প্রতিপদের ভাইফোঁটা

প্রতিপদের ভাইফোঁটা
********************

ঘটনাটা আজকের । আজ প্রতিপদ । কালীপূজার পরের দিনের সকাল । আমি ঘরে বসে শারদীয়া পূজাবার্ষিকী পড়ছি । আর মাঝে মাঝেই আমার ব্যচমেট, শালবনীর বন্ধু, অতনুর সাথে গ্রুপে টুকটাক কথা বলছি ।

এই নভেম্বরের পাঁচ তারিখ মানে সামনের শনিবার ওর সাথে দেখা করে আড্ডা দেবো বলে মনস্থির করে সেকথা অতনুকে জানাতেই ও সটান কল্ করে বসলো আমাকে ।

আমি কথা বলতে বলতেই বউ এসে আমাকে বললো কিছু ছবি তুলে দিতে হবে ওর মোবাইলে । মোবাইলটি MI কোম্পানীর থেকে সদ্য নতুন কেনা একটি অসাধারণ কনফিগারেশনের মডেল । ফ্লিপকার্ট থেকে অনলাইনে নেওয়া, আর সেটাও অনেক কথা আর গাল শুনে, অনেক সাধ্যসাধনা আর কসরৎ করে কেনা হয়েছিলো ।

সেই কেনার পদ্ধতি নিয়ে আর তারপর তার ইনস্টলেশন্ নিয়েও বিস্তর ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল আমাকে বউয়ের সাথে । যাক্ গে সেসব কথা ।

আমি আমার ট্যাব হাতে অতনুর সাথে কথা বলতে বলতেই বউ বসে পড়ল তার ভাইকে ফোঁটা দিতে । আমি কথা বলতে বলতে একটু ইশারা দিলাম, মিনিট দুয়েক সবুর করবার জন্যে । তো সেটা হয়তো তার পক্ষে সম্ভবপর ছিলো না বলেই আমি কোনওমতে বন্ধুর সাথে কথা সেরে ফেললাম ।

তারপর অতি দ্রুততার সাথে কিছু স্ন্যাপ্ নিলাম । আমার শ্যালক মশাই ছবিগুলো তার মোবাইলের জন্যে চাইলেন । আমি "শেয়ার ইট" অ্যাপস্ অন করে বাছাই করে ভালো ছবিগুলো দিয়ে দিলাম ।

তবে দেওয়ার আগে খারাপ তোলা ছবিগুলো, অর্থাৎ যেগুলো ঝাপসা এসেছে বা যেগুলোর ফ্রেমিং ঠিকঠাক হয়নি বা ফোকাসিং নড়বড়ে এমন ছবিগুলো ডিলিট করে দিলাম ।

এই কর্মটিই আমার সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিলো । এখানে আমি অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করিনি বা এর পরবর্তী ফলাফলটা নিয়েও ভাবনাচিন্তা করে দেখিনি । আর সেই সুনামির মত বিশাল প্রত্যাঘাতটা এল ঘন্টা খানেক পরেই ।

বউ তার সব কাজ সেরে যখন নীচে নেমে এলো, তখন তার রণচন্ডী যুদ্ধং দেহী তীক্ষ্ণ আক্রমণাত্মক মেজাজে আমি সাময়িকভাবে ক্ষতবিক্ষত হলাম ।

তার অভিযোগ খুবই গুরুতর ছিল । আমি নাকি তার তোলা সবেধন নীলমনি তিনটি ছবিকেই ডিলিট করে দিয়েছি । আমি কেন এমন জঘন্য একটি কাজ করলাম, তার জন্যে আমাকে যারপরনাই এবং যাচ্ছেতাই ভাবে অনেক কিছুই বলা হলো ।

আমি তাকে বোঝাতে চাইলাম ছবি তোলা একটা শিল্প । ছবিকে দিয়ে কথা বলাতে হয় । লোকে পয়সা খরচ করে ছবি তোলার প্রশিক্ষণ নেয় । অনেক সাধ্য সাধনা না করলে ভালো চিত্রগ্রাহক হওয়া যায় না ।

কিন্তু এইসব শব্দগুচ্ছের একটি কণাও তার কানের পর্দায় ধাক্কা খেলো না । উল্টে আমায় আরও যাচ্ছেতাই ভাবে অচ্ছেদ্দা করা হলো । অপমান করা হলো । বলা হলো আমি নাকি একজন _ ***** ড্যাশের ফটোগ্রাফার ।

আমি বারবার তাকে এই কথাই বোঝালাম, যে আমরা যেটাই করি, সেটা যেন যত্নসহকারে মন দিয়ে ভালোবেসে করি । কিন্তু তার কথার আগুনে আমার এই প্রতিপদের সকাল টা যেন রোস্টেড চিকেন এর মতোন ঝলসে গেল । ব্যাপারটা শেষমেষ প্রায় হাতাহাতির পর্যায়ে চলে গেলো ।

আমার গিন্নি তেজের চোটে তার খাবার থালায় বেড়ে রাখা সমস্ত ভাত ও আনুসঙ্গিক সামগ্রী মেঝেতে আছড়ে ফেলে দিল । ঘরময় ভাত আর অন্যান্য সব পদে ছেয়ে গেল ।

এমন বিচ্ছিরি ঘটনার আগাম আঁচ আমি পাইনি । পেলে ছবি তো তুলেই দিতাম না । বউয়ের ফোনে হাতও দিতাম না । মনস্থির করে ফেললাম আমার ট্যাব ও বউয়ের ফোনের ভিতর কোনও সংযোগ রাখব না । মানসিক ভাবেও না, ভার্চুয়াল ভাবেও নয় ।

অথচ ওর এই ফোন অনলাইনে বুক করবো বলে আমি মালদায় আমার চার জন ভাতৃসম প্রিয়জনকে অনুরোধ করেছিলাম । কারণ যেদিন এবং যেই সময় ফ্লিপকার্টে এর বুকিং হওয়ার কথা, তখন আমি আমার ব্লক অফিসে একঘর লোকের হাজিরা নিয়ে মিউটেশন কেসের হিয়ারিং নিতে ব্যস্ত ।

সুতরাং শিক্ষা অনেকগুলো পেলাম এই ফোনটির জন্য _

এক.
কারো জন্যে কিছু করবার আগে হাজার বার অগ্র - পশ্চাৎ ভাবতে হবে ।

দুই.
মূর্খ ও অবিবেচক দের থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে, এবং সেটা ভার্চুয়ালদের ক্ষেত্রেও সমানভাবেই প্রযোজ্য ।

তিন.
ভুল মানুষের সাথে থেকে কষ্ট বা যন্ত্রণা পাওয়ার চেয়ে একলা থাকা অনেক বেশী শ্রেয় ও আনন্দদায়ক ।

যেমন ভাবনা, তেমন কাজ । Faceboook Account on করলাম । Legal Mrs. কে প্রথমে Unfriend করলাম । তারপর Block করলাম ।

এরপর Marrital Status এ গিয়ে লিখলাম Complicated since 2005, অর্থাৎ যেই না শুকানো ঘায়ের যন্ত্রণাটা আমি ভোগ করে চলেছি সেই সময় থেকেই চুপচাপ একাকী পরম নীরবতার সাথে ।

শেষের কথা _

বহু ব্যবহারে জরাজীর্ণ একটা প্রবাদ মনে পড়ছে বেলা শেষে :-

মান (সম্মান ) + হুঁশ (বোধ_জীবনানন্দের কবিতা) = এই দুইয়ের সঠিক সমন্বয় বা মেলবন্ধন জীবনে আছে যার, সত্যি সত্যিই হয়তো রোস্টেড কপাল তার

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি