ঘেউ ঘেউ প্রসঙ্গে
কুকুরের ঘেউ ঘেউ প্রসঙ্গে __
মাননীয়া,
আমরা রাজ্য সরকারী কর্মচারী নাকি আপনার পোষ্য কুকুর, তাই নিয়ে বিতর্কে যেতে চাইনা ।
আপনি সাংবিধানিক পদমর্যাদায় রাজ্যপালের পরেই আমাদের সর্বেসর্বা ।
আপনার ছবি আঁকা, ছড়া লেখা মনের পাশাপাশি আরও একটা মন রয়েছে । সেই ভাবনায় জারিত আপনার স্বত্ত্বাটি যে রকমের অভব্য এবং অমার্জিত ভাষায় রাজ্যের সমস্ত রাজকর্মচারীর যৎসামান্য প্রাপ্তির দাবী দাওয়াকে গোটা দুনিয়ার সামনে প্রকাশ্য মিডিয়ায় "কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ" বলে সম্বোধন করলেন, তার থেকে আপনার রুচিবোধ এবং সংস্কৃতিবোধের বিলক্ষণ পরিচয় পেলাম ।
নাহ, অবাক হয়নি । আশ্চর্যও হইনি । কারণ আপনার চারপাশের বিষাক্ত পরিবেশ আর তার দূষিত বাতাবরণ আপনাকে হীরক রাজার মতো আচ্ছন্ন করে রেখেছে । তাই লোকজন আড়ালে আবডালে আপনাকে "হীরক রাণী" বলেও সম্মান করেন ।
আপনার চারপাশে যারা বিচরণ করেন, তারা মেরুদন্ডহীন তোষামোদপ্রিয় চাটুকার বিশেষ । পা-চাটা তাদের মজ্জাগত । আপনি তাদেরকে দেখে আর বাদ বাকি সকলকে এক আসনে এক সারিতে বসিয়ে দিলেন কেমন করে ? সকলে কিন্তু শিরদাঁড়া টা বাড়িতে খুলে রেখে কাজে আসেন না ।
আপনাকে আমরা ভরসা করে, ভালোবেসে, বিশ্বাস করেছিলাম । ভেবেছিলাম আপনি মহাপাপী 'মাকু'সুর দের বধের নিমিত্ত এই বাংলার বুকে জন্ম নেওয়া দেবী মহামায়া । আপনাকে মন্ডপে মন্ডপে পাড়ায় পাড়ায় দেবী দুর্গার প্রতিরূপে সাজানোর ঢল নেমেছিলো ২০১১ র সময় থেকে । আর এখন আপনার নামের আগে চার পাঁচটা অমার্জিত অনুচ্চারিত শব্দ জুড়ে সবার মুখে মুখে ঘুরে ফেরে ।
একবার ভাবুন । নিজের তৈরী ইমেজ কেমন করে আপনি ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দিচ্ছেন । আমাদের ভরসার আশ্রয়স্থল আপনি ছিলেন । আপনার কথাকে আশ্রয় করে আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম । কখনো ভাবিনি আপনার শব্দেরা সুমেরু থেকে কুমেরুর দিকে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে যাবে ।
আপনি বারবার বলছেন অর্থ নেই । কর্মচারীদের পাওনা গন্ডা মেটাতে আপনার বিরাট অসুবিধে ।
আপনি তো বিলক্ষণ জানেন যে অসুবিধার অন্যতম কারণ বেহিসাবী খরচ ! মন্ত্রীদের সভার জাঁকজমক, গাড়ি নিয়ে বিনা কাজে ঘুরে বেড়ানো, সরকারী অফিসগুলিকে কর্পোরেটের ধাঁচে সাজানো এবং সর্বোপরি আপনার সপার্ষদ জেলাসফরের এলাহী বন্দোবস্তের বিপুল খরচ ।
এছাড়াও রয়েছে উৎসব পালনের ঘনঘটা । সমস্ত লোকাল ক্লাবগুলিকে দেদার অর্থ বিলিয়ে দেওয়া বছরে অন্ততঃ দুই বার । আর ভোটের আগের খাই খরচ তো আছেই । সেটা আর এখানে ধরলাম না ।
অর্থ দপ্তরের দেওয়া হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এই অপারেশন অ্যান্ড মেন্টেন্যান্স খাতে ২০১১'র মার্চে খরচ ছিল ৮৯০ কোটি টাকা যা ২০১৬'র মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৮০ কোটিতে !!!
ঋণের কারণে মন্ত্রী, বিধায়কদের বিলাসী ভ্রমণ তথা বিলাসীবহুল অফিস তৈরিতে সরকারের কোনো কার্পন্য নেই । আপত্তি শুধু শিক্ষক আর কর্মচারীদের বেতন বা ডি.এ. বাবদ খরচে ?
ডি.এ. নিয়ে যদি এত সমস্যা হয় আপনার, যদি আমজনতার উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক হয়, রাজস্বের ক্ষতি হয়, সরকারের হয়রানি হয় তাহলে জনপ্রতিনিধিরা আইনসভাতে বিল পাস করে ডি.এ. কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিলেই তো একবারে ল্যাটা চুকে যায় । সংবিধানে তো নাকি ডি.এ. র অধিকারের কথা লেখাই নেই । সুতরাং মামার বাড়ীর এই ঝাঁটের আবদারেরও আর দরকার নেই ।
ত্রিপুরাতেও এই একইরকম ভাবে লালচোখ দেখিয়েছিল সরকার বাহাদুর, কিন্তু কর্মী, শ্রমিক, চাকুরেদের আইনি জেদের কাছে মাকুদের বাস্তিল দূর্গের পতন ঘটেছিল । ত্রিপুরার "ডি.এ. র উপর অধিকার" মডেল ভারতবর্ষের মধ্যে প্রথম ।
এর থেকে কি আমরা কিছুই শিখব না ?
সমস্ত কাজের ইমপ্লিমেন্টেশনের দায়ভার রাজকর্মচারীদের । সমস্ত ভুলের মাসুল গুনতে হয় রাজকর্মচারীদের । যে কোন পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রশাসন সরকারী চিকিৎসক এবং অগ্নি নির্বাপন কর্মীরা প্রস্তুত হয়ে থাকেন প্রতিকূল অবস্থাকে সামাল দেওয়ার জন্যে দিন রাত চোখের পাতা এক করে, অশান্তি এবং বিপর্যয়ের মোকাবিলা করবার জন্যে । সামনেই আসছে বাঙালীর সবচেয়ে বড়ো আনন্দের উৎসব । তখন রাস্তায় রাস্তায় নেমে আসবে পুলিশ আর প্রশাসন । ডিউটি করবে । আর সাধারণ মানুষ বউ বাচ্চা গার্লফ্রেন্ডের হাত ধরে ঘুরবে, বেড়াবে, ভালো মন্দ খাবে । বন্ধুরা প্যান্ডেলের পিছনে বসে লুকিয়ে চুরিয়ে মদ গিলবে ভাঙ্ খাবে ।
আপনি হয়তো ভুলে গেছেন যে আমাদের চাকরির মেয়াদ আপনার ক্ষমতায় বসে থাকার মেয়াদের থেকে ঢের বেশী - অনুগ্রহ করে এটা মাথায় রাখুন । আর কাজী নজরুল ইসলাম রচিত - 'সব্যসাচী' কবিতার লাইনগুলিও অনুগ্রহ করে মাথায় রাখুন -
"আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে
কাল তারা পদানত"
ইতিহাস কিন্তু কাউকে ছেড়ে কথা বলেনা ।
আর সমস্ত সরকারী কর্মচারী এবং আধিকারিকদের উদ্দেশ্যে বলছি -
রাজ্যের সমস্ত কুত্তার বাচ্চারা এক হোন ।
কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ আর নয় । অনেক হয়েছে । এবার কামড়ানোর আঁচড়ানোর সময় । বার্কিং ডগের স্ট্যাটাস / তকমা সেঁটে বসে থাকা আর নয় ।
গোটা রাজ্য জুড়ে সকলে একসাথে একজোট হয়ে কলম বন্ধ (Pen Down) করুন । পাবলিক আসলে ফিরিয়ে দিন । পরিষেবা দেওয়া বন্ধ করুন । আম পাবলিকের নাভিশ্বাস উঠুক । ওরা সমবেত হয়ে মিডিয়ার ******** ধরে মাননীয়ার কাছে যাক । আবেদন নিবেদন করুক । আর মাননীয়াও ভোটের আগে যেমন করে হাতজোড় করে ভোটভিক্ষে করেন, ঠিক তেমন করেই ক্ষমা চান জনসমক্ষে ।
এখানে বিরোধীদের টুঁটি চিপে মেরে ফেলার কালচার সেই কংগ্রেস আর সিপিএমের আমল থেকেই । আর সরকারী কর্মচারী হলে তার জন্যে রয়েছে ট্রান্সফারের জুজু । রয়েছে ভুল ভাল অভিযোগ দায়ের করিয়ে ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিং । রয়েছে সাসপেনসন্ এর আশঙ্কা ।
হয়তো এই লেখার ফলশ্রুতি হিসেবে এই লেখকের সাথেও সেই একই ট্র্যাডিশনকেই অনুসরণ করা হবে । তবুও এটা না লিখে পারলাম না । জানিনা, আগামীতে আর এমনটা লেখার সুযোগ পাবো কিনা ।
সকলে মেরুদন্ডটা পরে সমবেত হয়ে লড়াই এ নামুন । ভালো থাকুন । নিজেকে পদলেহনকারী কুকুর ভেবে, কিছুই করবার নেই বলে ধরে নেবেন না । সমস্ত কুকুর একজোট হয়ে দেখিয়ে দিন একবার, হ্যাঁ আপনারাও পারেন । তবেই আমার এই লেখাটা সার্থক বলে মনে হবে । আমি মরে গেলেও আমার আত্মাটা শান্তি পাবে ।
নয়তো মাননীয়ার কথাটাই সত্যি বলে প্রতিপন্ন হবে । আয়নার মুখোমুখি দাঁড়ালে হিজড়ে নপুংসক বলে মনে হবে নিজেদের ।
ভাবছি _ কি করবেন এবার ? কবিবর সুবোধ সরকার ? উনিও কি ঘেউ ঘেউ করতে করতে কবিতা পড়তে যাবেন অ্যাকাডেমি থেকে অ্যাটলান্টা ?
এবার নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করবার দায়ভারটা কিন্তু আপনাদেরই । আপনারা আসলে যে কি, তার বিচারভার এবার সময়ের হাতেই তুলে দিলাম ।
সকলকে সুপ্রভাত ।।।
@ রা জে ন্দ্র
Comments