কিছুদিনের না বলা কিছু কথা
কাব্যগ্রন্থ ~ ফেসবুক ডট কম
ভূমিকা:-
"আজকাল
সবকিছুই গুগলড্ হয়
শুধু
নিজেকেই
নিজের জন্যে
খুঁজে ফিরতে হয়"
পাখির ছবি তোলা যেমন খুবই মুশকিল, তেমনই কবিতার শব্দও । হাতে একটু ফাঁকা সময় থাকলেই যে ধরা দেবে ওরা একে একে, এমনটা নয় । শীতের দিনে ভোর বেলায়, রোদের আলতো ছোঁয়ায়, কুয়াশার ক্রিম মেখে, গরম কফির পেয়ালার চুমুকের সঙ্গে, একদিন কবিত্বর পাকোড়া করে সোয়াদ নেবো, এমনটাই ভাবি রোজ রোজ সকালে, না -ইচ্ছের ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই । কিন্তু, অবকাশ নেই । দৌড় দেই রোজ অফিস নামক সেই পরম তত্ত্বের অফিসার গিরিতে ! টুকিটাকি খাবো নাকি কবিতা, এখন যদি সে আমার স্নানঘরে এসে উঁকি দেয় ? দিতেই পারে, বলা তো যায় না কিছুই আর আজকাল, আগে ভাগে । তালগাছের ওপর হাঁড়ি চাপিয়েছি, কল্পনার চাল ফুটবেই ফুটবে । গরম গরম আতপের সুবাস মেশানো ভাতও হবে । অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আমিত্ব, আমাকে কতটুকু আলোকিত করে, তা জানিনা ঠিকই, তবে কুরে কুরে খেতে দেখি স্বরচিত সীমানাকে, একটু একটু করে, ক্ষয়ে যেতে যেতে, আপতিত আলোর কয়েক যোজন আলোকবর্ষ পিছনে, লুকিয়ে থাকা ছায়াময় অন্ধকারের গভীরে । তাই আরো একবার জিয়নকাঠির খোঁজে মরণের সাথে আমরণ সখ্যতায়, পিঁপড়ে বসা হলুদ ঘাসের উপর শিশিরের জমাট বাঁধায়, ডোবা থেকে কাঠামো তুলে খড় মাটি মাখা ঠাকুরের ঘ্রাণে রঙের প্রলেপ দেওয়ায়, মুখের উপরে এসে আছড়িয়ে পড়া ভোরের প্রথম আর সূর্যাস্তের শেষ আলোয়, ভালোবাসা পরমাণুকণার শেষ বিন্দুটুকুও কুয়াশা ভেজা অন্তর্বাসের ওম শুষে নেওয়ায়, ফেলে যাওয়া মৌচাক খোপের কিছুই আর যায় আসে না । তবুও এদের তুলনায়, কম্বল জড়িয়ে, ফুটপাতের ভিখিরীর পাশে, রাতভর কুঁকড়ে কুন্ডলী পাকিয়ে থাকা, কুকুর ছানার মতো অসহায় শীতকাতুরে জীবনে একফোঁটা রোদ্দুর কণাই বিলাসিতা হয়ে যায় । অঙ্কুরিত হয় চন্দন সুবাস নেশাতুর ঘাসের দানায়, ফুটে ওঠে স্বেদবিন্দুরা ছোলার বৃন্তে; নাভিমূলে, ভগাঙ্কুর ভোগবতী হলে । তাও সবকিছুর মাথা চিবিয়ে, ছিবড়ে হয়ে যাওয়া ফুসফুসের দেহ বেয়ে, ছড়িয়ে গজিয়ে ওঠা বাষ্পের অভিমুখে, লজ্জাহীন ভাবে বলি - "ভালো লাগে" । যদিও এই ভালোলাগাটা আর পাঁচটা ভালো লাগার থেকেও অনেক বেশী । এই ভালোবাসাটুকু নামমাত্রই । কামনা বাসনাহীন নয় একেবারেই । ধূপ আর ফুলের গন্ধকে ভালোবাসার মতোনই এই ভালোবাসার আবেশ । প্রজাপতি আর পাখির রঙিন ডানা ঝাপটানো দেখে আনন্দ পাওয়ার মতোন আমার এই ভালোবাসার জারণ বিজারণ । এই ভালোবাসাকে কখনো কখনো ঠিক নলেন গুড়ের মতো ঋতুকালীন বলে ভ্রম হয় । কুয়াশামাখা শীতের সকালে কম্বল জড়িয়ে খেজুর রসের স্বাদ নেওয়ার মতো । শরতের হাওয়ায় দুলতে থাকা কাশফুলের মতো । পুজোর প্যান্ডেলে বা নদীর পাড়ে শেষবারের মতো বাজতে থাকা বিসর্জনের ঢাকের বাজনার মতো । এই ভালোলাগা গুলো উদ্দাম, উন্নাসিক, বল্গাহীন । সীমানাবোধ হীন । কাঁটাতারকে উপেক্ষা করার মতো মনোবল, সাহস আর শক্তি ধরে এই ভালোবাসা । যাক । আমার সব কিছু চলে যাক । শুধুমাত্র রাঙা মেঠো ইঁটভাঙ্গা পথের উপর, দুইপাশ দিয়ে নুইয়ে পড়া বাঁশঝাড়ের পাতার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়া চাঁদের মায়াবী আলোর বিন্দুর ভিতর, জমাট বেঁধে থাকা আমার এই ভালোবাসার কণাটুকু, একান্তভাবেই আমার ভিতরে থাক ।
তাই শৈশবের জন্মলগ্ন থেকেই যদি কবিতা লেখার চেষ্টার সূত্রপাত হয়েছে বলে ধরতে হয়, তাহলে আমার লেখা প্রথম কবিতাখানা, এখনও ঠাকুরদাদার তৈরী পুরানো বাড়ির ছাদের ঘরের, রংচটা প্রায় ভেঙে পড়া চিলেকোঠার, ধুলো আর ঝুল কালি মাখা স্তূপের কোণায়, দমবন্ধ অবস্থায়, চেপে ঠাসা রয়েছে ... আর আমার লেখা দ্বিতীয় কবিতাখানাও, ইস্কুলের বারান্দায়, অবহেলায় ফেলে রাখা পুরানো ভাঙা বেঞ্চের তলায়, না কুড়িয়ে পাওয়া একমুঠো কাগজের দলার ভিতরে, অনেক বছর ধরে প্রকাশিত হওয়ার জন্যে উসখুস করছে ... আমার লেখা তৃতীয় কবিতাখানা এখনও জমাট বেঁধে রয়েছে আমার জ্যাঠাইমার বিবর্ণ সিঁথি জুড়ে ... আমিও এখন কখনো কখনো, আমার বাদ বাকি কবিতা লেখক বন্ধুদের মতোই, আমার সমস্ত লেখা এক জায়গায় জড়ো করে, আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের চ্যাটবক্স স্মাইলিদের সাথে, অক্ষর বুনে বুনে জুড়ে দিতে চাই ... যেমন করে কবি বন্ধুদের ফেসবুক আর ব্লগজিনে কবিতা আপলোডের সাথে সাথেই, ওদের নির্মিত শব্দসম্ভার লাফিয়ে লাফিয়ে আদায় করে নেয় জনমত, তেমন করে হয়ত আমিও সব সময় সেটা করে উঠতে পারি না ... কিন্তু দিনে বা রাতে যখন আমিও একলা আর নীরব হয়ে কিছুটা সময় নিজের সাথে নিজে থাকতে চাই, তখন আমার হয়ে আমার শব্দেরাই কথা বলতে চায় অক্ষরের আঁচড়ে ।
রাজ্য সরকারের ভূমি রাজস্ব দপ্তরের কোনো আমলা যদি প্রতিদিন নিয়ম করে বাড়ি থেকে অফিসের পথে যাতায়াতে, প্রায় সাত ঘণ্টার মতো সময় খরচ করে দেন, এবং বাদবাকি গোটা দিন ধরে – জল খাওয়া, টয়লেট করা আর টিফিন করবার সময় ভুলে, দিনের পর দিন ধরে ঘুরতে থাকা, হাজারখানা মানুষের হাজার রকমের জমির জট ছাড়াতে ছড়াতে, ক্রমশঃ নিজের সাথে নিজেই একান্তে ক্লান্ত অবসন্ন হতে থাকেন, তারপর অবশিষ্ট সময়, কেমন করে হাতে থাকে আর, কবিতাকে ভালোবাসার, কিছুটা বেঁচে থাকা সময় সাহিত্য সাধনায় দিয়ে, নিজের মন প্রাণ ভালোলাগা ভালোবাসাকে নিয়োজিত করবার ...
আর যেহেতু মানুষটা আমি বরাবরই, খানিকটা নিজের বৃত্তস্থ কক্ষপথে একটানা আবর্তিত এবং অনেকটাই প্রচারবিমুখ, নির্লিপ্ত গোছের চাকুরীজীবী ... তাই এমন কেইবা আছে এখন আর, যিনি নিজের লেখার প্রচার ছেড়ে, আমার হয়ে, আমার জন্যে, অযাচিত প্রচারের উপকার করবেন । আর আজকাল যখন সকলেই প্রায় কমবেশি ছোট বা বড় কবিতা গল্প প্রবন্ধ লেখক সাহিত্যিক, তখন আর কেউ কারো টাইমলাইনে যাওয়ার, অপরের লেখা পড়বার জন্যে সময় বের করবার, অবকাশ খুঁজে পান না । প্রায় সকলেই তাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন নিজ নিজ যশ প্রচারের এককেন্দ্রিকতার আবর্তে ।
এই নিয়মমাফিক রুটিন বাঁধা ইঁদুরদৌড়ের ক্যালেন্ডারে কি আর তাই অপরের অপেক্ষায় চুপ করে বসে থাকা চলে ? নিজের সন্তান পরিবার, অফিস প্রশাসনের টার্গেট কেন্দ্রিক পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক প্রভাবের সাঁড়াশি চাপ আর মানসিক যন্ত্রণা, যখন মনের সমস্ত রসটুকু নিংড়ে আকন্ঠ পান করেও ক্ষান্ত হয়না, যখন শুধুমাত্র আখের ছিবড়েটুকুর মতোই ফেলে রেখে দেয় আমার আমিত্বকে এই অধমের জন্যে অখণ্ড নীরবতার চোরকুঠুরিতে, তখন একমাত্র ইচ্ছে করে নিজেকে নিজের শব্দেই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে চারপাশের ধ্বংসের তাণ্ডবলীলায় চুপচাপ নীরব দর্শক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আর বাদবাকিদের মতোই হিসেবকষা সুবিধেবাদী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নাসারন্ধ্রমূলে তেল লাগিয়ে নিরাপদে রাতের বিছানায় একলা নিদ্রা যেতে ।
কিন্তু হৃদপিন্ডের ভেতরের এক কোণে, একটা ক্লান্তিহীন যন্ত্রণার মোচড় লাগে স্বতঃসিদ্ধ সংকোচন প্রসারণের উথ্বান পতনে । নিজের ইচ্ছেতে তাই, নিজেই লজ্জিত হয়ে, মুখ লুকিয়ে ফেলি বিবেকের ভাঙা আয়নায় । আর সেই চুরি করে নেওয়া সময়ের ফাঁক ফোঁকর দিয়েই গলন্ত ম্যাগমার মতো বের হয়ে আসে অক্ষর জট । শব্দছকের কারসাজিতে, চোখধাঁধানো আজগুবি জাগলারিতে, মোটা মোটা অভিধানের একে অন্যের সাথে কোলাকুলি আর কুস্তিতে, তারাও তাই অবসন্ন হয়ে পালিয়ে যেতে চায় আমাকে একলা ছেড়ে ।
কবিতার নানা গ্রুপে থেকেও আমি তাই কোথাও নেই এখনও পর্যন্ত কারো দলেই নেই, কারো সাথেই নেই । তবে নিজের সৃষ্টির প্রতি মায়াপরবশ আমিও আর বাদবাকিদের মতো । তাই চাই ওদেরও একটু আশ্রয় হোক । আমার মতো ওরাও যেন একলা আর নিঃসঙ্গ না হয় । ওরা যেন একটু আধটু হলেও, কারো না কারো ভালোলাগা ভালোবাসা পায় ।
সেই ছোট্টবেলায় ঠাকুরমার আঁচলের খুঁট আর আঙুল ধরে টানতে টানতে, কাকু জেঠু দাদুর কোলে পিঠে চড়ে, ইস্কুলের হাফপ্যান্টের সীমানা পার করতে করতে, পেনসিল ছেড়ে ফাউন্টেন পেনের নিবে আঁচড় টানতে টানতে, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে দুর্গাপুজোর অষ্টমীর রাতে ফ্লাইওভারের তলায় সিগারেটের ধোঁয়ায় সুখটান দিতে দিতে, একদিন নতুন নতুন রং চেপে বসে শব্দের ঘোরে ... যেই খাতার একটা কবিতাও কোথাও কখনো ছাপাই হয়নি অক্ষরের বুনোটে, ছেলেবেলার সেই কবিতা ডায়েরির পাতায়, শিরায় উপশিরায় ঝরে পড়া হলুদ খয়েরী পাতার, ছোপ পড়ে যায়, বিস্মৃত ভাবনার ... ছেলেবেলার সেই সব শব্দেরা ... "মাঠের পরে লাজুক ঘাসে, / দেখো শিশির কেমন হাসে" ... কিংবা "জ্বলে নেভে জোনাকির আলো, / অলৌকিক এক আলো, / নাহ, লাগছে না ভালো" ... এখন সুদূরের ধূসর পাণ্ডুলিপির উইপোকা কাটা ইতিহাস মাত্র ... নিবিড় বন্ধুত্ব তার ইস্কুল আর জেলা গ্রন্থাগারের গল্পের বইয়ের সঙ্গে আর টিফিনের জন্যে হাতে পাওয়া পয়সা, একটু একটু করে জমিয়ে গল্পের বই কেনার নেশায়, যেন বুকের খাঁচায় আটক হয়ে থাকা এক অদ্ভুত সুখস্মৃতি ... এখনো জমাট বেঁধে রয়েছে সেই সব অতীত দিনের কোলাজ, ফুসফুসের চারপাশে নিকোটিনের কালশিটে ছোপে, ঈশান কোণের দেওয়ালে ... চাকরির সুবাদে গ্রামবাংলার টানে চারপাশ ঘুরে ঘুরে ছবি তোলা, একটু আধটু অসময়ে আঁকা আর পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে তার অসংলগ্ন কবিতা যাপনের একটা উদাস বেপরোয়া চালচিত্র উঠে এসেছে কবিতার অক্ষরে অক্ষরে ... "স্বপ্ন ভাঙা টুকরো রোদ / পড়ছিল তুলো ঝরে" ... কিংবা ... "কম্বল ছেঁড়া ঘুম / নেড়িটার ওম লেপ্টে ছিল পায়ে / ঘড়ির কাঁটায় ভোর পাঁচটা" ... কিংবা ... "জন্ম নিয়েছে গর্ভব্যাথা থেকে / পাগলি বোঝেনি মা হয়েছে / পেয়েছে শুধু ব্যথাটা" ... এইসব শব্দেরা নিঃসঙ্গ ভাবনার একাকিত্বে একটানা সাহচর্য দিয়েছে ... এরা কতখানি সাহিত্য, কতখানি কবিতা, তা বিচার করবার দায়ভার এখন শুধুমাত্র পাঠকের উপর । এখন শুরু অপেক্ষার ... পাঠ প্রতিক্রিয়ার
© রাজেন্দ্র
এক
দ্বিখন্ডিত মনের মালিকানা
শুধু আমার নয় একার
কখনো কবিতার ঘোরে বাঁচা
কখনো বা সঙ্গ তোমার
দুই
জেগে থাকে
নিঃশ্বাসের ছায়াপথ মেপে
আরও এক বিশ্বাসের
রাতজাগা ভোর
বর্ণমালা ভেঙ্গে
নেমে আসে
দ্বিখন্ডিত ঘোর
তিন
ক্ষয়াটে চাঁদের বুকে
মুখের ঘাম মোছা
রুমালের ভাঁজে
উঠে আসে
চুমু খাওয়া
লিপস্টিক ঠোঁটের
আটকে থাকা দাগ
সাবানের
ভাঙতে থাকা
বুদবুদ ফেনায়
অনন্য নীরবতায়
ধুয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়
চার
ছায়ায় ছায়ায়
ছোঁয়াছুই করতে করতে
আলোর ঢেউয়ে
সাঁতার কাটতে কাটতে
এগিয়ে চলা
পিচ আচ্ছাদিত পথে
একটু একটু করে
নিজেকে
বিলিয়ে দিতে দিতে
পুড়তে থাকা
সিগারেটের মতো
নিঃশেষিত হতে হতে
জ্বলনাংকের
একদম শেষ সীমানায় এসে
উপনীত হয়েছিলাম তখন
পাঁচ
হিসেব কষা
সামাজিক জায়েজ বন্ধনের
হাতকড়া
পালঙ্কের রাতজাগা মোহ
উদ্বায়ী শিশিরের মতো
বাতাসে মিলিয়ে
হারিয়ে যায় বলেই
কলঙ্কিত আবেগ ছাড়া
ভালোবাসা নেই
রাধিকার প্রেমে
কিংবা
আলোকিত চাঁদের বুকেও
কলঙ্ক দাগ রয়েই যায়
নিষিদ্ধ পরকীয়া
উষ্ণতার
প্রেমের অবুঝ ঠিকানায়
ছয়
সত্যমেব জয়তে
দেশের নোটের গান্ধীও এখন
বদলে ফেলছেন অবস্থান
ফ্যাব্রিকেটেড ইমোশনস
নিলাম দরে কেনাবেচা হয় আজ
তীর্থক্ষেত্র আর
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাও যখন
ব্যবসাই বলা যায়
সত্যমেব জয়তের যখন
কোনও ভূমিকাই নেই
আর
কেউ কি বলতে পারেন
এত শব্দ খরচে
ফোকটে বিদ্যে জাহির করবার
কি দরকার
সাত
গোপনতার মোড়কেও
লুকিয়ে থাকে
না হারানো গোপন
সব গল্পেরা
অনেকটা না বলার
নিপাট নিখাদ ভাঁজে
আট
চোখের তারায় (এক)
চোখের তারায়
মন হারিয়ে যায়
বারবার টানে আমায়
পাশে থাকার
অনন্ত অপেক্ষায়
চোখের তারায় (দুই)
জমাট বাঁধা
অব্যক্ত মন ক্যামনের গভীরে
উদ্বায়ী শিশির বিন্দুর পলকে
ভালোলাগার শব্দেরা
হারিয়ে যায়
চোখের তারার
নীরব গোপন ঠিকানায়
চোখের তারায় (তিন)
মন্দাক্রান্তা ছন্দে
ভেসে ওঠে ছায়া
চোখের তারার
সাদা কালো ক্যানভাসে
চিরসবুজ
অপেক্ষার কায়া
নয়
পৃথিবীতে
যত কোটি মানুষ
তত কোটি সংজ্ঞা
পাপ পুণ্যের
দর্শনের
আমরা সকলেই ছাত্র
যার যার জীবনের
দশ
ঘুম জড়ানো পদ্মপাতায়
ভেসে ওঠে অবাধ্য
মুকুলের সোহাগ
নেমে আসে শিশিরবিন্দুর
উত্তাপহীন ভালোবাসা
বন্ধ চোখের তারায়
চারপাশের আলোবিন্দুরা
নিভে গেলেই
গোপন ইচ্ছেকাঁটারা সব
একে একে ডানা মেলে দেয়
পূর্ণিমা জোছনায়
এগারো
সূর্য্য অস্ত্য গেলেও
প্রতিশ্রুতি রেখে যায়
আলোর আকাঙ্খায়
বারো
দূরে থাকলেই
ভালো থাকে মন
যেন কতই না আপন
দেহ তো ধর্ষকও ছোঁয়
বেশ্যাও দেয়
নির্বোধ মূর্খ
শুধু শরীর খোঁজে
দেহেই সব পেতে চায়
তেরো
শব্দ ঘোরে আত্ম–যাপন
সেল্ফি উৎসব নয়
রক্ত ঝরে একুশের দিনে
ভাষা অমর হয়
চোদ্দ
পাপ
ঈশ্বরও নাকি
সাপ্লিমেন্ট ভেবে
খেয়েছিলেন ফল জ্ঞানবৃক্ষের
নইলে কেন নির্লজ্জ বেহায়ার মত
তিনি সেবা নেবেন
খাবি খাওয়া মরণশীল মূর্খের
মনে হয়
ঈশ্বরের লোভ হয়নি কখনো
তবুও তো তিনি খান
ঘুমান সেবা পান
চারদেওয়ালের ধূপ
মোমবাতির ঘেরাটোপে
দর্শনের ভি.আই.পি লাইন
বিলি হয় উচ্চমূল্য ধরে
মন কেনা বেচা
ক্ষমতার প্রতিযোগিতা
নির্লজ্জ উৎসাহে চলে
লোভী কুৎসিত হাতে
ভ্রান্ত ঈভও একদিন
খেয়েছিলেন ফল রসের বশে
শুনেছিলেন হিসহিসে শয়তানী বানী
কানে কানে
কামড়েছিলেন আদমও সেইদিন
আপেলখানা পরম সঙ্গম সুখে
বেচারা ঈশ্বরও এখন
খাচ্ছেন আঙুর
পাপীর হাতে
স্থাবর সম্পদ ভোগে
স্বর্গচ্যূতি তো হয়েছে ওনারও
মানসিক বিকার ঘোর রোগে
পাপক্ষয় - লাভ - জয়
সবেতেই ভাগ পান নির্বিষ ঈশ্বর
জন্মান্তর কর্মফলে চাকা ঘোরে
ভোগবাদী নশ্বর
যত অর্বুদ কোটি মন
তত কোটি ভাবের
অক্লান্ত একান্ত বিচরণ
অমৃতের সবটুকু তো
বিলিয়েছে সেই কবেই
অলক্ষীর নজর পেতে
পাপ তো একটু হবেই
পনেরো
চায়ের দোকানে
দেওয়ালে কাটা
তিন আঁচড় নামে
একরত্তি ভালোবাসা
বসেছিল মনে মনে
একফালি চায়ের দোকানে
ঋতুরা সব গেছে ঘুরে
সন্ধ্যে ভেঙে রাত পর্যটনে
একফালি চায়ের দোকানে
বিজ্ঞাপন লেখে
কেটলির কালো গায়ে
রকমারি ভাবনা
যেনো রুটিন মেনে
চিনচিন চিনচিনে বুকে
অবাধ্য যন্ত্রণার আনাগোনা
টবে জল না পাওয়া
সব গাছ পুড়ে গেছে
স্রোতের বিপরীতে বিঁধে
একটানা যন্ত্রণায়
কেরোসিন ড্রামে ভরা
নদীর জল
ঈশান কোণের
বিদ্রুপ মেখে
পায়ের কাছে এসে
একলা বসে
নিরুপায় অসহায়
উফফফফ
শুধু একটা পায়ে
মোজা পড়ে আছে
খুদে পা একখানা
নেই তার শরীর
শুধু পায়ের গোড়ালিতে
গায়ের মতোন কেটলির
কালো এক টিপ
ইমন কল্যাণের ...
তখনো দেওয়া আছে
ষোলো
সীমানা পাল্টায়
সীমানারা পাল্টায় যথাযথ
উদ্বাস্তু ভালোবাসার দল
পলাশের ভ্রূণ পিষে
বিক্ষত গভীর বুকে
স্মৃতির কোলাজ টলমল
পায়ের নুপুর ভেঙে
সময় থেকে ছিটকে আসে
অগণিত কলরব
পিশাচের নাটকীয় সংলাপ
বুকে চোখে মুখে
বারুদের গন্ধ
রেখে যায় রাতভর
এসব স্মৃতির কাছে
নীরবে ভোর নেমে আসে
পাখিদের কলতান
শুনিয়ে যায় ভালোবাসার গান
সকাল সকাল
বড়ো খালি খালি লাগে
নিঃসঙ্গ নীরব অন্তঃস্থল
চায়ের ভাঁড়ের সাথে
এক আনার বিস্কুট ছাড়া
আর কিইই বা দিতে পারে
মানুষে ...
সতেরো
সবুজ ঘাস রঙা
ফৌজি কামান
আর জমিয়ে রাখা
মার্বেল কাঁচ গুলি
খেলনা হলেও
ফেলনা নয়
ভিজে চোখের তারায়
রঙভাঙা তুলিও
দুর্ঘটনায় শহীদ শোকে
জয়হিন্দ হয়
আঠেরো
যদি ঠোঁটের উত্তাপ পরশ মেখেও, জ্বলেপুড়ে, নীরবে একলা ছাই হয়ে যাওয়া, চটি জুতোর চাপে অনায়াসে নিভে যাওয়া, অতি সস্তার নির্লিপ্ত সিগারেটও, তার সবটুকু একান্ত ভালোলাগার নিকোটিন অনুভব, উজাড় করে, চুম্বনরত ফুসফুসের বুকে, দায়িত্ব সহকারে ভরে দিয়ে, নিজেও সর্বহারাদের মতো রিক্ত নিঃস্ব হয়ে ফুরিয়ে যায়, তাহলে মানুষও কি পারেনা দিতে তার সবটুকু উজাড় করে অকাতরে?
উনিশ
ছেড়ে দিতে
মন করে না
তোমায়
অবহেলা
তাচ্ছিল্যের
ভেলায়
কুড়ি
চিতার চুল্লী ছুঁয়ে
চিমনি থেকে দূরে
যদি আধপোড়া ছাই
ভেসে যায় উড়ে
দিও একমুঠো আগুন
ভালোবাসার মুখে জ্বেলে
সময় পেলে
একুশ
ভ্যালেন্টাইনে
ইনবক্স মেসেজ বা
দুর্ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ নয়
এখন বন্ধ থাক
হোয়াটস অ্যাপ ফেসবুক
দুধেভাতে বাঙালি
ভার্চুয়াল ফেলে
ফৌজে যাক
বন্দুকের একমাত্র বদলা হোক
বন্দুক
বাইশ
বর্ণহীন বিষন্নতায়
বল্গাহীন বাঁচার প্রহর
কেটে যায়
প্রতিবার রুটিন মেনে
বসন্ত এলেও
দাবদাহ জ্বালায় ফিরে যায়
ঘুম ভাঙা চোখের পাতায়
ভোরের আলোও থমকে
দাঁড়িয়ে যায়
সুখের অবয়ব নিয়ত
ইচ্ছেমত কোঅর্ডিনেট বদলায়
কেউ "ভালো থাকুন"
মেসেজ করলেও এখন
পুরানো অম্বলের ঢেঁকুর
উঠে আসে মুখে
নিকোটিন মাখানো গলায়
বুকটা জ্বলে যায়
তেইশ
নরম সাদা আলোর মতো
রিক্তশস্য প্রান্তরের মতো
হারিয়ে গেল সে
ধীরে ধীরে
কালো কালো
হাজার হাজার
অগুনতি মাথার ভিড়ে
শুধু একবার
ভিজে চোখের পাতা
কেঁপে উঠেছিল তার
পেঁজা তুলোর মত আঙ্গুল
আমার আঙ্গুলে রেখে
চব্বিশ
মনের থেকেও শুদ্ধ
মনের ভাব
ভাবের থেকেও শুদ্ধ
ভাবের প্রেম
আমি জানু পেতে
নৈঋতে বসি
অবহেলা আর
তাচ্ছিল্য মেখে
পঁচিশ
তেল আর জল
প্রকৃতি যদিও তরল
তবুও
কেউ ভাসতে চায়
কেউ অতল সুখে
শান্তি পায়
ছাব্বিশ
আমিই "সেই"
দেহ নিয়ে, মন নিয়ে, দেহ মনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে, অনেকেই অনেক কিছু বলেছেন, লিখেছেন, আলোচনা করেছেন ।
ধর্মগুরুদের অনেকেই তাঁদের কথায় লেখায় আলোচনার সময় বলেছেন, ঈশ্বরকে লাভ করতে, যে কোনো প্রকারের জৈবিক চেতনা (ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা এবং কাম) নাকি মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে, সাধকের সাধনার পথে, প্রবল রকমের অন্তরায় । আর এদের ভিতরে প্রবলতম শত্রুই নাকি হলো কামের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আগ্রহ ।
আচ্ছা, আমরা তো সকলেই জানি যে, সারা বিশ্বব্যাপী যে সার্বজনীন দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় শরতকালে, তা আসলে রাবণকে বধ করবার জন্যে, রামায়ণে বর্ণিত রামচন্দ্রের অকালবোধন । সেই পুজোয় দেবীকে সন্তুষ্ট না করতে পারলে রাবণকে বধ অসম্ভব । আর দেবীকে তুষ্ট করতে হলে প্রয়োজন ওই সময়ের সব থেকে বড় দেবীর ভক্তকে । তিনি দশনন রাবণ । একমাত্র রাবণের হাতেই তিনি পুজো নেবেন । সন্তুষ্ট হয়ে রামচন্দ্রকে তাঁর কাঙ্খিত বর প্রদান করবেন । ইনিই সেই রাবণ, যার কিনা এক হাজার জন পত্নী, যে কিনা রামচন্দ্রের পত্নী সীতাকে বলপূর্বক অপহরণ করে নিজের কাছে এনে রেখেছে । যাঁর লঙ্কা পুরীর সিংহদুয়ার এ পাহারা দেন দেবী লঙ্কেশ্বরী স্বয়ং । সমাজের ধর্মের বিচারে সে একজন মহাপাপী । অথচ এমন মহাপাপীর হাত থেকেই দেবী দুর্গা, তাঁর পুজো নিয়ে, সন্তুষ্ট হয়ে, রামচন্দ্রকে রাবণ বধের জন্যে বরদান করবেন । রামায়ণের কথা অনুসারে, সেই সময়ের সব থেকে বড় শিবভক্তও কিনা রাবণ । অথচ ব্রাহ্মণ পুত্র বিশ্বশ্রবার পুত্র, রাক্ষসরাজ রাবণের ভিতর আহার, নিদ্রা, সূরা ও নারী সম্ভোগের বাসনা, মৈথুনের প্রবৃত্তি কিন্তু প্রবল ।
এবার আসি মহাভারতের কুন্তীর কথায় । বিবাহের পূর্ব থেকেই তাঁর পুরুষ সংসর্গের কথা জানি আমরা । সেই কারণেই কর্ণের আবির্ভাব । এরপর পান্ডুকে বিয়ে করেও তাঁকে একাধিকবার দেবতাদের সাথে সহবাস করতে হয়, কারণ পান্ডুরাজার সমস্যা ছিল । তাই কুন্তী নিজের পছন্দ মাফিক দৈবগুণ সম্পন্ন মহাশক্তিশালী পরাক্রমীদের সাথে সহবাসে লিপ্ত হলেন । জন্ম নিলেন পাণ্ডবেরা ।
গীতায় কৃষ্ণ (পৌরাণিক মতে যাঁর নিজের নাকি দশ হাজার স্ত্রী এবং সম্পর্কে নিজের মামী ও বয়সে অনেক বড়ো রাধার সাথেও পরকিয়া প্রেমে লিপ্ত) অর্জুনকে বলেছেন জিতেন্দ্রিয় । জিতেন্দ্রিয় তিনি, যিনি সমস্ত ইন্দ্রিয়কে নাকি জয় করেছেন । অর্থাৎ ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা, কাম, জয় করেছেন । অথচ অর্জুনের পত্নী সংখ্যাও (দ্রৌপদী, শুভদ্রা, উলুপী) কম নয় । তিনিও মহাদেবের কাছ থেকে ভয়ংকর পাশুপত অস্ত্রলাভ করেছিলেন এবং কৃষ্ণের প্রিয়তম সখা ছিলেন ।
নশ্বর জীবের একটা প্রাণযুক্ত দেহ বা শরীর আছে, তাই আছে তার উপযোগী একটা মনও । আর দেহের দৈনন্দিন জাগতিক চাহিদাই (ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা ও কামের), মনের গভীরে সরাসরিভাবে স্থানান্তরিত হয় । আর সেই চাহিদাগুলোর নিবৃত্তি না হলে, দেহের তৃষ্ণাজনিত অতৃপ্তি থেকেই যায় । চাহিদা বা তৃষ্ণা থেকে গেলেই, রয়ে যায় অভাব অভিযোগ । তাই প্রতিটি জীবের উচিৎ, যতখানি সম্ভব সময় সুযোগ বের করে, নিজের নিজের দৈহিক জৈবিক চাহিদার প্রয়োজন মাফিক নিরসন করা । দেহের অভাব অভিযোগ মিটিয়ে, দেহকে বাঁচিয়ে রাখতে, রোগমুক্ত রাখতে, পান, আহার, নিদ্রা, মৈথুন সবকিছুই সময় সময় প্রয়োজন । আর দেহ শান্ত হলে, মনও শান্ত ধীরস্থির ধ্যানস্থ আত্মস্থ হয়ে যায় । সহজেই যে কোনো অন্য কাজেও মনোনিবেশ করা যায় । মনসংযোগ আর অন্য কোথাও বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় না । যে কোনো কাজেই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয় । এমনকি ঈশ্বর লাভের অনুভূতিও প্রত্যক্ষ করা যায় ।
অতএব, একটাই কথা উঠে আসছে উপরের আলোচনায় । ভাবের জগৎ দিয়ে নয়, যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবের জগতে আসুন । নিজের দেহকে সব সময় সবদিক থেকে শান্ত রাখুন, তৃপ্ত রাখুন । আপনার মনও তাহলে শান্ত হবে । আপনি সমস্ত কাজেই সাফল্য লাভ করবেন । এমনকি ঈশ্বরকে লাভও সম্ভব হবে ।
আর ঈশ্বরলাভ মানে তো আসলে নিজের ভিতরে নিজেকেই অনুসন্ধান করা । সঠিক অর্থে আত্মউপলব্ধি । উপনিষদের ভাষায় যাকে বলা যায় — "সো হম" (অর্থাৎ, "আমিই সেই")
সাতাশ
খসে পড়া
নোনা ধরা পাতার
পড়ে থাকা পলাশের অবহেলার
পায়ের চাপে ভাঙা শব্দেও
গুমরে ওঠে আভোগী মন
আধফোটা আতপের ঘ্রাণে
ঘাসেরাও ঘুমিয়ে পড়ে
ফুটে ওঠে রাতজাগা প্রহর
শিশিরের ভারে
যখন তখন
আঠাশ
রাতের ফুল ফুটুক
বা ভালোবেসে ঝরে যাক
বিষন্নতার শুরু শেষ নেই
নেই কোনো অজুহাত
মুহুর্তের ভালোলাগার
এক আছে
শুধু অপেক্ষার তুমি
আর আছে এক
তোমার অপেক্ষার
উনত্রিশ
হারিয়ে যায় না কিছুই
কিছুই তো হারায় না
অতীতের ঘ্রাণ ছুঁয়ে
শুয়ে থাকে একলা শরীর
আর জেগে থাকে পাশে
নোনা জলের কান্না
তিরিশ
ঈশ্বরের আশ্চর্য বাগানের
আধফোটা হাস্নুহানা আর
ছাতিমের মাদক সুবাসে
মাটি মাখা ঘাসের ডগায়
উদ্বায়ী শিশিরের নিস্তব্ধতা বুনে
দিন বদলের সন্ধ্যা নেমে আসে
বাগানের দোলনার চারপাশে
জোনাকিরা বাতি জ্বেলে
ভেসে পড়ে মেঘের ভেলায়
আর ফুটে ওঠা তারারা
বহু যুগ শেষে
কাজল মুছে
নিবিড় সুখে নিদ্রা যায়
এমন আশ্চর্য প্রত্যয় সুখে
জলপরীরাও জল ছাড়া
একরকম বাঁচতে শিখে যায়
একরোখা ভালোবাসার ঈশ্বর
একমনে বুনতে থাকেন
স্বমেহন জাল
যার নেই ইহকাল পরকাল
নেই চাওয়া পাওয়ার
ঐকিক অসুখী বিলাস
মন্দাক্রান্তা ছন্দে
দেহ বেয়ে জমে ওঠে
অলৌকিক সুখ
আর জমে ওঠে
বিন্দু বিন্দু ভালোবাসারা
অপলক লৌকিক অক্ষরে
একত্রিশ
মনের সাথে মনের মিলন
জমাট বাঁধেনা বলেই
প্রেম বা সখ্যতা নয়
বিরহের উদ্বায়ী আঙুল ছুঁয়েই
শিশির ভেজা ঘাসের আগায়
কবিতার জন্ম হয়
বত্রিশ
অ্যাকয়ারিয়াম
মাছটা অপলক চোখে
নড়াচড়া করে ঢেউ তুলে
রঙিন পাথরের কোণে
পরিণত আলোর বৃত্তের উপমায়
লেজ দুলিয়ে এগিয়ে চলে
বাঁচার আকাঙ্খায়
নিজেকে বারবার লুকায়
বুদ্ধিমান মানুষ
কখনো সাঁতারু
কখনো পাতে জাল
চুপিচুপি নৌকায়
অ্যাকরিয়ামের কোমল জল
নিয়ম মেনেই বদলায়
একদিন মাছটা ঝাপটা দেয়
লাফিয়ে মেঝেতে পড়ে যায়
ভেঙে চৌচির অ্যাকরিয়াম
ছড়িয়ে যায়
মাছ ছটফট করে
লাফায় ঝাঁপায়
একসময় জীবন
চুপটি করে থেমে যায়
আঁশটে ঘ্রাণ
ঘরময় ছড়িয়ে যায়
শৌখিন মন
আনন্দে থাকতে চায়
আবার একবার
ভালো থাকার নিয়মে
অ্যাকরিয়াম বদলে যায়
তেত্রিশ
উদ্বায়ী শিশিরের বুকে
নেমে আসা ফড়িংয়ের মতো স্মৃতির গভীরে
পথ হারিয়ে যায়, মন ক্যামনের জমাট গোপন ঠিকানায়
চৌত্রিশ
সাত ভাগের ভাবনা
ক
উজাড় করা উপস্থ, উপুর্যপরি উপুড় করে, অন্তর্বাস নামিয়ে নৈবেদ্য নিবেদন করলেও, গৃহদেবতারা আর খুশি হন না সহজে ।
খ
প্রতিবাদী কৃমিরা, গুহ্যদ্বারে যথেচ্ছাচারে সুড়সুড়ি দেয়, মহুয়া আর তাড়ির তাড়নায়, লাথখোর মাছিদের ভনভন যাতনায় ।
গ
আবেগের আনন্দ জল শিশিরবিন্দু কণা, নাকি মগজের ঘিলু ঘাঁটানো ঘামের ফোঁটা, এ নিয়ে বোদ্ধারা ব্যস্ত সর্বদা, বোধি বিনিময়ে ।
ঘ
আজকাল ফসল কাটা অহল্যারা সবাই নাকি একে একে ফসিল হয়ে যাচ্ছে ।
ঙ
আমপাতার কাজল লেপ্টে যায় অন্তরীপের সজলতায়, শেষ বেলায় ।
চ
মেঘের চারিত্রিক আবির্ভাব চেনা যায়, রোদের লাল হলুদ রং খেলার পর ।
ছ
ছৌ নাচ শেষে ক্লান্ত মুখোশ বেচারা, তারার মতো খসে পড়েছিলো মাঝরাতে, পেতেছিল দুই হাতে আলোর কুসুম, মধ্যবিত্তের চতুর্ভুজ ঘিরে ঘুমিয়ে থাকা, অন্তর্মুখী বহুকেন্দ্রিক বৃত্ত ভেঙে ।
পঁয়ত্রিশ
সময়ের আগে
হয়ত কোনো কিছুই
সম্ভব নয়
নয়ত অসময়ে
চেনা হাতের মুঠোও
আলগা হয়
৯
মুঠো আলগা হলেও
ভালোলাগা রয়েই যায়
উন্মুক্ত হাতের পাতায়
১০
বেঁচে থাকার অভ্যাসে
বাঁচতে জানায়
কোনো বাহাদুরি নেই
উপলক্ষ্য কি আর কতটুকু
বুঝে উঠতেই
অতিক্রম করে ফেলি
একটা সামগ্রিক জন্ম
১১
অপালা
চশমার ঠিক মাঝে, আঙ্গুলের আলতো চাপে, নাক বরাবর একটু ঠেলা দিলেই, চোখের পাতা ভারী হয়ে এলেই, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসার মতো করেই, ঘোলাটে অস্পষ্ট বর্ণহীন, একটা ঘোর লেগে যায় ইতিহাসের সাম্মানিক বিভাগের ছাত্রী অপালার । আগামীকালের ডিবেট প্রতিযোগিতায় নামও দেওয়া রয়েছে তার । আর আগামীকালের বক্তব্যের বিষয়টাও সম্পূর্ণভাবে অজানা নয় তার — "নারী পুরুষের জীবনে সমানাধিকার" । দুপুরের সময়টায় লাইব্রেরীতে বসে, একটানা একদৃষ্টে দেখতে থাকা, ইতিহাস বইয়ের খয়েরী হলুদ তেলচিটে পাতা থেকে, মোটা কাঁচের ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া হারিয়ে যায়, আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগের, ঋক বৈদিক যুগের, আর্যাবর্তের কোনো এক আর্য জনপদের ঠিকানায়, যেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কোনো এক বিদুষী ব্রহ্মবাদিনী, উপবীতধারিনী, মন্ত্রদ্রষ্টা আর্যকন্যা । তাঁর নামও ছিল ওরই মায়ের দেওয়া নামে; অপালা । ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজে আচ্ছাদিত, নানা রঙের ফুলে ফলে উদ্ভাসিত, হোমকুণ্ড থেকে প্রজ্জ্বলিত আগুনের আলোয় উত্তাপিত, ধূপে আর ফুলের আতরে সুবাসিত, এক মনোরম পর্ণকুটির, যার চারদিক জুড়ে নির্ভয়ে বিচরণ করে চলে, ডাগর কালো চোখের হরিণ শাবকের ছানা আর ইতস্তত ভাবে ছুটে ছুটে নিজেদের ভিতরে খেলা করে চলা, দুধসাদা শিশু খরগোশের পাল । নুড়ি বালি মোরাম রাঙা পথের দুইপাশে, গজিয়ে ওঠা কচি সবুজ ঘাসের উপর, নিভৃতে জমাট বেঁধে থাকা, ভোর রাতে ঘনীভূত শিশির কণারা, যাদের উপরে প্রতিফলিত সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ে চারপাশের সবুজ ঘন গাছের পাতায় পাতায়, মাটির ঘরের উপর ছাওয়া খড়ের চালায় । অনতিদূর থেকে ভেসে আসে সুরেলা নারীকণ্ঠে সুস্পষ্ট গায়ত্রী মন্ত্রোচ্চারণ, ভেসে আসে বৈদিক সামগান, যার সুর তাল লয়ে ছন্দে কেটে যায় সমস্ত প্রকট ও প্রচ্ছন্ন সংস্কার, জীবনরসে সিক্ত হয় ঈষৎ সান্দ্র আপাত তরল, উদ্বায়ী তুচ্ছ প্রাণ । নারীর জীবন "কি" ও "কেন" র প্রশ্নে আচ্ছন্ন অপালার অন্তরতম স্বত্ত্বা, একাকী প্রবেশ করে বৈদিক আশ্রমের অজ্ঞেয় অজ্ঞাত নির্জন পর্ণকুটিরে । নারীকণ্ঠের গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণে, স্তব্ধ নির্বাক নিস্পন্দ মন তার, নীরবে নতজানু হয় চরণতলে, আর্য ঋষিকন্যার । স্মিতহাস্যে অভয় দেন আর্যকন্যা, তাঁরই পরবর্তী উত্তরসুরী, আগামী দিনের অপালার কাঁধে নিজের পদ্মতুল্য দুই হাত রেখে । মুছে দেন একবিংশ শতকের অপালার শিউলি ভেজা চোখের জলবিন্দু সস্নেহে । জানতে চান, বর্তমান আধুনিকতার আবাসন ফেলে, প্রায় ইতিহাসবিস্মৃত, একবিংশ শতাব্দীর নারীজাতির প্রতিনিধির, ধুলি ধূসরিত সুদূর অতীতের জগতে আগমনের প্রত্যক্ষ কারণ । লাইব্রেরীর টেবিলে, ফেলে আসা ইতিহাসের পাতার অক্ষরের বুনোট ভেঙে, অতীত সময়ের গভীরে অনুপ্রবিষ্ট অপালা, যজ্ঞ — উপবীতধারিনী ঋক বৈদিক আর্য্যকন্যা, অপালার পদপ্রান্তে উপনীত হয়ে, নারী পুরুষের ভেদাভেদের প্রকৃত স্বরূপ জানতে চায় । ঋগবৈদিক যুগের প্রতিভূ, আর্যা অপালার মুখ থেকে নিঃসৃত হয় একটাই শব্দ – "সোহহম", যার অন্তর্নিহিত অর্থ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে সমগ্র পর্ণকুটির সহ আশ্রম ঘিরে, – "আমিই সেই" । উত্তর খুঁজে পেয়েই, লাইব্রেরীর চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে আবার, ফিরে আসে অনুসন্ধিৎসু মন তার । আর আপনমনেই বলে ওঠে, ভিতরে প্রচ্ছন্ন হয়ে লুকিয়ে থাকা, এত বছরের অজানা, অচেনা, অবুঝ, ব্রহ্মবাদিনী, উপবীতধারিনী, মন্ত্রদ্রষ্টা মন, —
"সমাজ ভাবে নারী পুরুষ
আমি ভাবি শুধুই মানুষ"
১২
কাজের ফাঁকে, একটু অবসরে,
লোনা সমুদ্র হাওয়া বুকের পাঁজর ভরে ___
সে তুমি নিতেই পারো ।
বুকের পাঁজরও তোমার
আর তোমার মুঠোয়
পড়ে থাকা একলা সময়ও ।
আর আমিও একদিন, গোলাপ লাল রাতের মরূদ্যানে, শিশির হয়ে, জমাট বেঁধে মিশে যাব, ঝরে পড়া শুকনো পাতার শিরায় উপশিরায়, বাগানের কোণে অবহেলায়, মাটির বাষ্প ছেড়ে, মেঘের দেশে ___
যেখানে রামধনুও অবলীলায়,
পাহাড়ী ঝোরার কোলে, সবুজ হলুদ শ্যাওলায় মেশে ।
১৩
পর্ণমোচী
মৃতপ্রায় বিবর্ণ
উৎকন্ঠাহীন পর্ণমোচীর মতো
শিশির মেখে ঝরে পড়ে
ঋতুকালীন বিষণ্ণ হতাশারা
আসন্ন মেঘের আল্পনায় ।
রূপকথার নবজন্ম লোভে
ভালোবেসে ফুটে ওঠে ফুল
রেণুমাখা পাপড়ির ভাঁজে
সুবাসিত কাজল রাত কল্পনায়
আর
গতানুগতিক
লাঞ্ছিত ভালোবাসার
স্বপ্ন সোহাগ বুনেও
ঘুমিয়ে পড়েন ঈশ্বরী আমার
বুনো হাঁস পালকের ওমে ।
১৪
ধর্ম কি
না জেনে বুঝেই
স্বাধীন দেশের
পরাধীন আমরা
জাতের লড়াই
অনেক লড়লাম
এবার
ভাতের লড়াই শুরু হোক
১৫
উট
নিজের অজান্তেই
বুকের গভীরে
এঁটে দেয় খিল
কৃপণ মন
অহংকারী গলা তুলে
ঘুরে ফেরে উট
মরুদেশে
প্রেমহীন একলা জীবন
১৬
মুহূর্তরা জেগে থাকে
বন্ধ চোখের পাতায়
রাতভোর তারার জাগায়
মনের মানুষের
একলা নীরব অপেক্ষায়
সময়ের কাঁটার ফাঁকে
ভাবনারা চেপে ধরে
নিষ্পেষিত করে
ভোরের কুয়াশা কেটে
ভালোবাসা ভিজে ওঠে
শিশিরের কণায়
মিশে যায় দেহ মন প্রাণ
রোমকূপ ঘামে জালিকায় শিরায় উপশিরায়
চাতকের ঠোঁটের ছোঁয়ায়
আধো আলো অন্ধকারে
অবচেতন দুরুদুরু মনে
পেলব কোমল পেশী
খেলতে থাকে
সংকোচন প্রসারণে
ভেসে আসে
সুবাসিত শীৎকার
আদুরী বিড়ালছানার
আনন্দ সুখের অবসানে
ইথারের ভাঁজে
সুখের সময় ফুরায়
আবার আলাদা
একলা কিছুকাল
সময়ের টানে
১৭
শীতের সকালে লেপ কম্বলের ভাঁজ ভেঙে উঠে, ট্যাংকের প্রায় জমে যাওয়া কনকনে হিমশীতল জলে চোখ মুখ হাত ধুয়ে, কুয়াশার চাদর ভেদ করে, পিচ ঢালা রাস্তার উপরে একলা দাঁড়িয়ে থাকা চায়ের গুমটির কোলে জ্বলতে থাকা কয়লার আগুনে, নিজেকে উষ্ণতায় মেখে নিতে বেশ লাগে । আর এই সুযোগ নিয়ে, এলোমেলো ভাবে সময়ের তালে তালে ঢেউ তুলে, ভেসে আসে শব্দমালারা একে একে ___ উষ্ণতার জন্য
যদি নিতে চাই চোখের পাতায়
ভেজা টলটলে তারায়
শিশিরের ঘ্রাণ
আধোঘুম ভাঙ্গা
সুবাসিত বালিশের পাশে
যদি দিতে চাই নিবিড় চুমু
গোলাপ রাঙা ঠোঁটের আগায়
সবুজ ঘাসের ডগায়
মুঠো ভরা শিউলির কাছে
তবে নিঃশ্বাস ভরে
রাখতে হবে ধরে
উষ্ণতার অফুরান
আনন্দ গান
সবকিছু বেশ ভালো আছে
১৮
জিঙ্গল বেল
সিরিয়ার কচিকাঁচা
অপরিণত শরীরগুলো
ক্ষত বিক্ষত যখন
বোমারু বিমান
আর রকেট লঞ্চারে
তখন স্যালাইন রক্ত
আর অক্সিজেন সিলিন্ডার
যেমন দরকার
তেমনি দরকার
সান্টার একরাশ ভালোবাসার
বড়দিন আসার প্রতীক্ষার
স্কুল আর মাঠের খেলা ফেলে
এখন ওরাও আছে
হাসপাতালে
কাতর দেহে চুপচাপ শুয়ে
সরি সারি বেডে
রাজপুত্রের মতো ঘোড়ায় চেপে
রাজকুমারীর খোঁজে
কখনো যাবে না ওরা আর
কোথাও
কাজল কালো দীঘির ঘাটে
থাকার কথা ছিল ওদেরও
কিন্তু সব কথা কি থাকে আর
সময় মাফিক মিলে যাওয়ার
অনেকেরই হয়তো
কোনওদিন কখনো
ফেরাই হবে না ইস্কুলে বা
প্রোমোটারহীন মাঠে
হয়তো ফেরাও হবে না আর
মাটিতে মিশে যাওয়া
আধপোড়া বাড়িতে কখনো
কাল বড়দিনে তাই
সান্টাক্লজ নিজেই
ওদের কাছে পৌঁছে যাবেন এবার
তাই শেষ বেলায় তিনি
নিজের ঝুলিখানা
গুছিয়ে নিচ্ছেন একমনে
সাদা পাকা চুল দাড়িতে
সুরভিত শ্যাম্পু
আর কন্ডিশনার
আর শুকনো ফুটিফাটা মুখে
কোল্ড ক্রিম মেখে
ধুয়ে নিয়েছেন তিনি
তার লাল টুকটুকে জামা
আর ফারের টুপিখানাও
গ্যারেজ থেকে
স্লেজ গাড়িখানা বের করে
ঝেড়ে নিয়েছেন
কাদা বরফ জমাট বাঁধা
সমস্ত ধুলো
এরপর পঁচিশে ডিসেম্বর
পৌঁছে যাবেন তিনি ওদের কাছে
ঝুলিভরা আনন্দ উপহার
আর একরাশ ভালোবাসা নিয়ে
হাসপাতালের চত্বর জুড়ে
বেজে উঠবে
স্বর্গের জিঙ্গল বেল
এক ঝাঁক
অপূর্ব কিউপিডের কাছে
পৌঁছে দেবেন সান্টা
অপেক্ষার প্রীতি উপহার
১৯
কত বার
আপনি কতবার
খুঁজে পেয়েছেন
হারিয়ে যাওয়া সুবাস
রজনীগন্ধার
কতবার
গোলাপের পাঁপড়িতে
চুমু খেয়েছেন ঘুমের ঘোরে
কখনো কি চুমু খেয়েছেন
পিছলে যাওয়া জলের ধারায়
একলা অপেক্ষারত
নিঃসঙ্গ পদ্মপাতায়
নাকি শুধু সহস্র কোটি বার
চুমু খেয়েছেন হাস্নুহানাকে
নিজের স্বপ্ন সৌধে
ইচ্ছেমতন
তার পলক ভেজা
চোখের পাতায়
আধো ঘুম মাখা
পাতলা ঠোঁটের আগায়
বাহুমুলের ভাঁজে
নাভিমুলে
উরুদেশে
জঙ্ঘায়
হার খোলা
ঘামে ভেজা গলায়
আপনি কি আদৌ বিশ্বাসী
সুন্দর শাশ্বতের আরাধনায়
নাকি রতির তৃপ্তির
বিরতি শেষে
হারিয়ে যাওয়া প্রেমের
অভিমানী আত্মহত্যায়
২০
ক্যারিশমা
তুমি একবার ডাক দিলেই
চশমা খুলে আমি বেড়িয়ে পড়ি
বন বাদাড় শ্মশান কবরস্থান
নদী নালা সাঁকো সেতু
ঘাস মাটি নুড়ি বালি পাথর
পার করে
অ্যাকুইরিয়ামের আলোর রঙে বন্দী
মাছের ঘোরে সাঁতার কাটতে কাটতে
ঝরণা বেয়ে পাহাড়ে চড়তে থাকি
রামধনুর রঙিন ধাপে ধাপে
শীতের ভোরে হাই তুলতে তুলতে
গায়ে হাতে পায়ে
তেল মাখতে ভুলে যাই
মেঘের আড়াল উপেক্ষা করে
আম কাঁঠাল কলাবাগানের পাতার ফাঁকে
পুকুর পাড়ে বসা হাঁসের পাশে
একমনে বুনো রোদ্দুর পোহাই
যদিও তোমার ধোপ দুরস্ত
কেতাবী অবয়ব নেই
নেই উদাত্ত শব্দের বাচিক আকর্ষণ
নেই পলকহীন মায়াপুরীর
সুগন্ধী আতর পরশ
তবুও খাঁটি মাটির ঘ্রাণে
তোমার গাড়ির চাকার থেকে
উঠে আসা ধূলোর পিছনে
একনাগাড়ে ছুটে চলি
দম হারানো বোহেমিয়ান
পালছেঁড়া বোধ হারানো
উদ্বাস্তু নাবিক মাস্তুলের মত
মাটির মানুষের ঘাম গায়ে মেখে
কিছু একটা আছে বোধহয় তোমার
কিসের বিশ্বাসে কোন আশ্বাসে
আমি আর আমার মতো
হাজারে হাজারে
কাতারে কাতারে
তোমার ডাকে জড়ো হয়
কে জানে ?
হয়তো এরই বাজারি নাম 'ক্যারিশমা'
চুম্বক বোধকরি সকলেই দেখেছে
অনুভব করেছে তার আকর্ষণ
পরখ করেছে তার অমোঘ টান
আর তোমার শক্তির পরীক্ষা নিয়ে চলেছে
হেরে যাওয়া পিঠ দেখিয়ে পালিয়ে বেঁচে থাকা
কিছু মুষ্টিমেয় চার অক্ষর বোকার দল
ওরা ভুলে গেছে হিটলার মুসোলিনির কথা
ওরা ভুলে গেছে চেঙ্গিজ খান তৈমুর লঙের কথা
ওরা ভুলে গেছে জার আর বাস্তিলের
অসহায় পতনের কথা
এখন তো ওরাও পতিত
তবুও জানিনা কেন
ওরা পতনের কথা বার বার ভুলে যায়
আর শুধুই অভ্যুত্থানের দিবাস্বপ্ন দেখে
টিকি দাড়ি টুপি পৈতের দেশে
অম্ল অজীর্ণে ধর্মান্ধ জরাজীর্ণ দেশে
পচে গলে ক্ষয়ে হারানো শতছিন্ন দেশে
বিভাজনে বিশৃঙ্খলায়
দেশ ভাগের লুন্ঠন দাঙ্গায়
জালিয়ানওয়ালাবাগের লজ্জায়
খুনে ধর্ষণে নির্যাতনে
লুন্ঠিত নির্ভয়ার দেশে
জেগে আছি অর্ধমৃত আমরা
পরের শেখানো পড়ানো বুলি
আউড়ে আউড়ে
কাকাতুয়ার মতো
আমি জানি
আমরা জানি
একদিন আমাদেরও
দিন আসবেই আসবে
একজোট হতেই হবে আমাদের
নয়তো এই দেশটাকে ছিবড়ে নিংড়ে
ফেলে দেবে কিছু ইতর নষ্ট ভ্রষ্ট লোক
এই 'কিছু' রাই এখন সংখ্যায় অনেক
তারাই এখন তোমার পতাকার ভার বইছে
বইছে তোমাকেও
আর নর্দমার জলে ভাসছে
ভাঙাচোরা আধমরা বিশ্বাস
কারণ সত্যিটা তো আমরা সবাই জানি _
একদিন তোমাকেও অতীত হতেই হবে
হতে হবে হলুদ পাতার মতো
অসংবাদিকতার ইতিহাস
২১
শীতের কুয়াশা ঘেরা
জমাট বাঁধা বালির বুকে
বৃষ্টি ছুঁয়ে যায়
দিনের শেষে
লাল মাটির দেশে
মেঘে ঢাকা শাল
আর ইউক্যালিপটাসও
একাকী আচ্ছন্ন হয়ে যায়
আরো একবার
খোয়াই এর বুকে
সন্ধ্যা নামে
২২
টাক, টাকা আর টুপির সম্পর্ক ঠিক কতখানি, তা অনেকে অনেকখানি জানলেও, কেউ কেউ তো নাও জানতে পারি, সবকিছুর কমবেশি রকমারি ।
তবে জানার সময় আর সীমানা, দুটোই যখন অসীম, তখন কি আর সত্যিই খুব দরকার, অর্বাচীনের মতো নিয়মমাফিক যুদ্ধ করবার ?
শীতকালীন ভোরে, কুয়াশা মেশানো ঝিরিঝিরি জলকণার পরশ, রোদ কেড়ে নিয়ে ঢেকে দিয়ে যেতে যায় চারপাশের হিমেল দুনিয়াটাকে, গোমড়ামুখো মেঘের আড়ালে, কনস্টিপেশন আর অম্বল রোগীর মতো ।
চারপাশে এত জল আর এত কাদা দেখলেও বলতে পারিনা, "কি আর করবেন দাদা" ।
এমনকি ঝুলতে থাকা প্যাসেঞ্জার দেখেও বলতে পারিনা এত ভীড় ! বাপ্ রে বাপ ! তার কারণ, আপনার আমার চারপাশের ব্যাপক চাপ ।
ঝড়বৃষ্টি যতোই হোক, আর যতোই খিদেয় কষ্টে গাড্ডায় বা আত্মহত্যার ধাক্কায়, মরুক না কোটি খানেক লোক, আমার আপনার সকলের নেতার ভোটবাক্সেই আসল ভয়, কারণ আজকাল তো ফেসবুক আর হোয়াটস অ্যাপেও জনমত হয় ।
আপনার আমার কষ্টের অর্জন, করের টাকা হয়ে, সরকার মারফৎ ক্লাবে যায় । আর পরীক্ষার হলে না গিয়েও, বাড়িতে বসেই, লাখখানেক টাকার চাঁদা ছিটিয়ে, অপগন্ড - অযোগ্যরা, ঘরের কাছে পায়ে হাঁটা পথে, চাকরি পায় ।
এক সময়ে নিজেদের ভিতরেই কাটাকাটি করা ডান বামও, আদর্শ ভুলে ক্ষমতা নিতে এক হয়, কারণ ধর্মের ধ্বজাধারী গেরুয়া বেশ ধারীও এই দেশে মুখ্যমন্ত্রী হয় ।
এদেশে শুয়োর আর গরু কাটার দোহাই দিয়ে, মন্দির মসজিদ গড়ে তুলবার অধিকার নিয়ে, মানুষ হন্যে হয়ে কোর্টে ছোটে । অথচ সরকারী হাসপাতালের বেড নিলামের দামে আর মিড-ডে মিল ইস্কুলের বেঞ্চে অনুপস্থিতির ধুলোর চোটে, হরিবোল ধ্বনি ওঠে ।
আপনিও এখন ব্যাঙ্কে টাকা রাখতে ভয় পান । অনলাইনে কেনাবেচা করলেও, মনে মনে একটা আতঙ্ক থেকেই যায় । কারণ, আপনি যতই কপাল চাপড়ে করে চলুন 'হায় হায়', এখনো এই দেশে মালিয়া - আম্বানী - আদানী, সব আরবপতিরাই ব্যাঙ্কের ধার বা কর মকুবে ছাড় পায় ।
চারদিক জুড়ে যখন এ হেন দৈন্য, তখনও আমরা গুলি গোলা ছুঁড়ে মারামারি করে, লড়াই করে মরি কাঁটাতারের সীমান্তে । কাশ্মীরে সেনার গুলিতে কিশোর মরলেও, নেতাদের আর কিই বা আসে যায়, শুধু আপনার আমার আর ওদের ঘরের, পরিবারের জন্য জীবন সংগ্রামে হারিয়ে যাওয়া, নিহত সৈন্য, জীবন আর যৌবন হারায় ।
আচ্ছা, আপনি কি এখনো বুঝতে পারেন নি, কে বা কারা, আপনার আর এই সমাজের, এই দেশ বা রাষ্ট্রের সত্যিকারের শত্রু ? যদি এখনো চিনতে পারেন নি তাদের, তবে কি বলতে পারেন, আর কত যুগ লাগবে আপনাদের, বুঝে নিতে আসল মানুষখেকো শয়তানদের মন ? উঠুক জেগে আধপেটা ভিটে মাটি ঘটি বাটি হারানো, ক্রমশঃ ডুবতে থাকা সর্বহারা মানুষের জমি, আবার উঠুক জেগে আম আদমী আপামর জনগন ।
২৩
কাঁটাতার
ভাবনারা দেয় ধরা সময়ে অসময়ে
কখনো মনের ঘরে
কখনো বা নদীর বুকে
জমাট বাঁধা চরের পরে
উদ্বাস্তু প্রেম
জল হয়ে জমে
চোখের কোণায়
ঊজ্জ্বল তারায়
স্বপ্নরা আসে একে একে
দিকচক্রবালে উঁকি মেরে
ডুবে যায়
অবাধ্য বেয়াড়া প্রশ্নমালা
মাঝে মাঝেই মনে এসে জমে
একতা আর
সংস্কৃতি বিস্মৃত জাতি
আমরা সবেতেই
বিভাজন চাই
এমনও ভাবেন কেউ কেউ
আমরা ঘরের খেয়ে
অকারণ বনের মোষ তাড়াই
কি আর করা
অপবাদ তাচ্ছিল্যমাখা জীবন
কেউ কি যেচে চায়
রোমকূপ থেকে
ঘাম ঝরার মতো
দেশ জাতি সংহতির ভূত
দিন রাত তাড়িয়ে বেড়ায়
আমার তোমার
আরও অনেকের
মা ঠাকুমারা এখনো মোছেন
শুকনো ভাঙা গাল বেয়ে নামা
লেপের ওমে
নোনতা গরম জল
সব ফেলে আসা
ভিটেমাটি জমি বাড়ি
পুকুর বাগান ধানক্ষেত
আর ইলিশ নদীর জল
টলোমল
এমনটা ভাববেন না যেন
মনে মনে আমি রোজ
প্রতিহিংসার গোখরো পুষি
ধর্মের যন্তর মন্তরে
আমিও তো শুধু চাই
আইসক্রিম চকোলেট খেতে
পিৎজাহাট ঠেক কোকাকোলা
হাতে হাত রেখে বসা
ঝাঁ চকচকে মলের অন্দরে
মিলে মিশে ভাই বোন
স্বামী স্ত্রী যেমন থাকে
আত্মীয় অনাত্মীয়
দূরে হোক বা কাছে
কাঁটাতার ভেঙে
আকাশের বুক চিরে
মেঘের মতো বার বার
স্বপ্নরা বৃষ্টি হয়ে বাঁচে
২৪
জলবিন্দু
জোনাকি বসা
আলো-আঁধারি পাতায়
ভালো না লাগার নজরে
আচ্ছন্ন মুখোশের সহবাসে
অপলক মাছের মতো
কাজল কালো হরিণী চোখে
রজনীগন্ধার স্নিগ্ধতা আর
রাতের আধফোটা হাস্নুহানার
মায়াবী ঘ্রাণে মিলে মিশে
গোলাপের পাঁপড়ি খসা
শিউলি উপচে পড়া
ভোর রাতের সবুজ ঘাসে
শিশিরের টুপটুপ ঝরে পড়া
আশ্চর্য শব্দের মতো
হলুদ পাখির দিকে ভেসে চলা
অজানা পারফিউম সুবাসে
মাঝে মাঝেই সব কেমন
গুলিয়ে ফেলি
নিজেকে আরও অচেনা লাগে
মিঠা পানে দারুচিনি এলাচের
স্বাদ আর গন্ধের টানে
তোমার ঘামে ভেজা এলো চুলে
এয়োতির মতো অতল চাপে
মাতাল হয়ে মেতে উঠি
আজন্ম আভোগী আমি
জরায়ুজ কামনা মাখি
ধূমায়িত পাহাড়ী চা আর
আতপ চালের গন্ধের মতো
রাজহাঁসের পালকে
ঠোঁট ডোবানো বুকে
মন কেমনের টানে
জলবিন্দু হয়ে জেগে থাকি
২৫
ভালোবাসার উপপাদ্যগুলো একে একে
কতখানি স্বচ্ছতার সাথে
স্কেল পেনসিল চাঁদা ফেলে
কাটাকুটি খেলতে খেলতে
ভাবনার গভীরে উপগত হয়ে
এক একটা চতুর্দশপদী কবিতার অন্তরে
যেমন করে দ্রবীভূত হয়েছে
তার হিসাব পান সিগারেট খৈনীতে ভরা
গাছের জ্যামিতিক হিসেবের সংসারে
কেমন করে হবে
২৬
পুরুষতান্ত্রিক
পাখির মতো মেয়েটিও
দেহে মনে প্রাণে
সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে
জীবনযাপন করতো
ইচ্ছে মতো হাসতো
খেলতো গাইতো
ঝরণার তালে তালে নাচতো
চলতো ফিরতো
দুনিয়া ঘুরে বেড়াতো সে
পোশাক পড়ে বা
পোশাকহীন হয়ে
যা কিছু মন চায়
সে তাইই করতো
একাধিক বন্ধু বান্ধবী
সঙ্গী সাথী ছিলো তার
সব রকমের খেলার নেশায়
আচ্ছন্ন থাকতে
ভালোলাগতো তার
প্রেমে ভালোলাগার ক্ষেত্রে
ভালোবাসার নিরিখে
এমনকি
যৌনাচারের প্রশ্নেও
বিশেষ কোনও ভেদাভেদ
ছিলো না তার মনে
পরকীয়া হোক বা অন্যকিছু
সে ছিল আপাদমস্তক বহুগামী
বহু চরিত্র ভোগ্যা
তার উদ্দাম উন্মুক্ত জীবন দেখে
সবাই রে রে করে
জ্বলে উঠলো হিংসায়
সমাজের মাথারা
সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলো
তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো
এক তান্ত্রিকের কাছে
এর বেশ কিছুদিন পর থেকে
ঐ মেয়েটির খোঁজ
এবার পাওয়া গেল
খাঁচার ভিতর
তার প্রাণবন্ত মনের
আর কখনো
কোনো খোঁজ
পেলো না কেউ
সমাজের সবাই
ঐ তান্ত্রিকের
জয়জয়কার করতে লাগলো
আর
সেই কর্মকান্ডের জন্য
পরবর্তী কালে
ঐ তান্ত্রিকের নাম দেয়া হয়
পুরুষতান্ত্রিক !!!
২৭
ঘরকন্যা শুরুর ধারণারা
দুরু দুরু রোমশ বুকের গভীরে
এক পশলা বৃষ্টির জলে
জমে ছিলো তখন
সবকিছু যেন এক একটা
অলীক আশ্চর্য অতীত বলে
মনে হয় এখন
বিয়ের জন্মদিন পালন
© রাজেন্দ্র
(সমাপ্ত)
[3/16, 8:34 AM] রাজেন্দ্র জিও:
প্রস্তর হতে হতেও
থমকে যায় চোখেরা
এক সমুদ্র ঢেউ এলে
© রাজেন্দ্র
Comments