রেশম পথের প্রথম দিন সিলেরি গাঁও
ঘুরে এলাম সিকিম এর রেশম পথে । চলার পথে যা যা দেখলাম __ তুলে নিলাম নিজের ডায়েরী র পাতায় । আর শেয়ার করছি বন্ধুদের সাথেও ।
আজ সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতার প্রথম কিস্তি __ @ রাজেন্দ্র
****************
প্রথম দিন _ ১০/ ০৬ / ২০১৮ (রবিবার)
বিকেল চারটে বেজে পঞ্চাশ মিনিট । চারপাশে নিঝুম নীরবতা । একটু দূরের থেকে ভেসে আসছে ফুটবল খেলার হালকা মৃদু শব্দ । আর মাঝে মাঝেই তাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে গুরু গুরু মেঘের গর্জন ।
সামনের মাটির রাস্তার ধারে বাচ্চারা ছুটোছুটি করে খেলতে মগ্ন আর জানলার কবাটে রাখা পরপর তিন খানা ধূমায়িত হার্বাল চায়ের কাপ ।
অনতিদূরের পাহাড়ের মাথা গুলো মেঘে কুয়াশায় আচ্ছন্ন । চূড়া গুলো ভাসা ভাসা আবছা নজরে আসছে ।
জানলার পাশেই ফুটে রয়েছে পাহাড়ি নাম না জানা ক্রিমসন রঙের ফুল আর কিছু ফুল আধফোটা আধঘুমে আচ্ছন্ন ।
আমরা তিনজন ( আমি, অতনু আর আব্দুল ) আজ বনলতা হোম-স্টে বাড়িতে এসে উঠেছি । বাড়িটা সম্পূর্ণভাবেই কাঠের তৈরী । জায়গার নাম সিলেরি গাওঁ, যা সমুদ্রতল থেকে প্রায় ছয় হাজার ফুট উচ্চতায় "নতুন দার্জিলিং" নামে পর্যটকমহলে পরিচিত ।
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে প্রায় ছিয়ানব্বই কিলোমিটার জার্নি করে এসে, আজ এখানে আমাদের বিশ্রাম নেবার পালা । তার আগে ফ্রেশ হয়ে চারপাশ ঘুরে নেব খানিকটা সময় ।
পাথর নুড়ি ফেলা কাঁচা ভাঙ্গা খাড়াই চড়াই পথে অনেকটাই উপরে উঠে এসেছি আমরা । চারপাশ জুড়ে শুধুই সবুজের অবিচ্ছিন্ন সমারোহ । আসার পথে ছেড়ে এসেছি অগুনতি নাম না জানা গাছ ।
একটু দূরেই পাহাড়ের কোলে জেগে উঠছে সাত রঙের রামধনু । ঘন গভীর পাইন দেবদারু বাঁশ এবং আরো অনেক চিরহরিৎ ট্রপিকাল অরণ্য ভেদ করে আমরা এই গ্রামে চলে এসেছি প্রায় আধঘন্টা আগে ।
গত ৯ই জুন রাতে হাওড়া থেকে পাহাড়িয়া এক্সপ্রেসে চেপে, নিউ জলপাইগুড়ি থেকে একটা রিজার্ভ করা গাড়ি নিয়ে দিনভর জার্নি করে তিস্তার পাশ ধরে আমরা চলে এসেছি প্রকৃতির কোলে কালিম্পং জেলার এক প্রান্তে।
এদিকে আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে টিপ টিপ করে বৃষ্টি । পাহাড়ি জংলী বৃষ্টি বলতে আমরা যা বুঝি, এটাও ঠিক তাই । আর তার পাশাপাশি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে কুয়াশা মাখা মেঘ । খুব ভালো লাগছে এমন করে প্রকৃতির সাদর অভ্যর্থনা পেয়ে ।
এখন চুপ করে বসে বসে চা আর সিগারেট খেতে খেতে পাখি আর ঝিঁঝির ডাক শুনবো একমনে । এই মুহূর্তে মনে পড়ছে কালিদাস এর মেঘদূত এর লাইন __ "আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে" ।
****
সন্ধে সাড়ে ছয়টা বেজে গেলেও এখনও এখানে দিনের আলো বেশ ভালোই রয়েছে । আমরা এখন একটা চায়ের দোকানে বসে চা সিগারেট সহযোগে গল্প গুজব করছি ।
ভেবেছিলাম বিকেল এর সময়টা চারপাশ ঘুরে ফিরে বেড়াবো । হরেক রকমের ফুলের আর গাছের ছবি তুলবো । পাহাড়ি পথে গভীর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পায়ে হেঁটে চলবো ।
ভেসে আসবে হরেক রকমের শব্দ । জল ভরা মেঘ আর কুয়াশা এসে শরীর ছুঁয়ে আদর করে মিশে যাবে গাছের পাতায় পাতায়, ঝলমলে রঙিন ফুলের পাপড়ির ঘ্রাণে ।
কিন্তু বৃষ্টি থামার আর কোনও লক্ষ্যই দেখলাম না । আমরা যে যার নিজের ছাতা খুলে বেড়িয়ে পড়েছিলাম । চারদিক ভিজে স্যাঁতসেঁতে আর মাটির পথ বেশ পিছল । সেল্ফি ছবি সহযোগে আরো বেশ কিছু ফুলের ছবি আর ভিডিও তুলে ফেললাম । ছবি তুলতে গিয়ে একটা মজার ঘটনা ঘটে গেলো ।
আমি রেলিং এ হেলান দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে অতনু কে বলেছিলাম আমার একটা ছবি সাইড থেকে তুলে দিতে । ও আমার ছবি তুলে দিলো বটে, তবে সেটা আমার বারমুডা পরা, কিছুটা উপরের দিকে উঠে বের হয়ে আসা, অন্তর্বাস সহযোগে আমার নিতম্বের একটা অদ্ভুত বিদঘুটে বিটকেল ছবি ।
আর এদিকে বৃষ্টি কিন্তু তার চাপ বাড়িয়ে ঝাঁপতালে ঝমঝমিয়ে বাজতেই থাকলো । আমাদের ফটো তোলার সেশন মাথায় উঠে গেলো । চারপাশ দেখতে দেখতে তাই এই চায়ের দোকানে এসে আশ্রয় নিলাম আর কোনও উপায় না দেখে ।
এখানে সব বাড়িগুলোর মাথায় টিনের ছাদ । পাহাড়ি মেঘের দল ব্যাগ উপুড় করে বড়ো বড়ো বৃষ্টির ফোঁটা উজাড় করে ঢালতে লাগলো একটানা ।
আরো জনা তিনেক স্থানীয় পাহাড়ি ছেলে ছোকরাদের দল ও এসে আমাদের গুমটি দোকানে আশ্রয় নিলো । ওদের কাছে ছিলো রামের বোতল । দোকান থেকে বাদাম নিয়ে ওরা আমাদের টেবিলেই বোতলের ছিপি খুলে গ্লাসে জল ঢেলে ওদের বৈকালিক গাল গল্প শুরু করে দিলো ।
আমরাও আমাদের মতো করে গল্পে জমে রইলাম । তারপর দোকানের পাওনা বিল মিটিয়ে সাবধানে অতি সন্তর্পনে পা টিপে টিপে উপরের দিকের খাড়া পথে চলতে লাগলাম । ইতিমধ্যে দিনের আলো আর বিন্দুমাত্রও নজরে আসছে না কোথাও ।
আমার এক হাতে ছাতা আর একহাতে মোবাইল, পায়ে বেল্ট ওয়ালা ফোমের জুতো । পা যে দুই একবার পিছলে যায়নি, তা নয় । কিন্তু কপালগুনে খোলা ছাতা (হিন্দিতে ছত্রী) হাতে পা হড়কে হড়কাবাহাদুর ছেত্রী হতে হতে বার বার সামলে নিয়েছিলাম নিজেকে ।
চারপাশে নেমে আসা অন্ধকার এর বুক চিরে দূরের পাহাড়ের কোলে ফুটে উঠেছিল এক অপরূপ মায়াবী স্বর্গরাজ্য । আমরা ঘরের পথে ফিরতে চললাম ওই আলো আঁধার ভেজা পরিবেশে ।
*********
সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা নাগাদ বনলতা হোম-স্টে বাড়িতে ফিরে এসে দেখলাম কারেন্ট নেই । এটাও পাহাড়ী এলাকার একটা বৈশিষ্ট্য । আমার ফোনে আর চার্জ করতে পারলাম না ।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে আর তেমনভাবে মোবাইল চার্জ করানোর কোনো সুযোগই পাইনি । এই চব্বিশ ঘণ্টায় অনেক ছবি ভিডিও তুলতে হয়েছে মোবাইল ফোনে । লিখতেও হচ্ছে টুকটাক । তারপর টাওয়ার এর আসা যাওয়ার ও বিরাম নেই । ফোনের আর কি দোষ । আর একটু পরেই ও অফ হয়ে যাবে ।
ইতিমধ্যেই আমাদের জন্যে চলে এলো দার্জিলিং চা আর গরম গরম ভেজ মোমো । আব্দুল চিঁড়ে আর শুকনো বালি ভাজা ছোলা বের করলো । বেশ জমে উঠলো আমাদের আড্ডাখানা ।
রাতে আর কারেন্ট এলোনা । আমরা জেনারেটর এর আলোয় রাতের ডিনার সেরে নিলাম । ডিনারে ছিল - ভাত, ডাল, সেঁকা পাঁপড়, ঝুরি ঝুরি করে কাটা আলুভাজা, হাফ সেদ্ধ আলু পেয়াজ এর সবজি আর চিকেন কারি । রান্নার মান একেবারেই বাঙালিদের মত মনে হলো খেয়ে ।
এদিকে কারেন্ট আসার ও আর নাম নেই । আমরা রাত দশটার ভিতরে সবাই যে যার মতো করে শুয়ে পড়লাম গতকালকের রাত থেকে আজ পর্যন্ত একটানা বয়ে চলা সমস্ত ক্লান্তিকে দেহে নিয়ে ।
উইকি থেকে আরো কিছু লাইন ___
There are many myths and legends associated with the name Sillery. It is said to be a portmanteau derived from the word Sillery, which is a plant that grows in abundance in the region. This area also abounds in cinchona plantation, which was introduced in the region by the British as a source of quinine used for the treatment of malaria.
The area offers views of the Mt. Kangchenjunga and its is allied peaks. An attraction for tourists visiting Sillery Gaon is Sangchen Dorjee Monastery, which was built during the Bhutanese rule in Pedong.
Sillery Gaon can be reached by a motorable road from Pedong.
Comments