মিশন বেগুনকোদর © প্রীতম গুহ
মিশন বেগুনকোদর
তারিখ : ১৮ নভেম্বর ২০১৮
এই সেই বেগুনকোদর রেলস্টেশন, যাকে ঘিরে কদিন ধরেই আমাদের যার পর নাই উত্তেজনা, বছরের পর বছর ধরে ছোট্ট এই রেল স্টেশনটিকে নিয়ে বিস্তর লেখালিখি হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতে, হয়েছে অসংখ্য ডকুমেন্টরি ভিডিও। ইন্টারনেট খুললেই আজও বিশ্বের নাম করা কুখ্যাত ভুতুরে রেল স্টেশনগুলির মধ্যে বেগুনকোদরের নাম প্রথম সারিতে উঠে আসে। তেমনই এক ভূতুরে গা ছমছমে অভিজ্ঞতার গল্প শোনাবো আজ। পুরুলিয়া জেলার অযোধ্যা পাহাড়ের গা ঘেঁসে অদ্ভুত প্রাকৃতিক শোভার সাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট এই স্টেশন ঘরটি। রেল মানচিত্রে এই স্টেশন বেগুনকোদর নামে নথিভুক্ত।
শোনা যায় আজ পর্যন্ত যারাই এই স্টেশন চত্তরে গিয়েছেন অ্যাডভেঞ্চরের নিমিত্তে তারা সকলেই টিম নিয়ে গিয়েছেন। কমপক্ষে দশ-বিশ জনের টিম ছাড়া কারো এই অভিযানে যাবার সাহসই হয়নি। আমি মানুষটা বরাব্বরই অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়, তাই গত সপ্তাহে এই স্টেশনের নাম শোনার পর থেকেই টানটান উত্তেজনার সূত্রপাত। সাথে টিম অ্যারেঞ্জ করবার জন্য সাত দিনের মধ্যে ফেসবুকে পোস্ট টোস্ট দিয়ে দাপাদাপি শুরু করে দিলাম চতূর্দিকে। ফলে এই মিশনে সামিল হতে চাইল উৎসাহী একদল ভয় পিপাসু মানুষ। ফেসবুকে পোস্ট দিতেই মহিলারাও এই মিশনে যেতে সমপরিমান আগ্রহ প্রকাশ করেন, মিশনে ছেলে ছোকরা রা থাকায়, এবং সারারাতের কর্মকাণ্ড হওয়ায় আমি এই মিশনে মহিলাদের আবেদন রাখতে পারিনি। গুগল্ মানচিত্র অনুসারে যাত্রাপথ বর্ধমান থেকে ২৩১ কিলোমিটার। মোট বারো জনের টিম নিয়ে যাত্রার সময় স্থির হল শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা, হুজুগে রাতারাতি একটি স্করপিও-ও ভাড়া করে ফেলা হল এই মিশনের উদ্দেশ্যে। স্টেশনের নামটা শুনে ড্রাইভার প্রথমে মোটেই রাজি হচ্ছিল না তবে বেশ কিছু মোটা টাকা অ্যাডভান্স দিতেই শেষমেষ রাজি হয়ে গেলেন তিনি। তবে শর্ত দিলেন এই যে স্টেশনের এক কিলোমিটার দূরেই তিনি পার্ক করবেন, সেখান থেকে স্টেশন অবদি সমস্ত পথটা হেটেই যেতে হবে আমাদেরকে। আমি রাজি।
ক্রমশ যাত্রার দিন ও সময় এসে উপস্থিত, এবার গণ্ডগোলের সূত্রপাত যাত্রারদিন সকাল থেকে, একে একে ফোন আসতে থাকে আমাদের টিমের প্রতিটি মেম্বারের তরফ থেকে। কেউ বলল- "বাড়ি থেকে অনুমতি দিচ্ছে না", কেউ বা বলল- "চাকরিতে ছুটি পাচ্ছি না"। এক এক করে মিশন বেগুনকোদর অভিযানের মেম্বার লিস্ট কমতে শুরু করল এবং বিকেল চারটের আগেই সম্পূর্ণ লিস্টটা খালি হয়ে গেল।
এদিকে আমি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সকলকে কথা দিয়ে বসেছি যে "রবিবার মধ্যরাতে লাইভ আসব"। আর আমি প্রীতম গুহ, কথা যখন দিয়েছি, কথার খেলাফ করব না, কথা দিয়েও মিশন ক্যানসেল হয়ে গেলে প্রেসটিজ ইস্যু হয়ে যাবে। তাই স্থির হল এই মিশনে আমি একাই যাব। বন্ধু ক্ষীরোদকে অবশ্য আমি পরে পেয়েছি, কারণ তাকে আমি এই অভিযানের মেমবার লিস্টে প্রথম থেকেই রাখিনি। ফেসবুকে আমার পোস্ট দেখেই মিশনের কথা সে জানতে পারে। বিকেলেই তার সাথে আমার ফোনে যোগাযোগ হয়, মিশনের কথা শুনে সে এক পায়ে রাজি, তবে এই মিশনে যে কেউ যাচ্ছেনা এই কথা তার কাছে গোপন রাখি। একা বাইকে দুজন যাবো শুনলে সে হয়তো আসবেই না।
মিশনের কথা শোনার আধঘন্টার মধ্যে শিয়ালদহ থেকে রওনা হয় বন্ধু ক্ষীরোদ। মিশনের নির্ধারিত সময়সীমা অনুসারে আমরা রওনাই হতে পারলাম না কারণ বর্ধমান পৌছাতে তার সময়ই লেগে গেল সন্ধ্যা সাতটা। তবে বিষয়টা গোপন থাকলনা বেশিক্ষন, বর্ধমান পৌঁছে সে যখন জানতে পারল এই মিশনে কেউ যাচ্ছে না তখন আমায় গালাগালি দিয়ে চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে দিল আমার এই বন্ধুটি। আমি তাকে জানিয়ে দিই সে যদি নাও যায় মিশন ক্যানসেল হবে না কোনোমতেই। তবে আমার এই বন্ধুটি আমার খুব প্রিয়, আমি একা যাব শুনে সে শেষমেষ সাথ দিলোই।
সাথে টিম না থাকায় অগ্রিম টাকা দিয়ে বুক করে রাখা গাড়ি ক্যানসেল করে দেওয়া হল। স্থির হল 231 কিলোমিটার পথ দুজন বাইকেই যাবো। পুরুলিয়ার বেগুনকোদর রেল স্টেশন, গুগল মানচিত্র অনুসারে আসানসোলের Nh থেকে ভেঙে যেতে হয় আরো ১১১ কিলোমিটার পথ।
একে চরম ঠান্ডা, তার ওপর পুরুলিয়ার পাথুরে এলাকার নির্জন পথ, মধ্যরাতের এই পরিবেশটা ভাবা মাত্র হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। ভূত নয়, তবে রাতের নির্জন এলাকার এই রাস্তায় ছিনতাইয়ের ঘটনা তো ঘটতেই পারে, প্রানহানীরও আশঙ্কা আছে। তবে হিন্দিতে প্রচলিত একটি কথা আছে - "দুনিয়া কা সাবসে বারা নাশা Risk", তাই স্থির হল আমরা যাকিছু হল্ট আসানসোলের আগে nh-এই করব, তারপর বাকি একশো এগারো কিলোমিটার পথ গাড়ি ননস্টপ এগোবে তা সে যতই শীত করুক, স্পিডোমিটার 100-নীচে নামবেই না। অবশ্য রাস্তা খারাপ থাকলে গাড়ির গতিবেগ 60-70kmph অ্যাভারেজ থাকতে পারে। দূরে যাত্রার জন্য উন্নত সিস্টেমের বাইক নাহলে রাস্তার প্রতিমুহূর্তে বিপদের আশঙ্কা থাকে। আমার বাইকটিতে নয় খানা সেন্সর, টার্নিং-এর মুহূর্তে 45 ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে কোনো মোড় বেঁকলে ইঞ্জিন আপনা হতেই বন্ধ হয়ে যায়, এছাড়া O2 সেন্সর এবং রেডিয়েটর ছাড়াও রয়েছে আরো ছয়টি সেন্সর যা রাস্তার যেকোনো বিপদের আশঙ্কা হতে সর্বদা রক্ষাকবজ হিসেবে সেফ্টিমুডকে অন করে রাখে।
প্যাকিং সেরে ফেলা হল একঘন্টার মধ্যে। সাথে নিলাম বেশ কিছু শুকনো খাবার, কিনে ফেলা হল একটা হাই সেলের টর্চ, তিনটি বড় মোমবাতি, কর্পূর, ধূনো, সাথে নেওয়া হল বেশ কয়েকটি ঘুঁটে, দু প্যাকেট চন্দন ধূপ, হনুমান চল্লিশা পুস্তক ও গীতা। এছাড়াও দুজনেরই সাথে ছিল গঙ্গা জল। এছাড়াও পাওয়ার ব্যাঙ্ক, ছবি তোলার জন্য নেওয়া হল DSLR, প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করতে পরনে ভারী পোষাক রাইডিং হ্যান্ডগ্লাভস, মুখে রুমাল মাথায় হেলমেট এবং জুতো মোজা সহ সর্বাঙ্গ ঢেকে ফেলা হল। তবে তাড়াহুড়োতা বশত আমার বন্ধুটি সোয়েটার বা জ্যাকেট নিতে পারেনি এমনকি জুতো মোজাও না। আমার বাইকের ব্যাকসিটটি স্প্লিট যা রাইডিং সিট থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে। তাই পিছনে কেউ বসলে উচ্চগতিতে থাকা এই বাইকের সমস্ত হাওয়ার সাথে বেশিরভাগ লড়াইটা তাকেই করতে হয়।
অবশেষে যাত্রা শুরু হল, তখন রাত্রি প্রায় আটটা। জি.টি রোড শেষ করে Nh এ ওঠার পরই পার্শ্ববর্তী পেট্রলপাম্প থেকে ফুয়েল ট্যাঙ্ক ফুল করে নেওয়া হল। তারপর শুরু হল আমাদের মিশন বেগুনকোদর। যাত্রার শুরুতেই বড়সড় বিপদের হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পাই আমরা। আমার একটি বিশেষত্ব হল আজো পর্যন্ত একদিনও আমি গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করি নাই, তাই অ্যাক্সিডেন্টের সামান্যতম অভিজ্ঞতা যেমন নেই তেমনি গাড়িতে হাল্কা স্ক্র্যাচও কোথাও নেই।
120 কিলোমিটারের Nh শেষ করার পর আসানসোল পুরুলিয়ার যে 111 কিলোমিটারের সিঙ্গেল রোডটি আমরা পাবো সেটির সম্পর্কে আমরা কেউই অবগত নই, রাস্তা খারাপ থাকলে পৌছতে অনেক সময় লেগে যাবে, অথচ সকলকে প্রমিস করা সময়ানুসারে রাত বারোটার মধ্যেই ওখানে পৌছে লাইভে আসতেই হবে, কারণ আজ আমাদের সাথে এই লাইভের জন্য রাত জাগছেন অসংখ্য মানুষ। তাই যাত্রাপথের এই দুর্গাপুর আসানসোল Nh এর 120 কিমি পথটাই সময় কমিয়ে দেওয়ার একমাত্র ভরসা।
রাত্রি প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ ঠাণ্ডা প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করতে করতে দূর্গাপুর nh ধরে যখন আমরা এগোচ্ছি তখন গাড়ির স্পীডোমিটার অনুসারে আমাদের গতি 135 kmph। শুনশান ফাঁকা বাইপাশে একটার পর একটা লরি ও টেক্সিকে ওভারটেক করে এগিয়ে চলেছি। হঠাৎ চোখে পড়ে অনতি দূরে পেট্রল পাম্প থেকে রাইট সাইড ইন্ডিকেটর জ্বালাতে জ্বালাতে nh এ উঠছে একটি কুড়ি চাকার বড় লরি, যা ধীরে ধীরে ব্লক করছে সমস্ত লেফ্টসাইড nh টিকেই। বাইকের গতি 135 kmph, আমাদের ও লরিটির মাঝের দূরত্ব একশো মিটারেরও কম যা হুহু কমে আসছে,। এতো দ্রুত গাড়ি থামাবো কিভাবে? আমার বাইকের দুটো চাকাতেই ডিসব্রেক, সজোরে মারলে দুটো চাকাই লক হয়ে থেমে যাবে এতোটাই গতিতে, তাই এই স্পীডে এতো জোরে ব্রেকিং-এ গাড়ি হয়তো থামবে কিন্তু টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে আমরা পরবই, দুটো দিকেই মৃত্যু, বাঁচার পথ একমাত্র লরিটিই, যদি লরিটি এর মধ্যে পুরোটা রোডে উঠে যায় তখন হয়তো একটু হলেও লরিটির পিছনে কিছুটা গ্যাপ পাওয়া যাবে, আমি কাটিয়ে নিতে পারব। এই মুহূর্তে মেইন ইম্পরটেন্ট হল সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি আর কম সময়ে তাড়াতাড়ি ডিসিশন নেওয়ার ক্ষমতা।
লরিটি নজরে আসার পর থেকে মাঝের দূরত্ব কভারের মোট সময় ছিল প্রায় 10 সেকেন্ডেরও কম, ধীরে ধীরে ব্রেকিং করতে করতে স্পীড কাট করতে থাকি কনটিনিউ। তবে গাড়ি থামাতে পারিনি এতো কম সময়ে, যখন লরিটির একেবারে কাছে চলে আসি তখন ভাগ্য ভালো লরিটির পিছনে একটি ফাঁক পেয়েছিলাম যেটা ছিল মাটির রাস্তা, আর সেখান দিয়েই প্রায় 75 kmph গতিতে আমরা বেরিয়ে যেতে সক্ষম হই। বেরিয়ে যাবার পর আমাদের দুজনেরই মনে হয় মৃত্যুকে যেন খুব কাছ থেকে আমরা দেখলাম, শিরদাঁড়া দিয়ে দুজনেরই ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
ভয়াবহ দুর্ঘটনার হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পাই আমরা। ভয়ের সম্মুখীন হওয়ার পরই আমার পাকস্থলী খালি হয়ে গেল, দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়ে টেনশনে আমার পেল খিদে আর আমার বন্ধুটির পেল অন্যকিছু। স্থির হল যাত্রাপথের সামনে যে ধাবাই পড়বে সেখানেই আমরা হল্ট করব। এরই মধ্যে ঘটে যায় আরো একটি ঘটনা। রাতের অচেনা রাস্তায় আমাদের গাইড বলতে গুগল ম্যাপ ছাড়া সহকারী আর কেউই ছিল না। গাড়ি আমি চালাচ্ছি, এবং পিছনে বসে আমার বন্ধুটি ক্রমাগত নজর রেখে চলেছে গুগল ম্যাপের দিকে। সাধারণত দুর্গাপুর Nh এ ম্যাপ দেখার প্রয়োজন পড়ে না, কারণ এপথ আমাদের পরিচিত, কিন্তু আমার বন্ধুটি বলল আরো একটি শর্টকাট রাস্তা সে দেখতে পাচ্ছে, একটি রাস্তা বাইপাসের বাম সাইড থেকে নেমে যাচ্ছে, ফলে আমাদের আসানসোল পর্যন্ত যেতে হবে না, এই রাস্তা দিয়ে গেলে আমরা কম সময়ে পুরুলিয়া রোডে উঠে যাব। গুগল ম্যাপ অনুযায়ি আমাদের সামনেই তিন কিলোমিটারের মধ্যেই পড়বে সেই রাস্তা। তাই হল, দুর্গাপুর nhকে ডানপাশে রেখে সেই রাস্তা ধরে নিচে নেমে গেলাম, ঘুরঘুট্টি অন্ধকার সেই রাস্তা, একটা জনপ্রানী নেই সেখানে, রাস্তা ক্রমশ সরু হচ্ছে, প্রায় এক কিলোমিটার এগিয়েছি, সরু হতে হতে একসময় রাস্তা শেষ হয়ে গেল, দাঁড়িয়ে পড়লাম। সামনে রাস্তার ওপরেই মানুষ সমান বড় বড় কাঁটা ঝোঁপ, সামনে খাল নাকি নদী ঠিক ঠাওর হল না, তার ঠিক পাশ বরাবর নেমে গেছে বালির রাস্তা। দুজনেই মারাত্মক ভয় পেয়ে গেলাম। এই রকম জায়গাগুলিতেই চুরি ছিনতাই মূলক ঘটনা ঘটে থাকে।
তবে একদিক দিয়ে ভেবে দেখতে গেলে এগুলোও অ্যাডভেঞ্চারের একটি অংশ। মধ্য রাতের নির্জন পথ, মাঝরাস্তায় গাড়ি খারাপ হয়ে যাবে, রাস্তা গুলিয়ে যাবে এসব ঘটনা না ঘটলে বুঝলেন কি না, অ্যাডভেঞ্চার বিষয়টা ঠিক জুতসই হয় না।
অতঃপর আমি ইউটার্ন মেরে আবার Nh ধরলাম। মিনিট পাঁচেক চলার পরই nh এর বামপাশে চোখে পড়ল সুসজ্জিত একটি ধাবা। সেখানেই আধঘন্টার জন্য হল্ট করলাম আমরা। বন্ধুটি বলে উঠল- "ভাই এখানে ঢুকব না, ঐ দেখ বাইরে রয়্যাল স্টাগের সাইনবোর্ড, এখানে মদ খায় সবাই, ছিঃ!"
আমি বললাম- "আরে ভিতরে রুটিও পাওয়া যায় রে গান্ডু, উফ্!" দু-একমিনিট তর্ক বিতর্ক চলার পর অতঃপর আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। তিনটে করে তন্দুরি রুটি, এক প্লেট চিলিচিকেন ও একপ্লেট কষা খাসির মাংস অর্ডার দেওয়া হল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই খাবার এসে গেল, খেয়ে যে কতটা তৃপ্তি অনুভব করলাম তা হয়তো নিজস্ব ভাষ্যমতে উল্লেখ করা অসম্ভব। আমার বন্ধুটি মোটা মোটা তিনটি তন্দুরি রুটির দুটো খেয়েই পেট ভরে গেল, কিন্তু আমার পাতের তিনটি রুটি খেয়েও আমার খিদে মিটল না, সুতরাং আমি আমার বন্ধুটির পাতের বাকি একটি রুটি তো খেলামই উপরন্তু আরো পাঁচটি তন্দুরি রুটি অর্ডার দিলাম আমার জন্য। এদিকে ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় দশটা ছুঁইছুঁই, আর দুঘন্টা পর বেগুনকোদরে লাইভ দেখবো বলে উত্তেজিত আগ্রহী মানুষ ঘুম বর্জন করে ওৎ পেতে আমার ফেসবুক প্রোফাইল পানে অপেক্ষা করছে আর আমি বেগুনকোদর থেকে প্রায় 200 কিলোমিটার দূরে চোব্যচোষ্য গিলেই চলেছি। খাওয়া শেষে ক্ষীরোদ হাগতে চলে গেল ধাবারই নিকটবর্তী শৌচাগারে, আর আমি ডিনারের বিল মিটিয়ে সিগারেটের প্রথম সুখটান দিতে দিতে ফেসবুকে আপডেট দিলাম- "এখনো অনেকটাই পথ বাকি, বারোটার মধ্যে গন্তব্যে পৌছানো অসম্ভব।"
এরপর আবার যাত্রা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। এতোক্ষন ধাবার মধ্যে থেকে গরম পরিবেশটা গা সওয়া হবার পর বাইরের বরফ ঠান্ডা পরিবেশটা শরীরের মেরুদণ্ড অবদি নাড়িয়ে দিল। খেতে নিতে হাগতে একঘন্টারও বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে, আর কোথাও হল্ট নয়। এরপর সোজা আসানসোল গিয়েই থামব।
এরপর সময় কেটে গেছে আরো একটি ঘন্টা, রাতের শুনশান ফাঁকা বাইপাশ বাম ও ডানপাশের একটার পর একটা ল্যাম্পপোস্টকে অতিক্রম করতে করতে ছুটে চলেছি অ্যাডভেঞ্চারের পথে। একবার দুর্ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার পর আর গতি বাড়াতে সাহস হয়নি মোটেই। তাই পথ অনুপাতে সময় বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকটাই। মোট 120 কিলোমিটার পথ শেষ করে (আসানসোল nh) পুরুলিয়ার সিঙ্গেল রোডের মোড়ে যখন এসে দাঁড়ালাম তখন রাত 11:12। কিছুটা হলেও শান্তি অনুভব করলাম, তখনো বাকি 111কিলোমিটার পথ। nh এর বাম পাশ ঘেঁষে নেমে গিয়েছে আসানসোল চিত্তরঞ্জন সিঙ্গেল রোড, এই রাস্তাটাই আমাদের নিয়ে যাবে আজকের মিশন স্টেশন বেগুনকোদরের গন্তব্যে। পাশেই একটি মুদিখানা দোকান, খুব সম্ভবত বন্ধ হতেই চলেছে, সেখান থেকে দু প্যাকেট গোল্ড ফ্লেক কিনে রওনা হলাম পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে।
দশ পনেরো মিনিট টানা চালানোর পর শহরতলিতে এসে পৌঁছালাম, জনবসতিপূর্ণ এলাকা ধীরে ধীরে জনশূণ্য ও দুর্গম হতে চলেছে। এপথে অনেকগুলি লেবেল ক্রসিং পড়ে, যার প্রথমটি পার করার পরই অনুভব করলাম শূণ্যতা কে, পথের আশেপাশে একটি ছোট্ট দোকানঘরও নজরে পড়লনা, একরাশ হিমশীতল বাতাস আমাদের আষ্টেপিষ্টে জাপটে ধরল, দুপাশে কেউ কোথাও নেই, আছে কেবল দুপাশে সারি সারি গাছ, এবং ধানের জমি আর যার বুক চিড়ে বেরিয়ে গেছে শেষ না হওয়া জনশূণ্য পথ। গাড়ির হেডলাইটে যতটুকু দৃষ্টিগোচর হওয়া সম্ভব ততোটুকুই হাতরে এই পথ এগোনো। চতূর্দিকে জমাট বাঁধা গাঢ় অন্ধকার যার মধ্যে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছি আমরা। এবরোখেবড়ো অসংখ্য তারাদের সুসজ্জিত আকাশের একফালি চাঁদ যেন মুখ বেঁকিয়ে তাচ্ছিল্য সহকারে আমাদেরকে দেখে হেসে চলেছে। হঠাৎই উপলব্ধি করলাম গোটা গাড়িটা কাঁপছে, পরে বুঝলাম পিছনে বসে থাকা আমার বন্ধুটি ঠাণ্ডা হাওয়ার সাথে মরিয়া হয়ে যুদ্ধ চালাচ্ছে। আমার হাতে ড্রাইভিং হ্যাণ্ডগ্লাভস থাকা সত্ত্বেও শীতে হাত আরষ্ট হয়ে যাচ্ছিল প্রতিমুহূর্তে। আঙুল নড়ছে না, ক্লাচ মারতে পারছিনা, অসম্ভব কষ্ট। দ্বিতীয় লেবেল ক্রসিংটা পেরোনোর পরই চোখে পড়ে বেশ কিছু আদিবাসী ছেলেরা রাস্তার ধারেই আগুন পোহাচ্ছে, পাশাপাশি ওপরে পিচ গরমের কাজ অব্যাহত। এপথে হল্ট করবনা ভেবেও শরীর গরম করার জন্য সেখানে মিনিট দশেকের হল্ট করতেই হয়েছিল। কিন্তু তাতে তো আরো বেশি কষ্ট। শরীর গরম হওয়ার পর আবার যাত্রা করতেই তো হিমশীতল ঠাণ্ডা বাতাস আরো বেশি করে প্রভাব ফেলবে গরম শরীরে। এরপর সময় কেটে গিয়েছে অনেক, দুর্গাপুর nh শেষ করার পর আসানসোল পুরুলিয়া সিঙ্গেল রোডটি কেমন হবে তা নিয়ে প্রথম থেকেই বেশ ধোঁয়াশায় ছিলুম, তবে এখানে এসে রাস্তাটার প্রেমে পড়ে গেলাম। রাস্তা তো নয় যেন মোজায়েক করা মেঝে, একটা ছোট্ট গর্ত বা নুড়ি পাথরও কোথাও নেই এই পথে, আধফালি চাঁদের মরা আলোয় নির্জন এই পথের মধ্যরাতের এই পরিবেশটায় ব্যাকসিটে গার্লফ্রেন্ডকে খুবই মিস করছিলাম। নির্জন শান্ত এই পথে ইঞ্জিনের প্রবল গর্জন ছাড়া আর কিছুই প্রায় শোনা যাচ্ছে না। পুরুলিয়ার প্রায় মাঝামাঝি চলে এসেছি আমরা, বামপাশে জয়চণ্ডী পাহাড়কে পিছনে ফেলে যখন রুদ্ধশ্বাসে ননস্টপ এগিয়ে চলেছি হঠাৎই পিছনে বন্ধুটির তারস্বরে বেসুরো গান শুরু হল, ফলে চমকে উঠেছিলাম। "খা খা খা, আমায় চুইসে চুইসে খা, আমায় গিলে গিলে খা..."
পরে বুঝলাম প্রবল শীতে শরীরকে গরম রাখবার উদ্দেশ্যেই এই রেওয়াজি প্রচেষ্টা।
ইতিমধ্যে তিনবার তিনটি কালো বেড়াল রাস্তা কাটায় তিনবার দাঁড়িয়ে যেতে হয়েছিল। চমকাবার কিছু নেই, কালো বেড়াল তো ভূতের সাথে যায় ভালো। এরপর আবার চলল ইঞ্জিন, ঘুরল চাকা। গাঢ় কুজ্ঝটিকা গ্রাস করেছে সমগ্র পথটিকেই যার গভীরতায় আমরা তলিয়ে চলেছি ক্রমাগত। গুগল মানচিত্র অনুসারে গন্তব্যের প্রায় 25 কিলোমিটার পথ যখন বাকি তখন চোখে পড়ে বেশ কিছু টর্চের জোড়ালো আলো যা আমাদের দিকেই লক্ষ করে ধেয়ে আসছে। ডাকাত হতে পারে তাই গতি কমানোর যায়গায় গতি বাড়ালাম। কাছে যেতেই দেখলাম পুলিশ, গাড়ি থামালাম।
দুটো প্রশ্ন ধেয়ে এলো আমাদের উদ্দেশ্যে-
"কোথায় যাবেন? কোথা থেকে আসছেন?"
কোনরকম মিথ্যে না বলে সঠিক উত্তরটাই দিলুম। দূরে কোথাও গেলে আমি নিজের কোনো খুঁতই রাখি না যে পুলিশ অ্যারেস্ট করবে। সাথে দুজনের ডবল হেলমেট, পায়ে জুতো, রাইডিং হ্যাণ্ড গ্লাভস, এছাড়াও গাড়ির পেপার, লাইসেন্স সবই ছিল। খুঁত পেলে তো আটকাবে।
তবে সেসব অবশ্য দেখতে চাননি বাবুরা, ভদ্রভাবে বিনয়ি সুরে প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতেই পথ ছেড়ে দিলেন তারা।
টানা আড়াই ঘন্টা চালানোর পর পিছন থেকে বন্ধুটির সাড়া এলো "এসে পড়েছি কাছাকাছিই"। যে গুগল ম্যাপটা এতক্ষণ পথ দেখিয়ে এতোদূর এনেছে সেই ম্যাপ পঞ্চাশ মিটারের মধ্যেই ডানদিকেই স্টেশনের নির্দেশনা দিচ্ছে। ডানদিক লক্ষ করে আমাদের দৃষ্টি সজাগ, চোখের পলক পড়ছেনা, তবু আমরা কোনো স্টেশনের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছিনা। অতএব স্থানীয় লোকই ভরসা। কিছুদূর এগোতেই বামপাশে চোখে পড়ল একটি লেভেল ক্রসিং, খুব সম্ভবত স্টেশন বেগুনকোদরেরই পোস্ট এটি। গাড়ি থামিয়ে স্টেশনটির সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই উত্তর এলো- "ভূত দেখতে যাচ্ছেন তো? এখানে পাকা রাস্তা ধরে পাঁচ ছয় হাত গেলেই বাম পাশে দেখতে পাবেন একটি মাটির রাস্তা সেই রাস্তা ধরে চার পাঁচশো হাত এগোলেই পাবেন রেললাইন এবং লাইনের ওপারেই পাবেন স্টেশনটি।"
তাই করা হল। পোস্টের বাম পাশে লেভেলক্রসিং পার করে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে ভয়ঙ্কর বন্ধুর (উঁচুনিচু) পথে ধূলো উড়িয়ে নাচতে নাচতে বেশ কিছুটা যেতেই গাঢ় অন্ধকারে আধখানা চাঁদের মরা আলোয় পথের ডানপাশে চোখে পড়ল ছোট্ট স্টেশন বিল্ডিংটির কঙ্কাল অবয়ব।
মিশন বেগুনকোদর- (পর্ব ৩)
তারিখ : ১৮ নভেম্বর ২০১৮
বেগুনকোদর রেলস্টেশন, রাত বাড়লেই যেখানে অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে স্টেশনসংলগ্ন সমস্ত গ্রামটিকে, পুরুলিয়া জেলার প্রায় শেষ প্রান্তে অবস্থিত অযোধ্যা পাহাড়ের গা ঘেঁষে মনোরম প্রাকৃতিক শোভার সাক্ষী হয়ে মূর্তিমান বিভীষিকার ন্যায় দণ্ডায়মান বহু পূরাতন বা প্রাচীন এই ছোট্ট স্টেশনঘরটি। একসময় এই স্টেশনটি রেলমানচিত্রে বাকি স্টেশনগুলির মতনই সাধারণ মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম ছিল। তখন বেগুনকোদর এলেই এখানে থামত সমস্ত প্যাসেঞ্জার ট্রেন। স্টেশন চত্তরের আশেপাশে ছিল বড় খোলা হাট বাজারও। তারপর হঠাৎ কি থেকে কি যেন হয়ে গেল, পরিস্থিতি গেল পাল্টে। শোনা যায় আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে এই স্টেশনের অন্তর্গত রেলকোয়াটারে স্টেশনমাস্টার এবং তার স্ত্রী যুগ্মভাবে খুন হন, পরদিন স্টেশনের নিকটবর্তী পাতকূয়োর মধ্যে থেকে পাওয়া যায় তাদের মৃতদেহ। তারপর থেকেই স্টেশন সংলগ্ন সমগ্র গ্রামে রটে যায় নানান ধরনের ভয়ের কাহিনী, শুরু হয় অশরীরী উপদ্রব। অশরীরী কর্মকাণ্ড শুরু হতেই রাতারাতি স্টেশন ছেড়ে পালিয়ে যান সমস্ত রেলকর্মী, ভারতীয় রেলদপ্তরের নির্দেশানুসারে বন্ধ করে দেওয়া হয় এই স্টেশন। রাতের অন্ধকারে তো দূর, ভরদুপুরেও এই স্টেশনের আশেপাশে দেখা যায়না কাউকেই। এরপর কেটে যায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময়। তবে প্রাক্তন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় 2010 সালে আবার খুলে দেওয়া হয় এই স্টেশন। তবে তা শুধু প্যাসেঞ্জার হল্ট হিসেবে। বহু পুরাতন এই স্টেশনের ভাঙাচোরা ইমারতটিকেই পুনরায় রঙ করে সংস্কার করে দেওয়া হয় রেল দপ্তরের পক্ষ থেকে। কিন্তু তাতে কি, আগের মতন স্টেশনচত্তরের রমরমে ব্যস্ততা আর ফিরে এল না। দিনের আলো যতক্ষন থাকে ততোক্ষন এখানে থামে হাতেগোনা কয়েকটি ট্রেন, বিকেল পাঁচটা নাগাদ এখানে থামে রাঁচী চন্দ্রপুর ধানবাদ প্যাসেঞ্জার, এটাই দিনের শেষ ট্রেন যা এখানে হল্ট করে, ভারতীয় রেল দপ্তরের নির্দেশনায় এরপর আর কোনো ট্রেনের স্টপেজই দেওয়া হয়নি এখানে। সূর্যাস্তের পর ট্রেন আসে ট্রেন যায়, কিন্তু রেল স্টেশন হওয়া সত্ত্বেও এখানে কোনো ট্রেন থামা তো দূর, এই স্টেশনের বুকের ওপর দিয়ে কোনো ট্রেন ধীর গতিতেও যায়না। সন্ধ্যার পর স্টেশনটিতে দেখা যায় না কোনো রেলকর্মী, টিকিটঘর সংলগ্ন রেল কোয়াটার সব তালাবন্ধই পড়ে থাকে। একটা আলোও জ্বলে না সেখানে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে আজো সেখানে গেলে রহস্য জনকভাবে নানান ভুতুরে কর্মকাণ্ডের দেখা মেলে, স্টেশন এবং স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় হঠাৎ করেই কমে যায় তাপমাত্রার পারদ। ভূততত্ত্বের ব্যাখ্যানুসারে বলা হয় অশরীরী শক্তি যখন হঠাৎ করেই অ্যাকটিভ হয় তখনই কোনো ঘরের বা এলাকার পারদ হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায়, এমনকি জ্বলে থাকা আলোও নিভে যায়। স্থানীয়রা বলেন আজো নাকি সেখানে গেলে নানান ধরনের অশরীরী কার্যকলাপের প্রমান মেলে, আকাশে নাকি খেলা করে নানান ধরনের উজ্জ্বল আলো, অন্ধকারে শোনা যায় অশরীরীদের ফিসফাস। এছাড়াও এই পঞ্চাশ বছরে এই বেগুনকোদর গ্রামে পঞ্চাশ থেকে ষাটবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। যদি ভুতুরে কর্মকাণ্ড নাই হয়ে থাকে তবে কেন এই ধরনের ঘটনা? কেন আজো সমস্ত স্টেশনগুলিকে ছেড়ে এই স্টেশনটিকেই এড়িয়ে চলে মানুষ? তাই ভূত আছে কি নাই, রীতিমতন ভূত দেখা বা উপলব্ধি করার জন্যই আমাদের আজকের এই অভিযান যার নামকরণ মিশন বেগুনকোদর।
প্রবল ঠাণ্ডায় টানা 231 কিলোমিটারেরও বেশি দুর্গম পথ অতিক্রম করার পর আমাদের বাইকটি যখন স্টেশনের সামনের মাটির রাস্তাটায় এসে থামল তখন চারপাশে গাঢ় কালো অন্ধকার ব্যতিত আর কিছুই প্রায় ছিল না। বাইকের ইঞ্জিনের প্রবল গর্জনে মাটি কাঁপছে, যার শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে ফাঁকা মাঠের দূর দূরান্তে। ইঞ্জিন বন্ধ করতেই সমগ্র এলাকাটায় ঝুপ করে নেমে আসে ভয়ানক নিস্তব্ধতা ও থমথমে ভাব, মাটিতে একটা পিন পড়লেও শব্দ পাওয়া যাবে। চারিপাশের মাঠে অসংখ্য জোনাকিরা ভৌতিক দীপাবলির শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, পারিপার্শ্বিকভাবে সুবিশাল স্টেশন বিল্ডিংটি জুড়ে ঝিঁঝিঁ দের ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিকটাও পরিবেশটিকে বেশ মানাসই করে তুলেছে যা প্রগাঢ় রহস্যে জমজমাটিয়া। একটা আলোও স্টেশনে জ্বলছে না, অথচ এখানে আসার পথে পাঁচ কিলোমিটার দূরে আমরা আরো একটি স্টেশন(Jhalida/ঝালিদা) পেয়েছি, যার প্লাটফর্ম থেকে শুরু করে স্টেশনঘরটি ছিল আলোয় আলোকিত। যারা বলেন এখানের ভৌতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনার ইতিবৃত্ত যা নাকি লোকমুখে রটানো অথবা আলোচ্য বিষয়টি শহুরে ভয়পিপাষু মানুষের ভ্রান্ত ধারনা, তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন এখন একটাই, তাহলে বেগুনকোদরে একটা আলোও কেন জ্বলেনা? রেল সরকারের কি একটা ডুম কেনারও সামর্থ্য নেই? সামর্থ্য যদি নাই থেকে থাকে তবে কেন এই স্টেশনের ঠিক আগের স্টেশনটি অসংখ্য আলোয় আলোকিত এবং সুসজ্জিত? জবাবটা অবশ্যই দেবেন কমেন্টে।
গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম, আধখানা চাঁদের মরা আলোয় চকচক করছে স্টেশনের অগ্রভাগে আপ এবং ডাউন রেললাইনগুলি, কোনো আলো না থাকলে স্টেশনের সম্মুখে দাড়িয়েও স্টেশন বিল্ডিংটি নজরে আসা অসম্ভব তাই বাইকটি লাইনের ওপারে রেখে স্টেশনের দিকে মুখ করে দুটো হেডলাইটই স্টেশনের দিকে জ্বালিয়ে ফেলা হল। বাইকের জোড়ালো দুটি হেডলাইটের আলো একই সাথে স্টেশনের ওপর পড়তেই বোঝা গেল স্টেশন বিল্ডিংটির অবয়ব। রাত তখন দুটো পনেরো, জোড়ালো আলোয় স্টেশন চত্ত্বর দিন হয়ে উঠল। বন্ধু ক্ষীরোদের হাইসেলের টর্চের আলোয় চকচক করে উঠল স্টেশন লাগোয়া হলুদ সাইনবোর্ডটি যাতে তিনটি ভাষায় কালো কালিতে লেখা এই স্টেশনের পরিচিতি। শুরু হল ফেসবুক লাইভ, হাজার হাজার ভয়পিপাষু, ভূতপ্রেমী অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষকে সাক্ষী রেখে শুরু হল ভৌতিক ইনভেসটিগেশন।
আপ ও ডাউন লাইন পেরিয়ে দুজনেই চলে গেলাম স্টেশনবিল্ডিংটির একেবারে সামনে। স্টেশনের সামনে প্লাটফর্ম বলতে নেই কিছুই, আছে কেবল উঠান মতন বাঁধানো অনেকখানি জায়গা যা স্টেশনের সিঁড়িটি শেষ হবার পরই বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে বিস্তারিত। এতদূর যখন এসেছি স্টেশনটির অন্দরমহলে প্রবেশ না করলে হয়তো পুরো মিশনটাই ব্যর্থ। আর তাই ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নেওয়া সিঁড়ির ধাপগুলি একেএকে ভেঙে উপরে উঠলাম আমরা। কয়েকটা ধাপ ওপরে ওঠামাত্রই বরফ ঠাণ্ডা একদল শীতল বায়ু আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরল আমাদের, যা এতক্ষন রাস্তায় থাকা শীতলতার তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ শীতল। বুঝলাম তাপমাত্রার পারদ নামছে দ্রুত গতিতে, লাইভ চলাকালীন মোবাইলটা ঠকঠক করে কাঁপছে, ফলে লাইভের ওপাশে বসে যারা ভিডিওটি দেখছেন তারাও কম্পমান পরিবেশ দেখতে পাচ্ছেন স্টেশন বেগুনকোদরের। জোরালো টর্চের আলো ঘুরে বেড়ালো গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত স্টেশন বিল্ডিংটির আনাচে কানাচে। টিকিট ঘর এবং প্রতীক্ষালয়ের কাঠের জানলা দরজা বন্ধ। পুরু ধূলোর আস্তরন গ্রাস করেছে সমগ্র জায়গাটিকেই। একটু পাশেই বড় দেওয়ালটির গায় কালো কালো দাগ নজরে এলো, টর্চের আলো সেদিকে পড়তেই গা টা ছ্যাঁৎ করে উঠল, এতো রক্তের দাগ, একমগ রক্ত দেওয়ালে ছুঁড়ে মারার পর তা শুকিয়ে গেলে এমন দাগের সৃষ্টি হয়। আশেপাশে চরম নিস্তব্ধতা গ্রাস করছে সমস্ত স্টেশনবিল্ডিংটিকেই। চতূর্দিকে বিরাজমান গা ছমছমে পরিবেশ। নিজের হার্টবিটের শব্দ কান পর্যন্ত এসে ঠেকছে। অদূরেই কোথা থেকে হঠাৎ যেন শেয়াল ডেকে উঠল।
আমার বন্ধুটি হয়তো আমার থেকেও বেশি সাহসী তাই স্টেশন বিল্ডিংটির ভিতরে আনাচে কানাচে ঘোরাঘুরির পর বারবার বলছিল- "কেউ আছেন? থাকলে জানান দিন প্লিজ।" লাইভ টেলিকাস্ট চলছে অক্লান্তভাবে, ভিউয়ার্স বেড়েই চলেছে প্রতি মিনিটে। অজস্র আগ্রহী মানুষ অপলক দৃষ্টিতে ভূত দেখার বাসনায় ওৎ পেতে বসে মোবাইল ও কম্পিউটারের সামনে। অদূরে শেয়ালটা ক্রমাগত ডেকেই চলেছে। সারা স্টেশন বিল্ডিংটির আনাচে কানাচে চষে ফেলার পরও যখন কিছুই দেখতে পেলামনা তখনও ক্ষান্ত হলাম না আমরা। হয়তো তারা আমাদের দেখা দিতে চাননা। এরপর শুরু হল জোরজবস্তি, "ভূত আসবে না ওর ঘাড় আসবে" এরকম খানিকটা আরকি। স্টেশনের সামনে জ্বালানো হল মোমবাতি, কাঁধের বড় বড় ব্যাগ গুলি নামিয়ে রেখে স্টেশনের মধ্যেই বসলাম প্ল্যানচেটে। চোখ বন্ধ করে একমনে স্মরণ করা হতে থাকলো অজানা পৃথিবীর অশরীরী আত্মাদের। মিনিট দশেক এভাবে চলল, এরপরই ঘটল বিপত্তি...
বাইকের হেডলাইটটি হঠাৎ আপনা হতেই কমে যেতে লাগল, আমার বাইক নতুন, 4000 কিমির বেশি চলেওনি, তাছাড়া আজ সকালেই শোরুম থেকে 3ঘন্টার ফুল চার্জ করেই রওনা হয়েছি, এছাড়াও বাইক চললে হেডলাইট আপনা হতেই চার্জ হয়। সুতরাং এরকম অস্বাভাবিক ঘটনা মোটেই আশাপ্রদ নয়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আলো একেবারে কমে গিয়ে বাল্বের ফিলামেন্ট তারগুলি বেড়িয়ে পড়ল। আমি লাইনের ওপারে দ্রুত গিয়ে চাবি বন্ধ করে হেডলাইটটি একেবারেই বন্ধ করে দিলাম। সাথে সাথে পুনরায় গাঢ় অন্ধকার নেমে এলো স্টেশনটিতে। শুধুমাত্র মোমবাতি ছাড়া আর একটিও আলো সেখানে অবশিষ্ট রইল না। এমতাবস্থায় ভয় পেলে নেগেটিভ শক্তি আরো বেশি গ্রাস করবে আমাদের তাই আবার শুরু হল প্ল্যানচেট, আবার ফিরে এলো অশরীরী আত্মাদের উদ্দেশ্যে চোখ বন্ধ করে আমন্ত্রণ জানানোর একাগ্রতা। কতক্ষন এভাবে কেটেছে জানিনা, হঠাৎ আমার পিছনে কারোর উপস্থিতি অনুভব করলাম, ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি একজন পুরুষ ও মহিলা একেবারে আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়ে, দূরত্ব এক হাতও হবে না...
অন্ধকারে অকস্মাৎ দুটি ছায়ামূর্তিকে দেখে রীতিমতন বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। টর্চের আলো ফেললাম সোজা ছায়ামূর্তীর মুখেই, এবং লাইভ চলাকালীন সাথে সাথে মোবাইলের ব্যাক ক্যামেরা অন করে ফোকাস করা হল সেদিকেই।
"কে আপনি? এখানে কি করছেন এত রাতে?"
প্রশ্নের উত্তরে হিন্দি আর বাংলা মিশ্রিত আধখামচা ভাষা ভেসে এল। বুঝলাম তিনি অবাঙালি। বললেন
-"বর্ধমান যানে কে লিয়ে ইয়াহাঁ ট্রেন পাকারনে আয়ে হ্যায় সাব।"
এরপর বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করতেই জানতে পারলাম উনি ভোর পাঁচটার গাড়িটা ধরবেন বলে এসেছেন। অথচ পাঁচটা বাজতে তখনও ঘন্টাদুয়েক সময় বাকি।
এতো রাতে এতো আগের থেকে তাহলে তিনি এখানে কি করছেন?
উত্তর এলো- "গাঁও কি লোগো নে হামকো বোলা পাঁচ বাজ গ্যায়ে চালা যাও স্টেশন, তো হাম তুরান্ত চালে আয়ে।"
শুনে আমার বন্ধুটি বলে উঠলো- "পাঁচ বাজনে মে আভি কাফি ওয়াক্ত বাকি হ্যায়, অওর আপকো মালুম হ্যায় না ইস স্টেশন কে বারে মে?"
উত্তর এল- "হাঁ হুজুর মালুম হ্যায়।"
- "তো ফির ইতনি রাত কো ইয়াহা ক্যায়া কার রাহে হ্যায় আপ? অওর উ কৌন হ্যায় আপকে সাথ?"
- "উ মেরে বিবি হ্যায় সাব।"
শুনে বললাম- "ঠিক হ্যায় যাইয়ে উধার যাকে আপনে বিবি কে বাগল মে ব্যাঠিয়ে।"
লোকটি তখনও নড়ল না, ঠায় দাঁড়িয়ে রইল আমার পাশে। হাতে লম্বা একটি তিন ব্যাটারির স্টিলের টর্চ, আপাদমস্তক মোটা পোশাকে আবৃত সেই অজানা অচেনা মূর্তী তাকিয়েই রইল আমার দিকে। মনে হচ্ছিল এই বোধহয় দিল আমার ঘাড়টা মটকে, আর আমি যা রোগা ছোট পারা মাল ও চাইলে আঙুলে করেই ঘাড়টা মটকে দেবে।
তার মুখের ওপর টর্চ মেরে লাইভ টেলিকাস্ট অব্যাহত। লাইভে তখন অসংখ্য মানুষ কমেন্ট করছে দেখতে পাচ্ছি আড় চোখে- "প্রীতমদা প্লিজ কথা বলো না", প্রীতম দা প্লিজ ওনার কাছে যেও না", কিন্তু তখন তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অবকাশ নেই। ইতিমধ্যে আপ লাইন দিয়ে গুমগুম শব্দ তুলে মাটি কাঁপিয়ে বেড়িয়ে গেল একটি মালগাড়ি। চতুর্দিকে আবার ফিরে এল ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা।
পাশে বসে থাকা বন্ধুটিকে ইশারা করে বললাম "ভাই স্টেশন মাস্টার আর তার স্ত্রীও কিন্তু স্বামী স্ত্রীই ছিলেন।" গাটা ছমছম করছে কথাটা ভাবা মাত্রই, অজানা আতঙ্ক গ্রাস করেছে সমস্ত অনুকূলতাকে। দূরে শেয়ালটি তারস্বরে চেঁচাতে শুরু করেছে, তার বিকৃত ধ্বনি প্রভাব বিস্তার করছে সমগ্র এলাকাটায়। অতঃপর অজানা সেই মূর্তী মোটা জ্যাকেট সরিয়ে বুক পকেটের মধ্য থেকে একটি বিড়ির প্যাকেট থেকে বিড়ি বের করে ইশারায় আমার কাছে আগুন চাইল। উঠে দাড়িয়ে লাইটারটা তার হাতে দিতেই বরফ শীতল স্পর্শে আমার ডান হাতের কুনুই অবদি অসার হয়ে গেল। মূর্তীর হাতটি বরফের মতন ঠাণ্ডা (লাইভ টেলিকাস্ট চলছে ক্রমাগত)। তার বিড়িটি ধরানোর পর তাকে একপ্রকার জোর করেই দূরে গিয়ে বসতে বললাম। বেশ কিছুক্ষণ তখনও দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে আমাদের থেকে হাত দশেক দূরে গিয়ে তার স্ত্রীর নিকটে গিয়ে দাঁড়ালেন। মোমবাতির অস্পষ্ট আলো ততোদূর দেখা যাচ্ছে নাই বলাবাহুল্য, আধফালি চাঁদের মরা আলোয় অন্ধকারে ভাসমান অদূরে অস্পষ্ট দুই ছায়ামূর্তী, ভেসে আসছে তাদের একে অপরের ফিসফাস।
হয়তো গ্রামেরই লোক তিনি, অজান্তে আমার হাতের সাথে তার হাতের স্পর্শে তার বরফ শীতল হাতটিও ধরে নিলাম এই ঠাণ্ডা পরিবেশের জন্যই সৃষ্ট। আগুন চেয়ে বিড়ি ধরানোর ঘটনাটিও ধরলাম বাস্তবসম্মত। কিন্তু তবুও মনে একটা খটকা রয়েই গেল, আর সেটি হল 'সময়'। একবিংশ শতাব্দীর উন্নত মানবসভ্যতার এই যুগে তার কাছে কি একটি হাত ঘড়িও নেই, সে নাই থাকতে পারে কারণ আমি নিজেই হাতঘড়ি ব্যবহার করিনা হাত চুলকায় বলে, তাহলে তার বাড়িতেও কি একটা ঘড়িও নেই? চলো তর্কের খাতিরে তাও ছেড়ে দিলাম, আজকাল যেখানে একটি রিক্সাচালকের কাছেও মোবাইল থাকে সেখানে তার কাছে কি একটি সাধারণ ফোনও নেই যা দিয়ে রাত তিনটে আর ভোর পাঁচটার ফারাক তিনি বুঝতে পারেন? ভাবাচ্ছে প্রশ্নটা আজও যার সঠিক উত্তর হয়তো কোনোদিনই মিলবে না।
এই ঘটনার পরই ধারাবাহিক ভাবে শুরু হয়ে গেল একের পর এক অলৌকিক ঘটনার সূচিপত্র। বন্ধুকে বললাম- "ভাই ব্যাগ থেকে গঙ্গা জলটা বের করে দুজনে একটু ছিটিয়ে নিই চল।"
মাটিতে একপাশে ধূলোর ওপর পড়ে থাকা আমার ব্যাগের প্রতিটা চেন খুলে ওলটপালট করে ঘেঁটে ফেললাম। গঙ্গাজলের বোতলটির বিন্দুমাত্র চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। টর্চের জোড়ালো আলো দিয়েও দেখা হল বেশ খুঁটিয়ে ব্যাগের ভিতরটা। তবুও সেটার অস্তিত্ব নিরুদ্দেশ। কেরোসিনের বোতল রয়েছে, রয়েছে জলের বোতলটিও, শুধু সেটিই অদৃশ্য। আমার ব্যাগে পাওয়া যাচ্ছে না দেখে বন্ধুটি নিজের ব্যাগ থেকে গঙ্গা জল বের করতে গেল, কারণ আমরা দুজনেই গঙ্গাজল আলাদা আলাদা ভাবে এনেছিলাম। অবিশ্বাস্য ব্যাপার তার ব্যাগেও নেই। আমি আবার নিজের ব্যাগটিতে খোঁজার চেষ্টা চালাতে যেতেই বন্ধুটি একটাই কথা বলল, যা শুনে গা টা রীতিমতন কাঁটা দিয়ে উঠল - "ছাড় ভাই ও মাল সরিয়ে দিয়েছে সে। পাবিনা।"
এরপর কেটে গেল আরো কিছুটা সময়, একটি ঘন্টারও বেশি হল লাইভ টেলিকাস্ট চলছে ক্রমাগত। ঘড়ির কাঁটা প্রায় চারটে ছুঁই ছুঁই। বন্ধুটি বলল- "ভাই DSLR টা বের করে মধ্যরাতের স্টেশনটা ছবিটা চট করে নিয়ে নে, এই পরিবেশটা আর পাবি না।" মনে মনে ভাবলাম "ঠিকই তো, এতোক্ষন এখানে এসেছি অথচ লাইভই করে চলেছি। ছবি তোলার কথা মাথাতেই ছিল না।" ব্যাগ থেকে DSLR বের করে অন্ধকার স্টেশন বিল্ডিংটির সামনে গিয়ে ISO, Aperture সেট করে ছবি তোলার জন্য শাটার টিপতেই ঘটল আরো এক অলৌকিক ঘটনা। ফ্ল্যাস নিচ্ছে না, বারবার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যখন ব্যর্থ হলাম তখন বাধ্য হয়ে বন্ধুটিকে স্টেশন বিল্ডিংটির ওপর টর্চের আলো ফেলতে বললাম। টর্চের আলো ফেলতেই ফ্ল্যাস নিল, এবং ছবিও উঠল। এটা অবশ্য ক্যামেরার সেন্সর প্রবলেম হতে পারে। গোটা কয়েক ছবি তুলে নিয়ে আবার ফিরে এলাম ব্যাগের কাছে। ক্রমাগত লাইভ চলায় ব্যাটারি 9% হয়ে নোটিফিকেশন দিচ্ছে ফোনে। এবার ফোন বন্ধ করতে হবে। সকলকে বিদায় জানিয়ে এরপর ঘরে ফেরার অবকাশ। ফোন বন্ধ করার আগে "Smile" 😊 বলে ফোনের ওপাশ থেকে DSLR-এ তাদেরও ছবি নিলাম যারা সারারাত লাইভে নিঃস্বার্থ ভাবে আমাদের পাশে ছিলেন।
তবে সারা রাতের ঘুম বর্জন করে উৎসাহী ও আগ্রহী ভয়পিপাষু মানুষ তখনো লাইভে থাকতে ইচ্ছুক। কিন্তু Sorry for that, ফোনের ব্যাটারি লেভেল 3% শো করছে। ব্যাগে পাওয়ার ব্যাঙ্ক বের করতে গেলে এর মধ্যে ফোনটি বন্ধ হয়ে যাবে লাইভ ভিডিও টি সেভ না হয়েই। কিন্তু লাইভটি আমাদের রাখতেই হবে, এটাই আমাদের একমাত্র প্রমান যার মধ্যে রয়ে যাবে আজ মধ্যরাতে ঘটমান সমগ্র ইতিহাসটা। তাই সকলকে বিদায় জানিয়ে লাইভটা শেষ করে পাওয়ারব্যাঙ্কের usb টা ফোনের পিছনে গুজে দিয়ে ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে দিলাম। "বাবা Iphone রেস্ট করুন এবার, সারাটারাত অনেক ধকল গেছে।"
এবার ঘরে ফেরার পালা। মাটিতে পড়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি গুটিয়ে নিয়ে ব্যাগের গোছগাছ শুরু হল পুরমাত্রায়, (লাইভ টেলিকাস্ট তখন বন্ধ হয়ে গেছে) তখনই ঘটল আরো এক অলৌকিক ঘটনা, পিছনে এসে দাঁড়ালো আরো এক মূর্তী, এই মূর্তী আগের জন নয়। লোকটার মুখটাও কি বিভৎসরকম, রাগে প্রায় ঠিকরে বেড়িয়ে আসা চোখ, দৃষ্টি সোজা আমার দিকে।
"তোমরা এখানে কি করছ এসব ধূপ ধূনো জ্বালিয়ে? জানো না এখানে একটা আতঙ্ক চলছে? গ্রামের লোক ভয়ে এখানে আসতে পারেনা!"
তিন বাক্যের কর্কষ স্বরের তিনটি প্রশ্ন ধাবমান হল আমাদের উদ্দেশ্যে। এখানে ভয় পাইনি বললে সত্যিই মিথ্যে লোকদেখানো ভ্রান্ত পৌরুষত্ব দেখানো হবে। তাকে Sorry বলে কান ধরে আর জীবনে কখনো এখানে না আসার প্রতীজ্ঞা করে আধগোছানো ব্যাগটাই কাঁধে নিয়ে ছুট দিলাম সেখান থেকে। মোমবাতী, কর্পূরদানী, ধূপের প্যাকেট সহ বাকি বেশ কিছু জিনিস পড়েই রইল সেখানে। রুদ্ধশ্বাসে আপ এবং ডাউন লাইন পেরিয়ে বাইকের কাছে চলে এলাম আমরা। পিছন ফিরে দেখি স্টেশনের সামনে কেউ নেই, নেই সেই স্বামী স্ত্রীও। সেল্ফ মেরে গাড়ি স্টার্ট করলাম মরিয়া হয়ে, এক ঘন্টা আগে হঠাৎ কমে যাওয়া গাড়ির হেডলাইট আপনা হতেই জ্বলে গেল ফুল পাওয়ারে, "চাপ বে বাঁড়া চাপ জলদি!" বন্ধুটি লাফিয়ে উঠে পড়ল ব্যাকসিটে। এবরো খেবড়ো মাটির উচু নিচু বন্ধুর রাস্তায় কয়েক সেকেন্ডে স্পীডোমিটার গিয়ে ঠেকল 70 এর কাছাকাছি...
এতোকিছুর পরও হয়তো কেউই বিশ্বাস করবেন না। লাইভ দেখার পরও না। তবে রবিবার মধ্যরাতের ছোট্ট এই স্টেশন সহ ভয়ঙ্কর এই পরিবেশটির ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা সারাজীবন বয়ে বেরাবো একমাত্র আমরা দুজনেই।
ভূত না হলেও একটা নেগেটিভ এনার্জি তো আছেই। তাই সেখান থেকে স্বশরীরে সুস্থ্যভাবে ফিরে আসতে আমি সক্ষম হলেও সেই দিনই গ্যাসের ওভেন ফেটে আমার বাবার গায়ে আগুন লাগে (এখন তিনি হাসপাতালে), সেই দিনই আমাদের বাড়ির ভাড়াটিয়ার মেয়েটি আমাদের বাড়ির পাশেই পুকুরে পা পিছলে পড়ে (স্থানীয়রা জলে ঝাঁপ দিয়ে তাকে উদ্ধার করেন), গতপরশু থেকে আমার গার্লফ্রেন্ড সুরঞ্জনার (পেট খারাপ, বমি, জ্বর নামছে না), এবং গতকাল সুরঞ্জনার মার গায়ে আগুন লাগে গ্যাস থেকেই।
আমি ঠিক থাকলেও নেগেটিভ এনার্জি প্রভাব বিস্তার করে আমার সাথে জড়িত প্রায় সকলকেই।
-সমাপ্ত-
© প্রীতম গুহ / Pritam Guha
Comments