পোষ্য

|| দৃশ্যপট - এক ||
----------------------
(( স্থান - প্রায় অন্ধকার স্টাডি রুম । টেবিলের উপর একটা ল্যাম্প জ্বলছে । মাথাটা নীচু করে কাঁধ ঝুঁকিয়ে দুই হাতের ভিতর মুখটা গুঁজে চুপ করে চোখদুটো বুঁজে চেয়ারে বসে আছে তিন্নি । আচমকা পিঠের উপর একটা আলতো করে হাত এসে পড়লো ... ))

- কি রে, কি করছিস তিন্নি ? ঘুমিয়ে পড়লি নাকি ?

- না মাম্মি । ঘুমটা আসছে না । মাথাটা বড্ড ধরে আছে। কিচ্ছু ভালো লাগছে না গো ।

- আহা, তোর ভালো না লাগলে কেমন করে হবে বল্ ? আর সপ্তাহ খানেক পরেই তো মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষা । আর তোর তো প্রায় সবটাই অলমোস্ট রিভিশন করা বাকি । এই তো দুদিন আগে জ্বর থেকে উঠলি ।

- সে আমার পরীক্ষা আমি না হয় বুঝে নেব । কিন্তু বাপি যে বলছে বাড়িতে কোনও কুকুর বিড়াল খরগোশ পশু পাখি - এসব রাখতে দেবে না, সেটাই বা কেমন করে মেনে নেবো বলো ?

- তুই তো জানিস মা, বাড়িতে এসব জন্তু জানোয়ার পোষার কত্তো ঝামেলা । একদম একটা বাচ্চাকে মানুষ করবার মতোন আদর যত্ন দিয়ে ওদের বড়ো করতে হয় । তারপর সময়মতোন ডাক্তার দেখানো, ভ্যাকসিন ...  আরো কতো কি । এছাড়া ওদেরকে বাড়িতে একলা ফেলে রেখে দূরে কোথাও কটা দিনের জন্যে ঘুরতে বেড়াতে যাওয়ারও অনেক সমস্যা । ওরা কি আর অন্য মানুষজনের কাছে থাকতে খেতে পারবে ? মানিয়ে নিতে পারবে বল্ ? আর অন্যেরাই বা কেন আমাদের এই দায় দায়িত্ব ঝামেলা ঘাড়ে নেবে ?

- তোমাকে প্রমিস করছি মাম্মি - এই সব কিছুর দায় দায়িত্ব, ঝুট ঝামেলা আমি নেব । তোমাদের কাউকে কিচ্ছুটি করতে হবে না । আর আমি যেখানেই যাই না কেন, ওদেরকেও সাথে নেবো । নয়তো যাবো না কোথাও । আর কোথাও গেলেও সেখানে এক রাতের বেশি থাকবো না । তুমি বাপি কে প্লিজ বলো । আমি জানি, তুমি বললে বাপি মানা করতে পারবে না ।

- বেশ, আমি বলে দেখবো তোর বাপি কে । আচ্ছা শোন, যে জন্যে তোকে ডাকতে এলাম - আগামীকাল শনিবার আমরা রাজারহাটে বসু আন্টির বাড়ি যাব । সম্ভবতঃ তুই কালকের বিকেলের কোচিং ক্লাসে যেতে পারবি না । ফিরতে রাত হয়ে যাবে আমাদের । তুই বরং কালকের কোচিং এর নোটস্ গুলো সব জোগাড় করে নিস । আগেভাগেই তোর ফ্রেন্ডস্ দের বলে রাখিস । পারলে তোর স্যারকেও একটা ফোন করে জানিয়ে দিস । যদি উনি তোকে এক্সট্রা কোনও একটা ক্লাস করিয়ে দেন অন্য কোনও একটা ব্যাচের সাথে ।

- আচ্ছা মাম্মি, এই বসু আন্টি কি তোমার পিসতুতো দেওরের মা ? ওনার ছেলে তো শুনেছিলাম কানাডায় রিসার্চ করছে । আর ঐ আন্টিও তো আমেরিকায় থাকতেন জানতাম । এখানে আবার কবে এলেন উনি ?

- সে অনেক কথা মা । ওনার স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পরে পরেই উনি কলকাতায় ফিরে আসেন । এখন রাজারহাটের একটা ফ্ল্যাটে একাই থাকেন । ওনাদের শ্যামবাজারের পৈতৃক বাড়িটার অংশটাও উনি ভাইদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন । এখন ওনার সম্পত্তি বলতে শুধুমাত্র এই ফ্ল্যাট টাই । উনিই একটু আগে আমায় ফোন করেছিলেন । আর দিন সাতেক পরেই উনি ছেলের কাছে কানাডায় চলে যাবেন । আবার কবে ফিরবেন, তার কোনও ঠিক নেই । তাই চলে যাবার আগে আমাদেরকে উনি একবার দেখতে চান । তাই বলছিলাম ...

- বেশ তো মাম্মি । যাব আমরা সবাই মিলে । কাল কটা নাগাদ বেরোবে বলো । সেই মতোন আমি চ্যাপটার গুলো শেষ করে অ্যালার্ম দিয়ে শোবো । এখন তো হাতে আর বেশি দিন নেই । তাই ঘড়ি ধরে সবকিছু মেপে করতে হচ্ছে । সাবজেক্টের পেপার ওয়াইজ টাইম ভাগ করে নিয়ে পড়ছি, যাতে কোনও এরিয়া নেগলেক্টেড না হয় ।

- ওকে । তুই তোর মতোন করে পড়াশুনো করে নে । কাল আমরা সকাল আট'টা নাগাদ বেরিয়ে পড়বো । ড্রাইভারকেও সেই মতোন করে পৌনে আট'টা নাগাদ আসতে বলে দিয়েছি । বেলা সাড়ে নয়টা - দশটার মধ্যেই আমরা আন্টির ফ্ল্যাটে পৌঁছে যাব । তুই সকাল ছ'টা - সাড়ে ছ'টার ভিতর উঠে পড়িস । তোর তো আবার তৈরী হতে খানিকটা সময়ও লেগে যাবে ।

- বেশ মাম্মি । তোমরাও আর লেট কোরো না । টাইম মতোন খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ো ।

- দাঁড়া রে দাঁড়া, আগে তোর বাপি আসুক । এখনো তো ওনার বাড়ি আসতে আসতে আধা ঘন্টার মতোন লেগে যাবে । আমি বরং এই ফাঁকে ফ্রিজ থেকে খাবার গুলো বের করে মাইক্রো তো গরম করে নেই ।

(( মিসেস মিত্র ধীরপায়ে চলে গেলেন । ঘরের নরম হাল্কা আলতো আলোর আদরে মাথা নীচু করে নীরবে পড়তে লাগলো তিন্নি ... ))

|| দৃশ্যপট - দুই ||
---------------------
(( স্থান - রাজারহাটের দুই কামরার ফ্ল্যাট । প্রায় সুজজ্জিত দামী ও ভারী আসবাবে পরিপূর্ণ ড্রয়িং রুম । সোফায় বসে একমনা হয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন ষাটোর্দ্ধ তনিমা বসু । ওনার পায়ের কাছে চুপ করে বসে একমনে বিস্কুট খাচ্ছে গুবলু । ওনার ভারি প্রিয় সর্বক্ষণের একমাত্র সঙ্গী ল্যাব্রাডর । এমন সময় কলিং বেলের শব্দ শোনা গেলো । বসু ম্যাডাম ধীরপায়ে অল্প খুঁড়িয়ে উঠে গেলেন দরজার ছিটকিনি খুলতে । ছিটকিনি খোলার শব্দ হলো । দরজা খুলে সাদরে আপ্যায়ণ করে ভেতরে আনলেন তিন্নিদের ... ))

- আরে এসো ... কতদিন পরে দেখলাম তোমাদের সকলকে একসাথে । কি ভালো যে লাগছে ।

(তিন্নির দিকে চেয়ে) ওব্বাবা ! এই তিন্নি যে কত্তো বড়োসড়ো হয়ে গেছে !

( তিন্নিও সাথে সাথে মাথা নীচু করে প্রণাম করলো বসু আন্টিকে )

থাক্ মা । অনেক বড়ো হও । সুখী ও সৌভাগ্যবতী হও ।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি