মানুষ কেন কষ্ট পায়

মানুষ কেন কষ্ট পায়?
+++++++++++++

গাছ, কীটপতঙ্গসহ যে কোন প্রাণীরই প্রাণ রয়েছে, রয়েছে অনুভূতির প্রাণবন্ত বহিঃপ্রকাশ।

একটা হিমসাগর জাতের আমের গাছ কিন্তু আদৌ জানে না, যে তার থেকে জাত ফলের প্রদত্ত নাম কি এবং কেমন তার স্বাদের আস্বাদন, আর কেমনই বা তার বাজারে চাহিদা। 

কারণ আম গাছের কাজ আম উৎপাদন করে তার বংশবৃদ্ধিকরণের পথ সুগম করে তোলা আগামীর নিমিত্তে। 

সেখানে মানুষ তার মতো করে গাছের ও তার জাতের নামকরণ করে, ফলের গুণমানের নিরিখে; নির্ধারণ করে সেই অনুসারী বাজারমূল্য। 

এতে কিন্তু আম গাছের কিছুই এসে যায় না। সে তার দৈনন্দিন কর্ম করে চলে এবং তা সম্পাদন করে প্রকৃতির নির্ধারিত নিয়ম মেনেই বিনা প্রত্যাশায়, মানুষের দ্বারা নির্ধারিত বাজার মূল্যের কথা ভেবে/ মাথায় রেখে নয়।

তাই তার কোনো ইচ্ছা/কামনা/বাসনা ও জাগরিত হয় না, কারণ সে কোনও মায়ার বন্ধনে, সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয় না, ফলে মানুষের তার থেকে যতই প্রত্যাশা থাকুক না কেন, সে তার সামর্থ্য অনুসারেই ফললাভের আশা ত্যাগ করেই নিষ্কাম কর্ম সম্পাদনে ব্রতী হয়। এখানে অবশ্য তার ইন্দ্রিয়পরায়ণতার ব্যাপারও নেই। 

আর তাই, গাছের ক্ষেত্রে যেটা খুব সহজেই সম্ভব, তা মানুষের পক্ষে খুব কঠিনই হয়ে ওঠে। 

কারণ মানুষ সহ যে কোনো ইতর প্রাণী বিশেষই, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শারীরিক অনুভুতি এবং সেই অনুভব অনুসারে উৎপন্ন মায়ায় আবদ্ধ হয়ে, মানসিক ইচ্ছাসমূহের চরিতার্থতার জন্যে, নিজেদের মানসিক অহংবোধের পর্যায় ও মাত্রা অনুসারে, দেহ বা শরীরের মাধ্যমে সামর্থ্য অনুযায়ী, কর্ম সম্পাদনে প্রবৃত্ত হয়, ফলাফল লাভের আশায়। 

এই মানুষ জন্মের পর থেকেই সমাজের চাহিদা আর পারিপার্শ্বিক চাওয়া পাওয়ার কথা মগজে বহন করে, সামাজিকীকরণের মাধ্যমে ক্রমশ অহংবোধ সম্পন্ন সামাজিক জীবে পরিণত হয়। আর সেই অনুসারেই সে ক্রমাগতভাবে নানান সম্পর্কের মায়ায় আবদ্ধ হয়ে ওঠে। সে তার ইন্দ্রিয়সমূহের দাস হয়ে ওঠে। আর এই ইন্দ্রিয়সমূহ চালিত করে তার মন/বুদ্ধি/বিবেক কে। সেই অনুসারেই চালিত হয় তার দেহ/শরীর। তার এই দেহ নানা কর্মের হাত ধরে এগিয়ে চলে, যার পিছনে থাকে ফল লাভের গোপন ও সূক্ষ্মতম অভিপ্রায়। 

তার দেহের অবয়বে সমাজ দ্বারা প্রদত্ত হয় নাম -  পদবী - উপাধি - ধর্ম - জাতপাত - ভাষাগত - সংস্কৃতিগত - কর্মভিত্তিক - বৃত্তিভিত্তিক - কৌলীন্যভিত্তিক পরিচিতি।
 
মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ তখন ভুলে যায় তার আসল/প্রকৃত আত্ম-স্বরূপ। তার প্রাণহীন দেহ যে আসলে জড়বস্তুর তুল্য অনিত্য এবং তার জাগতিক শরীর যে পঞ্চভূতের থেকেই নির্মিত এবং তার সবকিছুই যে একদিন প্রকৃতির ভিতরেই বিলীন হয়ে যাবে সব ফেলে, তার অহংবোধ সহযোগে, এই চরম সত্যকথা সে অহংজাত মায়ার বন্ধনে থেকে বিস্মৃত হয়। 

ফলতঃ সে তার কৃত সকল কর্মেই ফলের আশায় আশাবাদী হয়, আর আশার পরিপূর্ণতা না হলেই, সে হয় আশাহত, যন্ত্রণাহত, আঘাতপ্রাপ্ত জীব।

যার যত মানসিক ইচ্ছা/কামনা তীব্র হয়, তার কর্মের নিমিত্ত কর্মফলের প্রতি আসক্তি ও লোভ ততই তীব্র হয়, এবং ফললাভ অনুরূপ /অনুকূল না হলেই, তার মনে অভাবের তীব্রতা অনুভব হয়। সে কষ্ট পায়, মানসিক যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়। আর এই পতন তাকে আরো অধিক মাত্রায় সামাজিকভাবে অসামাজিক ও প্রতিযোগিতামূলক হিংস্র দানব করে তোলে। 

সৃষ্টি হয় মোহ, লোভ, হিংসা, ক্রোধ, মদমত্ততা / অহংকারের দম্ভ, প্রতিহিংসা - ইত্যাদি আসুরিক ও অমানবিক গুণ, যাকে ষঢ়রিপুও বলা হয়ে থাকে।

সুতরাং এক লাইনে বলা যায়, যে, ইন্দ্রিয় আসক্ত মায়ায় আবদ্ধ এই মানব দেহ, মনের ইচ্ছার/কামনার/বাসনার অধীন হয়ে, ফল লাভের আশায় কর্মে প্রবৃত্ত হয় এবং আশানুরূপ ফললাভে বঞ্চিত হলেই মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

তাই নিজেকে, নিজের স্বত্ত্বাকে, চেনা, অনুসন্ধানের মাধ্যমে আবিষ্কার করা, খুব জরুরি। এই দেহ পঞ্চভূতের থেকেই সৃষ্ট। এর ভিতরে স্থিত মন/বিবেক/বুদ্ধিই চালনা করে দেহকে। সামাজিকীকরণ থেকেই দেহস্থিত বুদ্ধি জন্ম দেয় অহংকারের, আমিত্ত্ববোধের। গাছের মন নেই। নেই ইন্দ্রিয়সুখের অনুভব। নেই সামাজিকীকরণ। আর তাই তার নেই ইচ্ছে/কামনার তাড়না। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে থাকে ইন্দ্রিয়সুখের অতীত/পূর্ব অনুভব অনুভুতি। অর্থাৎ দেহে স্থিত পঞ্চইন্দ্রিয় অনুভূত অতীত অনুভবের বারংবার রসাস্বাদনই জন্ম দেয় পরবর্তী ইচ্ছের/আকাংখার। আর সেই ইচ্ছে/কামনা/বাসনার চরিতার্থতা লাভের উদ্দেশ্যেই দৈহিক কর্ম করা। আর এর সাথে ওতোপ্রোতভাবে সংযুক্ত থাকে আমিত্ত্ব/অহং ভাবের বোধ, যার মাধ্যমেই মানুষ জড়িয়ে পড়ে কর্মফলের পাকচক্রে। আর এই কর্মফল মনের ইচ্ছের অনুরূপ না হলেই শুরু হয় যত বিপত্তি, অশান্তি ঝামেলা।

তাই সবার আগে জরুরি আত্ম-জিজ্ঞাসার মাধ্যমে আত্ম-সচেতনতার অন্বেষণ। এর থেকেই বেরিয়ে আসবে মুক্তির পথ, প্রকৃত অর্থেই শান্তির উপায়।

[ [ +++ কিন্তু কি ভাবে তা সম্ভব? +++

এই জগৎ সংসারের নাট্যমঞ্চে একই জীবদেহের একাধিক পরিচয় আর সেই অনুসারে তার ভূমিকা আর কর্তব্য। 

কখনো সে পিতা/মাতা, সন্তান, প্রেমিক প্রিয় পরিজন, কখনো ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবি বা অন্যকিছু পেশার সাথে সংযুক্ত। যার যেমন পার্ট, তার তেমন কাজের মাত্রা।

এই সব রকমের পরিচয়েরই মূল পরিচালক কিন্তু শরীরে স্থিত পঞ্চ ইন্দ্রিয় এবং মনের নানা ভাব বা বোধ বুদ্ধি।

এই বোধ থেকেই আবার অহং বা আমিত্ত্ববোধের সূচনা, যেটা গাছেদের একেবারেই নেই।

দেহের মনের সাথে জুড়ে থাকে যে কোন কর্ম সংক্রান্ত ভাব, সেটা ভালো বা মন্দ হতে পারে, এই ভাবই হচ্ছে কর্মফল। 

যে কোন কাজেরই ভালো বা মন্দ ফল থাকে, আর সেই অনুসারে থাকে দেহের মনের চাওয়া বা না-চাওয়া।

ফল চাইতে চাইতে, বা পেতে পেতে, কিংবা না পেতে পেতে মন ও ইন্দ্রিয় সমূহ আরো অধিক মাত্রায় চাহিদার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে মনের ও দেহের চাহিদা অসীম অনন্ত হয়ে যায়।

এই চাহিদা সমূহের নিবৃত্তি না হলে, কর্মফল অনুসারে মনের ইচ্ছে/ চাহিদার পূরণ না হলেই শুরু হয় মানসিক কষ্ট বা যন্ত্রণা। 

তাই, মানুষকে আমিত্ত্ববোধ ত্যাগ করে, মনকে সংযত করে, ফলহীন কর্মের দিকে, নিরাসক্তভাবে অগ্রসর হতে হবে।

নাটকের পার্ট করার সময় অভিনেতা যেমন সতর্ক হয়ে থাকে, যেমন করে সে অভিনয়ে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদন করলেও, অভিনয় শেষে সেই চরিত্রেই পরিণত হয় না, নিজের প্রকৃত স্বত্ত্বায় পুনরায় ফিরে আসে, ঠিক তেমন করেই, যে কোন কাজের সময় খেয়াল রাখতে হবে যে পঞ্চভূতে নির্মিত এই নশ্বর দেহটি আসলে ওই চরিত্রের রোল ও দায় দায়িত্ব পালন করছে। তাহলে আর সে আর কর্মফলের আশা করে ঐ চরিত্র ধরে আজীবন বসে থাকবে না। দিনের নানা সময়ে সে কখনো কর্মী, কখনো পিতা, কখনো ভ্রাতা, কখনো স্বামী বা সখা, এই নানা ভাবে সে নানা রোলে অভিনয় করার মতো করেই নিষ্কাম ভাবে কর্ম সম্পাদনে প্রবৃত্ত হবে। ফলে তার কৃত কর্মের কর্মফল সে নেবে না। আসক্ত হবে না কর্মফলের প্রতি। আর এর থেকেই আসবে তার মুক্তিভাব।

যার আসক্তি যত কম, সে ততই মুক্ত মনা পুরুষ। আর তার যন্ত্রণাও ততই কম।

যার যেমন গুণ, সেই অনুসারে তার কর্মের পরিমাণ তাকে করতেই হবে। আর তা করতে হবে অহং বা আমিত্ত্ববোধের থেকে বের হয়ে এসেই, যেমনটা করে থাকে নাট্যমঞ্চের অভিনেতাগণ। কেউ সুভাষচন্দ্রের চরিত্রে অভিনয় করলেও সে জানে যে সে আসলে তা নয়, প্রকৃত জীবনের ক্ষেত্রেও সেটাই করতে হবে, নিজেকে অভিনেতা জ্ঞান করে। এতে তার সেই চরিত্রের প্রতি, বা সেই চরিত্র থেকে প্রাপ্ত ফলের প্রতি আর কোন মায়া মোহ আকর্ষণ থাকবে না আগামী দিনে। সে আবার পরের চরিত্রে সময় দেবে নিষ্কাম ভাবে। তার ভিতরে প্রত্যাশা জনিত মানসিক যাতনাও থাকবে না আগের চরিত্রের রোলে অভিনয় করার জন্য।

এইভাবেই কর্মফল ত্যাগ করতে করতে একদিন ভাবনার মুক্তি, চেতনার উন্মেষ ঘটে যাবে, হয়ে যাবে উত্তরণ এবং আত্ম-উপলব্ধি। ] ]

সকলের অন্তরে এইভাবেই অধ্যাত্মচেতনা বোধের জাগরণ হোক।

শুভায়ু ভবতু।

© রাজেন্দ্র 

(সূত্র - শ্রীমদ্ভাগবৎগীতা)

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি