গল্প গুচ্ছ

গল্প গুচ্ছ
© রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য

আমাদের সবার জীবনে এক একটা রূপকথার জন্ম হয় । রাজপুত্র বা রাজকন্যারা আসে, আবার চলেও যায় তারা কালের নিয়মে সময়ের সিঁড়ি ধরে নির্দিষ্ট অ্যালবামের পাতায় । কখনো সখনো তা উঠে আসে আমাদের চোখের ভারী পাতায় আনন্দ আর দুঃখের পর্দায় ।

জীবন একটাই নাকি অনেকগুলো তার বিচার এখানেই হয়ে যায় । কেউ রাজার জীবন ছেড়ে গৃহত্যাগী সন্যাসীর জীবন বেছে নেয় সিদ্ধার্থের মতো ।

কেউ আমলাতন্ত্রের মোহ সুখ আনন্দ ছেড়ে ঝাঁপ দিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায় রাজনীতির অপবিত্র পাঁকে ।

কেউ সরল পল্লীবালা থেকেই পেটের তাগিদে হয়ে ওঠে নাইটক্লাবের সবার দিনে রাতের কামনার ধন ।

কেউ কেউ যৌবন আসতে না আসতেই হিংসা উন্মত্ততার বলি হয়ে যায় যখন তখন ।

জীবনের মূল্যমান নির্ণয় আপেক্ষিক । চাওয়া পাওয়ার হিসেব নিকেশ আপেক্ষিক । ছোট বড় মাঝারি এসব আভিধানিক শব্দ সমাজের অনেকেই মুখে আর মগজে ভরে নিয়ে ঘোরেন । তুলনাতেই তারা খুঁজে ফেরেন শান্তি ।

আমার মনে হয়, কলম থেকে ঝরে পড়া শব্দের দায় লেখকের নয় । যে পড়ে পাঠোদ্ধার করবে, অনুধাবন করবে, একমাত্র তারই আছে বলবার অধিকার ।

আমি পড়ি বা লিখি, ওটাই আমার কাজ । ভাবনার দায়, মানুষকে খুশী করবার দায় আমি নিতে পারবোনা । মনের গভীরে শব্দমালা মায়ার জাদুতে বিচরণ করে । ভেসে থাকে তারা আমার চারপাশে । তাদেরকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই আমার । কারণ আমি যে খুব সাধারণ একজন । কেউকেটা দার্শনিক বা সমাজতত্ববিদ নই ।

আমি শুধু একটাই শব্দে বিশ্বাস করি _ "চরৈবেতি"

++++++++++++

প্লবতা - রাজেন্দ্র

("এ যুগের আরশি" তে প্রকাশিত)

সুমির কাছে সকাল বেলাতেই এক পশলা মুখ ঝামটা খেল সৌম্য । সদ্য সে বিছানা ছেড়ে উঠেছে । ব্রাশটাও করেনি । রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাসের ওভেন অন করে জলটা গরম করতে বসিয়ে বেসিনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন সময়ে সুমির টিক টিক শুরু । উফফফ্, এভাবে রোজ ঘ্যানর ঘ্যানর শুনতে শুনতে সৌম্য কেমন যেন পাথরের মতো অবশ অসাড় হয়ে যাচ্ছে । এখন ও শুধুই বাক্যবাণে একতরফা চুপচাপ বিদ্ধ হয় । ক্ষত বিক্ষত হয় । রক্তক্ষরণের পাট চুকে গেছে অনেক আগেই ।

একমনে ব্রাশটা সেরে নিল সৌম্য । গরম জল নামিয়ে লেবু আর মধু মিশিয়ে চুমুক দিতে দিতে পেপারটা দেখতে লাগল ও । এরপর বাজার সেরে ওকে অফিস ছুটতে হবে । পান থেকে সামান্যতম চুন খসলেই ওর জন্য রাশি রাশি মুখ ঝামটা বরাদ্দ । খবরগুলো কোনওমতে গিলেই বাজারের দিকে দৌড় দিল সৌম্য ।

সবেমাত্র সব্জীর বাজারটা শেষ করে মাছের বাজারে ঢুকতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই মোবাইলের রিঙটোনটা বেজে উঠল,
- হ্যাঁ রে সৌমেন, বল্ ।
- ভাইটি, বড় বিপদে পড়েছি রে । পারলে একটু আয় আমার এখানে ।
- সে না হয় যাব, কিন্তু হয়েছেটা কী শুনি ?
- ভাই রে, এখানে খুব চুরি চামারি শুরু হয়েছে মাস খানেক ধরে । মা বাবা তো উত্তরাখন্ডে ঘুরতে গেছে দিন কয়েক হলো । বাড়িতে তো এখন আমি একাই আছি । কিন্তু আমার আবার একটা কল্ এসেছে ভুবনেশ্বর থেকে । আমি আজই রাতের ট্রেন ধরব । কাল বাদে পরশু আমার ইন্টারভিউ । না গেলে একটা খুব ভালো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে । আর তুই তো নিজেও খুব ভালো করেই জানিস, এখানে চাকরির বাজার কেমন । আমি খুবই টেনশনে আছি রে ভাই । আর এই সময় সবার আগে আমার তোর কথাই মনে এল ।
- বেশ তো, আমি না হয় যাব । কিন্তু রান্না বান্না ? আমিতো আবার তোর মত হাত পুড়িয়ে খেতেও পারিনা ।
- আরে, সে সব নিয়ে তোর কোনও চাপ নেই । আমি পাড়ায় দাদা বৌদির ভাতের হোটেলে বলে দিচ্ছি । ওরা হোম সার্ভিসও দেয় । তুই আগামী তিনটে দিন এখান থেকেই অফিস আসা যাওয়া করিস । তোরও কদিন একটু অন্যরকম লাগবে । সুমিতা বৌদিকে একটু ম্যানেজ করে নে ভাই ।
- আচ্ছা বেশ । আজ অফিস ফেরতা তোর সাথে দেখা করে চাবিটা নিয়ে নেব না হয় ।
- না না ভাই, তুই রাতের গল্প করিসনা । একটু কষ্ট করে দিনের বেলাতেই চলে আয় । আর তোর এখানে ড্রিঙ্ক করলেও তো সমস্যা হবেনা । আমার হার্ড ড্রাইভ মেমরি টাও রেখে দিচ্ছি কম্পিউটারের সাথে অ্যাটাচ করে । যত খুশী সিনেমা আর গান নিয়ে সময় কাটাস ।
- ওকে ভাই । তবে আমি অফিসে একটু দেরী করেই না হয় যাব । লেট দিলে দিক গে । আর তেমন দেরী হয়ে গেলে যাবোই না । যা ঘন্টার মাইনা পাই, সেন্ট্রালের একটা গ্রুপ-ডি স্টাফও তো প্রায় আমাদের সমান সমানই মায়না পায় এখন ।
- বেশ, তবে আয় তুই । আমি না হয় একটু পেপার্স গুলো গুছিয়ে নিই আর জামাকাপড়গুলোও প্যাকিং করে নেই এই ফাঁকে ।

ফোন্ কাটার সাথে সাথেই সৌম্য ঠিক করে নিল একেবারে চার-পাঁচ দিনের বাজার টা সেরে নেবে । সুমিকে সৌমেন এর বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারে একবার জানাবে । ওর যা যা লাগতে পারে, সেগুলো কিনে দিয়ে হাতে আপৎকালীন কিছু টাকা পয়সাও দিয়ে আসবে সৌম্য ।

বাজারের ব্যাগটা রেখে, বেসিনের লিক্যুয়িড সাবান দিয়ে হাত ধুতে ধুতে, সৌমেনের পুরো ক্রাইসিস টা সংক্ষেপে বলতেই ক্ষেপে লাল হয়ে গেল সুমি,
- তোমার এই বন্ধুপ্রীতিই একদিন কাল হবে দেখে নিও ।
- এমন করে বলতে নেই সুমি । সৌমেন আমার অনেক বছরের বন্ধু । আমার কিছু বেস্ট ফ্রেন্ডের ভিতর ও একজন ।
- কই, এমনিতে তো তোমার ব্যাপারে কাউকে বিশেষ খোঁজ নিতেও দেখিনা । আর বেস্ট ফ্রেন্ডদের হয়ে কীর্তন গেয়ো না তো । যেখানে যাচ্ছ যাও । আমার হাড় জুড়াবে কটা দিনের জন্য ।

সৌম্য আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ শেভিংটা সেরে নিল । ওকেও কিছু জামাকাপড় নিতে হবে । ব্রাশ তোয়ালে চিরুণী ভরতে হবে । কোন পথটা দিয়ে সৌমেনের বাড়ি যাবে ও সেটা ভাবতে ভাবতেই প্যাকিং আর স্নানটা সেরে নিল । কিচেনে গিয়ে দেখল রান্না বলতে প্রায় কিছুই করেনি সুমি ওর জন্যে আলাদা করে । সৌম্যর এইসব এখন অভ্যেস হয়ে গেছে । ও চট্ করে চার চামচ ছোলার ছাতু একটু বীটনুন আর লেবু দিয়ে গুলে নিল । এটা পেটে গেলে বেলা দুটোর আগে আর পেটে ছুঁচোয় ডন বৈঠক করবে না । গাঢ় নীল জিনসের প্যান্ট আর সাদা টী শার্ট পড়ে বেরিয়ে এল ও ।

হিন্দমোটর থেকে ট্রেন ধরে রিষড়া রেল স্টেশনে এসে নামল । আর নামার সাথে সাথেই শুরু হলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি । প্ল্যাটফর্মের টিনের ছাদ জল পড়ার শব্দে মড়মড় করতে লাগল । ছাতা খুলে স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালো ও । না অটো, না কোনও টোটো, শুধু সামনের শনি মন্দিরের সামনে একটা আধভাঙা রিক্সা আর তার জীর্নদেহ চালক । রিক্সাওয়ালাটার সামনে এগিয়ে গেল সৌম্য,
- ঘাটে যাবেন নাকি দাদা ?
- যাবো, ত্রিশ দিতে হবে ।
- সেকি, পনেরো তো ছিলো । একেবারে ডবল্ কেন ?
- দেখুন, যাওয়ার হলে চলুন, মেলা সময় নষ্ট করবেন না আমার । আপনি না গেলেও আমার ভাড়ার অভাব হবে না । আজ অটো টোটো সব বন্ধ । কিচ্ছু পাবেন না । না উঠলে পায়ে হেঁটে যান ।

সৌম্য আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ল রিক্সায় । দরাদরি করে কোনও লাভ নেই এদের সাথে । দীর্ঘ একটা সময় তো এদেরই একচেটিয়া রাজত্ব ছিল । আর তারপর অটো টোটোর যুগে এদের জোরজুলুম দাদাগিরি তো একেবারেই শেষের পথে । ভাবতে ভাবতে খেয়াঘাট অবদি চলে এল মাঝবয়সী রিক্সাওয়ালা ।

ভাড়া মিটিয়ে ও এগিয়ে গেল টিকিট ঘরের দিকে । খেয়াপারের জন্যে ব্যক্তিপিছু ভাড়া পাঁচটাকা । এইবারে একটু বেকায়দায় পড়ে গেল সৌম্য । ওর কাছে তো পাঁচ টাকার খুচরো নেই । টিকিট কাউন্টারের লোকটারও খুচরো চাইই চাই । অগত্যা উল্টোদিকের একটা দোকানে ঢুকলো ও । গোটা তিনেক চুইংগাম নিতে হলো ওকে । টিকিট টা কেটে টি শার্টের বুক পকেটে রেখে নৌকার দিকে এগোল ।

ইতিমধ্যে বৃষ্টিটা আবার শুরু হয়ে গেছে । এবারে যেন আরও জোরে নেমেছে । সাথে বইছে তুমুল এলোপাথারি জোলো হাওয়া । ছাতাটা উল্টে গেল একবার । পড়ি কি মরি করে এবার জেটির দিকে আরও জোরে জোরে পা চালালো সৌম্য ।

লোহার বিশাল জেটি টা ভেসে আছে গঙ্গার উপর । এই পাড়ের মূল ভূখন্ডের সাথে জেটিটা জোড় দেওয়া আছে ব্রীজের মাধ্যমে । ব্রীজটার কাঠামোটা লোহার হলেও পায়ে চলা পথটায় বড়ো বড়ো কাঠের পাটাতন পাতা ।

প্রচন্ড পিছল হয়ে আছে যাতায়াতের গোটা পথটাই । খুব সাবধানে পা না ফেললে যে সমুহ বিপদের সম্ভাবনা পদে পদে, এটা খুব ভালো করেই জানা আছে ওর । খুব সন্তর্পণে ও ব্রীজটা  পার করে চলে এলো ভাসমান জেটির উপর, যেখানে গোটা দুই ছোটবড় খালি নৌকা দড়ি ফেলে বাঁধা আছে ।

একজন মাঝ বয়সী মহিলা যাত্রীও ওর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল হাতে একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে । তাকেই ও প্রশ্ন করে বসলো,
- ও মাসিমা, একটু বিরক্ত করছি আপনাকে ।
মহিলাটি একমনে ওপার থেকে ভেসে আসা নৌকার দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিলেন । সৌম্যর কথায় মাথাটা একবার ঘোরালেন ।
- বলছি ওপারে যাওয়ার নৌকা আসবে কখন ? এই দুটো তো মনে হচ্ছে আর যাবেনা ।
- ঐ তো, ঐ নৌকাটা যাত্রী নিয়ে যাবে । ওপারের থেকে দ্রুতগতিতে ভেসে আসা একটা যাত্রীবোঝাই নৌকা জল ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে আসতে দেখা গেল ।

এদিকে বৃষ্টি এখন বেশ চরমে । হাওয়াতে সব ওলটপালট অবস্থা । জেটির লাগোয়া একটা চায়ের দোকানের টিনের চালটা সশব্দে উড়ে গেল । পাশেই মোবাইল টাওয়ার । তার উপর কানে তালা লাগানো আওয়াজ করে চোখ ঝলসানো আলো এসে ঠিকরে পড়লো । মাথাটা মুহূর্তের জন্য ঘুরে গেল সৌম্যর । মনে হলো ওর যেন এখুনি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে । কিন্তু তেমন কিছুই হলো না । ও বুঝতে পারলো যে ভাসমান জেটিটা প্রচন্ড রকম ভাবে দুলছে । গঙ্গার ঢেউগুলো ক্রমশ ফুলে ফেঁপে উঠছে ।

ইতিমধ্যে ওর মতন আরও কিছু যাত্রী জড়ো হয়েছে চারপাশে । সবাই কমবেশি আতঙ্কিত । দুই একজনের কোলে বাচ্চা । তারা কোনওমতে নিজের মাথা আর বাচ্চাকে বাঁচাতে ব্যস্ত । এলোপাথাড়ি হাওয়া আর বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন শপাং শপাং করে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে পিঠের উপর । আর সেই চাবুকের আঘাতে যেন ধুয়ে যাচ্ছে ওর সমস্ত রক্তক্ষরণের জমাট বাঁধা দাগ ।

মোবাইল টা বাজছে । সৌমেন ফোন করেছে । সম্ভবত কতদূর আছে ও এখন, সেটাই জানতে চায় । ও আর ফোনটা বের করলোনা ব্যাগ থেকে । যা জলের ছাঁট, ভিজে গেলে খুব সমস্যা হবে ওর । আর এই একটাই সর্বসাকুল্যে ফোন ওর । খারাপ হলে ওর সমস্যার শেষ থাকবে না ।

ইতিমধ্যে যাত্রীবোঝাই নৌকো এসে দড়ি ফেলেছে ভাসমান লোহার জেটির উপর, যার উপর ওরা সকলে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল । একজন বয়স্ক মানুষ দুলন্ত নৌকা আর লোহার জেটির মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে না পেরে জলেই পড়ে যাচ্ছিল প্রায়, যদিনা সৌম্য ওনাকে শক্ত করে ধরে ফেলত ।
- কাকু, সাবধানে চলবেন তো । দেখছেন তো, কি খারাপ অবস্থা ।
- আর অবস্থা । আটান্ন চলছে । এখনো এই সামনের কারখানায় আসি । একজন মেয়ের বিয়ে এখনও বাকি । একটিমাত্র ছেলে বেকার । গিন্নী শয্যাশায়ী ।
ভদ্রলোক আপনমনে আরো কি সব বলতে বলতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন । ওনার যাওয়ার পথের দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিল সৌম্য । তারও কেমন যেন গুলিয়ে উঠছে শরীর খানা ।

হঠাৎ মাঝির ডাকে ওর ঘোরটা কেটে গেল,
- ও দা'বাবু, আসেন এবার । নাও ছাড়তি হবেক ।
সৌম্য সামনে তাকালো । সারি সারি কালো কালো মাথা ছাউনির ভিতর গাদাগাদি করে ঠাসা । তিলধারণেরও বিন্দুমাত্র জায়গা নেই । নৌকার সামনের দিকে সাইকেল আর গোটা দুই বাইক হেলান দিয়ে রাখা ।

সৌম্য ছাউনির ভিতর মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলো না । অগত্যা ছাতা মাথায় বাইরের দিকে দাঁড়িয়ে রইলো । মাঝি ততক্ষণে জেটির থেকে দড়ি খুলে পা দিয়ে একটু ঠেলা দিয়ে দিলো নৌকায় । নৌকো টা অসম্ভব রকম দুলতে লাগলো ঢেউএর ধাক্কায় । বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ক্রমশ বড়োসড় আকার ধারণ করল । অতো দম আটকানো ভিড়ের ভিতর থেকেই কয়েকজনের মুখ খুলে গেল, - একটু দেখে শুনে, সাবধান ! সামনে বান ।

সৌম্য এতদিন শুধু বান শব্দটা কানেই শুনেছে, কখনো দেখেনি । এবার সে দেখল তার অসাধারণ পৌরুষ । পাগলের মত বিশাল বিশাল এলোপাথাড়ি ঢেউ এসে আছড়ে পড়তে লাগলো ওদের নৃত্যরত দোদুল্যমান নৌকায় ।

ওর মনে পড়ে গেল ছোটবেলার সেই বর্ষার মেঘাচ্ছন্ন আলোআঁধারি দিনগুলোর কথা । বাড়িতে উঠোনময় শুধু জল আর জল । ও বাড়ির হোমওয়ার্কের খাতার পৃষ্ঠাগুলো খুব যত্নসহকারে খুলে নিত আর বানাতো কাগজের নৌকা । নৌকাগুলোর কয়েকটা হাঁটু জলের আকুলিবিকুলি সামলে নিতে নিতেও শেষরক্ষা করতে পারত না । আর বাকিগুলো টালমাটাল অবস্থা সামলেও ভিজে তলিয়ে যেত কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই । আজকের এই বৃষ্টিভরা গঙ্গার বুকে এমন জলোচ্ছ্বাস দেখে সৌম্য র মনে হলো যেন সে কাগজের নৌকো চড়ে পাড়ি দিয়েছে জীবনে শেষবারের মতো ।

ও চটজলদি ব্যাগ খুলে ভিতরে রাখা দুই লিটারের জলের বোতলখানা বার করল । কিছুটা খেলো শুকিয়ে আসা গলা ভেজাতে । বাকিটা ও ঢেলে ফেলে দিল । খালি বোতলের ভালো করে মুখ বন্ধ করে আবার তাকে পিঠের ব্যাগে ভরে ফেলল । এরপর সে তার ব্যাগের ভিতর রাখা কালো বড়ো পলিপ্যাক টা বের করলো । ভিতরে রাখা আপেল টা সে কিছুটা কামড়িয়ে খেল । বাকিটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো জলে । এরপর ফুঁ দিয়ে পলিব্যাগটা ফুলিয়ে নিয়ে বেলুনের মতো করে মাথায় একটা গিঁট মেরে দিল ।

পাশের একজন মোটাসোটা গোলগাল মতো যাত্রী ওর কান্ডকারখানা মনে দিয়ে লক্ষ্য করছিল, - এসবের মানে কী দাদা ? আপনি কি ভাবছেন আমরা সকলে নৌকাডুবি হয়ে মরবো ? আর আপনি একা বহাল তবিয়তে ও পাড়ে উঠবেন ?
- আরে না না, তেমন কিছুই না । ঐ একটু প্লবতা বাড়ানোর চেষ্টা আর কী ।
বাতাস ভরা পলিথিনের প্যাকেটটা নিশ্চিন্তে ব্যাগে ভরে নিল সৌম্য ।

ইতিমধ্যেই নৌকা চলে এসেছে ঘাটের কাছাকাছি । তেমন কিছুই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলো না । নৌকা এসে নিশ্চিত নিরাপদে ভিড়লো খেয়াঘাটে । সকলেই একে একে নামতে লাগল । এ নৌকা যে কাগজের নয় আর চালকহীন অসহায় দিশেহারা নয়, তা টের পেতে ওর বেশি সময় লাগলো না ।

এপাড়েও ভাসমান জেটির সামনে কংক্রিটের ঢালাই করা সেতু । ঘাটের মুখে একজন টিকিট পরীক্ষক ওর জন্যে অপেক্ষারত । লোকটা ঈষৎ বেঁটে ও গোলগাল প্রকৃতির সদাহাস্যময় অবয়ব নিয়ে একটা কাঠের বেঞ্চে বসে আছে । সৌম্য এগিয়ে গেল । পকেটে হাত দিয়ে টিকিট টা হাতড়ে বের করে তুলে দিল লোকটির হাতে । তারপর আবার জোরকদমে পা চালালো ।

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এখন একটু ধরেছে । মিনিট দশেক টানা হেঁটে ও পৌছে গেল বি.টি.রোডের ধারে । সৌমেনের বাড়িটা এখানেই কাছাকাছি কোথাও একটা হবে । মোবাইল বের করে দেখলো গোটা তের খানা কল্ । সবকটাই সৌমেনের । এবার ও কল্ লাগালো,
- ভাই, এসে গেছি তোর এলাকায় । থানার পাশেই গায়ে লাগানো রাস্তার মাথায় আমি অপেক্ষা করছি । তুই আয় ।
- সে তো আমি আসছি । কিন্তু তোকে হতচ্ছাড়া এতবার আমি কল্ করলাম । ফোনটা ধরলি না কেন তুই ?
- কি করে ধরবো ভাই বল্ ? একটা মাত্র সবেধন নীলমনি ফোন আমার । আর যা বৃষ্টির নমুনা । জল লেগে বারোটা বেজে গেলে আমার যে সর্বনাশ হয়ে যেতো ।
- বেশ, তুই মিনিট দুই দাঁড়া ভাই । থানার উল্টোদিকের বাসস্ট্যান্ডেই অপেক্ষা কর ।
- হ্যাঁ, আমি এখানেই অপেক্ষা করছি । তুই আয় । আমি অপেক্ষা করছি ।

এম.পি.ল্যাডের টাকায় তৈরী নতুন ঝকঝকে বাসস্ট্যান্ডের সিটে বসলো সৌম্য । ওর পাশেই এক কোণে একটা শতছিন্ন পোষাকের পাগলা গোছের লোক বসা । গান দিয়ে তার উৎকট পূতিগন্ধ ভেসে আসছে । এখানে বসাই ওর কাছে দায় । পাশেই অটো আর রিক্সার লাইন । কি অদ্ভুত ব্যাপার রে বাবা । গঙ্গার ওপারে অটো টোটোর দেখা মেলাই ভার । আর এপারে গমগম রমরমা ব্যাপার ।

পিঠের পিছনে একটা আলগা চাঁটি এসে পড়লো ।
- ভাই, এসে গেছি ।
- এবার চল দেখি তোর বাড়ি । প্যাকিং কমপ্লিট আশা করি ?
- আর প্যাকিং ! এই জন্যেই তো তোকে তেরো চোদ্দোবার কল করলাম । তুই তো ধরলিই না ।
- আমি ঝড় বাদলের দিনে রাস্তায় থাকলে মোবাইল ধরিনা রে ভাই । তুই তো জানিস আমার পকেটের হাল হকিকত । তোকে তো আর আমার লুকোবার নেই কিছু । আর তুইও এতবার ফোন করলি কোন্ দুঃখে ? আমি তো আসবো বলেই দিলাম । না আসার হলে তো তোকে তখনই না বলে দিতাম । অদ্ভুত পাগলা তো তুই !
- আচ্ছা শোন্, যে জন্য তোকে এতবার কল্ করলাম, তার কারণটা একটাই ।
- সেটা কি এমন হাতিঘোড়া মার্কা কথা যে মোবাইল ছাড়া জানান দেওয়া যাবে না । এই টুকু সময় কি তোর অপেক্ষা না করলে চলছিল না হতভাগা?
- আরে, আমার কথাটা তো শোন্ । আসার পর থেকে শুধু বকেই চলেছিস ।
- আচ্ছা বেশ । বলে তুই । আমি শুনি ।
- শোন্, তোকে কল্ করে আমি প্যাকিং শুরু করে দিলাম । এমন সময়ে ফোন এলো ঐ স্টিল কোম্পানির । বিশেষ কারণবশতঃ ওদের ইন্টারভিউ নেওয়ার কাজ এখন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওদের ম্যানেজমেন্ট প্রশাসন । আবার ওরা পরে ফোন ও মেইল করে আমাকে সময় ও তারিখ জানিয়ে দেবে ।
- সুতরাং আজ তোর যাওয়ার প্রোগ্রাম স্থগিত । আর আমাকে ফিরে যেতে হবে আবার ঘরের ছেলে ঘরে ।
- স্যরি ব্রাদার । এই জন্যেই তোকে আমার অতোবার কল করা, যাতে আর তোকে কষ্ট করে এতটা এসে আবার ফিরে যেতে না হয় ।
- তবে আর কি কাজ বল তোর বাড়িতে ঢুকে? আমি বরং অফিস চলে যাই । ওখানের কাজ সেরে আবার বাড়ি ফিরে যাব । এদিকটায় আর আসছি না ।
- ভাই, রাগ করিস না । মনখারাপ ও করিস না । কি করবি বল্ ? এতো আমার হাতেই ছিলোনা । আমিও কি জানতাম যে এমনটা করবে ওরা ।
- যাক্ গে । বাদ দে এসব । আমি চললাম অফিসে ।
- ভাই রে, কিছু মনে করিস না প্লিজ । এক্সট্রিমলি স্যরি ।
- আরে না না, বন্ধুদের ভিতর নো স্যরি । ফর্ম্যালিটি রাখ । আমি এগোলাম । তুই ভালো থাকিস ভাই ।
- আরে দাঁড়া না রে ভাই । শোন্ না । কথা আছে ।
- আচ্ছা বল্ ।
- বলছি তোর বাড়ি আর অফিস তো জানেই যে তুই এখানে এসেছিস ।
- তো ?
- কি তো ? শোন্, আজ বরং তুই আমার এখানেই থেকে যা । আমি ভালো স্কচ হুইস্কি এনে রেখেছি । সাথে দারুণ দারুণ সব চাট জোগাড় করে নেব । এখন তুই আমার বাড়ি চল । স্নান খাওয়া সেরে বিশ্রাম নে । সিনেমা দ্যাখ । তারপর না হয় বিকেল করে আমরা বসে পড়ব । একদম শেষ রাত অবদি আসর চলবে । আমি আমার আরো দুটো বান্ধবীকে ডেকে নিচ্ছি । ওরা খুব ফ্রী মাইন্ডের । আর খুব দিল খোলা । তোর মন খুশ করে দেবে আজ ওরা । চল আমার সাথে । সামনেই ভালো রেস্টুরেন্ট আছে । যা যা খাবি আনিয়ে নেব ।

সৌম্য হাঁ করে অবাক হয়ে গিলছিল সৌমেনের সব কথাগুলো । মদ অবদি ব্যাপারটা ঠিকই ছিল এতক্ষণ । এতদিন পর দুই বন্ধুর দেখা ।একটু আধটু আনন্দ ফুর্তি হতেই পারে । কিন্তু তাই বলে মেয়েমানুষ নিয়ে .... !! যদি প্রেমিকা হতো, তবুও ওর কেমন বাধো বাধো ঠেকত । আর এই হারামজাদা টা বলে কী এসব ! ও বললো,
- দেখ ভাই, তোর মদ অবদি যে পরিকল্পনা, তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই । কিন্তু তুই পরের যে অংশটা বললি, তাতে আমার প্রবল অনীহা । আমার নিজের বউএর সাথেই আমার মানসিক টানাপোড়েন এতটা যে আমরা আলাদা ঘরে রাত কাটাই । আর তুই বলছিস ...  না না ভাই, আমি নেই তোর এসবের মধ্যে । তুই বরং একাই ওদের ডেকে এনজয় নে । আমি এমন মানসিকতার সাথে একটুও অভ্যস্ত নই । আমি বরং আসি ।
- আরে দাঁড়া না ভাই । অত জলদি জলদি সিদ্ধান্ত টানিস না । এতদিন পরে পেলাম তোকে । বেশ, তোর কথাই রইলো । কাউকে ডাকছিনা । এখন তুই চল্ তো আমাদের বাড়িতে । এবার তো আর কোনও সমস্যা হবার কথা নিয়ে তোর ।

ওরা দুজনে এগিয়ে গেল বাসস্ট্যান্ড ছেড়ে । এদিকটায় কোনও গাছপালা নেই । চারদিকে শুধুই বহুতল । কংক্রিটের চিরস্থায়ী জঙ্গল । এই জঙ্গলে ধনী মানুষদের অধীনেই বাকি সব জীবজগৎ । এই ধনীরা অধিকাংশই কালো টাকা আর তার সুদ হিসেবে সব রকমের পাপ জমিয়ে রাখে নানা উপায়ে । মদ মেয়েছেলে জুয়া নানা রকম নেশার সম্ভারে এদের জীবন যেন রঙিন প্রজাপতি । এক ফুল ছেড়ে অন্য ফুলে আনাগোনাতে এরা অনন্য ।

বাড়িতে ঢোকার আগে এক প্যাকেট মার্লবোরো সিগারেট নিলো সৌমেন । আসার সময় ও পনেরো লাখ টাকার হার্লে ডেভিডসন বাইক নিয়ে এসেছিলো । মডেলের নাম ফ্যাট বয় । এই মডেল হিন্দি সিনেমাজগতের দুই তারকাও ব্যবহার করে । সঞ্জয় দত্ত আর শাহিদ কাপুর । সৌম্যর নিজের কোনও বাহন নেই তেমন । ছিল একটা বাবার আমলের হিরো সাইকেল । তাও আবার সেকেন্ড হ্যান্ড । সেটার ব্যবহার এখন আর প্রায় হয়না বললেই হয় । তবুও বাইক নিয়ে তার একটা ফ্যান্টাসি কাজ করে । তার মনে হয় সেও একদিন বুদ্ধ ইন্টারন্যাশনাল সার্কিটে রেসে অবতীর্ণ হবে তার নিজের বাইকে চেপে ।

ভাবতে ভাবতেই ওরা এসে দাঁড়ালো সৌমেনের বিশাল বাগানবাড়ির সামনে । ক্যামেরা বসানো দরজার ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট লকিং সিস্টেম বাঁ হাতের তর্জনীর সাহায্যে খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো ওরা । বাড়ির সামনের অংশে দুই পাশ জুড়ে বিশাল বড়ো বাগান । মাঝখানে রয়েছে দুটো স্করপিও গাড়ি পাশাপাশি চলার মত মোরাম দেওয়া চওড়া উঁচু রাস্তা । জল জমে প্যাচপ্যাচে কাদা বা কাগজের নৌকা ভাসানোর কোনও সুযোগ এখানে নেই ।

ওরা ভিতরে ঢোকার সাথে সাথেই টেপ করা মহিলার স্বরে ওদেরকে স্বাগত জানানো হলো । এখানে সব ঘরেই স্বয়ংক্রিয় সেন্সর বসানো । ওদের ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই আলো ফ্যান জ্বলে উঠল । ঘরের উষ্ণতা আর ভয়েস কম্যান্ড অনুসারে আলো পাখা আর উষ্ণতা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এখানে । মেঝেতে কাশ্মীরি গালিচা, কাঁচের জানলার উপর ভারী পর্দা, মেহগনী কাঠের আসবাব সামগ্রী, সবকিছুই যেমন কোন বিদেশী সিনেমার প্যালেস বা পাঁচতারা হোটেলগুলিতে দেখা যায় ।

সৌম্যের মাথাটা একটু ধরেই ছিল । সম্ভবত কিছুটা বৃষ্টি ভেজার কারণে আর বাকিটা এই বিলাস বৈভবে ।
- যে ভাই, স্নানটা সেরে ফেল্ । আমি এই ফাঁকে খাবার গুলো হাল্কা হাল্কা গরম করে নেই মাইক্রোওয়েভ এ ।

সৌমেনের কথামত সৌম্য প্রথমে গেল বাথরুমে স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে নিতে । ব্যাপক খিদে পেয়ে গেছে ওর । সেই কখন বের হয়েছে । বাথরুমে ঢুকেই আরেক প্রস্থ মাথাটা ঘুরে গেল ওর । যেই দরজা খুলেছে আলোটা জ্বলে উঠলো আর এক্সজর্জস্ট ফ্যানটাও নিজের মতো করে ঘুরতে শুরু করলো । কলের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ওর বাঁহাতে এক ফুট তফাতে দেওয়ালে সাঁটা একটা বাক্স থেকে ভেসে এল নির্দেশ । ও ঠান্ডা গরম মেশানো জলের কথা বলতেই কল থেকে জল বের হতে লাগল ওর কথামতো ।

সৌমেন ভাবলো শুধু চাকরি বা ব্যবসার ধনে সাধারণ বাঙালী এত কিছু করতেই পারবেনা । সৌমেনের বাবা রাজ্যের অগ্নি নির্বাপন দপ্তরের উচ্চষদস্থ সরকারী আধিকারিক । সম্ভবতঃ এখন উনি দপ্তরের ডাইরেক্টর জেনারেল । মানুষ হিসেবে খুব একটা সুবিধার নয় । ঘুষখোর আধিকারিক হিসেবে খুবই দুর্নাম ওনার । এমন লোকের বাড়ি তো এই ধরণের হওয়াই খুব স্বাভাবিক ।

সৌমেনের মা গত হয়েছেন বছর দুয়েক হলো । এখন যাকে ও 'মা' বলে সম্বোধন করে, তিনি ওর বাবার দ্বিতীয় পক্ষের । ওর বড়ো ভাই ব্যাঙ্গালোরে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পড়া শেষ করে এখন ওখানেই কর্মরত ।

স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ গিয়ে বসলো ওরা দুজন । একটি বছর কুড়ির মেয়ে এসে খাবার বেড়ে দিলো ওদের । সৌমেন আলাপ করিয়ে দিলো, - এই হলো সোনালি । বাড়ি ক্যানিং লাইনে । আমার দেখভাল করে । বাবার এক ক্লায়েন্ট ওকে আমাদের এখানে রেখে দিয়ে গেছে । ওর মা বাবা কেউ নেই ।
- দেখভাল করে মানে ? তুই কি বাচ্চা নাকি ! না কি বয়সভারে অসুস্থ রোগী ?
সৌমেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, - এগজ্যাক্টলি ঠিক তা নয় । আসলে ঘরের দেখাশোনার সাথে সাথে আমারও সমস্ত প্রয়োজন মেটায় ও ।

সৌম্যের আর এসব দেখতে শুনতে ভালো লাগছিলো না । কতখানি পরিবর্তন হয়ে গেছে ছেলেটার মানসিকতা । অতিরিক্ত প্রাচুর্য বোধহয় স্বভাব আর অভ্যেস দুটোকেই এই ভাবে অবনতির দিকে ঠেলে দেয় । একসময় এই ছেলেই ওদের বাকি সকলের মত মেয়েদের দিকে চোখ তুলেও চাইত না । মদ সিগারেট বা অন্য কোনও নেশার ধার ধারত না কেউ । নেশা বলতে ছিলো শুধু ফুটবল ক্রিকেট আর সাইকেল চেপে টো টো করে ঘোরা । সময় যে সৌমেনকে এতখানি পাল্টে ফেলেছে, এটা যেন ভাবতেই পারছেনা সৌম্য ।

খাওয়া শেষ । হাতমুখ ভালো করে ধুয়ে দাবার বোর্ড সাজিয়ে বসলো ওরা । সোনালি এসে বলে গেল কোনও প্রয়োজন পড়লেই যেন ওকে ডাকা হয় । এখন ও শুয়ে বসে গড়িয়ে টিভিতে সিরিয়াল দেখবে রোজকার মতন নিয়ম করে । খেলাটা যখন একটু জমে উঠেছে, এমন সময় সৌমেন একটু অপেক্ষা করতে বলল সৌম্যকে, - একটু বস্ ভাই । আমি তোর আর আমার জন্য সোনালিকে দুটো পেগ বানাতে বলি ।
- তার কোনও দরকার নেই ভাই । আমরা কি কিছু কম যাই বল ? কেন, তোর কি মনে নেই, শিলাজিৎদের গঙ্গার ধারের সেই পুরানো বাড়ির ছাদে আমরা চারজন মিলে প্রথমবার বীয়ার খেলাম । সেদিন আবার স্বরস্বতী পুজো ছিল । আমরা ভোগ খেয়ে নিলাম একটু আগেভাগে । মনে পড়ছে কী কিছু ?
সৌম্য মাথা দুই পাশে দোলালো । অর্থাৎ কিছুই মনে নেই ওর, শুধু বললো, - চল্, স্কচের বোতলটা বের করি । বরফও লাগবে সাথে । আপেল শশা ডাঁসা পেয়ারা বীটনুন আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে চাট বানাতে বলে দিই সোনালিকে ।

সোনালি গদিওয়ালা সোফায় পায়ের উপর পা তুলে একমনে দেহটা এলিয়ে টিভি দেখছিল । সৌমেন নিঃশব্দে ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো । তারপর আলতো করে ওকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে খুব আদুরে আদুরে গলায় বলে উঠলো,
- সোনু ডার্লিং, একটু উঠতে হবে যে । ফলগুলো একটু স্যালাডের মতোন করে কেটে নুন লঙ্কা ছড়িয়ে দাও । আমরা একটু ড্রিঙ্ক করবো ।

সোনালি যেন খুব বিরক্তির সাথে সোফা ছেড়ে উঠে গেল কিচেনের দিকে । এখানে খাঁচায় বন্দী ডানাভারী পাখির মত অসহায় জীবন ওর । কোথাও গিয়ে যে নিজের মতো করে মেয়েটা বাঁচবে, এমন বিকল্প উপায়ও ওর নেই । এখানে তবুও সে যেমন খুশি খেতে পড়তে পাচ্ছে । এইসব তৃতীয় বিশ্বের দেশে বাপ-মা মরা অসহায় মেয়েদের জীবনে এর থেকে বেশি ভালো কিছু আশা করাটাই বোধকরি অন্যায় ।

সোনালি ফিরে এলো । মেয়েটা সালোয়ার পরে আছে । আহামরি রকমের সুন্দরী নয় । তবে মুখটায় একটা লক্ষীশ্রী ভাব রয়েছে । বেশ নরম আর মিষ্টি স্বভাবের আচরণ । কোনও ডাঁট বা অহঙ্কারের লেশমাত্রও নেই ।

ফ্রুট স্যালাড রেডি । বেলাও এখন অনেকটাই । বাইরের অবস্থা ঘর থেকে বোঝার উপায় নেই । হয়ত অন্ধকার হয়ে এসেছে । পেগ তিনেক শেষ হওয়ার পর টেবিল ছেড়ে উঠলো সৌমেন,
- ভাই, একটু বস্ । আমি জল ছেড়ে আসছি । এক নম্বর লেগেছে জোর ।
সৌম্যেরও যে বাথরুমে যেতে মন করছিল না, তা নয়, ওটা বলে উঠলো, - বেশ তো । চল্ । আমিও সেরে আসি এক প্রস্থ । তোদের এখানে তো অতিরিক্ত বাথরুম আছে আশাকরি ?
- সে আর বলতে ! সব ঘরে একটা করে অ্যাটাচ বাথরুম করা আছে । তুই যেটায় খুশী যা । হাল্কা হয়ে আয় ।

সৌম্য হাল্কা ঘোরে বিলাস বহুল আলো আঁধারিতে যেন হারিয়ে ফেলল নিজেকে । ভুলবশতঃ এগিয়ে গেল সামনের বসবার ঘরে । ঘরে ঢোকার মুখেই একটা চরম ধাক্কা খেল ও । দেখল সৌমেন আর সোনালি একে অপরকে সাপের মতো জড়াজড়ি করে মেঝের কার্পেটের উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে ।

সোনালি বোধহয় সৌমেনের নাগপাশ থেকে নিজেকে আপ্রাণ ছাড়াতে চাইছে,
- ছাড়ো আমায়, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও । পায়ে পড়ি তোমার । এসব আমার একটুও ভালো লাগছে না । রোজ এমন করে উন্মত্ত মদ্যপের মত হিংস্রতা আমার ভালো লাগেনা । আজ আমার শরীরটাও ভালো না ।
- নাগো, এখন যে ছাড়তে পারবো না তোমায় । একটু আদর তো করতেই হবে তোমাকে । নইলে তো তুমি জানোই, আমি কি করতে পারি ।
- এই সৌমেন, কি করছিস এসব ! ছাড় ওকে । এই তোর বাথরুম আসা ! আর আমি ওখানে একা ..
- অ্যাবে শালা, তুই একা কী বে ? এই তো আমার জানু রয়েছে । চল, আজ এই ডবকা মাগীকে দুজন মিলে ...

সৌমেনের মুখের কথা শেষ হলো না । সৌম্য ওর মুখ লক্ষ্য করে সপাটে একবার পা চালালো । ইতিমধ্যেই সোনালি নিজেকে আলাদা করে নিয়ে কিছুটা তফাৎ চলে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।
- তুই আমাকে মারলি ! মারতে পারলি ! তবে রে শালা নিমকহারাম .. টলতে টলতে সৌম্যকে কব্জা করতে চেষ্টা করল ।

ওদিক থেকে সোনালি যেন এমন একটা সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল । সোফা সংলগ্ন টেবিলে পড়ে থাকা পাথরের অ্যসট্রেটা তুলে সোজাসুজি বসিয়ে দিল সৌমেনের মাথার পিছনে । কার্পেটের উপর লুটিয়ে পড়লো সংজ্ঞাহীন সৌমেনের দেহ ।

সৌম্যের নেশা নিমেষের ভিতরে কোথাও যেন উধাও হয়ে গেছে । সম্বিত ফিরে আসতেই ও দেখল কার্পেটের উপর রক্ত । আর সোনালি ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে । উত্তেজনা ভয় দুশ্চিন্তা সব যেন একসাথে জমাট বেঁধেছে মাথায় ।

- এখন কি হবে ! ও কি মরে গেল নাকি ? কি করবো এবার ? যাব কোথায় আমি ?
সৌম্য ঝুঁকে পড়ে সৌমেনের নাকের কাছে আঙুল নিয়ে গেল । অনুভব করতে পারলো নাক থেকে বের হয়ে আসা গরম হলকা বাতাস,
- নাহ, মরে নি হতভাগাটা । বেঁচে আছে । এক কাজ করুন বোন, শিগগির কাউকে ডাকুন তো । হাসপাতালে নিয়ে গেলে ও ঠিক হয়ে যাবে ।
- কিন্তু ওকে বাঁচিয়ে কি লাভ ? ও তো ছাড়বেনা আমাদের ।
- শুনুন, অন্যায়টা ও করেছে । আর পালিয়ে বেড়াব আমরা ? তার চেয়ে বরং আমরা ওকে বাঁচাই । আর লোকাল থানাতেও লিখিতভাবে বিবৃতি জানাই সম্পূর্ণ ঘটনা টা শুরু থেকে শেষ ।
- কিন্তু দাদা, এর বাবা যে খুব প্রভাবশালী । উনি তো ঠিক ওনার ছেলেকে সুরক্ষা দেবেন । আর আমাদের ক্ষতি করবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবেন । উনি কিন্তু ছেলের চেয়েও আরও বেশি খারাপ লোক ।
- সে দিন না । তবে এটা জেনে রাখবেন, আমরা কেউ আইন ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে নই । এখনো এই দেশে অনেক নেতা মন্ত্রী আমলার সাজা হয় । আর এই বাড়িতে তো সিসিটিভি ও আছে । আমরা বরং ঘটনা ঘটার রেকর্ডিং করা অংশ টা আমাদের কাছেই রেখে দেই একটা কপি । আমার কাছে ল্যাপটপ আর পেনড্রাইভ আছে । নো টেনশন্ সিস্টার । আর আমি গোটা ঘটনাটা আমার এক উকিল বন্ধুকে জানিয়ে রাখছি বিশদে । অত ভয় পাওয়ার কিছু নেই । আপনি এখানে একলা থাকেন । এটা গোটা পাড়া জানে । আর ওর যে স্বভাব চরিত্র খুব একটা সুবিধের নয়, এটাও তো ওর বাবা লুকিয়ে রাখতে পারবে না । তাছাড়া বাড়িতে পুলিশ আসবে । এত বিলাসবহুল বাড়ির খবর যদি আয়কর আর ভিজিল্যান্স দপ্তরের লোকজন জানতে পারে, তবে তো ওর বাপেরও রেহাই নেই । ওর বাবা চালাক লোক । এত ঝামেলার ভিতর দিয়ে যেতেও চাইবেনা । বরং তোমাকে বড়সড় টাকার অ্যামাউন্ট অফার করবেন উনি । আর তুমিও এই সুযোগ হাতছাড়া করো না ।
- দাদা, এই সব কী বলছেন আপনি !
- শোনো বোন, আমি কিন্তু ভুল কিচ্ছু বলিনি তোমাকে । এরা যেমন খারাপ লোক, এদের সাথেও এমনটাই করা উচিত । তুমি বাস্তবটা বুঝতে পারছোনা কেন বলতো ? আজ এই মুহুর্তে তোমার পাশে একমাত্র আমি ছাড়া আর কেউ নেই । আজ আমি না থাকলে তোমার সাথে যে কি কি হতে পারতো তা ভেবেই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে । এই জানোয়ারটাকে আমি কিছুতেই আমার ছোটবেলার বন্ধুর সাথে মিলিয়ে উঠতে পারছিনা । এটা মানুষ নয়, পশুরও অধম । আজকের পর তুমি কোথায় যাবে, কি করবে আমি জানি না । তবে আমি এটুকু জানি যে তোমার যদি একটা ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট থাকে আর সেখানে একটা মোটা অঙ্কের টাকা, তবে তোমার সেই টাকা অনেক উপকারে লাগবে । আর যতদিন না তুমি অন্য কিছু কাজ দেখছ, ওটা তোমার কাছে আশীর্বাদ বলে জেনো ।

সোনালির চোখের পাতা ভিজে গেলো । সত্যিই এই দাদাটি বড়ো ভালোমানুষ আর চরম বাস্তববাদী । ও মনে মনে প্রণাম করলো নিজের এই নতুন ইষ্টদেবতাকে ।

সৌম্য প্রথমে হাসপাতাল, তারপর থানায় ও শেষে নিজের উকিল বন্ধু জয়দীপকে ফোন করল । জয়দীপও ওকে জানালো যে থানায় যা যা বয়ান দেবে ওরা, তা যেন উকিল কে সাথে করে নিয়ে গিয়েই জানায় । সৌম্য জয়দীপ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করল ।

ইতিমধ্যে সোনালিও সৌমেনের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করে ফেলল লোকাল ক্লাবের ছেলেদেরকে ডেকে । আধঘন্টার ভিতরেই জয়দীপ এসে হাজির । এরপর থানায় গেল ওরা ।

থানার সেকেন্ড অফিসারকে বিশদে সব জানালো জয়দীপ । লিখিতভাবে সবটুকু জমা দিলো । অফিসার আশ্বস্ত করলেন যে এই ক্ষেত্রে থানাও ওদের পাশেই থাকবে । সৌম্যের সবকিছু কেমন যেন স্বপ্নের মতো বোধ হচ্ছিল । থানার কাজ মিটতেই সৌম্যকে বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে তুলে দিল জয়দীপ । সৌম্য জানলার ধারে খালি সীট পেয়ে বসে পড়লো ।

মনে এখন আর তার বিন্দুমাত্রও চাপ নেই । সে এই এক বেলায় অনেকগুলো দারুণ দারুণ শিক্ষা পেয়েছে তার এই জীবন থেকে । সে বুঝেছে জীবনের চেয়ে, আনন্দে বেঁচে থাকার চেয়ে আর বড়ো কিছুই নেই । সুমির বলা শব্দগুলো শুধু যে ফলে গেল, তাই নয়, অনেক পথের সন্ধান দিয়ে গেল তাকে । ভাগ্যিস আজ অমন করে বৃষ্টি হলো । নয়ত ওকে সৌমেনের ফোন ধরে অফিস চলে যেতে হত । এই অন্যরকম বৈভবময় কদাকার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতে হতো তাকে । আজ সে যখন সে দোদুল্যমান নৌকায় মৃত্যুভয়ে কাতর না হয়ে ধীরে ধীরে জীবনে টিঁকে থাকার লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন সে ভাবতেই পারেনি যে জীবনে আর কাউকে সে দেখতে পাবে । দুর্ঘটনা তো কিছুই হয়নি । আর সেও তো দিব্বি বহাল তবিয়তেই আছে । আজ সে যেমন করে তার পিঠব্যাগের প্লবতা বাড়াচ্ছিল ঐ অশান্ত জলের মোকাবিলা করবে বলে, ঠিক তেমন করেই ওকে জীবনের সমস্ত বাধা আর সমস্যার বিরুদ্ধে প্লবতা বাড়াতে হবে রোজ, যাতে তাকে অযাচিতভাবে ডুবে মরতে না হয় । সে নিজেও রোজ বাঁচবে আর অন্যকেও বাঁচাতে চেষ্টা করবে । একবুক নিঃশ্বাস নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো সৌম্য । সোনালি আর জয়দীপ তার দিকে হাসিমুখে চেয়ে রয়েছে । সৌম্য না এলে আজ ঐ মেয়েটিও হয়ত বাঁচত না । হাতটা তুলে বিদায় জানাল ওরা দুজন । সৌম্যও ঘুরে দেখল ওদেরকে আরও একবার । জয়দীপ সোনালিকে ওদের মাসির বাড়িতে বৃদ্ধা মাসির দেখাশোনার প্রস্তাব দিয়েছে । সেখানে আছে তার মাসি আর ডিভোর্সী মাসতুতো বোন । বোন ব্যাঙ্কে চাকরি করে । বৃদ্ধা মাকে একলা বাড়িতে ফেলে রেখে কাজ করতে ওর বোনের হাজারখানেক টেনশন । আর আয়াসেন্টার গুলোও সব কেমন যেন । টাকা নেবে গুনে অথচ পরিষেবায় লবডঙ্কা । সোনালিও মেনে নিতে দেরি করেনি । ওরও তো মাথা গোঁজার একটা ঠিকানা দরকার এই মুহূর্তে । সত্যিই বোধকরি ভগবান মুক্তি দিলেন ওকে এত যন্ত্রণার পরে । বাসের ড্রাইভার এবার ইঞ্জিনে স্টার্ট দিয়েছে । ওদের সবার জন্যেই জীবন এখনো অনেকভাবে অপেক্ষা করে আছে, আরো একটু প্লবতার সন্ধানে ।

(প্রকাশিত)
*********

রাতের তারা - রাজেন্দ্র

মাথাটা অল্প বিস্তর ঘোরাচ্ছে । চোখে নতুন চশমা লেগেছে । সকাল থেকেই আফিমখোরের মতো ঝিম্ মেরে চুপটি করে বিছানার একটা কোণে বসে রবীন্দ্র-রচনাবলীর প্রথম খন্ড পড়তে শুরু করেছিল ঋক । গায়ে জ্বর জ্বর ভাব । চোখের পাতা ভারী । গলা খুসখুস । নাকের একপাশ বন্ধ । একপাশ হাফ্ খোলা ।

হফাৎ নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো ঝটিকা হাওয়া সহযোগে গিন্নি এসে দাঁড়ালেন মুখের সামনে । একথা সেকথার পরে বললেন ছেলেকে নিয়ে সেলুনে যেতে ।

ছেলের মাথার চুল বড়ো হয়ে কান পর্যন্ত ঢেকে যাচ্ছে । বিকেলের সাঁতারের ক্লাসে গেলে টিচার নাকি বকাঝকা করছেন । আর ইস্কুলের দিদিমনিরাও নাকি এত বড়ো বড়ো চুলের বাহার পছন্দ করছেন না ।

ঋক একটু দোনামনা করছিলো প্রাথমিক ভাবে । কিছুটা বিরক্তি কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে একটু আধটু খুচরো বাদানুবাদ সেরে অতি কষ্টে জিনসের প্যান্টখানা কোমরে গলিয়ে নিলো শেষমেষ ।

এক হাতে সর্বক্ষণের সাথী ছাতাটিকে নিয়ে ছেলেকে সাথে করে যখন ঘরের বাইরে পা দিলো ঋক, তখন চারপাশ উঁচুনীচু এবং সবকিছু কেমন যেন টলছে । ও ভালো রকম ভাবেই জানত, এই দুইরকম পাওয়ার ওয়ালা বাইফোকাল প্রোগ্রেসিভ লেন্স চোখে সেট হতে দিনকয়েক সময় লাগবে । এটা দোকানদার বলেছিলো ওকে ।

ঘর থেকে বের হলেই সামনের খোলা উঠোনের লাগোয়া আমগাছ । সেখানে রোজ পালকওঠা অতিবৃদ্ধ জ্ঞানী গোছের একজন কাক এসে বসে থাকে গোটা দিন এবং দুপুর । আজকেও নির্দিষ্ট ডালের মাথায় এসে বসেছিলো সেই জ্ঞানবৃদ্ধ সর্বজ্ঞ কাকটি ।

বার কয়েক গলা খাঁকারি দিয়ে কাকটি যেন মানুষের ভাষায় ঋকের দিকে চেয়ে ব্যঙ্গ করতে লাগলো । বলতে লাগলো - "আহা, বাছা । মন মেজাজ শান্ত রাখো । ধীর স্থির হয়ে ভাবো । সংসার বড়ো বিষম বস্তু । আর সাধু সন্যাসীর জীবন আরও জটিল । তাঁদের সংসার ভুবনজোড়া । তুমি বাপু তুচ্ছপ্রাণ ক্ষুদ্র জীব । এইসব ছোটখাটো সংসারী কাজ চুপচাপ সেরে ফ্যালো । নচেৎ নিজের কাজ, নিজের জগতে নিজের মতোন করে বেঁচে থাকা বেরিয়ে যাবে ।"

ঋকের মনে পড়ে গেলো রবীন্দ্র-রচনাবলীর প্রথম খন্ডের অবতরনিকার কিছু লাইন যেখানে গুরুদেব কবিকুলকে মৎস প্রজাতির সাথে তুলনা করেছেন । সেখানে কবি লিখছেন, - "মাছ যতক্ষণ জলে আছে ওকে কিছু কিছু খোরাক জোগানো সৎকর্ম, সেটা মাছের নিজের প্রয়োজনে । পরে যখন তাকে ডাঙায় তোলা হল তখন প্রয়োজনটা তার নয়, অপর কোনো জীবের । তেমনি কবি যতদিন না একটা স্পষ্ট পরিণতিতে পৌঁছয় ততদিন তাকে কিছু কিছু উৎসাহ দিতে পারলে ভালোই - সেটা কবির নিজেরই প্রয়োজনে । তার পরে তার পূর্ণতায় যখন একটা সমাপ্তির যতি আসে তখন তার সম্বন্ধে যদি কোনো প্রয়োজন থাকে সেটা তার নিজের নয়, প্রয়োজন তার দেশের" ।

ঋক নিজে একজন অপরিণত কবিতা লেখক । নিজেকে সে কবি বলে ভাবতে পারেনি এখনো । তবে কবিতার চর্চায় সে ডুবে থাকতে চায় । চায় উদ্বায়ী ভাবনায় ভেসে থাকতে । আর তার জন্যে প্রয়োজন উপযুক্ত মানসিক স্থিতি । অস্থিরতা অশান্তি একেবারেই কাম্য নয় তার । সুতরাং প্রসন্ন মনে ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে পড়লো সে ।

একটুখানি এগোনোর পরেই ছেলের চোখে পড়ে গেল একটা মরা কুনো ব্যাঙ্ । কোনও একটি ভারী কিছুতে বেচারী পিষ্ট হয়ে প্রাণত্যাগ করেছে । সাত বছরের ছেলে খুব সরলভাবে একটা প্রশ্ন রাখলো এবার ঋকের সামনে - আচ্ছা বাবা, ঐ ব্যাঙ্ টা কি এখন স্টার হয়ে গেছে ? নাকি ভূত হয়ে গেছে ?

ঋক মৃদু হাসলো - না বাবা, ও স্টারও হয়নি । ভূতও হয়নি ।

ছেলে আবার পাল্টা বলে উঠলো - আচ্ছা বাবা, কোনটা বেশী ভালো ? স্টার হওয়া ? নাকি ভূত হওয়া ?

ছেলের কোর্ট থেকে ছুটে আসা প্রশ্নের বলটাকে আবার ঘুরিয়ে দিলো ঋক - তোমার কি মনে হয় ? কোনটা ভালো ?

ছেলে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে জবাব দিলো - আমার মনে হয় ভূত হওয়াটাই বেশী ভালো । তাহলে ওদের নাক ধরা যাবে ।

এবার হেসে ফেললো ঋক । ও জানে ছেলে নাক ধরে চটকাতে ভালোবাসে । ও এবার ছেলেকে বললো - না বাবা । ওদের ধরা ছোঁয়া যাবেনা । কিন্তু ওরা তোমায় ধরতে ছুঁতে পারবে । ভূতে না পারুক, রাতের তারার আলো আমাদের সকলকে ছুঁতে পারবে । ওদের নরম তুলতুলে মোলায়েম আলো আমাদের গায়ে মাথায় মুখে বুলিয়ে দিতে পারবে । এই আলো মেখে আমরা অনেকেই পূর্ণিমার রাতে সামনের খোলা মাঠে ছোটাছুটি করতাম, খেলতাম । এখন আমরা ঘর শপিংমল ছাড়া আর কিছু বুঝি না । তাই ওদের ভারী দুঃখ হয় । রোজ রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ওরা জেগে থাকে আমাদের আসার অপেক্ষায় । আর রোজ আমরা ওদেরকে হতাশ করি । তাইতো আমরা ভাবি মরে গিয়ে একদিন আমরা তারা হয়ে ওদের দলে যোগদান করবো । ওদের সাথে ওদের ভীড়ে মিশে যাব ।

ছেলে কি বুঝলো জানা গেলো না । ও শুধু বললো - বাবা, তুমি মরে গেলে স্টার হয়ে যেও না । ভূত হয়ে থেকে যেও আমার চারপাশে । আমি তোমার নাক ধরে খেলবো ।

হাঁটতে হাঁটতে বাপ ছেলে সেলুনে পৌঁছে গেলো ।

@ রাজেন্দ্র

**********

মোহ _ রাজেন্দ্র (প্রকাশিত)

অফিস যায়নি আজ অতনু । জেলা সদর অফিসে মিটিং ছিল সারা দিন । ওদের দপ্তরের জেলা আধিকারিকের আজ শেষ কর্মদিবস উপলক্ষে একটা আনুষ্ঠানিক সমাবেশ ছিল দিনভর । ওর সতীর্থরা সকলেই খুব খুশী আধিকারিকের চলে যাওয়ার জন্য । সুতীর্থ তো আনন্দের সাথে একটা আঁটোসাঁটো ভাষণই ঝেড়ে দিলো,
- ভাইসব, আজ আমাদের জেলার দপ্তরের ব্যর্থতম সেনাপতি, কর্মজগতে নির্লিপ্ততম ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি চরিতার্থকারী জড়ভরত, যিনি শুধুমাত্রই ফেসবুক আর হোয়াটস্ অ্যাপ এ রাতদিন বিচরণকারী, আমাদের জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক বিদায় নিলেন । আমাদের মুক্তি দিয়ে গেলেন । ওনার কর্ম নিস্পৃহতাকে আমাদের আধিকারিক সংগঠনগুলির তরফ থেকে অর্বুদকোটি প্রণাম । উনি ওনার পূর্ববর্তী দপ্তরে অগ্নি নির্বাপন তো অনেক করেছেন । আর এই জেলার দপ্তরেও শুধুমাত্র শব্দবানেই কেশোৎপাটন করেছেন । ওনার পরবর্তী দপ্তরবাসীদের জন্য আমরা আগাম শুভেচ্ছা জানাই । আর এই আনন্দঘন মুহূর্তে আমরা আজ সকলে মিলিত হই ব্যারন এ, আমাদের আনন্দপানের মুক্তিক্ষেত্রে ।
অতনু এই সময় একমনে চ্যাট করছিল হৈমন্তীর সাথে । হৈমন্তীর সাথে ওর সদ্য আলাপ হয়েছে সপ্তাহ খানেক আগে একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে । মেয়েটি শিক্ষিতা রুচিশীল সুন্দরী ও ডিভোর্সী । আবার পাত্র দেখাশোনা চলছে ওর । ওকে নিজের ব্যাপারে কিছুই লুকায়নি অতনু । নিজের বৈবাহিক ও পারিবারিক জীবনের একাকীত্ব রোজ ওকে কুরে কুরে খুবলে খায় । নিজের সবকিছুই ও বিশদে বলেছে হৈমন্তীকে । আর আলাপচারিতাও বেশ জমে উঠেছে মিটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে । ওরও বেশ ভালো লাগছে এই ভার্চুয়াল আবেগ ও সান্নিধ্য । আজ ওর বিকেল থেকেই খুব মদ খেতে ইচ্ছে করছে । তার উপর সতীর্থ বন্ধু ও দাদাদের এমন উদাত্ত আহ্বান মোটেই ফেলে দেওয়ার নয় । আর সেটা ও হৈমন্তীকে জানান দেওয়ার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ভেসে এসেছে কড়া ও ঝাঁঝালো সাবধানবাণী,
- না, একদম না । আপনি একদম খাবেন না । আমার দিব্যি রইলো । আর যদি আপনি খান, তবে আমার কিন্তু দারুণ ক্ষতি হবে ।
একটু অবাকই হয়েছিল অতনু । মেয়েটা বলে কী ! এই তো সবে আলাপ ! তার ভিতরেই এত জোর কি করে পেলো ও ! আর কীই বা ক্ষতি হবে হৈমন্তীর যদি ও মদ খায় ! আচ্ছা অদ্ভুত আবেগ তো মেয়েটার ! তবে কী হৈমন্তী ওকে পছন্দ করতে শুরু করেছে ? আর অতনুর দিক থেকেও ইতিমধ্যে একটা দুর্বলতার জায়গা তৈরী হয়ে গেছে মনের ভিতরে । মনের ভিতর ওর মোটামুটি ভাবে প্রস্তুত । হৈমন্তীকে ও মোটেই হারাতে চায়না কোনোও মূল্যে । আর মিথ্যাচারিতাও ওর ধাতে সয়না । তাই মনে মনে ঠিক করল আর ও মদ খাবে না কোনোভাবেই । ইতিমধ্যে চ্যাট বক্সে ফুটে উঠেছে হৈমন্তীর রাগ মনখারাপ আর অভিমান । এমনঅবস্থায় কেমন করে ও মিথ্যাচার করে হঠাৎই সন্দীপনের গলা, - কী রে ভাই, চল্ । মিটিং তো শেষ । আর ইটিংও । এখানে বসে থেকে করবি টা কি তুই । চল্ ব্যারন ঘুরে আসি ।
- না রে ভাই, আজ ছাড় । ভালো লাগছে না । আজ যাবো না । তোরা চরে আয় । চুটিয়ে মৌজ করে আয় । আমি ঘরে যাচ্ছি ।
বেরিয়ে টো ।টো তে চেপে বসলো অতনু । মোহের ঘোরে সে আজ তার বিশেষ কাউকে কথা দিয়ে ফেলেছে । আর সেই কথা তাকে যে রাখতেই হবে যে কোনও মূল্যে । নয়তো, কিসের এই সম্পর্ক । হৈমন্তীকে জিজ্ঞাসাও করছিল ও । উত্তরে ওদিক থেকে ওর স্ক্রিনে ফুটে উঠেছিল দুটো ছোট্ট শব্দ, - সবটাই মোহ ।

*************

সিকস্তি - রাজেন্দ্র
---------------------
("এ যুগের আরশি" তে প্রকাশিত )

সকাল থেকেই একটানা বৃষ্টি পড়ে চলেছে । কাপড়চোপড় সব দরমার ঘরের ভিতরেই কোনওভাবে মেলে রেখেছে রানি । রোদ না ওঠা অবদি মাথার উপর টালির চালে জামা কাপড় মেলবারও কোনও উপায় নেই । আর মুন্নিটাও একটানা কেঁদেই চলেছে । সাবুটা সেই কখন সাতসকালে বেরিয়েছে নতুন মাস্টারের বাড়ি, এখনো হতভাগার ফেরার কোনও নামগন্ধ নেই । সাবুকে ইস্কুলে পাঠাতে হবে । তারপর রানিকে আবার গিয়ে হাজিরা দিতে হবে ব্লকের সেটেলমেন্ট অফিসে । আজ তার একটা জমির কেসের শুনানী আছে । এদিকে রাস্তার যা অবস্থা, চারদিকে শুধু থইথই করছে জল । ওদের বাড়িটা গঙ্গার পাড় ঘেঁষে, পশ্চিম নারায়ণপুর এলাকায় । এবার তো খুব একটা বৃষ্টিও হয়নি ওদের এখানে । হঠাৎ করে আজ ভোররাত থেকেই আকাশটা কালো । বৃষ্টি যে খুব জোরে পড়ছে, তাও নয় । তবুও চারদিকে এমন বানভাসি কেন যে হলো, ভগবানই জানে । মনে হচ্ছে বাঁধের জল ছাড়ছে কাল রাত থেকে । তাই ওদের এই অবস্থা । বৃষ্টি ধরবার কোনও নামগন্ধও নেই । কোনওরকমে প্লাস্টিক বোতলে তুলে রাখা জলে মুড়ি ভিজিয়ে মুন্নির পেটের চুল্লীতে জল ঢেলে দেয় রানি । গতরাতের বাসি ভাতে জল ঢালাই ছিল । তাতে এক চিমটে নুন মিশিয়ে দিয়ে এক টুকরো লেবু আর দুটো কাঁচালঙ্কা সাবুর জন্যে তুলে রাখে রানি । নিজেও ওর থেকে খানিকটা উদরস্থ করে ফেলে । ওর জমির সব কাগজপত্র আর দলিল খুবই নাকি প্রয়োজনীয়, একথা তাকে জানিয়েছিল ভোলা মুহুরী । আর সেটা রানি নিজেও বেশ ভালোই বোঝে । জমিটা কিনেছিল ওর শ্বশুরমশাই । কিন্তু জমিটা শ্বশুরের নামে রেকর্ড করা নেই । ওর বিয়ে হয়ে আসার পর পরেই শ্বশুরটা মরে গেল । এরপর গেল ওর মরদ । ফলে এখন জমিটা আর রেকর্ড না করালেই নয় । কে জানে, কোনদিন কে এসে হঠাৎ করে উৎখাত করে দেয় ওদের । আর ওর যা অবস্থা, তাতে কোনও মুহুরীর খরচও দিতে পারবে না । তবে ভোলা মুহুরী ওর উপর একটু বেশীমাত্রায় দয়াপরবশ । আর তার কারণটাও রানি বেশ ভালোই বোঝে । লোকে বলে অভাবে নাকি স্বভাব নষ্ট হয় । কিন্তু কই, তাকে তো রানি এখনো অবদি তেমন কোনও প্রশ্রয় দেয়নি । ভোলা পাশের গ্রামে থাকে । বেশিরভাগ সময়েই হাতে করে কিছু না কিছু নিয়ে আসে রানির জন্যে, ওর ছেলেমেয়ের জন্যে । এটা সেটা টুকটাক আনতে রানিও ওকে বাধা দেয়নি কখনো । ভোলা ওর চেয়ে হয়তো সামান্যই বড়ো হবে । বিয়ে থাও করেনি এখনো পাগলটা । তবে রানির সাথে কখনোই জোর জবরদস্তি কিছু করেনি ও । মনে হয় ওকে নিয়ে রানিকে এবার একটু ভাবতে হবে । তার আগে ওদের জমিটার একটা গতি করা খুবই দরকার । মুন্নির বাপকে ও অনেকবার বলেছিল জমিটা নিয়ে একটু ভাবনাচিন্তা করতে । ওর মরদ ছাক্কু মহালদার পেশায় জেলে ছিলো । মাছ মেরে দিন গুজরান হতো ওদের । ছাক্কুটা তিন দিনের জ্বরে সোজা উপরওয়ালার কাছে চলে গেল । ব্লক হাসপাতালের ডাক্তার তো কিচ্ছু করতে পারলো না । আর ওদের তো তেমন কিছু টাকা পয়সাও নেই, যা দিয়ে মালদা শহরে নিয়ে গিয়ে একটু ভালো চিকিৎসা করানো যায় । টাকাও যেমন ছিলোনা তেমনই ছিলোনা চিকিৎসার জন্যে যথেষ্ট সময়ও ।

- "মা, এসে গেছি । জলদি কিছু খেতে দেবা আমারে । খুব খিদা পেয়েছে গো"।

রানির হুঁশ ফিরে আসে । চটজলদি সাবুকে গতরাতের জল ঢালা নুনলঙ্কা ভাত তুলে দিতে দিতে বলে, - "বেটা, আজ আর তোকে ইস্কুলে যেতে হবেনি রে । চারদিকে কত জল দেখেছিস । কেমন সমুদ্রের মত ঢেউ খেলছে উঠান জুড়ে ইধারে উধারে । তার চেয়ে বরং পারলে কিছু চুনো মাছ তুলে আনিস । রাতে না হয় মাছের টক খাওয়া যাবে"।

সাবুর দারুণ খিদে পাচ্ছিল । কোনও কথা না বলে একমনে হুড়মুড়িয়ে ভাত খাচ্ছিল সে গোগ্রাসে । জলঢালা নুন লেবু লঙ্কা মাখা মোটা চালের ভাতগুলো এই মুহুর্তে তার কাছে ঠিক যেন অমৃতের মতোই লাগছে । সারাদিন রাতে মাত্র বার দুই খেতে পায় ওরা । কখনো সখনো একবেলাও কোনওমতে খেয়ে পড়ে বাঁচতে হয় । খাওয়া বলতে নদীর মাছ, ভাত, মড়ি আর শাচপাতা । জমিজমাও ওদের তেমন কিছুই নেই । থাকার মধ্যে শুধুমাত্র এই ভিটেখানা । ও নিশ্টিত বিশ্বাস করে, এই যন্ত্রণাটা তার আর কিছু বছরের । যদি কষ্টেসৃষ্টে ওর লেখাপড়ার গতি করে নিতে পারে, তবে ও একদিন সরকারী আধিকারিক হবেই হবে । ওর নিজের এলাকার মানুষের দেখভাল করবে । সুন্দর করে সাজাবে ওর জন্মভিটা ও চারপাশ । এখানে যতগুলো বিডিও এসেছে, সবকটা চোর আর অকর্মার ধাড়ি । শুধুই কন্ট্রাকটারের সাথে ওঠাবসা ওদের । আর ওদের কাজকর্মের সবটাই ভোটভিত্তিক । এখানে সাবুরাই সংখ্যালঘু । তাই ওদের নিয়ে উন্নয়নেরও কোনও মাথাব্যাথা নেই কোনও রাজনৈতিক দলের । সবাই হিসেব কষে লাভ লোকসান বুঝে উন্নয়নের রাজনীতি করে । এসব ভাবতে ভাবতেই খাওয়া সেরে ফেলে সাবু । রানি ততক্ষণে ট্রাঙ্ক খুলে জমির কাগজপত্র সব বের করছে । কাঁচা বয়সেই বিয়ে হয়ে গেছিল ওর । তখন ওর সবেমাত্র বারো কি তেরো । স্কুলের আঙিনাতেও পা রেখেছিল । তখন ওর ক্লাস সিক্স । বাংলাটা ভালোই পড়তে পারে ও । ইংরাজীতে নিজের নাম ও টুকটাক শব্দ বা বাক্যও গঠন করতে পারে । কিন্তু অভাবী মা বাবা । অনেকগুলো বোন ছিল ওরা ।তাই বিয়ে না করেও কোনও উপায় ছিলো না রানির । ওর মা অনেক কান্নাকাটি করেছিল বিয়ের আপত্তি এনে । কিন্তু টেকেনি সেই বাধা । খড়কুটোর মত সব উড়ে গেছিলো অভাবী পেটের তাড়নায় । বিয়ের পাঁচ বছরের ভিতর চার চারটে বাচ্চা হয়ে গেলো ওর । সাবু ওর মরদের প্রথম পক্ষের ছেলে । জন্মের সময় থেকেই ছেলেটা মা হারা । রানিকেই ও মা বলে জানে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে । আর ওর নিজের সবকটাই তো মেয়ে । ছেলে হয়নি একটাও । ওর মরদ ছাক্কুর শরীরে ওর জন্যে কোনও দয়ামায়াই ছিলো না । মেয়েগুলো সবকটা প্রায় না খেতে পেয়েই মরে গেল । বেঁচে গেল শুধু শেষ জন, মুন্নি । এই ছেলমেয়ে দুটোকে ভালো করে লেখাপড়া করাতে চায় রানি । এসব ভাবতে ভাবতেই কাগজগুলো গুছিয়ে একটা প্লাস্টিক প্যাকেটে ভরে নিল ও । বাইরে থেকে ডাক ভেসে এল ভোলার, - "আরে ওই রানি, জলদি জলদি কর । হাতে একটু সময় নে চল । ওখানে বিরাট লাইন পড়ে যাবে গো । হাজিরা যত আগেভাগে দিবি, তত চটজলদি ডাক আসবে তোর"। রানি আর দেরী না করে বের হয়ে পড়ে । যাওয়ার সময় সাবুকে বলে যায় মুন্নির দেখভাল করতে ।

জল ইতিমধ্যে অনেকটাই বেড়ে উঠেছে । ওদের উঠানের মাটির পাঁচিলটাও পড়ি কি মরি অবস্থায় কাত হয়ে আছে । ছোট্ট টিনের ডোঙায় চেপে বসল ওরা দুজন । ছোট আকারের জন্য একজন বসলেই ভালো । কিন্তু রানির যে উপায়ও নেই । ডোঙা একটাই । আর সেটা ঐ পাগলা ভোলার । ওই বাঁশের লগি দিয়ে ঠেলা মেরে মেরে এগিয়ে নিয়ে চলছে ডোঙা । রানির সাথে ভোলার ছোঁয়া লেগে যাচ্ছে । দুজনেই চাপাচাপি করে বসা । দাঁড়ানোর কোনও সুযোগ নেই । কারণ দাঁড়ালেই উল্টে যাবে ডোঙা । অথচ ওর মন এখনো পড়ে আছে ঐ ঘরের চৌকাঠে । জলটা যে এখন কতদূর উঠলো ! আতঙ্কে বুক ধড়ফড় করে ওঠে রানির । ক্রমশ: ডোঙাটা বাজারে এসে ভেড়ে । এখানে এক হাঁটুর চেয়েও একটু বেশী জল জমে আছে । আরও খানিকটা যাওয়ার পর ওরা দুজন নেমে পড়ে । এখান থেকে এবার পায়ে চলা পথে যেতে হবে ওদের ।

- "আর কতটা দূর যাব রে ভোলা"?

- "এই তো । এসেই গেছি প্রায়, আর মিনিক পাঁচেক চলতে হবে রে"।

দেখতে দেখতে ওরা পৌঁছে গেল সেটেলমেন্ট অফিসে । ধবধবে সাদা রঙের দোতলা বাড়ি । একতলায় হাজিরা দিল ওরা । সাহেব নাকি অফিসে এসেই আবার বেরিয়ে পড়েছেন । এখনও এসে পৌঁছান নি । ভোলা খোঁজ নিয়ে জানালো যে কোথায় নাকি উনি পাট্টা খারিজের কেসে সরেজমিন তদন্ত করতে গেছেন । ফিরে এসে সব কেসের হিয়ারিং নেবেন । রানির ছটফটানি আরও বেড়ে গেল । সাবু নিজেই ছোট ছেলে । বোনের খেয়াল রাখছে ও একা একা নিজের লেখাপড়া ছেড়ে । ওদিকে এখন হালচাল কেমন কে জানে ।

অপেক্ষায় টেনশনে দেওয়াল ঘড়ির কাঁটা দু'টো ছুঁয়ে গেল । সাহেব অফিসে ঢুকে গেলেন । এসেই টিফিন সেরে চা খেলেন । তারপর প্রথম জনের ডাক পড়লো । রানির নাম আছে সাত নম্বরে । এই সবে মাত্র প্রথম জন গেল । রানীর বুক ধড়ফড় করছে । গলা শুকিয়ে যাচ্ছে । একটু ঢোক গিলে সে ভোলাকে বললে, -"আর কত দেরী হবে রে ভোলা"। ভোলা একটু কঠিন হয়ে চোখ পাকিয়ে চাইলো রানির দিকে -"তার আমি কী জানি বল্ ? কার কতক্ষণের ব্যাপার সেটা তো তার কেসের জটিলতার উপর নির্ভর করবে । তুই এখন চুপচাপ বসে থাক্ তো বাপু । এত কম ধৈর্য্য নিয়ে এ দপ্তরে পা বাড়াতে নেই রে রানি । কার কপালে যে কত হয়রানি লেখা আছে, তা কি কারো মুখ দেখে বোঝার উপায় আছে বল্ ? এই দপ্তরে পা রাখা আর শনির দশা লাগা একই ব্যাপার । বুঝলি"? সময়ের কাঁটা থেমে নেই । প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ ভিতরে ডাক পড়লো রানির ।

পিওন এসে আওয়াজ দিয়ে গেল, -"রানি মহালদার"। আর কালবিলম্ব না করে দুরুদুরু বুকে অফিসারের ঘরে ঢুকলো রানি । সাথে ভোলা । সাহেব একবার রানির দিকে চাইলেন । আর একবার ভোলার দিকে ।

-"আপনি কি বাদী রানি মহালদার"?
-"জি হাঁ"
-"আর আপনি"? প্রশ্ন ধেয়ে গেল ভোলার দিকে ।
-"আজ্ঞে আমি ওর মুহুরী, সাহেব"।
এবার যেন সাহেব একটু বিরক্ত, -"তা হিয়ারিং এর সময় মুহুরী কেন"?

ভোলা জানত, সাহেব এই প্রশ্নই করবেন । সে তৈরী হয়েই এসেছিল, বলল -"সাহেব, ও তো লিখাপড়া তেমনি শিখে নাই । জমির ব্যাপারে কিছু জানার থাকলে আপনি আমাকেই জিজ্ঞাসা করেন সাহেব । এই কেসটা আমারই লিখা আছে"।

সাহেবের বেঞ্চ ক্লার্ক কাগজপত্র সব দেখে খুঁটিয়ে মেলাল । বলল, -"এই দাগ গুলো তো সব সিকস্তি হয়ে আছে । সিকস্তি জমি তো রাজ্য সরকারী সম্পত্তি । মানে ভেস্টেড । এই জমি কী করে রেকর্ড করাবে তুমি । এ জমি রেকর্ড হবে না । জমি যেমন আছে, তেমনি থাকবে"।

ভোলা সাহেবকে অনুরোধ করল । রানিও অনেক কাকুতি মিনতি করল । কিন্তু সাহেবের চিন্তা গলানো গেল না ।

সাহেব বললেন, -"আমার ডিলিং অ্যাসিস্টেন্ট ভুল তো কিছু বলেনি । ওটা আপনি আপনার দখলে রেখে দিন রানি দেবী । এখান থেকে রায়তের নামের রেকর্ড সংশোধন সম্ভব নয় । এ কাজ আমরা পারবো না । স্যরি । এই কেসের আবেদনটা আমি খারিজ করলাম"। অর্ডার শিটে কি যেন লিখতে লাগলেন সাহেব ।

নিরাশ হয়ে বের হয়ে এল রানি । এতটা পথ জল ঠেঙিয়ে এল ও । এতক্ষণ অপেক্ষা করে রইলো ওরা দুজন । আর শেষ পর্যন্ত কিনা ওর আবেদনটা বাতিল করে দিলেন সাহেব ! রানি সহজে কান্না কাটির মেয়ে নয় । তবুও এই অবস্থায় ওর চোখের কোণের এক প্রান্তে টলটল করতে লাগল আবেগের ধারা । শাড়ির আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুখ মুছতে মুছতে বের হয়ে আসছিল ও, এমন সময় অফিসের পিওন টা পিছন থেকে ডাক দিলো ।

-"আপনাকে ডাকছেন আমাদের সাহেবের অ্যাসিস্ট্যান্ট । একটু আসবেন"? একটু অবাক হলো রানি । ব্যাপার টা কী ? এই তো কেসখানা নাকচ হয়ে গেল ।

-"আবার কি দরকার আছে ওনার"?

-"সে আমি বলতে পারবো না, তবে মনে হচ্ছে আপনার কেসখানা নিয়ে কিছু বলতে চান দামোদরবাবু"।

রানি বুঝে নিল দামোদরবাবু বলতে ঐ সাহেবের অ্যাসিস্টেন্ট এর কথাই বলছে পিওনটা । মনে এক ঝলক আশার ফুলঝুরি চলকে উঠল ওর । দেখা যাক কি চায় ও । টাকা পয়সা চাইলে ও যে করে হোক, সেটা ধারকর্জ করে বন্দোবস্ত করতেই হবে ওকে । জমিটা যে করেই হোক, হতছাড়া করা চলবে না কোনওমতে । একবুক আশা বেঁধে লাফাতে লাফাতেও দামোদরবাবুর কাছে গেল ।

গোলগাল নাদুস নুদুস দামোদর তখনও সাহেবের সাথে বসে অবশিষ্ট কেসের হিয়ারিং গুলো নিচ্ছিল । রানি কে তার মোটা ফ্রেমের চশমার ওপর দিয়ে আড়চোখের ইশারায় বাইরে অপেক্ষা করতে বলল সে । প্রায় পৌনে পাঁচটা অবদি সাহেবের সঙ্গ দিয়ে এবার নিজের টেবিলে গেল ও । বাইরের বেঞ্চে বসে থাকা রানিকে কাছে ডাকল । চা খেতে বলল । রানির তখন ঘরে ফেরার জন্য মন ছটফট করছে খাঁচায় বন্দী পাখির মতো । চা খাওয়ার জন্য একটুও মেজাজ নেই তার ।

-"বলেন সার্, কেন ডাকলেন"?
-"ভাবছি সাহেবকে বলে কয়ে তোর কাজটা আমি করিয়ে দেব, তবে .."
-"কত দিতে হবে বলেন"?
-"ওরে, আমি কি টাকার কথা বলেছি নাকি"?
-"তবে"?
-"দেখ, আমি জানি তুই একলা মেয়েছেলে । অনেক অভাব অসুবিধা তোর । ঐ টুকু জমি পেলে তোর একটু সুরাহা হয়"..
-"সে তো হবেই । কিন্তু আপনিই তো প্রথমে বলে দিলেন, ঐ কাজ করবেন না"।
-"আরে পাগলী, সে তো সাহেবের সামনে বলেছি । সাহেব যখন অন্য কাজ করবেন, তখন আমি তোর কেসটা কম্পিউটারে ভরে টুক করে সাহেবের অ্যালাউ করা কেসের ভিতর মিশিয়ে দেব । স্যার টের পাবেন না । তোর কেসটা তামিল হয়ে তোর নামে খতিয়ান খুলে যাবে । তবে কাজটা খুবই রিস্কি । ধরা পড়লে আমার কপালে অনেক দুঃখ আছে । চাকরি নিয়েও টানাটানি হতে পারে আমার"।
-"আমি অতশত বুঝি না, কি দিয়ে কি ভালো হবে তা আপনিই দ্যাখেন । শুধু আমায় কত কী দিতে হবে বলেন ? আমি যেমন করেই হোক, ধারদেনা করে..."

কথাটা শেষ করতে পারলো না রানি । শেষ বিকেলের ফাঁকা অফিসঘরে ওর একটা হাত চেপে ধরল লোভী দামোদর । ব্যাস, সাথে সাথে বাঘিনীর মতো ক্ষেপে উঠল রানি । সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিলো সে জানোয়ারটার গালে । মুখের চিবানো পান এক থাপ্পড়ে বাইরে ছিটকে এল, সোজা পড়লো ওর সামনের টেবিলটায় ।

আর একটুও দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছিলো না সবার চোখে কাঁচা বয়সের বিধবা, রানি মহালদারের । চোখের জল শুকিয়ে গেছিল রাগে ।মাথাটা বেশ দপ্ দপ্ করতে লাগলো ওর । কোনওমতে নিজেকে সামলে নিয়ে, দামোদরকে হতভম্ভ করে, অফিসের বাইরে ওর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ভোলার সাথে বাজারের দিকের পথ ধরল ও । বাজারের একপ্রান্তে এসে আবার ডোঙায় চড়ে বসল ওরা । এবার ও নিজের হাতে তুলে নিল বাঁশের লগিখানা । ভোলা কোনওরকম নিষেধ করলো না । কারণ ও জানে এখন রানি কারো কোনও কথাই শুনবে না ।

আরও কিছুটা সময় কেটে গেল চুপচাপ । কানে শুধু বাজছে লগি ঠেলার শব্দ । ভোলা চুপচাপ মাথা নীচু করে বসেছিল । দূরের আকাশটা এখন টকটকে লাল আপেলের মত রঙ ধরেছে । একফোঁটা মেঘের চিহ্ণমাত্র নেই কোথাও । অনেকটাই চলে এসেছে ওরা । চারদিকে শুধু ঢেউ আর ঢেউ । কোথাও কোনও ডাঙার হদিস নেই । মাথার উপর দিয়ে এক ঝাঁক সাদা বক উড়ে গেল ।

হঠাৎ ও শুনলো জলের উপর সজোরে কিছু একটা লাফিয়ে পড়বার শব্দ । মুখ তুলে চাইলো ভোলা । দেখল রানি জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আর আঁতিপাতি করে খুঁজছে ওর ভিটাবাড়ি । বন্যার জল বাড়তে বাড়তে ওর ঘরের দেওয়াল সহ পুরো বাড়িটাকেই নদীর পেটে ভরে ফেলছে । রানি পাগলীর মত চারপাশের ঘোলাটে জল দাপিয়ে কিছু যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে ।

চোখেমুখে তার একটাই কথা, একটানা আপনমনে সে বিড়বিড় করে চলেছে -"সব ভেস্ট হয়ে গেল, আমার ঘরদোর সন্তান.. সব নদীর কোলে সিকস্তি হয়ে গেল"।

("এ যুগের আরশি" তে প্রকাশিত )

*****************

স্বর্গ ( আত্মকথা ) / প্রকাশিত

/এক/

আকাশটা বেশ কালো করে এসেছে । ঘন সরের মতো জমাটি ঠান্ডা একটা বাতাস বয়ে গেল গা বেয়ে । আধবোজা ঢুলুঢুলু চোখে মুখ তুলে চাইলাম চালাঘরের দরমার ফাঁক দিয়ে । দূরে কোথাও বৃষ্টি পড়ছে হয়তো । বেলা বারোটা বেজে গেছে সেই কখন । দুই চোখের পাতা লেগে এসেছিলো নিজেরই অজান্তে, ক্লান্তির অনভ্যাসে । মেঘের কড়কড়ানিতে আমেজটা একেবারেই চটকে গেলো এবার । নাহ্, আর বসে থাকা ঠিক হবে না । তিনদিন ধরে শরীরে কোনও সাড় পাচ্ছিনা । কিছু খেতেও পারছিনা । তাও এখন ছুটতে হবে কালিন্দীর পাড়ে সজিনাহাটের চরে । ওখানে হাড় বজ্জাত অমানুষ কালুধোপা এখন কাপড়ের গাঁঠ তৈরী করে সাজিয়ে রাখছে আমার আসার অপেক্ষায় । দেরি হলে তো মার খাবই আর খাওয়াও বন্ধ । কারণ ওই আমার সবেধন নীলমণি একমাত্র মনিব ।

/দুই/

আমার কিন্তু কাজে মন নেই একটুও । আর কি করেই বা থাকা সম্ভব ! ওই বেআক্কেল বুদ্ধুটার তো কোনও হদিসই নেই । কতগুলো দিন হয়ে গেল । কোথায় যেন উবে গেল হতভাগা গাধাটা । ও থাকলে সব কাজ যেন নিমেষে হয়ে যেত । কি যে ম্যাজিক জানতো ব্যাটা ! যে কোনও বোঝা, তা সে যতই ভারী হোক্ না কেন; তাকে অবলীলায় নিজের পিঠে চাপিয়ে মাইলের পর মাইল সে ছুটে চলে যেতে পারত পঙ্খীরাজের মতো । আর এখন কোনও কাজেই তিলমাত্র মন লাগছেনা আমার । তাই ফাঁক পেলেই এখন চরে চরে বনে বাদাড়ে ঘুরে ফিরছি । কাশের বন, বাংলা ভাটা, কলাই-পাট-শশার ক্ষেত, ভগবানদাসের আমবাগান টপকে এলাকার ইঞ্চি ইঞ্চিতে ঐ গাধাটার গায়ের সুবাস খুঁজে ফিরছি ।

/তিন/

আদতে আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই একটা আস্ত নিরেট গাধি । নাহ্, গালি নয় । সত্যিই জন্মসূত্রে আমি একটি গাধি বিশেষ । জন্মের দিন কয়েক পরেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিলাম কালুধোপার কাছে । কালু আমাকে নগদ পাঁচ হাজারে নিয়েছিল । অত ছোটবেলার কথা খুব বেশি মনে নেই । শুধু চোখে আটকেছিল মায়ের ভেজা চোখের তাকিয়ে থাকার করুণ দৃশ্য । আর সেদিনও ছিল শ্রাবণের ভরা বাদল । রাতভর বৃষ্টিতে ভেসে গেছিল সারা কালিন্দী । কোথাও কোথাও জেগে থাকা চরগুলো ছিল সেই কেনাবেচার একমাত্র সাক্ষী । মায়ের ভেজা চোখ, ভাইবোনদের অবাক ভাব আর খৈনিটেপা মিশকালো কালুধোপার একমুখ হাসি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছিল সেই মেঘভাঙা রাতে ।

/চার/

এখানে আসা অবধি আজ পর্যন্ত কালুধোপা আর ওর দ্বিতীয় পক্ষ আমাকে বিশ্রাম দেয়নি একটা দিনও । মাল টানা আর গাল খাওয়া; কখনো সখনো মার - এই হলো জীবন । তবে এতকিছুর পরেও মনে শান্তি ছিল মনে । কারণ একটা বন্ধু ছিল আমার; প্রকৃত সমব্যথী । আমার হতভাগা বুদ্ধুরাম । গাধা হলেও নির্বোধ ছিল না সে । কালুধোপা ওকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসত । ওই ছিল আমার একমাত্র খেলার সাথী । মার খেয়ে মন খারাপ হলেই ও ছুটে আসত আমার এই চালাঘরে । এসেই নাক মাথা ঘষত গায়ে । পায়ের খুর মাটিতেে ঘষে নিজের অস্তিত্ব জানান দিত । বোঝাত; ও পাশেই আছে । আমি জানতাম ঐ বুদ্ধুটাও আমার মতোই আশ্রিত । আমিও অপেক্ষায় গুনতাম প্রহর । আর এখন আমি সময় গুনতেও যেন ভুলে গেছি । এখন আর আমি কারও অপেক্ষায় কান খাড়া করে থাকিনা । লেজও প্রয়োজন ছাড়া নাড়াই না । আমি জানি, সবকিছু আমার আয়ত্তে নেই । আর উপরওয়ালাও সবার সব প্রার্থনা মিনতি কানে তোলেন না । তাই কারো দয়া করুণার পাত্রী হতে চাইনা আমি ।

/পাঁচ/

জানিস বুদ্ধু, তোকে খুব্ মনে পড়ছে আমার । জানিনা কেউ বা কারা তোকে কিনে নিয়ে গেলো কিনা । জানিনা তোকে হাইওয়ের উপর কোনও গাড়ি পিষে দিলো কিনা । জানিনা তুই কোথায় হারিয়ে গেলি আমায় ফেলে রেখে । তোর কি একটুও মনে পড়েনা রে এই হতচ্ছাড়ি গাধি টার কথা ! তোর কি মনে পড়েনা সজিনার চরে একসাথে নরম রসালো বুনোঘাসের ফাঁকে আমাদের লুকোচুরি খেলা, শরতের বিকেলে মেঘলা হাওয়ায় কাশবনে ছুটে ছুটে বেড়ানো ! কাপড়ের গাঁটের ভার বয়ে চলা হয়তো সহজ কিন্তু জীবনের ভার ! অবহেলার ভার ? এই মালবাহী জীবনের ভার আর টানতে ভালো লাগছে না আমার । এবার আমিও তোর পথেই চলবো । অনির্দিষ্ট অজানার পথে অনিশ্চিত দিগন্তে পা বাড়াবো । হয়তো বা কোনও এক মাহেন্দ্রক্ষণে দেখা পাবো তোর বা তোর ছায়া এসে মিলিত হবে একদিন আমার দেহাতীত অনুভূতির সাথে । জানিনা, সেই মুহূর্তে আমার ইন্দ্রিয়গুলো তোকে চিনতে পারবে কিনা । কারন বয়স আমার থেমে নেই । অনুভব ও অনুভূতিরা ধুয়ে মুছে এখন সব কালিন্দীর জলে ভেসে গেছে । তারা এখন হয়তো বা মিশে গেছে আমার মা ভাইবোনের চোখের জলের সাথে একই দিকচক্রবালে মেঘের আড়ালে । হয়তো তারা এখন রামধনু সেজে ফুটে উঠেছে তোর মনে, তোর জগতে অপর কোনও গাধির মুখের ঘাসের আগায় ।

/ছয়/

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ধীরপায়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন কালুর কাছে গিয়ে হাজিরা দিলাম, নিজেকে মনে হচ্ছিল যেন ঠিক কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামী । দেরী করার অপরাধে বিস্তর কুকথা ও গালমন্দ খেতে হল । আর পিঠেও বেশ কয়েক ঘা জুটল । আমি তো পেটেও খাইনি । দিন কয়েক না খাওয়ার জন্য দুর্বল শরীরে মার সহ্য হলো না । মাথা ঘুরে বসেই পড়লাম । কিন্তু সেটা কালুর পক্ষে অসহনীয় ছিল । অনেক গুলো কাজ নিয়ে ওর দিনভর ব্যস্ততা । এটাও ঐ কাজেরই একটা অংশ । অতএব ও টেনে তুলল আমায় । চাপিয়ে দিলো ইয়া মস্ত একটা কাপড়ের বোঝা । আমার পা গুলো থরথর করে কাঁপছিল । দুর্বলতার আতিশয্যে আবার ধরিত্রী গ্রহণ করলাম । আবার ঘা কয়েক পড়লে না উঠে পারলাম না । উপায়হীন অবলার কে আছে আর এই দুনিয়ায় !

/সাত/

আকাশ জুড়ে মেঘেরা একজোট হয়েছে আজ । সবার মুখেই কমবেশি বাঁকা ভ্রুকুটি । ঠিক এমনই এক মেঘলা দিনে শেষবারের মতো দেখেছিলাম আমার বুদ্ধুকে । গুমোট আকাশ । ঝড় আসন্ন প্রায় । অথচ এক ফোঁটা হাওয়া বইছে না । আমার পা টলছে । ফেনা উঠছে মুখ দিয়ে । দুর্বল শরীর আর পিঠের দুর্বিষহ ভার আবার ফেলে দিলো আমায় । এবার একেবারে মুখ থুবড়ে রাস্তায় । আর সাথে সাথে চারপাশ জুড়ে নামল জমাট অন্ধকার । ছুটে আসছিল মালবোঝাই একটা বড়সড়ো ট্রাক । ড্রাইভার হয়তো শেষ চেষ্টা করেছিলো । কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না । ওর ডানদিকের সামনের একটা চাকা উঠে এলো আমার উপর । আহ্ .... অবশেষে কি মুক্তি এলো তবে !

/আট/

চোখ মেলে চাইলাম । দেখি হতভাগা বুদ্ধু তাকিয়ে রয়েছে । মিটিমিটি হাসছে । আমি খুব সহজেই উঠে দাঁড়ালাম । আর কোনও ক্লান্তিবোধ নেই, নেই কোনও যন্ত্রণা ও । সব যেন কোথায় উবে গেছে । আকাশ টা নীল । চারপাশে কচি ঘাস । সবুজ রঙে রঙিন গোটা এলাকা । চারপাশে কোনও ঘর নেই । নেই কালুধোপার মতো অমানুষ । পাশ দিয়ে বইছে নাম না জানা নদী । কাঁচের মতোন টলটলে জলে আকাশের ছায়া পড়েছে । এ আমি কোথায় এলাম রে বুদ্ধু ! বুদ্ধু এগিয়ে এলো । আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো । ওর চোখের উজ্জ্বল মণিতে ভেসে উঠলো একটা ছোট্ট শব্দ - 'স্বর্গ'

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি