কবিতা সমগ্র

~নোলক~
~আল মাহমুদ

আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।
নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
হাত দিও না আমার শরীর ভারা বোয়াল মাছে।
বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে
শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ্ ছড়িয়ে থাকে।

জল ছাড়িয়ে দল হারিয়ে গেলাম বনের দিক
সবুজ বনের হরিৎ টিয়ে করে যে ঝিকমিক
বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দেবে ভাই,
আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরে ফিরতে চাই।

কোথায় পাবো তোমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া ধন
আমরা তো সব পাখপাখালি বনের সাধারণ।
সবুজ চুলে ফুল পিন্দেছি নোলক পরি না তো!
ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও, হাত পাতো হাত পাতো----
বলে পাহাড় দেখায় তাহার আহার ভরা বুক
হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ।

এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন ফের বাড়ালাম পা
আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরে ফিরবো না।

-----

মহারাত্রি ।। মণীন্দ্র গুপ্ত

রাত্তিরে মারা যাবার পর বোঝা গেল রাত্রি কী দীর্ঘ !
কোটি কোটি মাইল রাত্রির মধ্যে যাবার পরও
রাত্রি ভোর হয় না ।

----

নিসর্গে : মুক্তি ।। মণীন্দ্র গুপ্ত

বৃষ্টি শেষে আকাশ কী নীল , যেন স্নেহ । মধ্যে
পাখি উড়ছে । খোঁচা হয়ে আছে কাঁটা
তারও মুখে আলো ।
এই দিন : যেন কুটুমবাড়িতে ছেলে চলেছে
গ্রামের পথে একা - চতুর্দিকে আহ্লাদের
মাঠ ও বাতাস - মাঠে জলপিপি , হঠাৎ-শাপলা ।

তেরাত্তির না পেরুতে শোক নমনীয় হয়ে এল ;
দুঃখ তার কান্না হারিয়ে , ভুলে , শিশুদের মতো
চেয়ে আছে ।

এই শূন্য পবনের মধ্যে
কোনো পাপ কঠিন না - কোনো দুঃখ
ব্যক্তিগত নয় ।

----

কোকিল
- মণীন্দ্র গুপ্ত

মৃত্যু হল কিনা জানব কি করে?
হাতুড়েরা বলল, নাক মুখ চোখ দিয়ে তখন প্রাণের বাতাস বেরিয়ে যাবে।
ডাক্তার বলল, যখন রাইগার মর্টিস শুরু হবে।
এ যেন এত সোজা--'বাড়িতে আছ নাকি, থাকলে সাড়া দাও।'
সাড়া না দিলে বুঝব, নেই।
গুরুজি বললেন, দ্যাখো, বাহার যদি ঠিক ঠিক হয়
তবে কোকিল ডাকবেই। বলে আলাপ করতে করতে
যেই কোমল নিষাদ থেকে ধৈবতে মিড় লাগিয়েছেন
অমনি দূরে সাড়া দিল কোকিল।

আমি ভাবছি---আমার বেলা, কোকিল যদি দেশে না থাকে?
ছটফটে বসন্তের শেষে কোকিল যদি ঘুমিয়ে পড়ে?

আমার গুরুর মতো গুরু হয় না। উনি মড়া জাগাতে পারেন।
তারপর থেকে বাহারের সঙ্গে ক্রমাগত ডেকে যাচ্ছে
মৃত কোকিল!

----

ছাই
মণীন্দ্র গুপ্ত

ছেলেবেলায়
পায়রার গলায় ছুরি বসিয়ে
লিচুগাছের ডাল ভেঙে
দুই কাঁদি তালশাঁস খেয়ে
বাগান লণ্ডভণ্ড আর পুকুরের জল ঘোলা করে
দিনের শেষে যখন বাড়ি ফিরতাম
তখন ঠাকুরমাবুড়ি মাকে শাসাত ঃ
খবরদার বউমা, ওকে আজ ভাত দেবে না,
উনুনের ছাই বেড়ে দেবে ।

ঠাকুমা কবে মরে গেছে। আমিও মরমর ।
কিন্তু এতকাল ধরে আমারা বাগান লণ্ডভণ্ড করেছি
শয়তানের পেছনে কাঠি দিয়েছি ।
এখন মাটির নিচে জল পাঁচ মিটার নেমে গেছে ।
মেঘ আসে, কিন্তু লাফায় না , গর্জায় না, মরা মাছের মতো নীরবে ভেসে যায় ।
বেশি টানাহ্যাঁচড়া করলে মাটি থেকে জলের বদলে আর্সেনিক ওঠে।
গাছের শিকড় নুন মাখানো জোঁকের মতো সিঁটিয়ে গেছে -
নিচে যেতে পারে না । পুত্রবধূ আর নাতবউয়েরা
পাথরের ফাটলবাসী গিরগিটিদের মতো ধুলোমাখা ।
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে ঃ খা , খা, হারামজাদা, ছাই খা !
কতদিন ঘরে এক দানা চাল নেই --
বউমা, ওদের ভাতের বদলে ছাই বেড়ে দাও,
উনুন থেকে গরম ছাই তুলে দাও ।

----

শেষরাতের আকাশে
- মণীন্দ্র গুপ্ত

অনেকদিন যায় যখন দেখা হয় না।
জলপাইগুড়ি থেকে পাঠানো চা সেখানকার শীতের বিকেলের মতো
মলিন হয়ে আসে।
গতবছর, বয়স ভুলে, শিলঙের বনের পীচ ফল পাঠালে--
সেই রক্তিম ক্ষতিপূরণ একটাও আমি মুখে তুলি নি,
একলা-বাড়ির ফ্রিজের কোনায় পড়ে থেকে থেকে শেষে নষ্ট হল।

চৈত্রপবনে যেসব গুজব ছড়ায়, রাত্রে পুরনো বইয়ের
অধ্যায়ের সঙ্গে সেগুলোর নাড়াচাড়া করি--
গীতবিতানের গানের সঙ্গে মিশিয়ে মিশিয়ে
তাদের সুরে বসাবার চেষ্টা করি।

একদিন প্রণয়পানীয় খুঁজতে ডাইনীদের কাছে যেতাম,
এখন রক্তাক্ত মেঘের বুকে আছড়ে পড়ার জন্যে পাহাড়চূড়া খুঁজি।
ফল একই-- বয়স শুধু পদ্ধতি পালটে দিয়েছে।

সত্যিই কি আমাদের আর কোনো দিন দেখা হবে না!
তুমি ফ্লোরীডায় তো আমি গ্যালাপাগোসে,
তুমি ভ্যাংকুবারে তো আমি ত্রিচিনাপল্লীতে,
আমি যখন আমার তেইশ সহস্রতম জন্মে ভাসমান তুমি তখন তোমার
উনিশ সহস্রতম মৃত্যুতে ডোবা।
তবু গতশরতের এক শেষরাতের আকাশ
আমাদের খুব কাছাকাছি এনেছিল--
তোমাকে দেখা গিয়েছিল কিরীটের মতো শুকতারায়
আর আমি ছিলাম তার ঠিক এক ফুট নিচে
চতুর্থীর হেলে পড়া চাঁদে।

----

নয় লক্ষ পৃষ্ঠার বই
-  মণীন্দ্র গুপ্ত

ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির বিবাহকালে
গাছটি ছিল ফুলে ফলে ভরা যুবতী
চার যুগ কেটে যাবার পরে
গাছটা এখন ফোকলা, কোটরে কোটরে গর্ত, হাঁটুর মালাইচাকি
বাদ গেছে।
গাঁটে ভরা, ফাঁপা বুড়ো গাছের বদলে ওরা এখন
একটা অতি প্রাচীন ভাঙা বাড়িতে বাস করে
আর সারা দিনরাত ধরে কথা বলে –
কথা কথা কথা – খনার বচন-গ্রামের রূপকথা-গল্পকথা-
মহাকাব্য – আকাশ পৃথিবী পাতাল নিয়ে লেখা
তিন লক্ষ পৃষ্ঠার বই।
আরো আরো আকাশ জ্যোতিষ্ক ছায়াপথ উড়ে উড়ে চলেছে –
ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি মাত্র দুটি –
কথা বলতে বলতে এখন নয় লক্ষ পৃষ্ঠার বই হয়েছে।

----

সাপ
- মণীন্দ্র গুপ্ত

আমাদের দীর্ঘ আয়ু দরকার, হাজার বা লক্ষ বছরের, যাতে
শেষকালে বাধ্য হয়ে আলো ফোটে।
দিন আরো লম্বা হোক, রাত্রি আরো বেশি, যাতে
উদ্ভিদ ও বর্ণের পল-অনুপল চিনি, যাতে
আঁধার ও প্রাণীদের যাবতীয় হৃদয়কাঁপন ধরতে পারি।

একটি সঙ্গমকাল অর্ধেক বসন্ত স্হায়ী হোক— পেরোবার আগে
প্রত্যেক সিঁড়িতে বসে জীবন ও মরণ আমি উলটেপালটে দেখি।

তারপরই দীর্ঘ উপবাস— সাধুর শিষ্যের মতো বলে শীর্ণ সাপ,
বনে বাস, অকিঞ্চন, বেতের পাতার মতো হালকা শীর্ণ সাপ।

----

মাংস
- সিকদার আমিনুল হক

মাংস উড়ে যায়, শুধু ভাতগুলো থাকে
পাত্রের সম্বল---
শীতের দুপুরে ঘুম; দ্যাখো, শেষে হয়
সন্ধ্যায় অম্বল!

কড়া নেড়েছিলো কাল, তিক্ত মুখ রাতে
রাস্তা তার চাই;
দুঃখ ছাড়া আজ কেন খুঁজিতেছে বাড়ি?
বলি,---আমি নাই!

বলে, ---আছো তুমি। এই কিছুক্ষণ আগে,
ছিলে ক্রীড়ারত!
মাংস যার ঘরে থাকে, ভাত আর বন্ধু
...বান্ধবী অনুগত!

সুখ তো ভীষণ দামি, কেনা কি সম্ভব?
...দুঃখ অতি সস্তা!
অন্যেরা পাগল! কেনে, সোনা-রুপা-হিরে;
আমি সুস্থ দস্তা।

মূর্খ, মাংস খাবে আজ আমার বোনেরা...
এটা ইহকাল।
ধার করেছিলে, যাতে তেতলায় থাকো;
পরে, পরকাল।

----

শ্রীকান্ত মনিদাস
- আব্দুল মান্নান সৈয়দ

আমাদের পাড়ায় ফুটপাতের ধারে বসে
জুতো পালিশ করে, সেলাই করে, তাপ্পি লাগায়।
থাকে আজিমপুরের এক-কামরার এক ভাড়াবাড়িতে।
ভাড়া মাসে ১৫০০ টাকা।
দাদার জমিজিরেত ছিলো।
কিশোরগঞ্জে।
সেসব বেচে খেতে খেতে কিছুই আর নেই।
বাপ বাধ্য হয়ে নামে মুচি হিসেবে।
শ্রীকান্তও বাপের পথ ধরেছে।
যে-দোকানগুলোর সামনে বসে, সেখানেই কোথাও
রাত্রিবেলা রেখে দ্যায় ওর জিনিসপত্তর
ওর জীবনসংগ্রামের সামান্য কয়েকটি হাতিয়ার।
দোকানদাররা ওকে কিছু বলে না।
ওই দোকানের মালিকও না।
দোতলার ডেন্টিস্ট মাঝে মাঝেই ধমক দ্যায়।
উঠে যেতে বলে।
যাবে কোথায়?
ফুটপাতের ধারে___ না ফুটপাতের না রাস্তায়
যতটা গুটিসুটি মেরে বসা যায়,
ততটাই বসে থাকে শ্রীকান্ত।
জুতো সেলাই আর পালিশ আর নিজের শরীর নিয়ে।
তিন মেয়ে শ্রীকান্তর।
বড় মেয়ের বিয়ে হবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।
মেয়ে পড়েছে এসএসসি অবধি।
বিয়ে ঠিক হয়েছে একজন পিওনের সঙ্গে।
জহরলাল।
বিয়ের পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়ে যাবে।
বয়েস?___ শ্রীকান্তের বয়েস হয়েছে ৪০/৪৫
খোঁচা খোঁচা দাড়ি। একটু পাক ধরেছে।
শারদীয় পূজো হয়েছে দুদিন আগে।
___'পূজোয় কি করলেন?'
___'আমাদের আবার পূজা?
মেয়ের যৌতুকের জন্যে একটু সাহায্য করতে পারেন?'
জিগ্যেস না করলে বলত না।
চাওয়ার মধ্যে কোনো প্রার্থনার আকুতি নেই।
যেন চাইতে হলো বলে চাইল।
নির্বিকার।

*
জীবন ওকে নির্বিকার করে দিয়েছে।
জীবনে ওর কোনো পালিশ নেই।
সেলাই করে আর তাপ্পি লাগিয়ে চালিয়ে নিচ্ছে।

*
শ্রীকান্ত মনিদাস, তুমি আমার ভাই।
তোমার কোনো জাতি, দেশ, ধর্ম নেই।
দারিদ্র্য তোমার ধর্ম, দারিদ্র্য তোমার দেশ, দারিদ্র্য তোমার জাতি।
আমার করুনাময়ী মায়ের সন্তান।

----

অন্বেষণ
- পূর্ণেন্দু পত্রী

কি চাই বা কাকে চাই এখনও জানি না।
স্মৃতি ও বিস্মৃতি থেকে কাকে চাই পথে ফেলে যেতে
পথ থেকে তুলে এনে কাকে খুলে দেবো সিংহদ্বার
পালঙ্কের নতুন বিছানা
এখনও জানি না।

অভ্র-আবীরের মত অঙ্গাঙ্গি জীবন কাকে নিয়ে
কোন শিল্প, কি রঙের তুলি হাতে নিলে
মুকুটের অধিকার, মানুষের প্রিয় অভ্যর্থনা
এখনও জানি না।

কোথায় আমার ক্ষেত, সার্থক লাঙল, শস্যদানা?
কৃষকের মত আছি, কাদা পায়ে, গায়ে ধুলোবালি
চিরুণীবিহীন চুল, ওকে ঝড় ওড়াক আকাশে
স্থিতিশীলতার চেয়ে একটু স্পন্দন ঢের ভালো।

----

চুপ

পিনাকী ঠাকুর

আজ যখন কালরাত্রি যখন তোমাকে বারণ করছি,সাড়া দাও
তোমাকে অনুরোধ করছি কথা শুনছ না কেন নিষেধ করলাম তোমাকে
ফলের ভারে মাথা নিচু আমাদের পেয়ারাগাছ,তুমি বোসো
জুতো লুকিয়ে রেখে বাঘা কুকুর 'যেয়ো না যেয়ো না' লেজ নাড়াচ্ছে
মা বলছে,শেষ রাতের তারা খসে পড়ল অমঙ্গল
ছোটদাদু বলছেন, ঘোর অশ্লেষা যাত্রা নাস্তি অলাবুভক্ষণ নিষিদ্ধ
তোমাকে কে বলল,পাখি ডাকলেই উঠতে হবে,দাঁত মাজতে হবে,চা-
সরলা ঘোষালের ডাকে যুদ্ধে যায়নি ইয়ংবেঙ্গল, কে বলল,যেতে হবে
                                                         এক্ষুনি?
যখন শিকড়মুখে মাটির বৃন্ত থেকে ধানগাছ শুষে নিচ্ছে প্লুটোনিয়াম,
ফুল যখন তেজস্ক্রিয়,পাতার শিরায় শান্তি ভ্রাতৃত্ব বিশ্বপ্রেমের ফোটোকপি
এবং রাত জেগে পাশের বাড়ির দিকে বেড়া সরানো, নাবালকের জমি দখল
তোমার গান তোমার আড়াল যখন তোমার রতিশয্যার ঝড়বৃষ্টি
অধিগ্রহণ করে নিচ্ছে রাষ্ট্র
অধিগ্রহণ করে নিচ্ছে 'গণতন্ত্র' তারপর নিলামে তুলবে তোমার শিড়দাঁড়া
বারণ করছি সুইচ কোথায় মাটি খোঁড়ো সাইরেন প্লেনের আওয়াজ ওই
শান্তি ওঁ শান্তি ওঁ বিস্ফারিত মেঘে ভেসে বেড়াচ্ছে শান্তির গুঁড়োগুঁড়ো
অবশেষে...
আজ আবার আমাদের জল আলো বাতাস তৈরি করে দাও
আঁকড়ে ধরবার হাত তৈরি করো
একটাও শব্দ নয় আর
বাঁচতে দাও
বাঁচো।

----

বিচ্ছেদ
- আবুল হাসান

আগুনে লাফিয়ে পড়ো, বিষ খাও, মরো
না হলে নিজের কাছে ভুলে যাও
এত কষ্ট সহ্য করো না।

সে তোমার কতদূর? কী এমন? কে?

নিজের কষ্টকে আর কষ্ট দিও না,

আগুনে লাফিয়ে পড়ো, বিষ খাও, মরো,
না হলে নিজের কাছে নত হও, নষ্ট হয়ো না!

পুনর্জন্ম।
                     মণীন্দ্র গুপ্ত।

-----

আমি শ্মশানে শ্মশানে ঘুরি।মৃতদের কাছে যাই-
চেষ্টা করি তাদের মুক্ত করতে।
মুক্তি  না পেলে তারা ভুত হবে ।
খোনা গলায় কথা বলবে,গাছে গাছে ঘুরে বেড়াবে,
মানুষকে ভয় দেখিয়ে মজা করবে,
দুপুরবেলায় অশথ গাছে পা ঝুলিয়ে বসে
দেহতত্ত্বের গান গাইবে।
খারাপ কী? এ তো প্রায় আদর্শ জীবন।
আমি নিজেও তো মজায় ভরা এই বাউন্ডুলের জীবনই
চেয়েছিলাম।

দুপুরেচণ্ডী বিকেল ঝরে,
শিউলি ঝরে সকালে
চারিদিকের পাকা ফসলের মাঠে সন্ধেবেলা
আলো মরে যায়।
হেমন্তের আকাশপ্রদীপ ইশারা-বাতি হয়ে জ্বলে।
বহুদূরের পূর্বপুরুষেরা আবার আলোর মতো কাঁপেন,
বোধ হয় শুনতে পান, কোথায় সপ্তদ্বীপে কুহকিনীদের মতো
লাল-নীল করুণ-মধুর স্বরে গান গেয়ে গেয়ে ডাকছে পুনর্জন্ম।

শারদীয় অনুষ্টুপ-১৪১২।

-----

নামরূপ
___শঙ্খ ঘোষ
.
কোন বিশেষণে বেঁধো না ওকে
ওকে ছেড়ে দাও সহজ ক্রিয়ায়
যেখানে ইচ্ছে সেখানে থাকুক
চলে যেতে দাও, যদি যেতে চায়।
.
ইচ্ছের কোন রূপরং নেই ?
হয়ত তা আছে, লুকনো শিরায়।
লুকনো থাকুক যদি থাকে তাই
ঘুরোনা কেবলই ওর পায়পায়।
.
বিশেষ্যভরে একদিন যদি
পৌঁছতে পারে সর্বনামে
সেটাই তো তার নামরূপ তবে
অক্ষয় সেটা -- সেই অব্যয়।

------

সহজ
- আলোক সরকার

অন্য এক পরিচয় আছে।
জানবে না কোনোদিন বিকেলের মায়াবী আলোয়
রাজারকুমার হ'য়ে আমি পথ হাঁটি। কতো কাছে
পেয়েছি চিন্ময় সুর, মনে-মনে ছড়ানো ভালোয়
গিয়েছি আলোর দেশে---সোনার গাছের হীরা-ফুল
এমন সহজ আসে নিভৃত চাওয়ায়।

ম্লানতা, বিবর্ণ দিনে যন্ত্রণায় ঝরেছে মুকুল
বিনম্র সৌরভ থাকে গোপন হাওয়ায়।
দেখেছো বিষণ্ণ রুগ্ন ব্যর্থতার তমসার কালি---
গভীর আড়ালে আমি সমতায় এক শান্ত স্রোত
অলোকসভার থেকে এনেছি বরণপুষ্পডালি
তোমাকে পাওয়ার ভাষা এমন সহজ।

কখন হারিয়ে যায় পরিচিত পথের দুপুর,
নিজের মনের রঙে মগ্ন দেবদূত চ'লে যাই।
তাকাইনি কোনোদিকে, কাছের ঠিকানা বহুদূর।
সংকোচে লজ্জায় আমি একা থাকি, কথা যে বলি না
তা নয় গর্বিত ইচ্ছা---চিরদিন আছে এক ভুল।

স্বপ্নের মন্দির ভাঙে পাছে এই ভয়।
মুহূর্তে চিহ্নিত বৃত্তে নামালাম ছায়া অনুকূল---

জানাইনি, কোনোদিন জানবে না অন্য পরিচয়

------

রাজপুরী
- একরাম আলি

এখনও তেমন কিছু রাত হয়নি, এখনও তেমন
কোনো কুকুরের দল রাস্তার দখল নেয়নি, যারা
শহরের গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে একে একে

মিহি একটা হাওয়া---যেমন গুজব
যেমন-বা মসলিন---যেসব হাওয়ায়
অতীতের বড়ো বড়ো যুদ্ধগুলি গুরুত্ব হারায়
প্রলয় দুর্ভিক্ষ আর মড়কের রোল থেকে জন্ম নেয় সুর
একটি বারান্দা একা নিমশূন্যে ভাসে
তেমনই পুরোনো একটা হাওয়া--- খুবই মিহি---
ঘিরে ফেলছে সবকিছু,
যেন-বা গুজব

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি