জালি বাঙালী
গুরুদেব থেকে নেতাজি, ‘জাল’-এ ধরা পড়েছেন সক্কলেই!
রবীন্দ্রনাথ থেকে নেতাজি: বাঙালি কতটা ‘জালি’, মেপে দিল গবেষণা
অনির্বাণ মুখোপাধ্যায় ।
গত একশো বছরে বাঙালি ঠিক কতটা জালিপনা দেখিয়েছে,তার তালিকা নির্মাণ অথবা তাকে ছানবিন করাটা মোটেই কোনও সোজা কাজ নয়।
‘জাল, জোচ্চুরি, মিছে কথা
এই তিন লয়ে কলকাতা’
বাঙালির জীবনে উপরের এই প্রবাদটি যে হাড়ে হাড়ে সত্য, সে কথা হুতোমের আমল থেকে সারদা কাণ্ড পর্যন্ত সময়কালে মালুম পাওয়া গিয়েছে। ‘ইতিহাসের সাক্ষ্য’ বলে বাংলা বাজারে যে কথাটা চলিত রয়েছে, তার সূত্র ধরে তো বলাই যায়, উপরন্তু গণস্মৃতি, দৈনন্দিনের বিস্মৃতিও একই কথা বলে। খবরের কাগজ খুলুন, এই মুহূর্তে জাল ডাক্তার নিয়ে হুড়ুমতাল। টিভি দেখুন, তাতে রাউন্ড দ্য ক্লক জালিপনার উদাহরণ ভুরভুরিয়ে উঠছে। কে বাড়িতে একটা আস্ত বউ রেখে আরও তিনটে বিয়ের মতলব করে ফেঁসে গিয়েছে, কে বিউটি পার্লারের আবডালে মধুচক্রের ছিমছিমে ব্যবসা করতে গিয়ে বে-নকাব— এ সব নিত্যিদিনের বহতা জল। তলিয়ে ভাবলে বাঙালির জালিপনা এতটাই জলভাত ব্যাপার যে সেটাকে তেমন ধর্তব্যের মধ্যে আমরা আনিই না। গত একশো বছরে বাঙালি ঠিক কতটা জালিপনা দেখিয়েছে,তার তালিকা নির্মাণ অথবা তাকে ছানবিন করাটা মোটেই কোনও সোজা কাজ নয়। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে এত বেশি চোরাগলি, এতো বেশি আলো-আঁধারির ছিনিমিনি যে, ভাবতে বসলেই মাথা ঘুরান্টি দেয়। হুতোম যেমন লিখেছিলেন—বিনে ব্যাঘাতে পথ চলা সোজা কথা নয়, তেমনই বাঙালির জালিয়াতির ইতিহাসকে দু’মলাটের মধ্যে ধরার চেষ্টাটাও ‘সোজা কথা নয়’।
এই কঠিন কাজটাকেই সম্প্রতি করে দেখিয়েছেন অদ্রীশ বিশ্বাস। প্রতিভাস প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিক এবং শেষ (হ্যাঁ, এই বই প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই অদ্রীশ কোনও দুর্বোধ্য কারণে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন পৃথিবী থেকেই) গবেষণা ‘জাল: বিশ শতকের বা শেষ একশো বছরের জাল বিষয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য নমুনা পর্যালোচনা’ হাতে আসা মাত্রই এই কথাটা বড় বেশি করে মনে আসে যে, অদ্রীশ এক অতি দুঃসাধ্য কাজকে অতি নীরবতার সঙ্গেকরে গিয়েছিলেন বছরের পর বছর ধরে। এই গ্রন্থে জায়গা পেয়েছে নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, খবরের কাগজ বা পত্রিকার কাটিং ও উদ্ধৃতি, প্রভূত ছবি । সেই সঙ্গে রয়েছে এক বিস্তৃত ভূমিকা। সব মিলিয়ে এই বইও যেন বাঙালির জালিকৃত্যের একটা প্রামাণ্য দলিল।
অদ্রীশের গ্রন্থে এই জাল-সংক্রান্ত ইতিবৃত্ত ১০০ বছরের। তার আগেকার জাল-জোচ্চুরির ইতিকথা অর্থাৎ চর্যাপদ-মঙ্গলকাব্য-পূর্ববঙ্গ-মৈমনসিংহ গীতিকার জালিপনা, ভারতচন্দ্র বর্ণিত বিদ্যাসুন্দরের আখ্যানের জালিয়াতিগুলি এখানে নেই। অদ্রীশ মূলত কথা বলেছেন উপনবেশ এবং উত্তর উপনিবেশের পরিসর থেকে। বাঙালির ট্র্যাডিশনাল জালিয়াতির থেকে এই জালপন্থির চেহারা ও চরিত্র একেবারেই আলাদা। বাংলায় ব্রিটিশ শাসন বিস্তৃত হলে এবং পশ্চিমি শিক্ষা, চিকিৎসাবিদ্যা ও আইন তার ডানা মেললে একদিকে যেমন সংস্কার ও আত্মসমালোচনার ঢল নামে। তেমনই অন্য দিকে, নতুনতর কাঠামোয় নতুনতর অপরাধ ও সামাজিক নীতিভঙ্গের খেলাও শুরু হয়। সবথেকে বেশি সমস্যা দেখা দেয় আত্মপরিচয় নিয়ে। অদ্রীশ তাঁর গবেষণায় এই আত্মপরিচয়ের অনেকান্ত বাওয়ালকেই সব থেকে বেশি গুরত্ব দিয়েছেন। একনজরে দেখে নেওয়া যেতে পারে তাঁর প্রতিপাদ্য।
ভাওয়ালের মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী, ছবি: ইউকিপিডিয়া
• এই বইয়ের একেবারে গোড়ায় বাংলার এক ঝড় তোলা মামলার কথা তুলে এনেছেন অদ্রীশ। ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা’ নামে পরিচিত সেই হেঙ্গাম গণস্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে রয়েছে মহানায়ক উত্তমকুমারের কাল্ট ছবি ‘সন্ন্যাসী রাজা’-য়। ১৯০৯ সালে ভাওয়াল এস্টেটের মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী দার্জিলিঙে স্বাস্থ্যোদ্ধারে গিয়ে ভুল চিকিৎসায় মারা যান। কিন্তু এগারো বছর পরে ১৯২০-২১ সালে ঢাকায় এক হিন্দিভাষী সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে, যাঁর সঙ্গে মৃত মেজকুমারের অবিশ্বাস্য মিল। ভাওয়ালের জমিদারি তখন রানির শাসনাধীন। কিন্তু প্রজারা তাদের ‘রাজা’কেই ফিরে পেতে চায়। এই সন্ন্যাসীকে ঘিরে শুরু হয় বিপুল উত্তেজনা। মামলা আদালতে পৌঁছয়। জটিল প্রক্রিয়ায় শুরু হয় আসল-নকল নির্ধারণের খেলা। সেই কাহিনিকেই আবার মনে করালো এই বই। মামলার খুঁটিনাটির সঙ্গে অদ্রীশ সন্নিবিষ্ট করেছেন ভাওয়াল সন্ন্যাসীর আত্মকথা, তুলে এনেছেন এ পর্যন্ত এই মামলা নিয়ে গবেষণার বক্তব্য। আদালত সন্ন্যাসীকেই রাজা বলে স্বীকার করে। কিন্তু অনেক পরে ইতিহাসবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অসামান্য গবেষণায় প্রমাণিত হয়, সন্ন্যাসী জাল। আত্মপরিচয়-সংক্রান্ত ঘোলাজলে তিনি দিব্যি মাছ ধরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
বালক ব্রহ্মচারী, ছবি ফেসবুক
• এই সূত্র ধরে অদ্রীশ দেখতে চেয়েছেন বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের সবথেকে বিতর্কিত অধ্যায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ‘ফিরে আসা’-কে। নেতাজির মহানিষ্ক্রমণের পরে বাঙালির যাবতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা ঘুরপাক খেতে থাকে তাঁকে ঘিরে। সুভাষচন্দ্র পরিণত হন অতিমানবে। তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনার কথা বাঙালি মানতে চায়নি। একটা জাতি মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করেছিল, তিনি ফিরবেন। এই বিশ্বাস থেকেই মাঝে মাঝে জন্ম নিতে থাকে নেতাজির ‘ফিরে আসার’ কাহিনি। কারা ফিরে এসেছিলেন নেতাজির বেশে? শৌলমারীর রহস্যময় সন্ন্যাসী সারদানন্দ থেকে মুখার্জি কমিশনের প্রতিবেদন—সফর করতে করতে অদ্রীশ প্রবেশ করেন পপুলার কালচারের বৃত্তে, গণমানসে নেতাজির ইমেজ যেখানে বিবর্ধিত হতে হতে প্রায় কল্কি অবতারে পর্যবসিত। নেতাজির প্রত্যাবর্তনের কাহিনির অন্তিম পর্বে রয়েছেন ধর্মগুরু বালক ব্রহ্মচারী। একটা বিরাট পর্ব ধরে এই জনপ্রিয় ধর্মগুরু দাবি করতেন— “নেতাজি ফিরে আসবেন নেতার বেশে”। কিন্তু এর মধ্যেই কোথাও ইতিহাসের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বাঁকা হাসি হেসেছিলেন। বালক ব্রহ্মচারীর প্রয়াণের পরে তাঁর কিছু শিষ্য তাঁর মরদেহ রেখে দেয়, তিনি ফিরে আসবেন—এই বিশ্বাসে। তুমুল গণ্ডগোলের পরে নিষ্পত্তি হয় এই ঘটনার।
• অদ্রীশের গবেষণার অন্যতম প্রতিপাদ্য আত্মপরিচয়ের লুকোচুরি। বাঙালির সব থেকে ব্যথার জায়গা এই আইডেন্টিটি। কে কখন কোথায় এবং কী ভাবে নিজেকে ঘাপলা করে রাখছেন, তা টের পাওয়া ভার। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও বাদ যাননি এই ঘোটালা থেকে। ১৯২৬ সালে ই জে টমসন ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর: পোয়েট অ্যান্ড ড্রামাটিস্ট’ নামের একটি বই লেখেন। সেই বই কবির একেবারেই মনঃপূত হয়নি। তাই সেলফ ডিফেন্সের জন্য নাকি অন্য কোনও দুর্জ্ঞেয় কারণে তিনি স্বয়ং ‘বাণীবিনোদ বন্দ্যোপাধ্যায়’ ছদ্মনামে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় কলম ধরেন এবং পরে রামানন্দবাবু কবির লেখাটিকে সমর্থন করে টমসনকে আক্রমণ করেন। বাংলা সাহিত্যের খুঁটিনাটির সঙ্গে পরিচিতদের কাছে এটা চেনা ঘটনা। কিন্তু এখানে যাবতীয় নথি সমেত ব্যাপারটাকে উদ্ধার করেছেন অদ্রীশ। বাঙালির ‘আত্মপক্ষ সমর্থন’-এর অনন্য নজির হিসেবে বিষয়টিকে আর্কাইভিকৃত করেছেন। মুনিদেরও যে মতিভ্রম হয়, স্বয়ং কবিগুরুও যে ‘জাল’-এ ধরা পড়েন, তার প্রমাণ হিসেবে রইল এই রচনা।
শ্রীস্বপনকুমার ওরফে সমরেন্দ্রনাথ পান্ডে, ছবি: ফেসবুক
• আইডেন্টিটির রহস্যজাল ক্রমেই ঘনীভূত হয়েছে। রহস্য কাহিনি লেখক শ্রীস্বপনকুমারকে কি এই প্রজন্মের বাঙালি চেনেন? যদি না চেনেন তবে জানিয়ে রাখি, এই ভদ্রলোক আক্ষরিক অর্থেই সহস্রাধিক গ্রন্থের প্রণেতা। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বাংলা বাজারে শ্রীস্বপনকুমারের আবির্ভাব। চার আনা দামেসাহিত্য। আক্ষরিক অর্থেই ‘পাল্প ফিকশন’। ‘বাজপাখি সিরিজ’, ‘কালনাগিনী সিরিজ’, ‘কালরুদ্র সিরিজ’ এবং ‘ড্রাগন সিরিজ’-এর ঘোরঘট্ট পাক ও চক্কর বাঙালি হামলে পড়ে গিলেছে এককালে। গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জি এবং তার সহকারী রতনলাল মোটেই ব্যোমকেশ ও অজিত নয়। তারা সাধারণ। এই সাধারণের স্বপ্নকেই তাঁর কয়েকশো বইতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন শ্রীস্বপনকুমার নামের এক মেঘনাদ। তিনি কে, তিনি কেন— এই সব প্রশ্ন তুলে মোটেই সময় নষ্ট করেনি বাংলা সুশীল সাহিত্য সমাজ।
শ্রীস্বপনকুমার প্রণীত গ্রন্থাবলি, ছবি: ফেসবুক
অদ্রীশ সন্ধান করে জানতে পারেন, শ্রীস্বপনকুমার নামের আড়ালে যে ভদ্রলোক লুকিয়ে রয়েছেন, তিনি কেবল গোয়েন্দা উপন্যাস নয়, অসংখ্য জ্যোতিষ ও ‘ডাক্তারি’ গ্রন্থেরও প্রণেতা। একসময়ে কলকাতার বিলবোর্ডস্থল ছেয়ে ছিল শ্রীভৃগুর বিজ্ঞাপনে। তিনিই যে কিংবদন্তির স্বপনকুমার, তা সেই সময়ে গুজব হিসেবে চলত বটে, তাকে ছানবিন করার চেষ্টা কেঊ করেননি। অদ্রীশের সন্ধানে জানা যাচ্ছে, মানুষটির আসল নাম সমরেন্দ্রনাথ পান্ডে। সাহিত্য জগতে ‘অচ্ছুৎ’ কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তাকে দুঁদে লেখকরাও ভয় পেতেন। বাড়িতে সর্বসমক্ষে সেই সব বই পড়া যেত না। বাপ-জ্যাঠা দেখলে কপালে দুর্ভোগ ছিল। এই বই ছিল ‘বখে যাওয়া’র সিম্পটম। এই নিষেধের আবরণটাকেই কি কাজে লাগিয়েছিলেন শ্রীস্বপনকুমার? অদ্রীশ নিজেই গোয়েন্দা হয়ে নেমে পড়েছিলেন আসরে।
বিমল মিত্র, ছবি: ‘জাল’ গ্রন্থ থেকে
• শুধু স্বপনকুমার নন, ‘জাল’ লেখক আরও ছিলেন। সেই সময়ে বিমল মিত্রের খুবই রমরমা। ‘সাহেব বিবি গোলাম’ কিংবদন্তিতে পরিণত। ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ বা ‘আসামী হাজির’ নিয়ে রীতিমতো ধুমকুম বহাল বই বাজারে। সেই সময়েই একাধিক ব্যক্তি বিমল মিত্রের নাম দিয়ে উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। কিস্যু করতে পারেননি প্রকাশক বা খোদ লেখক। তেমনই একজন ‘বিমল মিত্র’-কে খুঁজে বার করেছিলেন অদ্রীশ। রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নামের সেই মানুষটিও একদা কলেজ স্ট্রিটে পা রেখেছিলেন লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু ‘গোস্ট রাইটার’ হয়েই কাটাতে হল সারা জীবন। জনপ্রিয়তা, পুঁজি আর সাপ্লাই-ডিম্যান্ডের জটিল আবর্তে মোহরা হয়ে যাওয়া মনুষটিকে কি সিম্পলি ‘জাল’ বলে উড়িয়ে দিতে পারি আমরা?
কে সি পাল, ছবি: ‘জাল’ গ্রন্থটি থেকে
• কে সি পাল। যিনি দাবি করেন, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। একটা লোক তার সারাটা জীবন, যাবতীয় সঞ্চয় আর শক্তি ব্যয় করে দিল একটা টোটালি ভুল থিওরিকে সাপোর্ট করে। কিন্তু তার বেদনা কে কী করে অঙ্গীভূত করব ইতিহাসের? অদ্রীশ সেখানেও পৌঁছেছেন। রীতিমত ইন্টারভিউ করে জানতে চেয়েছেন কলকাতার ফুটপাথ জুড়ে সাদা-কালোয় লেখা ‘সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে’-র রহস্য।
এই ভাবেই কখনও পি সি সরকার, কখনও ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় উঁকি দিয়েছেন এই গ্রন্থে। কখনও ছুঁয়ে গিয়েছেন ঠাকুরবাড়ির রেসিপি, তো কখনও সংকলিত করেছেন খবরের কাগজে প্রকাশিত দৈনন্দিন জালিপনার ডোরিক। ফ্রেন্ডশিপ অ্যাডের অন্তরালে থাকা কাঁচা দেহব্যবসার বৃত্ত থেকে সিলিকন-শাসিত নারীবক্ষের অপার মায়াকেও তিনি নিয়ে এসেছেন দু’মলাটের মাঝখানে। পাতায় পাতায় ছড়িয়ে রেখেছেন ছবি, ফ্যাকসিমিলি আর নথি। এই কাহিনি একটা জাতের সামগ্রিক সার্ভে নয়। স্যাম্পল সার্ভে হসেবেও যদি ধরা যায়, অদ্রীশ পথিকৃৎ হয়ে রইলেন এ ব্যাপারে।
‘জাল’-এর প্রচ্ছদ এবং অদ্রীশ বিশ্বাস, ছবি: অদ্রীশ বিশ্বাসের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট
যে কথা না বললে ভাল হতো
এই গ্রন্থ প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যে অদ্রীশ নিজেকে সরিয়ে নিলেন পৃথিবী থেকে। জানা নেই, কোন অভিমান তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। তাঁর মৃত্যুসংবাদ শোনার পর থেকে একথা মনে হছে না যে, বাঙালি তার ইতিহাসের এক নিষ্ঠ সত্যান্বেষীকে হারালো। বরং বার বার মনে হচ্ছে ইতালীয় দার্শনিক উমবের্তো একোর ‘বাওদোলিনো’ উপন্যাসের নামচরিত্রের কথা, যে দাবি করত— সে-ই সভ্যতার শ্রেষ্ঠ মিথ্যুক। যে নিজেই রচনা করেছিল এমন এক ইতিহাস, যা আসলে অলীক। কার্যত সেই অলীকত্বে বিশ্বাস করেই একদিন বাওদোলিনো প্রবেশ করে তার স্বরচিত মিথ্যার দেশে। এবং অবশ্যই আর ফিরে আসে না। মনে হয়, অদ্রীশও বাঙালির জালিপনার ইতিহাস লিখতে লিখতে সেই রকমই কোনও জগতের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে সত্য আর মিথ্যের সীমারেখাটা ভারি সূক্ষ্ণ। কখন যেন জীবনের রিয়্যালিটিটাকে অতিক্রম করে ফেলেছিলেন, ‘ফেক’-এর জগতে ঢুকে পড়েছিলেন। কে জানে ‘ফেক’-ই প্রকৃত ‘রিয়্যাল’ কি না। আমরা জানি না। অদ্রীশ বোধ হয় জেনে গিয়েছেন।
Comments