ভবঘুরের ডায়েরী

ভবঘুরের ডায়েরী থেকে - রাজেন্দ্র

####################

বিবর্ণ খোলের ভিতর বেঁচে থাকা শান্ত কচ্ছপের
নাছোড়বান্দা কামড় কিন্তু বড়ো ভয়ঙ্কর । অকারণে সব কেটে কুচিকুচি করা আর চিরাচরিত ইঁদুর দৌড়ে প্রবল অনীহা তার । পন্ডিত শেয়ালের মত বারবার কুমীরছানা দেখাতেও চায় না সে । বউ তার চলাফেরায় রোজ হাসে, দুই বেলা হাঁউ মাঁউ কাঁউ করে গাল পাড়ে আর ভাবে মিনসে কুরুম টা তার বড়োই আলসে ।

রূপোলী ইলিশের জাতভাই এর মতো স্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে তার উভলিঙ্গ ভাবনারা ডিম পাড়তে ভালোবাসলেও অকালপক্ক অপরিনত ভাবনা গুলো গর্ভেই বিনষ্ট হয়ে যায় সময়ে অসময়ে । তবুও তার রজস্বলা মন ভাবনার ডিমে তা দিলে কখনো কখনো ডিমের খোলস ভেঙে ফুটে বের হয়ে আসে আধপোড়া আধজ্বলা শব্দেরা । আর বাদ বাকি সবাই কেউ হাফ কেউ বা ফুল বয়েলড হয়ে কিংবা আধকাঁচা পোচ হয়ে প্রাতরাশের পাতে উঠে আসে ।

কুকুরের ঘেউ ঘেউ আর বিড়ালের মিউ মিউ ডাকে অপমানিত হতে আপত্তি নেই যেই সব মানুষের মুখোশধারীদের, তারাও কিন্তু আসলে সেই ছাগলের তিন নম্বরের মত । আর এখন তো সেই 'তিন' নম্বরটাও ভেঙেচুরে ছয় থেকে নয় আর নয়ছয় হয়ে গেছে সময়ের চোরা স্রোতে । সেই সব নয়ছয়ের কারবারীরা আজীবন অনন্তকাল ধরে ভাবনা আর শব্দের প্রয়োগবিধির উপর খবরদারী করতে চায় ।

বলবান গাধার হুঙ্কারে ভাবনা আর কলমের প্রায় কিছুই এসে যায় না । টন টন মোট যে তাকে বইতেই হবে । ছোটবেলা থেকে চাকরি জোটানো কাল অবধি টেক্সটবুক জাবর কেটে উগরে দেওয়াকেই তারা শিক্ষা আর পান্ডিত্য বলে ভ্রম করে । তাদের মগজে ভরে থাকা সেই সব ত্রুটিপূর্ণ ভাবনার সংশোধন কে করবে ?

মাথায় চাঁটি আর পেটে পিঠের বদলে পিঠে পিটুনি খাওয়া যে তার রোজকার বরাদ্দ । তবুও তার ভাবনারা যেন এক একটা বুদবুদ । ভোরের না বলা স্বপ্নের অতল নিখাদ গভীর থেকে চাপ খেয়ে উপরে উঠে এসে তারপর শেষরাতে বিদীর্ণ হয়ে যাওয়া তো লেগেই আছে ।

আর এরপরেও জীবনকে দেখা অনেকটাই বাকি রয়ে গেছে তার । এই হতভাগ্য বঙ্গদেশ সহ সমগ্র দেশের মোট সাত'শো র অধিক জেলা ঘুরে ঘুরে দেখতে চায় সে । তুলনা করতে চায় আর বাদ বাকী গোটা দেশের মানুষের সাথে পশ্চিমবঙ্গবাসীর । আসমুদ্র হিমাচল মানুষের খাদ্য পোষাক আচার আচরণ ভাষা সংস্কৃতি চেখে দেখতে চায় সে তার পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে । তাদের সাথে মিশতে চায় সে । কথা বলতে চায় । তাদের নিয়ে লিখতে আঁকতে গাইতে আর ছবি তুলে গোটা বিশ্বকে দেখাতে চায় সে ।

না না, বিদেশ নয় । দেশের মাটির ভিতরেই তো আছে ঘন গভীর সবুজ । আছে উত্তপ্ত উষর মরুভূমি । আছেন চির তুষারাচ্ছন্ন গিরিরাজ হিমালয় । আছে তিন তিনটে মহাসাগর । আছে সব রকমের দ্বীপ । এত বড়ো দেশটাকে চোখে দেখে চিনতে এবং জানতে চায় সে । নিজের ঘর বলতে যেটুকু যা আছে পিতার নামে, কিছুই চাই না তার । শুধু চাই একটা ব্যাগ, যার ভিতরে থাকবে রঙ তুলি কাগজ কলম ক্যামেরা । আর চাই এক একটি মাস এক একটি জেলায় একটু খানি আশ্রয় । সেটা কুঁড়েঘর হলেও আপত্তি নেই তার । সে জানে, এই জীবন অসীম অনন্ত নয় । তাই একান্ত নিজের মত করেই তার বাঁচা দরকার ।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি