আমার ভয় করছে বাবা
ল্যাট্রিনের কমোডের জলে পড়ে যাওয়া আরশোলা যেমন ধড়ফড়িয়ে ওঠে, ঠিক তেমন করেই ভাতঘুম ভেঙে জেগে উঠেছিলাম বিকেলের শেষ দিকে আর তারপর এককাপ চা খেয়ে ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে পড়েছিলাম সন্ধ্যা নামার পর, জোনাকির আধো-আলো অন্ধকারে, গলিপথ বেয়ে কয়েকশো পা এগিয়ে প্রশস্ত রাজপথে ।
ঘর থেকে বের হতেই সবার প্রথমে নাকে ভেসে এসেছিলো ছাতিম ফুলের উগ্র গন্ধ আর গলির ভেতরে ঢুকেই পর পর গন্ধরা পাল্টাতে লাগলো, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা টিউবলাইটের আধমরা আলোর বাড়া কমার সাথে সাথে, নাম না জানা ফুসমন্তরের টোকায় ।
টোটো রিক্সা সাইকেল বাইকের ভীড় ঠেলে, অনেক রকম শব্দকে পার করে, শেষমেষ ঢুকে পড়েছিলাম রামকৃষ্ণ মিশনের ভিতরে, মন্দিরের সন্ধ্যা সঙ্গীত আবহে ।
খানিকটা সময় মুঠোবন্দী করে, চোখ বুঁজে বকের মতন চুপটি করে বসায়, শান্ত হলো মন, মুছে গেলো চারপাশের আর বাদ বাকী সমস্ত শব্দেরা, শুধুমাত্র ঠাকুরের নামগান ছাড়া ।
একসময় থেমে গেলো সুরেলা গান । উঠলো জয়ধ্বনি । ঠাকুরের, স্বামীজীর, শ্যামসুন্দরের । কিন্তু উপেক্ষিতা রয়ে গেলেন মৃন্ময়ী জগন্মাতা সারদামনি দেবী ।
উঠে গেলো আপ্লুত ভক্তেরা একে একে প্রণাম সেরে বাক্সে প্রণামী ফেলে দিয়ে । আমি কিন্তু বসেই রইলাম জড়ভরতের মতো, কখনো চোখ খুলে চারপাশ দেখে, কখনো দুই পাতা বুঁজে ।
কপালের ঠিক মাঝখানে উপচে পড়ছিলো অসংখ্য অযুত কোটি আলোক বিন্দু, বরফ ঢাকা পর্বতের মাথায় সূর্যোদয়ের মতো, যেন আমি ভাবঘোরে ভেসে চলেছিলাম অদ্ভুত এক আনন্দে, তরঙ্গ ভাবে বিভোর ভ্রমরের মতো ।
কখনো কখনো মনে হয়েছিলো মা সারদামনির কথাও - কেন যে এনারা মায়ের নামগান করলেন না !
দুনিয়ার সব ভাবনা আর শব্দেরা গিয়েছিলো মুছে একে একে । ছেলে বারবার ডেকে ডেকে অবশেষে তুলে দিলো আমাকে ওর বায়নায় ।
মন্দিরকে বার কয়েক পরিক্রমা করে আমরা পূবের বাগানের ধারে এসে থামলাম । আজ পূর্ণিমার আগের রাত । চারপাশে মেঘমুক্ত আকাশে আলোর ছটা । চারিধার ভেসে চলেছে আলোর ঝরণাধারায় ।
বাগানের অন্ধকার ভেদ করে পাতার ফাঁক দিয়ে ঠিকরে পড়া আলোতে, ঝলমলে হাসি আর শব্দের কলতানে ভরে উঠলো নিষ্পাপ শিশুর হাসিমাখা মুখ ।
আমি ছেলেকে দেখালাম সেই চাঁদখানা, লেবুপাতার ফাঁক দিয়ে, ঠিক যেমনটা করে আমাকে দেখাতেন আমার ঠাকুরমা, একহাতে কোলে নিয়ে রাতের ভাত খাওয়ানোর ফাঁকে, পাড়ভাঙা পুকুরের ঝঞ্জালমুক্ত বাঁকে ।
আশেপাশে ডাকছিল ঝিঁঝিঁ, ডাকছিল নাম না জানা আরো কেউ কেউ ।
চারপাশ নির্জন, শুনসান বাঁধানো ঝকঝকে পথের দুধারে দাঁড়িয়েছিল বেড়াবাঁধা গাছেরা, দলে দলে অতন্দ্র প্রহরীর মতো, যার ওপারে ফুটেছিলো কত রকমের ফুল ।
আসছিলো ভেসে হাস্নুহানা আর গন্ধরাজের গন্ধের মিশ্রণ । প্রাণখানা যেন দেহ ছেড়ে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে গেলো সুবাসিত মন কেমনের দেশে ।
দিনের বেলার কথা বললে আমি বলবো সেই বারোটা বছরের কথা, যখন আমি ছাত্র ছিলাম এই প্রতিষ্ঠানের । বিকেলের পরে মাঠেঘাটে খেলে ক্লান্ত দেহে ঘরে ঢুকলেই ঘুম নেমে আসতো দুচোখের পাতায় ।
আর এখন যে সময়টা পার হয়ে গেছে । শুধু থমকে রয়ে গেছে ঐ চাঁদের আলো ।
দুধের মত আলোর ঝরণায় ধুয়ে ভেসে গিয়েছিলো সমস্ত মেঘ, চকচকে সবুজ পাতার ভালোবাসার কাছে, পুরানো খাতার কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতির মতো ।
বেশ কিছুক্ষণ ঐ ভাবে ভাব-সমাহিত হয়ে ছিলাম ।
আচ্ছন্নতা কাটলো ছেলের হাত ধরে টানায়, -
" আর নয় । আমার ভয় করছে বাবা । এবার বাড়ি চলো । "
- রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য / ৩ অক্টোবর, ২০১৭
Comments