপারে বেশ কয়েকজন অভিযানপ্রিয় বাইকচালক আমাদের নজরে এলো । এর আগেও এই হিমাচল ঘোরার পথে আমাদের নজরে অনেক বাইকার ( Biker / Bike Rider ) পড়েছিলো, যারা Royal Enfield মোটরবাইকে চেপে অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় দুর্গম পথে বাইক চালিয়ে ঘুরে বেড়ায় । ওদেরকে এখানেও পেলাম । এদের অধিকাংশই পাঞ্জাব চন্ডীগড় হিমাচল আর উত্তরাখন্ডের থেকে আসে । ওদের কয়েকজনের সাথে সফরসঙ্গিনীও ছিলো । ওদের সকলের উৎসাহ উদ্দীপনা আর উত্তেজনাও বেশ চোখে পড়বার মত ছিলো । আমাদের মত ওরাও ব্রীজ পার হচ্ছিলো একে একে ।

আমরা ব্রীজের মাঝখানে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম । আর দূরের উপত্যকা ভেদ করে ছুটতে ছুটতে নেমে আসা পাহাড়ী নদীর মনোরম দৃশ্য মোবাইলে বন্দী করলাম । তারপর ধীরপায়ে সন্তর্পনে বরফে আচ্ছাদিত নদী উপত্যকায় পা রাখলাম ।
*****
নদী পার হয়ে এপারে আসার পরে যেন আচমকাই অনেকখানি ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব বেড়ে গেলো । আমরা যতক্ষণ ওপাড়ে ছিলাম, বেশ চড়চড়ে রোদেলা একটা ভাব ছিলো । সেটা এখনো আছে । কিন্তু এই পাড়ে বিশাল বিশাল সব পাইন গাছ । গাছের মাথায় পাতায় গোড়ায় আর চারপাশে বরফ জমে আছে । আর সেই বরফের স্তর চলে এসেছে একেবারে নদীর পাড় অবধি ।

এদিকের পাহাড় এর মাথাটা পুরোটাই পুরু বরফে ঢাকা । সেখানে ঠিকরে পড়া সূর্যের আলোয় চোখদুটো ধাঁধিয়ে গেল । আমি এবার চশমাটা খুলে সানগ্লাস পড়ে নিলাম । চোখে একটু আরাম পেলাম । বরফে ঠিকরে পড়া প্রতিফলিত আলোয় এবার আর খুব একটা সমস্যা হলো না ।

আমরা এই পাশের পাড় দিয়ে হেঁটে চলার সাহস পেলাম না । পাথর গুলো বরফে ঢাকা আর পিছল হয়ে ছিলো । আমরা বাধ্য হয়ে খানিকটা দূরে উপরের দিকে সরে এলাম । আর পা চালাতে লাগলাম ।

আমাদের খুব সতর্ক হয়ে পা ফেলে ফেলে চলতে হচ্ছিলো । মাঝে মাঝে বরফ মেশানো ভেজা মাটি থেকে গোড়ালি স্লিপ কেটে সরে সরে পিছলে যাচ্ছিলো । বেশ কয়েকবার পড়তে পড়তেও ভাগ্যের জোরে আছাড় খেয়ে পড়ে যাইনি । অথচ অনেককেই দেখলাম পিছলে আছাড় খেতে । সবই কপাল ।

অনেকেই আবার বরফের উপর গড়াগড়ি করছিল । কেউ কেউ বেশ কিছুটা উঁচুতে উঠে আবার স্লিপ কেটে সাঁই সাঁই করে নীচে নেমে আসছিল বসে থাকা অবস্থায় । ইচ্ছে থাকলেও আমরা আর ঐ মজা নেবার সাহস পেলাম না প্যান্ট ভিজিয়ে ঠান্ডা লাগানোর ভয়ে ।

আমরা এগিয়ে চললাম । অল্পবয়সী সাহসী বাইকার গুলোকেও দেখলাম আমাদের পাশ দিয়ে কনকনে হাওয়া কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হু হু করে । বেশ কিছু হিমাচলী পরিবারকেও দেখলাম উইকএন্ড আউটিং এ এসেছে । খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি পরিবার এর পুরুষ-নারী - সকলেই কম বেশী মদ্যপান করছে ।

আমরাও নড়ে চড়ে উঠলাম । ক্রমাগতঃ হিমেল হাওয়া বয়ে চলার কারণে ঠান্ডাটাও বেশ জমিয়ে পড়েছিল । আমাদের সাথে নেশা করে শরীর গরম করে তুলবার মতো কোনও রকমের উপকরণ ছিলো না । আর আমরা এমন একটা জায়গায় চলে এসেছিলাম, যেখান থেকে আড়াই কিলোমিটারের ভিতর কোনও ঘরই ছিলো না । ছিলো কিছু টেন্ট / তাঁবু সহ সিমেন্ট কংক্রিটের ঢালাই করা বেসমেন্ট ।

এখানে নদীর পাড়ে, বেশ কিছুটা এলাকা জুড়ে, ক্যাম্প করে রাত্রিবাস করবার মতো ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার খরচ দিন আর জন প্রতি আড়াই হাজার করে । এই ব্যাপারটা আমাদের কাছে জানা ছিলো না । এমন পরিবেশে ক্যাম্প করে থাকার উত্তেজনা আর আকর্ষণই আলাদা । তবে অন্ধকার হলেই পাহাড়ি ভালুক, স্নো লেপার্ড, চিতা, নেকড়ে, পাইথন আর বিষাক্ত পোকা আর মাকড়ষার আক্রমণের ভয় ছিলো, যা উপেক্ষা করা সত্যিই খুব দুষ্কর ।

ড্রাইভারকে দিয়ে আমরা লিকার আনাতে দিলাম । কি পেলে কি করবে, সেটা তাকে বিশদে জানিয়েও দিলাম । কারণ পরে আর ফোনের মাধ্যমে কোনও রকম ভাবেই কিছু করা সম্ভব হতো না । এই এলাকায় বি.এস.এন.এল ব্যতীত আর কোনও মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজই করছিলো না । আর আমাদের কারো কাছেই বি.এস.এন.এল এর সিমকার্ড ছিলো না । তাই ফোনের মাধ্যমে কোথাও কারো সাথে খুব সহজে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভবপর হচ্ছিলো না ।

মাঝে মাঝে কখনো সখনো একটু আধটু নেটওয়ার্ক আসছিলো । তাও সেটা 2G নেটওয়ার্ক । আর হোটেলে রাত বাড়লে নেটওয়ার্ক একটু ভালো কাজ করতো । কিন্তু আমাদের গোটা দিন ছবি আর ভিডিও তুলে তুলে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যেত । আর সন্ধ্যের পরে হোটেলে এসে আমরা আমাদের মোবাইল চার্জিং এ বসিয়ে দিচ্ছিলাম ।

আমরা যেই পাহাড়ের সানুদেশ ধরে হেঁটে চলেছিলাম, তার গোটা মাথা সহ প্রায় ষাট শতাংশ দেহই বরফে আচ্ছাদিত ছিলো । পাহাড়ের মাথার খানিকটা নীচের থেকে শুরু হয়েছিলো ঘন সুউচ্চ পাইনের জঙ্গল, যার অধিকাংশটাই সাদা হয়েছিলো । গাছগুলোর গোড়া সম্পূর্ণভাবে বরফে ডুবে ছিলো । বরফগুলো জমাট বেঁধে ছিলোনা । গোটা রাত ধরে বরফপাতের ফলে কোথাও কোথাও কোথাও প্রায় এক কোমরেরও বেশী বরফ জমে উঠেছিলো । তবে আমরা যেখান দিয়ে হেঁটে চলছিলাম, সেখানে একটু জল জল পিছল ভাব ছিলো । কারণ দিনের মেঘহীন আকাশের রোদের তাপে আর তেজে ঐখানকার বরফ গলতে শুরু করেছিলো ।

আমরা চলতে চলতে একসময় একটা উঁচু সমতল এলাকা পছন্দ করে যে যার মত বসে পড়লাম । সেখানে জায়গাটা খানিকটা শুকনো আর বড়ো বড়ো পাথর ছড়ানো । ওদিকে পাশ দিয়ে প্রবল গর্জন করতে করতে, কাঁচের মত স্বচ্ছ অথচ কনকনে বরফ শীতল জল নিয়ে, দুর্দান্ত রূপ ধারণ করে, ছুটে চলেছে পাহাড়ি নদী ।

ওখানে বসে বসেই হরেক রকমের আড্ডা চলছিলো । আমি চারপাশের ভূমিরূপ আর পরিবেশ বেশ গভীর ভাবে অনুভব করছিলাম । মাঝে মধ্যেই রঙ বেরঙের ও নানা আকারের পাথরের ভিতরে একমনে খুঁজে ফিরছিলাম শিবলিঙ্গ । কিন্তু আমার তো আর তেমন কপাল নয় । আমি পাপী মানুষ । চরম ভোগী মানুষ । আত্মসুখ সর্বস্ব স্বার্থপর জীব । বস্তুজগতের মোহে আর ষড়রিপুর তাড়নায় আক্রান্ত স্বত্ত্বা । আমার কপালে শিবলিঙ্গ কুড়িয়ে পাওয়া ছিলো না ।

বেশ কিছু ঘন্টা এমন পরিবেশে উপভোগ করে আবার ব্রীজের উপর দিয়ে আমরা নদীর অপর পাড়ে চলে এলাম, যেখান থেকে আমরা পথ চলতে শুরু করেছিলাম । ইতিমধ্যে আমাদের ড্রাইভার অন্যকিছু না পেয়ে, আপেল থেকে বিশেষ রকম ভাবে তৈরী, স্থানীয় মদ জোগাড় করে আনলো ।
******
আপেল থেকে তৈরী মদের গন্ধটাও যেন অনেকটাই আপেলের মতো । আমি জানতাম, এখানকার স্থানীয়রা, বাছাই করা গুণমানসম্পন্ন লাল আপেল ( যেমন, ম্যাকিনটোস ভ্যারাইটি ) দেশের নানা স্থানে পাঠিয়ে দেয় । আবার খুব বেশী পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত, অ্যান্টিক্যানসারাস সবুজ আপেল, যা পেকে গেলে হলুদ হয়ে যায় ( যাকে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে - গোল্ডেন ডেলিশিয়াস বলে ), সেটারও প্রায় পুরোটাই বিদেশে রপ্তানি হয়ে যায় । আর বাদ বাকী অবশিষ্ট যা এখানে পড়ে থাকে, তার থেকে এই জাতীয় দেশী পানীয় তৈরী করা হয় ।

এখানকার স্থানীয় মদ যে কী পরিমাণ কড়া, আর অতি অল্পেতেই চট করে ধরে নেয়, তা একটু খাওয়ার পরেই টের পেয়ে গেলাম । ওদিকে পাল্লা দিয়ে নদী উপত্যকার জোলো হিমেল হাওয়া, আর তার সাথে এমন এয়ার কন্ডিশনড্ বার এর মতো পরিবেশ, সব মিলিয়ে চরম নেশা হয়ে গেলো । ঠান্ডা বোধও অনেকটাই কমে এলো । আর মাথার উপরে কড়া রোদের তেজে আমরা ঘামিয়ে উঠলাম । আমাদের পা ভারী হয়ে গেছিলো । কিন্তু এতখানি পথ চলে আসার ক্লান্তির এক ফোঁটাও আর অবশিষ্ট ছিলো না ।

আমরা একে একে নদীর ধার থেকে উঠে পড়লাম । বড়ো বড়ো বোল্ডার পাথরে পা ফেলে ফেলে অতি সন্তর্পণে আমরা আবার ফিরে চললাম । যেই খাড়া কংক্রীটের ঢালাই করা পথ বেয়ে আমরা উপর থেকে নীচের নদী উপত্যকায় নেমে এসেছিলাম, আবার সেই পথ ধরেই আমরা চলতে লাগলাম ।

ইতিমধ্যে আমাদের ড্রাইভার গাড়িটাকে নীচে নামিয়ে এনেছিলো । ইতিমধ্যে আমাদের গাড়ির ঠিক পাশেই রাখা আরেকটা গাড়ি, নীচের দিকে নামার সময়ে, একটা বড়োসড়ো পাথরে ধাক্কা মেরে, খারাপ হয়ে গেছিলো । আমাদের ড্রাইভার আর স্বপনদা গেল ঐ গাড়ির চালককে সহায়তা করতে ।

ঘন্টাখানেক সময়ের অপচয় করেও কাজের কাজ কিছুই হলো না । ঐ চোট লাগা গাড়ির হাল যেমন ছিল তেমনি রইলো । আমাদের ড্রাইভার বেচারীর এক পয়সাও অতিরিক্ত রোজগার হলোনা হেল্পারের কাজ করে ।

এদিকে কৃষ্ণদা আর আমি টুকটুক করে হেঁটে উপরের দিকে উঠে যেতে লাগলাম । কিছুটা একটানা উঠে আসার পরে কোমর ধরে যাচ্ছিলো । পায়ের মাংসপেশীতে একটু ব্যথাও করছিল । আমি মাঝে মাঝে থেমে খাড়া দেওয়াল সংলগ্ন পাথরের উপর একটু বসে নিচ্ছিলাম । এইভাবে টুকটুক করে চলতে চলতে গাড়ি পার্কিং এলাকায় চলে এলাম ।

বাদ বাকীরাও নীচের থেকে গাড়ি চড়ে উপরে উঠে এলো । চারপাশ জুড়ে ইতিমধ্যেই বেশ অন্ধকার নেমে আসছিলো । আজ আমরা পনেরো হাজার ফিট উপরে উঠে এসেও যে ভাবে মৌজ-মস্তি-এনজয় করলাম, তা সত্যিই জীবনের একটা অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা । তাই বিশদে এই অভিজ্ঞতা সকলকে শেয়ার না করে পারলাম না ।

আমাদের গাড়ি আবার ছুট লাগালো সাংলার পথে । বেশ খানিকটা নীচে নেমে আসার পরে আবার একটা ছোটখাটো গুমটির মতো দোকান পেলাম । আমাদের বেশ খিদে খিদে ভাব এসেছিলো । চারপাশে ঘন পাইনের বন । আর উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলে, পাইনের ডালের ফাঁক দিয়ে, বরফ আচ্ছাদিত পাহাড়ের মাথায় অস্ত যেতে থাকা সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ার অপরূপ মাধুর্য্য । এমন জায়গায় বসে খাওয়া বা আড্ডাও বেশ আনন্দদায়ক ।

আমরা এগ চাউমিন আর চা অর্ডার করে দিয়ে চারপাশে দেখতে লাগলাম । হঠাৎ দোকানের এক পাশে নজরে পড়লো কলকাতার ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের পতাকা । এমন জায়গায় কারা, কেমন করে একটা ফুটবল ক্লাবের পতাকা পুঁতে দিয়ে গেল, তা নিয়ে আমাদের ভিতর বিস্তর কথাবার্তা হলো । ঐ পতাকা সহ বেশ কিছু ছবিও তোলানো হল ।

ইতিমধ্যে আমাদের খাবার চলে এলো । আমরা বেশ তৃপ্তির সাথে বিকেলের টিফিন সেরে আবার রওনা দিলাম । সাংলা ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে আটটা বেজে গেলো । এদিকে ঠান্ডার মাত্রাও অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিলো । আমরা সকলেই জ্যাকেট টুপি আর মাফলার চড়ালাম । কৃষ্ণদারা এসেই ফ্রেশ হয়ে পেগ বানাতে বসে পড়েছিলো । আমিও রাতের মেনুতে ডিম-ভুজিয়া আর রুটি অর্ডার করে ওদের সাথে আড্ডায় যোগ দিলাম । আমাদের আড্ডার বিষয়বস্তু ছিলো আগের দিনের মাঝ রাতের দিকে স্থানীয় কুকুরের বিভৎস চিৎকার করা নিয়ে । ওরা খুব সম্ভবতঃ কোন হিংস্র জন্তুর চলাফেরার ঘ্রাণ আন্দাজ করতে পেরেছিলো । আলোচনা করতে করতেই গরম গরম খাবার চলে এলো । এখানকার প্রবল হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় ফুটন্ত চা বা কফিও মিনিট তিনেকের ভিতর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিলো । সুতরাং আমরা আর কাল বিলম্ব না করে ডিনার সেরে লেপের ভিতরে সেঁধিয়ে গেলাম । আগামী কাল আমরা কিন্নর জেলার কলপার পথে রওনা দেব । অনেকটাই জার্নি করতে হবে ।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি