চর্যা (১ - ১০) অনুবাদ
সাইদুল ইসলাম (Saidul Islam) সম্পাদিত ছোট কাগজ 'চর্যাপদ'-এ প্রকাশিত 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়'-এর প্রথম দশটি কবিতার আধুনিক বাংলা রূপান্তর নিয়ে একটু আগে যে পোস্ট দিয়েছি, তার ছবি থেকে কবিতাগুলো ঠিকমতো পড়া যাচ্ছে না। তাই কবিতাগুলো পাঠযোগ্য করে আরেকটা পোস্ট দিলাম।
চর্যা-১
রাগ: পটমঞ্জরী
লুইপাদ
কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল॥ ধ্রু॥
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ॥ ধ্রু॥
সঅল সমাহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরিঅই॥ ধ্রু॥
এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুনুপাখ ভিতি লেহু রে পাস॥ ধ্রু॥
ভণই লুই আম্হে ঝানে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিণ্ডি বইঠা॥ ধ্রু॥
আধুনিক বাংলায়:
এই কায়া তরুবরে পঞ্চটি ডাল
চঞ্চল চিত্তে প্রবেশে কাল।
দৃঢ় করে নাও মহাসুখ পরিমাণ
লুই বলে গুরুকে শুধিয়ে তবে জান।
সবাইকে কেন বল কর সমাহিত
সুখে হোক, দুখে হোক, মরা তো নিশ্চিত।
মিছে আশাবন্ধন পিছে যাও ফেলে
উড়ে চলে যাও শূন্যের পাখা মেলে।
লুই বলে এ আমার ধ্যানেই প্রকাশ
দু পিঁড়িতে বসে আছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস।
চর্যা-২
রাগ: গবড়া
কুক্কুরীপাদ
দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই।
রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাঅ॥
আঙ্গন ঘরপণ সুন ভো বিআতী।
কানেট চোরে নিল অধরাতী॥ ধ্রু॥
সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগঅ।
কানেট চোরে নিল কা গই [ন] মাগঅ॥ ধ্রু॥
দিবসই বহুড়ী কাড়ই ডরে ভাঅ।
রাতি ভইলে কামরু জাঅ॥ ধ্রু॥
অইসন চর্য্যা কুক্কুরীপাএঁ গাইড়।
কোড়ি মঝেঁ একু হিঅহি সমাইড়॥ ধ্রু॥
আধুনিক বাংলায়:
কচ্ছপের দুধ দুয়ে পাত্র কি ভরা যায়
গাছের তেঁতুল তো কুমিরে খায়।
ও গাইয়ে শোনো, উঠোন ঘরের ভেতরে
মাঝরাতে কানফুল চোর চুরি করে।
বউ জেগে আছে আর শ্বশুর ঘুমায়
চুরি যাওয়া কানফুল খুঁজবো কোথায়?
দিনের বেলায় বউ কাককে ডরায়
রাতের বেলায় বউ কামরূপে যায়।
এমন চর্যা কুক্কুরীপা গায়
কোটিতে একজন তার অর্থ খুঁজে পায়।
চর্যা-৩
রাগ: গবড়া
বিরূপাপাদ
এক সে শুণ্ডিনি দুই ঘরে সান্ধঅ।
চীঅণ বাকলঅ বারুণী বান্ধঅ॥
সহজে থির করি বারুণী সান্ধ।
জেঁ অজরামর হোই দিঢ় কান্ধ॥
দশমি দুআরত চিহ্ন দেখিআ।
আইল গরাহক অপণে বহিআ॥
চউশটি ঘড়িয়ে দেল পসারা।
পইঠেল গরাহক নাহি নিসারা॥
এক সে ঘড়লী সরুই নাল।
ভণন্তি বিরুআ থির করি চাল॥
আধুনিক বাংলায়:
এক শুঁড়িনি* দুই ঘরে ঢুকে রয়
চিকন বাকলে বারুণী** বেঁধে থোয়।
সহজে স্থির করে বারুণী বাঁধ
যে অজরামর, তারই দৃঢ় কাঁধ।
দশম দুয়ারে চিহ্ন দেখে দেখে
গ্রাহক চলে এলো আপনি থেকে।
চৌদ্দটি ঘটিতে দেয়া হলো পসার
গ্রাহক তো ঢুকলো, বেরুলো না আর।
একটি সে ঘড়া, সরু তার নাল,
বিরুয়া*** বলছে স্থির করে চাল।
* নারী মদ বিক্রেতা, শুঁড়ির স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ।
** মদ
*** বিরূপাপাদ
চর্যা-৪
রাগ: অরু
গুণ্ডরীপাদ
তিয়ড্ডা চাপী জোইনি দে অঙ্কবালী।
কমলকুলিশ ঘাণ্টি করহুঁ বিআলী॥
জোইনি তঁই বিনু খনহিঁ ন জীবমি।
তো মুহ চুম্বী কমলরস পীবমি॥
খেপহুঁ জোইনি লেপ ন জাঅ।
মণিকুলে বহিআ ওড়িআণে সমাঅ॥
সাসু ঘরেঁ ঘালি কোঞ্চা তাল।
চান্দসুজবেণি পখা ফাল॥
ভণই গুণ্ডরী অম্হে কুন্দুরে বীরা।
নরঅ নারী মাঝেঁ উভিল চীরা॥
আধুনিক বাংলায়:
ত্রিচক্র চেপে যোগিনী দে না আলিঙ্গন
কমলকুলিশ ঘেঁটে করবো বিলাসন।
যোগিনী, তুই ছাড়া ক্ষণেকও থাকবে না প্রাণ
তোর মুখ চুম্বনে করবো কমলরস পান।
খেপে গেছি যোগিনী, যাচ্ছে না চাপা
মণিপুর* বেয়ে তবে উড্ডীয়ানে** দাও পা।
শাশুড়ির ঘরের দুয়ারে তালা ঝোলাও
চাঁদ সূর্যের পাখা কেটে ফেলে দাও।
গুণ্ডরী বলছে, আমি সব ইন্দ্রিয়ের বীর
নর-নারী মাঝে সরে গেল চীর***।
*/** যোগসাধনার শব্দবিশেষ
*** সন্ন্যাসী বা শ্রমণের বস্ত্র
চর্যা-৫
রাগ: গুর্জরী
চাটিল্লপাদ
ভবণই গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী।
দুআন্তে চিখিল মাঝে ন থাহী॥
দামার্থে চাটিল সাঙ্কম গঢ়ই।
পার্গামি লোঅ নিভর তরই॥
ফাড্ডিঅ মোহতরু পাটি জোড়িঅ।
অদঅ দিঢ় টাঙ্গী নিবাণে কোরিঅ॥
সাঙ্কমত চড়িলে দাহিণ বাম মা হোহী।
নিয়ড়ি বোহি দূর মা জাহী॥
জই তুম্হে লোঅ হে হোইব পারগামী।
পুচ্ছতু চাটিল অনুত্তর সামী॥
আধুনিক বাংলায়:
ভবনদী গহন গম্ভীর বেগে ধায়
দু প্রান্তে পিচ্ছিল, মধ্যে নেই ঠাঁই।
ধর্মার্থে চাটিল সাঁকো গড়লো
পারগামী লোক নির্ভয়ে পেরুলো।
নির্বাণ কুঠার ধারালো করে
কেটে মোহতরু, দাও তক্তা জুড়ে।
সাঁকোতে চড়লে ডানে-বামে হবে না
বোধি তো কাছেই, দূরে যাবে না।
যদি তুমি হে লোক হবে পারগামী
চাটিল শুধালো, নিরুত্তর স্বামী।
চর্যা-৬
রাগ: পটমঞ্জরী
ভুসুকুপাদ
কাহেরে ঘিণি মেলি অচ্ছহু কীস।
বেটিল হাক পড়অ চৌদীস॥
অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।
খনহ ন ছাড়অ ভুসুকু অহেরি॥
তিন ন চ্ছুপই হরিণা পিবই ন পানী।
হরিণা হরিণীর নিলঅ ন জানী॥
হরিণী বোলঅ সুণ হরিণা তো।
এ বণ চ্ছাড়ী হোহু ভান্তো॥
তরংগতে হরিণার খুর ন দীসঅ।
ভুসুকু ভণই মূঢ়হিঅহি ন পইসই॥
আধুনিক বাংলায়:
কাকে ঘৃণা করে ভালো বলি কাকে
বেড়িলে হাঁক পড়ে যায় চৌদিকে।
আপন মাংসই হরিণের বৈরী
কখনো ছেড়ো না ভুসুকু তারে।
তৃণ ছোঁয় না হরিণী, ঘাসও খায় না
হরিণ-হরিণীর নিলয় জানি না।
হরিণী বলে, হরিণ শোনো তো
এই বন ছেড়ে কোথায় যাচ্ছো।
তরঙ্গে হরিণের খুরের ছাপ মেলে না
ভুসুকু বলে, মূঢ়রা দেখতে পায় না।
চর্যা-৭
রাগ পটমঞ্জরী
কাহ্নুপাদ
আলিএ কালিএ বাট রুন্ধেলা।
তা দেখি কাহ্নু বিমন ভইলা॥
কাহ্নু কহিঁ গই করিব নিবাস।
জো মনগোঅর সো উআস॥
তে তিনি তে তিনি তিনি হো ভিন্না।
ভণই কাহ্নু ভব পরিচ্ছিন্না॥
জে জে আইলা তে তে গেলা।
অবণাগবণে কাহ্নু বিমন ভইলা॥
হেরি সে কাহ্নি নিঅড়ি জিনউর বট্টই।
ভণই কাহ্নু মো হিঅহি ন পইসই॥
আধুনিক বাংলায়:
আলোতে কালোতে বাট রুধলো
তা দেখে কাহ্নু বিমনা হলো।
কানু কোথায় গিয়ে করবে নিবাস
যে মনোগোচর সে-ই উদাস।
তারা তিন, তারা তিন, তিন হয় ভিন্ন
কাহ্নু বলছে, হও পরিচ্ছিন্ন।
যারা যারা এলো, তারা তারা গেলো
গমনাগমনে কাহ্নু বিমনা হলো।
আনন্দনগরী কাছে তো বটেই
কাহ্নু ভণে তবু না-পারি পশিতেই।
চর্যা-৮
রাগ: দেবক্রী
কম্বলাম্বরপাদ
সোনে ভরিতী করুণা নাবী।
রূপা থোই নাহিক ঠাবী॥
বাহতু কামলি গঅণ উবেঁসে।
গেলী জাম বহু উই কইসেঁ॥
খুণ্টি উপাড়ী মেলিলি কাচ্ছি।
বাহতু কামলি সদ্গুরু পুচ্ছি॥
মাঙ্গত চড়্হিলে চউদিস চাহঅ।
কেড়ুআল নাহি কেঁ কি বাহবকে পারঅ॥
বাম দাহিণ চাপী মিলি মিলি মাঙ্গা।
বাটত মিলিল মহাসুহসাঙ্গা॥
আধুনিক বাংলায়:
সোনায় ভরেছে করুণা নাও
রুপো থোয়ার ঠাঁই নেই কোথাও।
বেয়ে যা তুই কমলি গগন উদ্দেশে
গেলো-জন্ম ফিরে আসবে কী বেশে।
খুঁটি উপড়ে খুলে দিয়ে কাছি
বেয়ে যা তুই কমলি সদ্গুরুকে পুছি।
চড়তে চাইলে চারদিকে চাও
দাঁড় ছাড়া কীভাবে বাইবে নাও?
বামে-ডানে চেপে মিলে মিলে বাও
তবেই মহাসুখসঙ্গের পথ খুঁজে পাও।
চর্যা-৯
রাগ: পটমঞ্জরী
কাহ্নুপাদ
এবংকার দৃঢ় বাখোড় মোড্ডিউ।
বিবিহ বিআপক বান্ধণ তোড়িউ॥
কাহ্নু বিলসঅ আসবমাতা।
সহজনিলীবন পইসি নিবিতা॥
জিম জিম করিণা করিণিরেঁ রিসঅ।
তিম তিম তথতা মঅগল বরিসঅ॥
ছড়গই সঅল সহাবে সূধ।
ভাবাভাব বলাগ ন[া]ছুধ॥
দশবল রঅণ হরিঅ দশদিসেঁ।
[অ]বিদ্যাকরিকুঁ দম অকিলেসেঁ॥
আধুনিক বাংলায়:
অহংকারের দৃঢ় বাকল ছিঁড়ে ফেলো
বিবিধ ব্যাপক বাঁধন ভেঙে ফেলো।
কাহ্নু বিলাসে আসবে উন্মত্ত
সহজপদ্মবনে গিয়ে তবে হয় নিবৃত্ত।
হস্তিনী যখন হস্তীকে মাতাল করে
তখন সেখানে মঙ্গল ঝরে পড়ে।
ষড়বিধ সকলে স্বভাবে শুদ্ধ
ভাবাভাবে কেউই নয়কো অশুদ্ধ।
দশবল রত্ন হেরো দশদিশে
অবিদ্যাহস্তীকে দমায় অক্লেশে।
চর্যা-১০
রাগ: দেশাখ
কাহ্নুপাদ
নগরবাহিরি রে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ।
ছোই ছোই জাহ সো বাহ্মননাড়িয়া॥
আলো ডোম্বি তোএ সম করিব মা সাঙ্গ।
নিঘিন কাহ্ন কাপালি জোই লাংগ॥
এক সো পদুমা চৌষঠ্ঠী পাখুড়ী।
তহিঁ চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী॥
হা লো ডোম্বি তো পুছমি সদভাবে।
আইসসি জাসি ডোম্বি কাহরি নাবেঁ॥
তান্তি বিকণঅ ডোম্বি অবরনা চাংগেড়া।
তোহোর অন্তরে ছাড়ি নড়পেড়া॥
তু লো ডোম্বী হাঁউ কপালী।
তোহোর অন্তরে মোএ ঘেণিলি হাড়ের মালী॥
সরবর ভাঞ্জিঅ ডোম্বী খাঅ মোলাণ।
মারমি ডোম্বি লেমি পরাণ॥
আধুনিক বাংলায়:
নগরের বাইরে ডোমনি তোর কুঁড়ে খাড়া
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় ন্যাড়া ব্রাহ্মণেরা।
ওলো ডোমনি, তোকে করবো সাঙ্গা*
নির্ঘিন কাহ্ন যে কিনা কাপালিক নাঙ্গা।
এক সে পদ্ম তার চৌষট্টি পাঁপড়ি
তাতে চড়ে নাচে ডোমনি সুন্দরী।
হাঁ লো ডোমনি, তোকে সদ্ভাবে জিজ্ঞাসা
কার নাওয়ে চড়ে তোর যাওয়া-আসা?
তাঁত বেচো ডোমনি অন্য চ্যাংড়াদের
তোর অন্তর ছাড়া হবে না তাদের।
তোর জন্যে ডোমনি কাপালিক হবো
তোরই জন্যে হাড়ের মালা পরে নেবো।
সরোবর সেঁচে ডোমনি পদ্মমূল খাও
মারবো তোকে ডোমনি, নেবো প্রাণটাও।
*বিয়ে
Comments