কথা রাখিনি, রাখতে পারিনি // রাহেন্দ্র প্রসাদ
কথা রাখিনি, রাখতে পারিনি
কথা কেউ রাখেনা, রাখতে পারেনা।
শুন্তে খারাপ লাগে, তাইনা?
তবুও কথাটা সত্যি। গল্পটা তবে বলি।
চারিপাশের পরিবেশ আবছা,
আলো-আধাঁরি ভাসা ভাসা মনে আছে।
বাড়ির চারিপাশে ছিল অসংখ্য গাছ,
জেলেরা ভোর রাতে জাল ফেলত।
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে দেখতাম।
কত মাছ, কত রং, কি আনন্দ তাদের!
কাঁচের মতন জল আমার
কী দারুণ ভালোলাগত।
ভালো লাগত পুকুর পাড় দিয়ে
বয়ে যাওয়া মিষ্টি হাওয়াকে,
মনটা এক পলকে ভিজে যেত।
আবার ভয়ও পেতাম অজানা শঙ্কায়,
সাঁতার কাটতে আরো ভয় লাগত,
কম্প দিয়ে যেন জ্বর আসত।
কত বন্ধু ছিল আমার!
বিকাল হলেই ছুটে যেতাম
আমবাগানে, পুকুর ঘাটে।
ব্যাঙমাছি খেলা, রঘু ডাকাত,
রামায়ণের হনুমান, রবিনহুড,
সবাই মিলে মিশে এক হয়ে যেতাম।
কখনো পিঁপড়ে ধরে শিশিতে ভরতাম।
আমবাগান, কলাবাগান, বাঁশবাগান,
সবার রাজা ছিলাম আমি।
সবাই ছিল আমার প্রজা।
সময় থেমে রইলনা,
আমিও থেমে থাকতে পারিনি।
যারা আমার একমাত্র সাথী ছিল,
সেই বাগান, পুকুর আর বাকি সবাইকে
ফেলে রেখে এলাম অতীতের এক কোণে।
তাদের মায়া কাটিয়ে এলাম স্কুলে।
আমি তাদের কথা রাখিনি,
রাখতে পারিনি।
স্কুলের নতুন পরিবেশে সবকিছু বন্ধ।
হাসি, হট্টগোলের মেলা নিমেষে উধাও।
নিয়মের বেড়াজালে জীবন অতিষ্ঠ হল,
তবে সে নিয়ম সবার কাছে সমান ছিলনা;
কেউ কেউ নিয়মকে ব্যঙ্গ করত,
তারা ছিল অনেকের নয়ন মণি।
অনেকেই স্কুলের বাইরে বাড়িতেও পড়াতেন,
তাদের অনেকেরই দ্বিচারিতা প্রশ্ন জাগাত।
পড়ানো নিয়েও তারা ভেদনীতি করতেন,
তারা অনেকেই কথা রাখেননি,
রাখতে পারেননি।
নিয়ম-নীতির স্কুলে অনিয়মের অনাচার,
প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তুলে মনে সংশয় জাগাত।
যে অঙ্গীকারে বদ্ধ ছিলাম, তাতে প্রশ্ন এল,
নিজের প্রতি আস্থা হারালাম,
আমি কথা রাখিনি, রাখতে পারিনি।
হঠাৎ করে অনেকটাই বড় হয়ে গেলাম।
স্কুলের গন্ডী ছেড়ে কলেজের প্রাঙ্গনে,
সোজা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়।
অঘটনের তখনো অনেক বাকী।
নতুন করে মানুষ চেনা শুরু হল।
দেখলাম বড়োদের দেওয়া
মগজ ধোলাইয়ের লজ্জাহীন প্রতিযোগিতা।
ছাত্র রাজনীতির দাদাদের দাদাগিরিতে
নিজের মতন করে বাঁচতে ভুলে গেলাম।
এই প্রথমবার বুঝলাম,
বাঁচতে শেখা একটা শিল্প।
আরো ভালো ভাবে চিনলাম
সমাজের ভাবনায় চিন্তিত দাদাদের,
যাদের সমাজ ভাবনার মূল কথা,
‘আখের গোছাও’।
তবু, আমার মন যে অগোছালো,
তাই অসমীকরণ এর জটিল প্যাঁচে
নিজেকে জড়িয়ে নিলাম।
সুযোগসন্ধানী সহপাঠীরা অনেকেই গোছালো,
আমার গোছানো হলোনা,
আমি তা চাইনি।
হয়তো এই প্রথমবার এর মত,
আমি কথা রাখতে চেয়েছি,
রাখতে পেরেছি।
এখন রাজনীতির আঙ্গিনায় যে সব
বিষাক্ত সাপ বিচরণ করে, তাদের
অনেকেই সেই সব কলেজের
বিষবাষ্প থেকে উঠে আসা
নীলকন্ঠ সম্প্রদায়ের নেতা।
যারা আজ সমাজের বড় বড় মাথা,
তারা অনেকেই প্রয়োজনে
অজগর সাপ হয়ে
ফণা বিস্তারে উদ্যত হয়,
অতীতেও হয়েছিলো, পরেও হবে।
তাদের ‘আখের গোছাও’ নীতি প্রতিনিয়ত
বহুজনকে বহু অসুবিধায় ফেলছে।
বড় মাছ হয়ে ছোট মাছ খাওয়া,
আগেও ছিল, আজও আছে, পরেও থাকবে।
আমি কথা রাখতে চেয়েছি বলে,
অনেক অজগরই আমার অজান্তে আমাকে
নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে চেয়েছে।
ছিলাম মোরগ, হলাম ফিনিক্স পাখী,
পায়ে বাঁধা লোহার বেষ্টনী ছিঁড়ে ফেলতে
লেগে গেল অনেকটা সময়।
এবারও আমি কথা রাখতে চেয়েছি,
রাখতে পেরেছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কুৎসিত রাজনীতির আঙিনা
থেকে মুক্তি এসেছিল অনেক অপেক্ষার শেষে।
সব যন্ত্রণার নাগপাশ থেকে নিজেকে ছিন্ন করে
এবার গেলাম পাহাড় কোলে মেঘের দেশে,
এক সবুজ সুন্দর মায়াবী স্বপ্নের রাজ্যে,
তখন আমার দু’চোখে শুধু
ঘন সবুজ গভীর জঙ্গলে ঢাকা
মেঘময় হিমালয়ের হাতছানি।
ভোরবেলায় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে
লাল আবীর মাখা রৌদ্রস্নাত পৃথিবী
আমার জানালায় আসত,
জানিয়ে যেত সকালের প্রথম পরিচয়।
দূরে পাহাড়ের চূড়ায় মন্দিরে বাজত
শঙ্খ-ঘন্টা, হত সন্ধ্যাকালীন আরতি।
আশপাশ থেকে আসত অসংখ্য নরনারী,
অশান্ত মন অজান্তেই শান্ত-স্নিগ্ধ হয়ে যেত।
পাশের ছোট মাঠে শিশুরা দলবেঁধে
খেলতে আসত, সাথে আসত আরো অনেকে।
শেষের বিকালে পূবের কোণ থেকে
উড়ে আসত শত শত পাখী,
একটু নীচেই বয়ে যেত নাম না জানা
ছোট্ট এক নদী, আমি তার
নাম দিলাম ‘মঙ্গলা’।
সাঁঝের আঁধারে যখন পাহাড়ের কোলে
প্রান্ত থেকে প্রান্তরে আলোর প্রদীপ
জ্বলে উঠত, মেঘমুক্ত আকশে তারারা
সবাই একে একে ফুটে উঠত, তখন
সবার চোখ জুড়ে নেমে
আসত ঘুম, গ্রাস করত ক্লান্তি।
দিনের বেলায় মেঘের দল খেয়ালখুশী মতন
খোলা জানালা পথে আমার ঘরে আসত,
আমি কখনো খুশী হতাম, কখনো বা রাগ।
মাঝে মাঝেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে
আসত পাহাড়ী মেঘের কলস ভরা জলের ধারা।
এ বৃষ্টি যে পায়নি, তার মানব জনম বৃথা।
মেঘের দল এখানে ইচ্ছামতন আসাযাওয়া করত,
ধোঁয়ার চাদরে মুখ ঢেকে বৃষ্টি আসত আপন তালে।
রোজ সকালে আমি পাহাড়ের চূড়ায়
মন্দিরে যেতাম, আবার কখনো
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নদীর কোলে,
ছোট-বড় রঙ্গিন নুড়ির উপর দিয়ে
বয়ে যাওয়া জল আপন খেয়ালে
নেচে খেলে ফিরত।
এখন আমি শহরে থাকি, যেখানে
প্রতিনিয়ত প্রলোভনের বিষবাষ্প
আমার মনকে নাড়া দেয়।
ধোঁয়া ধুলো জঞ্জালে ভরা এই প্রেতনগরীতে
হৃদয়ের দম্ দেওয়া সবুজ ঘড়িটা
থেমে আসতে চায়। এখানে সংস্কৃতি যেন
পারফিউমের হাল্কা সুবাস।
রুচির মান আর জমকালো আড়ম্বর
দুচোখ ধাঁধিয়ে দেয়, আর
চলে ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগিতা।
অসমীকরণের সমীকরণ মেলানোটা
সময়ের কাজ, তা তোমার, আমার
বা বাকী সবার নয়।
আমরা সবাই প্রতারণা করেছি
আমাদের অতীত সময়কে, এখনো করছি
আর ভবিষ্যতেও করব।
আমি বা আমরা কথা রাখিনি,
রাখতে পারিনি।
কথা কেউ রাখেনা, রাখতে পারেনা।
Comments