বিভাজন
।। হিন্দু এবং মুসলিম, এই দু-ধরণের মানুষ যেমন আছে, আরো অনেকরকম 'দুধরণের মানুষ' কিন্তু আছে। উদাহরণ হিসেবে- কিছু মানুষ চামড়ার জুতো পরে, কিছু পরে কাপড়ের জুতো। কিছু লোক বাংলা সিরিয়াল দ্যাখে, কিছু লোক দ্যাখে খেলা- টিভি দেখার প্রায়োরিটি নিয়ে আপনার পরিবারে অশান্তি কি হয় না, একবারও হয়নি? তাহলে আপনার পরিবার স্বর্গ। তাছাড়া ধরুন চিরকালই একদল মানুষ আমিষ খায়, আরেকদল নিরামিষ। এখন ধরুন আপনি সপরিবারে নিরামিষ খান, এবং দেখলেন কিছু লোক রাস্তায় বেরিয়েছে আর শ্লোগান দিচ্ছে,'নিরামিষভোজী মুর্দাবাদ! নিরামিষভোজীরা সব জঙ্গলের দালাল। ঘাসখেকোদের নিকেশ করো। এই শহরে কোনো ঘাসখেকোকে আমরা বাঁচতে দিচ্ছি না, দেব না!'... আপনি কী করবেন?
.
আপনি বিপন্ন বোধ করবেন। আপনি দল বাঁধবেন, কারন সমষ্টিই শক্তি। আপনি তখন আপনারা হয়ে উঠবেন। হয়ত দু-একদিন পরেই আপনারাও একটা শোভাযাত্রা বের করবেন, এবং সেটাতে আমিষভোজীদের উদ্দেশে তীব্র শ্লোগান দেওয়া হবে। দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই আপনার শহরে একটা সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাত শুরু হতেই পারে- আমিষাশী এবং নিরামিষাশী এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে। হয়ত রক্তও ঝরবে। যারা মাংস খায়না, তারাও হাতে অস্ত্র তুলে নেবে। নন-ভেজ রেস্তোঁরা, হোটেল এবং ধাবার মালিকদের গর্দান হয়ত সবার আগে যাবে, ওরাই তো আপনাদের খাদ্যাভ্যাসের পুরোহিত। এই দাঙ্গায় আপনার বন্ধু এবং আত্মীয়দের মৃত্যুও হতে পারে। আপনাদের নিরামিষাশী পল্লিতে নেমে আসতে পারে সন্নাটা। পুলিশ এসে সৈন্যবাহিনী এসে পরিস্থিতি শান্ত করবে, কিন্তু একটা ঘা রয়ে যাবে মনের মধ্যে।
.
এই যে সাময়িক কৃত্রিম শান্তি নেমে এল, এর বেশ কয়েক বছর পর আপনারই পাড়ার একটি ছেলে কোনো কারণে আপনাদের সবার উপরে তিক্তবিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল- 'মুর্গিমাটন জিন্দাবাদ! রুইমাছের কালিয়া জিন্দাবাদ! যারা আমিষ খায় না তারা সবাই শুয়োরের বাচ্চা।'... প্রশ্ন হোল, তখন কী হবে? পাড়ার যত খাঁটি নন-ভেজ আছেন, তাঁরা বেরিয়ে আসবেন। যা কিছু হবে, সবকিছুর আদি কারন হোল কিছু মানুষ তাদের খাদ্যের অভ্যাসকে মৌলবাদ বানিয়েছিল, এবং রাস্তায় নেমে এসেছিল নিজেদের অভ্যাসকে অন্যদের উপরে প্রতাপ ও আধিপত্য দেওয়ার জন্য।
.
খাদ্যাভ্যাসটা মানুষের বাড়ির ভেতরের ব্যাপার, কোন জুতো পরবে সেটাও পছন্দের ব্যাপার, সেটাকে সদর দরজার বাইরে এনে জাহির করার দরকার নেই। ঠিক আপনার ঈশ্বরবিশ্বাসের মতোই। ভাবুন তো ফুটবল দাঙ্গায় কত লোক মরে যায়! ইংল্যান্ডের ফুটবল সমর্থকদের কথা ভাবুন। যে দেশে খেলা দেখতে যায় ওরা, সেই দেশের প্রশাসন ভয়ে কাঁপতে থাকে। ওরা জানে ফুটবল ওদের ধর্ম। সত্যিই কি তাই? ফুটবলের সঙ্গে ওদের কোনো সম্পর্কই কি আছে আদৌ? ওরা চায় উত্তেজনার সুযোগ। হিংস্র হয়ে ওঠার যুক্তি।
.
হয়ত একদিন সব সম্প্রদায় মুছে গিয়ে মানুষ আবার সেই ধর্মের কাছে ফিরে যাবে যেখানে প্রাকৃতিক শক্তিগুলোই উপাস্য ছিল। পরিবেশ দূষণ তাকে ওখানেই ফিরিয়ে দেবে। মানুষ আবার জলকে পুজো করবে। বিশুদ্ধ বায়ুর সামনে নতজানু হবে। আগুনকে জানাবে তার ত্রাস আর কৃতজ্ঞতার কথা। আকাশের কাছে ফিরে চাইবে গাঢ় নীল রঙ আর মেঘের কালো বিছানা। বিজ্ঞান আর উপাসনা আবার একীভূত হবে।।
Comments