কাল্পনিক চরিত্র অবলম্বনে
“কাল্পনিক চরিত্র অবলম্বনে এই ব্যাঙ্গ নাটকের সকল চরিত্র, স্থান, কাল সবই কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে এর কোনও সম্পর্ক নেই ……… সুবীর ব্যানার্জী” |
-:: চড়াম চড়াম ঢাক ::-
ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং
বুদ্ধ : হ্যালো, কে বলছেন ?
জ্যোতি : কমরেড বুদ্ধ , কমরেড জ্যোতি বলছি |
বুদ্ধ : কমরেড জ্যোতি ? হোয়াট এ গ্রেট সারপ্রাইস ! কমরেড আপনি কোথা থেকে বলছেন ? আপনি কি সরাসরি স্বর্গ থেকে ফোন করছেন ?
জ্যোতি : বুদ্ধ তুমি দেখছি বুদ্ধুই থেকে গেছো | আমি নরক থেকে বলছি |
বুদ্ধ : সে কি ! আপনি শেষ পর্যন্ত নরকে ! তা কেমন আছেন ?
জ্যোতি : কেমন আছি সে প্রশ্ন করোনা বুদ্ধ |
বুদ্ধ : কেন কেন ?
জ্যোতি : আর কেন | সেদিন ইন্দিরা ভবনের উঠোন......
বুদ্ধ : ওখানেও ইন্দিরা ভবন ? মানে নরকেও আপনি তাহলে ইন্দিরা ভবনেই আছেন ?
জ্যোতি : হ্যাঁ, এখানেও একটা ইন্দিরা ভবন আছে | সেখানে অনিতা থাকে | অনিতা, সেই যে অনিতা দেওয়ান | সেদিন ভুল করে বলে ফেলেছিলাম “অমন তো কতই হয়” | আর আজ কিনা আমাকে উঠোন ঝাঁট দেওয়া, বাগান পরিষ্কার করা……..
বুদ্ধ : সে কি ? আপনাকে দিয়ে ঝাঁট দেওয়ানো, বাগান পরিষ্কার করানো ……
জ্যোতি : সেদিন কি বলে জানো মেয়েটা ? বাড়ির পাশে একটা ছোট্টো বাগানে একটা শিয়াল ডাকে বলে তার নাকি রাত্রে ঘুম হয় না | যান ব্যবস্থা করুন |
বুদ্ধ : তা কি করলেন কমরেড ?
জ্যোতি : কি আর করব ? ধুতি পরেতো আর জঙ্গলে যাওয়া যায় না | ধুতি খুলে আন্ডার প্যান্ট পরে বাগানে গিয়ে শিয়াল টাকে ধরলাম, তারপর এখান থেকে অনেক দুরে যেখানে ওর জাত ভাইরা থাকে সেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এলাম |
বুদ্ধ : আচ্ছা ওখানকার খাওয়া দাওয়া ? মাছ, মাংস, চাইনিজ, তারপর স্কচ, হুইস্কি সব ঠিকঠাক পাচ্ছেন তো ?
জ্যোতি : মস্করা করোনা বুদ্ধ | যে চাল গুলো রেশনে দিতাম সেই চালের ভাত | ভাবোতো একবার খাওয়া যায় ?
বুদ্ধ : আচ্ছা কমরেড, আমাদের অন্যরাও কি ওখানেই আছে ?
জ্যোতি : কোথায় আর যাবে ? সবাই এখানেই আছে | কেউ চুল দাড়ি কাটে,, কেউ জামা কাপড় কাচে |
বুদ্ধ : কাদের ? নরকের দেবতাদের চুল দাড়ি কাটে, জামা কাপড় কেচে দেয় ?
জ্যোতি : আরে না না,, দেবতারা আমাদের মানে মাকুদের ছোঁয়া জিনিস স্পর্শ করে না |
বুদ্ধ : তাহলে কাদের ?
জ্যোতি : শুনবে ? ভিখারি পাসোয়ানের, তাপসী মালিকের, সাঁই বাড়ির ছেলে গুলোর, বিজন সেতুর সন্যাসীদের, রাজভবন অভিযানের ১৩ জন, নানুরের চাষি গুলোর, কেশপুর, দিনহাটা, মঙ্গল-কোট ওখানকারও অনেক মানুষ আছে | তারপর শিঙ্গুর, নন্দী-গ্রাম, নেতাই এর অসংখ্য নারী পুরুষ যাদের তোমরা ………
বুদ্ধ : থাক থাক থাক কমরেড আর বলতে হবে না | আমি বুঝে নিয়েছি | আচ্ছা, একটা ব্যাপার কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না | আপনারা নরকে আছেন, আবার অনিতা দেওয়ান, ভিখারি পাসোয়ান, তাপসী মালিক, ওরাও কেন নরকে ?
জ্যোতি : হেঃ, হেঃ, হেঃ, আমারও ঐ রকমই ধারনা ছিল বুদ্ধ | স্বর্গ আর নরক দুটো আলাদা জায়গায় | কিন্তু এখানে এসে দেখলাম ধারনাটা একদম ভুল | স্বর্গ আর নরক একই জায়গায় | এখানে আসার পর চিত্রগুপ্ত খাতা খুলে সবার কর্মফল বিচার করে একরকম কুপন দেয় | কাউকে সবুজ কুপন, আর কাউকে লাল কুপন | যারা সবুজ কুপন পায় তারা ভীষণ সুখে থাকে, কোনো কাজ করতে হয় না | তাই ওদের কাছে এটা স্বর্গ | আর আমরা মাকুরা, যারা লাল কুপন পেয়েছি, আমরা ওদের সেবা করি | যখন যা প্রয়োজন তাই করে দি | মানে ওদের ফাই ফরমাস খাটি | তাই আমাদের কাছে এটাই নরক |
বুদ্ধ : এই রকম ব্যাপার | তা আপনি এত ধুরন্ধর মানুষ, কায়দা করে টুপি টাপা দিয়ে একটা সবুজ কুপন সালটে দিতে পারলেন না ?
জ্যোতি : চেষ্টা কি আর করিনি | কিন্তু এটা তো আর ঐ ভোটের ব্যালট বাক্স নয় যে কাউন্টিং এর সময় লোডশেডিং করে দিয়ে সব উল্টে দেব পাল্টে দেব | এটা একদম ঐ আধার কার্ডের মত, চোখের মনি, হাতের ছাপ সব থাকে, ম্যানেজ করার কোন চান্সই নেই বুদ্ধ |
বুদ্ধ : বলছেন কি, ওখানেও আধার কার্ড ! আপনিতো চিন্তা ধরিয়ে দিলেন কমরেড | আচ্ছা সুহাষদার কি খবর ?
জ্যোতি : সুহাষ মাঝে মধ্যে সত্যি কথা মিডিয়াতে বলে দিত | তারপর তারাপীঠে একবার পূজোও দিয়ে এসেছে তাই ও একটু বেটার আছে | ও সবার রান্না করে | ওরা যে যেদিন যা খেতে চায় তাই বানিয়ে দেয় |
বুদ্ধ : আর বলবেন না কমরেড, ভীষণ নার্ভাস লাগছে |
জ্যোতি : আর বলেইবা কি হবে ? মিনিমাম ৩৪ বছর ভোগ করতেই হবে | তা তোমাদের কি খবর বুদ্ধ ? ঘোঁট পাকিয়ে, গেরুয়াদের সাথে তলে তলে সেটিং করে, মিডিয়া, দিয়ে কুৎসা আর অপপ্রচার করে, সেন্ট্রাল ফোর্স, কমিশন, কোর্ট সব একসাথে লাগিয়ে, একেবারে অভিমন্যুর মতো ঘিরে ধরেও শেষে আঙুল চুষতে হলো তো !
বুদ্ধ : সে কি ? এখানকার এত খবর কিভাবে জানলেন ? ওখানে টিভিও দেখেন বুঝি ?
জ্যোতি : হ্যাঁ, নরক যন্ত্রনা ভোগ করার জন্য একটাই চ্যানেল “একেবারে পচা আনন্দ” | খোঁজ খবর কিছুটা পাই | তা তোমরা এবার কি করবে ? হাতের সব তাস তো খেলে ফেললে | এবার কি মঙ্গল গ্রহে দল খুলবে নাকি, কামিয়েনিস্ট পার্টী অফ মঙ্গল ?
বুদ্ধ : কি জে করি ! কিছুই ভাল লাগছে না | রুপুও নেই, নন্দনেও যেতে পারছি না | সময় কাটানোই দায় | টিভি খুললেই শুধু সবুজ আবির আর নাচা নাচি | কিছুতেই কিছু করা গেল না |
জ্যোতি : তোমরা নিজেদের বড্ড চালাক ভেবেছিলে | ভেবেছিলে তোমরা যা গেলাবে, মানুষ তাই গিলবে | মানুষ কি এতই বোকা |
বুদ্ধ : প্রচুর মানুষ কিন্তু খেয়ে গেছিলো ব্যপারটা | কিন্তু ওরা যদি মানুষকে আসতেই না দেয়, রাত্রি বেলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিয়ে আসে তাহলে কি করে হবে ? এই অসভ্যতা মেনে নেওয়া যায় ?
জ্যোতি : আমরা এতদিন কি করেছি বুদ্ধ ? মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা রৌদ্রে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন ভেতরে যেত বলতাম যান বাড়ি চলে যান, আপনারটা হয়ে গেছে, তখন ? ওরা তো তবু আমাদের লোকেদের কষ্ট দিচ্ছে না | বাড়ি এসে বলে যাচ্ছে কষ্ট করে আর যাবার দরকার নেই, ছুটির দিন, বাড়ি বসে বিশ্রাম নিন, খাওয়া দাওয়া করুন, টিভি দেখুন…..
বুদ্ধ : আমরা করেছি বলে ওরাও করবে ? তাহলে কিসের পরিবর্তন ? এভাবে চললে তো গণতন্ত্র বলে আর কিছু থাকল না.
জ্যোতি : চুপ, চুপ, চুপ. ঐ গনতন্ত্র কথাটা উচ্চারণ করোনা বুদ্ধ, তোমার বাড়ির চাকর বাকর গুলো শুনলেও হেসে উঠবে | ওটার যা হাল করে ছিলাম আমরা | এখনতো তবু বিচার টিচার হচ্ছে, | ভাবোতো, ঐ যে কার্টুন মহাপাত্র, বজ্জাতটা ঐ কাজটা যদি আমাদের সময় করত তাহলে ও বেঁচে থাকত ?
বুদ্ধ : তাহলে এখন কি হবে কমরেড | আমরা কি ছাগলের তিন নম্বর হয়েই থেকে যাব ?
জ্যোতি : শোনো ভায়া, ওসব শর্টকাট শিস্টেমে কিছু হবে না | মানুষের পাশে থেকে সংগঠন বাড়াতে হবে বুঝলে | লড়াই করতে হবে, মার খেতে হবে | আবার নতুন উদ্যমে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে |
বুদ্ধ : একেবারে শূন্য থেকে ? কাকে নিয়ে করব ? লক্ষণ জেল থেকে বেরিয়ে এখন পারলে আমাকেই জেলে পোরে | সুশান্তকে পাবলিক ধরে চটি পেটা করছে | আর পাগলু ! ওতো জোকার, আস্ত পাগল একটা, ওকে দিয়ে চলে ? দলের সম্পদরা সব গর্তে ঢুকে গেছে | চাষার ব্যাটা শুর শুর করে ওদিকে ঢুকে পরল | নাটা বোস, এমন নতুন সূর্যদয়ের গল্প শুনিয়েছে যে এখন ওকে টিভিতে দেখলেই পাবলিকও পাল্টা বলছে দ্যাখ কেমন লাগে | খোকন শুয়ে পরেছে | ,টেকো দেবকে পাবলিক এখনো রিগীং দেব, রিগীং দেব বলে, এদের দেখলেই পাবলিক হাসে | সূর্য একেবারেই অস্ত গেছে |
জ্যোতি : তোমারও তো দেখছি নতুন করে শুনানি শুরু হতেই যখন তখন পাজামা ঢিলা হয়ে যাচ্ছে | ভয়ের চোটে অসুস্থ অসুস্থ ভান করে বেশ কেটে পরলে |
বুদ্ধ : আরে না না ঠিক তা নয় | আসলে তখন খুব হম্বি তম্বি করে ফেলেছিলাম, মেরে মাথা ফাটিয়ে দেব | তাই একটু নার্ভাসতো লাগবেই | তারপর ওরা যদি অনবরত বলতে থাকে “চরাম চরাম ঢাক বাজাবো”, বুকের ভেতরটা দরাম দরাম করবে না |
জ্যোতি : হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ, তাহলে কেষ্টর “চরাম চরাম ঢাক” তোমাদের তাল কেটে দিল ! যা শুরু করেছিলে ঐ বাহিনীকে দিয়ে | ভেবেছিলে মানুষকে ভূল বুঝিয়ে আর ওদের ভয় ধরিয়ে বাজি মাত করে নেবে | কেষ্টর “চরাম চরাম ঢাক” তোমাদের ঢোল ফুটো করে দিল | তাহলে এখনই আসল “দুঃসময়” কি বলো বুদ্ধ ? আচ্ছা বুদ্ধ শ্যামল কোথায় ?
বুদ্ধ : শুনলাম ও বৃন্দাবনে গেছে …..
জ্যোতি : কি বলছ বুদ্ধ ? তোমার মাথার ঠিক আছে তো ? শ্যামল বৃন্দাবনে ?
বুদ্ধ : ঠিকই বলছি কমরেড | ও এখন মাঝে মাঝেই বৃন্দাবন যায় | কিছুদিন আগে একটা মিটিংএ শ্যামল নিজেই ফাঁস করে দিয়েছিল, কদিন আগে বৃন্দাবনে যমুনার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, কে যেন পিছন থেকে “রাধে, এই রাধে , আমার রসগোল্লা খাবে” বলে ডেকেছে |
জ্যোতি : তাই নাকি ? ব্যাটা ঘার বেঁকা, কোমর সোজা হয় না, তলে তলে এত | তারপর তারপর.......
বুদ্ধ : আজ এসব কথা থাক কমরেড | মীরা শুনলে খুব রাগ করবে |
জ্যোতি : কেন কেন, কেন, আজকে থাকবে কেন ? আজকে কি কিছু আছে নাকি বুদ্ধ ? আচ্ছা বুদ্ধ মাঝে মধ্যে ঢং ঢং করে কাঁসর ঘণ্টা বাজার শব্দ আসছে যেন ?
বুদ্ধ : বাড়িতে সত্যনারায়ণ পূজো হচ্ছে কমরেড | কদিন হল দীক্ষা নিয়েছি | গুরুদেবের কথা মতো আজ সন্ধ্যায় তারাপীঠ থেকে ৩ জন তান্ত্রিক আসবেন, বাড়িতে একটু যজ্ঞ করাব, তাই বলছিলাম আজ এসব কথা………….. , ঐ মীরা ডাকছে, যাই শান্তির জল নিয়ে আসি | কমরেড আজ তাহলে রাখি, পরে আবার কথা হবে........
Comments