বুদ্ধস্থঃ চরিতার্থায় বুদ্ধামাভিন্নে পারাবারে
" বুদ্ধস্থঃ চরিতার্থায় বুদ্ধামাভিন্নে পারাবারে "
-------------------------------
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা আমার ভাই Reeju Pathak তার Facebook post এ Tapabrata Bhaduri র লেখা শেয়ার করলো । সেটা ছিলো ঠিক এইরকম ____
আদিম কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রধান দেবতা ছিল পৃথিবী৷ পৃথিবী শস্য ও উদ্ভিজ্জপ্রাণের উৎস৷ তাই আদিম সমাজে পৃথিবী হয়ে ওঠে আদিমাতা (Primordial Mother)৷ পাশাপাশি মানুষ দেখেছে, নারী সন্তানের জন্ম দেয়৷ এ-ব্যাপারে পুরুষের ভূমিকা সম্পর্কে আদিম সমাজ ছিল অজ্ঞ৷ লোকবিশ্বাসে রহস্যময় সৃষ্টিক্ষমতার গৌরবে নারী ক্রমে আদিমাতা পৃথিবীর সমকক্ষ ও প্রতিভূ হয়ে ওঠে৷ এইভাবে ধরিত্রীমাতা ও নারীর প্রজননশক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে প্রাচীন এক ধর্মমত – উর্বরতাবাদ (Fertility Cult)৷ এর সূচনা হয়েছিল মাতৃতান্ত্রিক সমাজে৷ প্রজননশক্তির অধিষ্ঠাত্রীরূপে লোকবিশ্বাসে কল্পিত হয়েছিল বিভিন্ন নারীদেবতা৷ নানা দেশে নানা নামে৷ ননা, অনৎ, অল্লৎ, ইশতার, সিবিলি, আইসিস, মা, মাইয়া, আর্তেমিস প্রভৃতি৷ নারীই হতেন সে দেবতার পূজক তথা পুরোহিত৷ যৌনক্রিয়া ছিল পূজানুষ্ঠানের অঙ্গ৷ সেইসঙ্গে হত পশুবলি৷
গোড়ায় এই আদিমাতা ছিলেন অবিবাহিতা চিরকুমারী৷ পরে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ যখন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তরিত হল, তখন নারীদেবতাদের পুরুষসঙ্গী কল্পিত হল৷ পরবর্তী যুগে ক্রমে ক্রমে তাঁরা পুরুষদেবতার সঙ্গে বিবাহসম্পর্কে আবদ্ধ হলেন৷ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে দেবতার পূজার অধিকার নারীর হাত থেকে চলে গেল পুরুষের হাতে৷ মন্দিরের নারীপূজকরা পরিণত হলেন পবিত্র গণিকায়৷ নতুন পুরোহিতদের বিধানে সমাজের অন্য নারীদেরও বিয়ের আগে অন্তত একবার দেবমন্দিরে বারাঙ্গনা বৃত্তি অবলম্বন করতে হত(উপেন্দ্রকুমার দাস, শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা, প্রথম খণ্ড, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ : ১৩৯১, তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ : আগস্ট ২০১০, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, কলকাতা, পৃ. ২২-২৩)৷
কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরবর্তী যুগে উর্বরতাশক্তির এই দেবীদের যুদ্ধদেবতা রূপেও উপাসনা করা হত৷ এসব ক্ষেত্রে যিনি সৃষ্টিশক্তির দেবী, তাঁকেই একাধারে ধ্বংসের দেবতা রূপেও কল্পনা করা হয়েছে(উপেন্দ্রকুমার দাস, শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ২০)৷ দৃষ্টান্তস্বরূপ গ্রিসের দেবী এথেনা, সুমের বা মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের দেবী ননা, প্যালেস্টাইন অঞ্চলের দেবী অনৎ এবং ব্যাবিলন ও আসিরিয়া অঞ্চলের দেবী ইশতারের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে৷ ভারতের দেবী দুর্গাও সৃষ্টিশক্তির প্রতিভূ আদিমাতার একটি রূপ৷ একই সঙ্গে তিনি রণদেবী৷ এথেনা আর্তেমিস প্রভৃতি পৃথিবীর অন্যা্ন্য প্রান্তের মাতৃকা দেবতাদের মতো দুর্গাও গোড়ায় ছিলেন কুমারী মাতা (Virgin Mother)৷ দেবতাদের তেজঃপুঞ্জ থেকে তিনি কুমারী নারী রূপেই আবির্ভূত হন৷ পরবর্তী কালে দেবীকে শিবজায়া রূপে কল্পনা করা হয়েছে৷ কিন্তু বৃহন্নীলতন্ত্রের মতো প্রাচীন শাস্ত্রে আছে, শিব দেবীর পুত্র – ‘ব্রহ্মাবিষ্ণুশিবানাঞ্চ প্রসূতে করুণাময়ি’৷ দেবী নিজ পুত্র শিবকে পতিত্বে বরণ করেন (উপেন্দ্রকুমার দাস, শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৯)৷
তন্ত্রশাস্ত্রবিহিত কুমারী পূজার মধ্যে কুমারী আদিমাতার উপাসনার প্রত্নস্মৃতি লুকিয়ে আছে৷ কুমারী এক্ষেত্রে দেবীর প্রতিভূ ও প্রজননশক্তির বিগ্রহ৷ আগম মতে, পূজার জন্য মনোনীত কুমারীকে অবশ্যই হতে হবে ‘অজাতপুষ্পা’ (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্গীয় শব্দকোষ, প্রথম খণ্ড, সপ্তম মুদ্রণ, ২০০৮, সাহিত্য অকাদেমি, পৃ. ৬৫০) ৷ ‘রজোদর্শনের পূর্বপর্যন্ত কুমারী পূজ্যা৷’ (সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমি, প্রথম সংস্করণ, ডিসেম্বর ১৯৯১, আনন্দ পাবলিশার্স, পৃ. ৯৬) অর্থাৎ, যার মধ্যে প্রজননশক্তি এখনও সুপ্ত অবস্থায় আছে, পরিস্ফুট হয়নি, এমন বয়সের কুমারী কন্যাই পূজার জন্য উপযুক্ত৷ প্রজননশক্তির প্রতীক রূপে নারীর পূজা এবং সে পূজার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রজোদর্শনের টাবু নারীর পক্ষে শ্লাঘনীয় কিনা, সে বিচারের ভার নারীর উপরেই ছেড়ে দিলাম৷
আধুনিক কালে কুমারী পূজার শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যকে নতুন করে প্রবর্তিত করেন বিবেকানন্দ ও তাঁর রামকৃষ্ণ মিশন৷ সেই ‘জ্যান্ত দুর্গা’র পূজার আড়ম্বরের অন্তরালে নারী সম্পর্কে এঁদের দৃষ্টিভঙ্গি আসলে ঠিক কী, তা জানার জন্য ঔৎসুক্য বোধ হওয়া স্বাভাবিক৷ রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা যে দশনামী সম্প্রদায়ের অন্তর্গত, তার প্রতিষ্ঠাতা আদি শঙ্করাচার্য তাঁর ‘মণিরত্নমালা’য় লিখেছিলেন,
‘কিমত্র হেয়ং? – কনকঞ্চ কান্তা৷’
অর্থাৎ, মুমুক্ষু ব্যক্তির পক্ষে কোন্ কোন্ বিষয় পরিত্যাগের যোগ্য? – ধন ও স্ত্রী৷
‘কা শৃঙ্খলা প্রাণভৃতাং হি? – নারী৷’
অর্থাৎ, জীবের দুশ্ছেদ্য বন্ধন কী? – নারী৷
‘ত্যাজ্যং সুখং কিং? – রমণীপ্রসঙ্গঃ’
অর্থাৎ, কোন্ সুখ সম্যকরূপে পরিত্যাজ্য? – স্ত্রীসম্ভোগ৷
‘দ্বারং কিমাহো নরকস্য? – নারী৷’
অর্থাৎ, নরকের দ্বার কী? – নারী৷
‘বিজ্ঞান্মহাবিজ্ঞতমোঽস্তি কো বা? –
নার্য্যা পিশাচ্যা ন চ বঞ্চিতো যঃ৷’
অর্থাৎ, এই জগতে বিজ্ঞ থেকে মহাবিজ্ঞতম কে? – যাঁকে পিশাচীরূপিণী নারী বঞ্চনা করতে পারেনি৷
‘মণিরত্নমালা’র এই উদ্ধৃতিটি আছে বিপিনবিহারী ঘোষাল প্রণীত ‘মুক্তি এবং তাহার সাধন’ বইতে ( অষ্টম পুনর্মুদ্রণ, মে ২০১৫, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, পৃ. ১২১) ৷ বইটির ভূমিকায় স্বামী হিরণ্ময়ানন্দ লিখেছেন, রামকৃষ্ণের সংগ্রহে এই বইটি ছিল৷ তিনি তাঁর তরুণ শিষ্যদের বইটি পড়তে দিতেন৷ রামকৃষ্ণের বহুল ব্যবহৃত বইটি বর্তমানে বেলুড় মঠের গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে৷
নারীকে রামকৃষ্ণও ‘কামিনী’ রূপে দেখেছিলেন৷ কথামৃতে একাধিক জায়গায় ‘কাঞ্চন’ আর ‘কামিনী’ সম্পর্কে ভক্তদের সতর্ক করা হয়েছে৷ বিশেষ করে ‘সন্ন্যাসীর বড় কঠিন নিয়ম৷ স্ত্রীলোকের চিত্রপট পর্যন্ত দেখবে না৷’ (‘সন্ন্যাসী ও কামিনী – ভক্তা স্ত্রীলোক’, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত, চতুর্থ ভাগ, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ২০০২, দে’জ পাবলিশিং, পৃ. ৬৮৩) রামকৃষ্ণের উপলব্ধিতে “ অত পাশ করা, কত ইংরাজী পড়া পণ্ডিত, মনিবের চাকরী স্বীকার করে তাদের বুট জুতার গোঁজা দু’বেলা খায়৷ এর কারণ কেবল ‘কামিনী’৷” (‘কামিনী-কাঞ্চন জন্য দাসত্ব’, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত, প্রথম ভাগ, চতুর্থ খণ্ড, চতুর্থ পরিচ্ছেদ, পৃ. ৬৮৩) ‘মেয়েমানুষ থেকে অনেক দূরে থাকতে হয়, তবে যদি ভগবান লাভ হয়৷’ ( ‘ঘোষপাড়ার স্ত্রীলোকের হরিপদকে গোপালভাব – কৌমার বৈরাগ্য ও স্ত্রীলোক’, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত, দ্বিতীয় ভাগ, ঊনবিংশ খণ্ড, পৃ. ৩৫২) রামকৃষ্ণ বিচার করতে বলেছেন, ‘কামিনীকাঞ্চনই যোগের ব্যাঘাত৷ বস্তু বিচার করবে৷ মেয়েমানুষের শরীরে কি আছে – রক্ত, মাংস, চর্বি, নাড়ীভুঁড়ি, কৃমি, মুত, বিষ্ঠা এই সব৷ সেই শরীরের উপর ভালবাসা কেন?’ ( “ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও যোগতত্ত্ব – যোগভ্রষ্ট – যোগাবস্থা – নিবাতনিষ্কম্পমিব প্রদীপম্’ – যোগের ব্যাঘাত”, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত, তৃতীয় ভাগ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৪৬৩)
ব্রাহ্মণ্য পিতৃতন্ত্রের স্মৃতিশাস্ত্র থেকে শুরু করে সেকালের শঙ্করাচার্য হয়ে একালের রামকৃষ্ণ পর্যন্ত বয়ে আসা নারীঘৃণার এই অসুস্থ বিকৃত বিপজ্জনক আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত সন্ন্যাসী সঙ্ঘ আর তাদের ‘জ্যান্ত দুর্গা’র পূজা পরস্পরের প্রতিবাদ করতে করতে বছর বছর চলে আসছে৷
----------------------
----------------------
এর উত্তরে আমি প্রতি উত্তরে লিখলাম ____
সম্পূর্ণ লেখাটাই পড়লাম ।
লেখকের শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব সম্পর্কে যে ভাবনা, তার সম্পর্কেই কিছু কথা বলতে চাই ।
পৃথিবীতে সনাতনীদের ভিতর মূলতঃ চার শ্রেণীর মানুষ আছেন _
এক । ভাববাদ এ বিশ্বাসী
দুই । বস্তুবাদ এ বিশ্বাসী
তিন । উপরের দুই বাদের সমন্বয়ে বিশ্বাসী
চার । উপরের কোনটিই নয়
রামকৃষ্ণদেব যে "কামিনী" ( যাঁকে দর্শন করলে বা যাঁর রূপ কল্পনা করলে কামভাব জেগে ওঠে ) এবং "কাঞ্চন" ( অর্থ, সোনাদানা, হীরে জহরৎ, বাড়ি ঘর প্রভৃতি যাবতীয় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ) এর কথা বলেছেন, তা স্বজ্ঞানেই বলেছেন ।
পৃথিবীতে সমস্ত অশান্তির মূল কারণ এই কামিনী- কাঞ্চন এর প্রতি মানুষের অমোঘ আকর্ষণ । এর থেকে জন্ম হয় আসক্তির । তার থেকে আসে লোভ এবং কথায় বলে, "লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু" ।
বস্তুবাদী বিচারে দেহ হলো পঞ্চতত্ত্বের সমাহার । অস্থি মজ্জা রক্ত মাংসের দেহের Basic Building Block হলো প্রোটিন কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট জাতীয় পদার্থের সমীকরণে সৃষ্ট উপাদান । আর ভাববাদী বিচারে তার উপর আরোপিত হয় আকর্ষণ, মোহ, প্রেম ভালোবাসা এবং মায়া ।
ঈশ্বরতত্ত্ব লাভ বা পরমতত্ত্ব প্রাপ্তির পথে ( ভগবৎসাধনায় ) এই লোভ এবং আসক্তি মায়ার কোনো স্থান নেই । শঙ্করাচার্য বলেছিলেন, - "ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা" । এটাই ভাববাদীদের কাছে বিচার্য এবং একমাত্র আলোচ্য বিষয় ।
এই মায়াময় জগতে একমাত্র সত্য মৃত্যু । জন্ম হলে তার মৃত্যুজনিত ক্ষয় অনিবার্য । তাই সাধকেরা বস্তুবাদ থেকে নিজেদের অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যান । ভাববাদে নিমজ্জিত হন । আচ্ছন্ন হন ।
কারণ এটাই সহজ সার সত্যি, যে আসক্তি এবং মায়ার বন্ধন ছিন্ন না হলে মানুষের আত্মজ্ঞান লাভ হয় না । মানুষকে বুদ্ধ হয়ে উঠতে গেলে, "আত্মদ্বীপঃ ভবো" হয়ে উঠতে হবে । তার জন্যে চাই কঠোর সংযমী মানসিক অনুশীলন ।
আর তাই রামকৃষ্ণদেব তাঁর ভক্তদের "কামিনী- কাঞ্চন" এর মায়া ত্যাগ করতে বলতেন । তাঁর নিজের উপলব্ধিকে সহজ সরল ভাবে তাঁর মতো করে গল্প আর উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন ।
এটা মার্কসবাদের পাঠ মুখস্থ করা বস্তুবাদীদের কাছে বোধগম্য হওয়ার কথা নয় ।
আমার ছোটবেলা তথা স্কুলের বন্ধু Nayan Guha আমাকে তার স্বরচিত একটা লাইন বলেছিলো দিন দুয়েক আগে ।
সেটা হলো,
"বুদ্ধস্থঃ চরিতার্থায় বুদ্ধামাভিন্নে পারাবারে"
- যার অর্থ হলো,
বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির জন্যে বুদ্ধই হয়ে উঠতে হবে,
অন্য কিছু নয় ।
Comments