ভূতনীর চরে

ভূতনীর চরে - রাজেন্দ্র
-----------------
চাকরীসূত্রে মালদায় আসার পর তিন তিনটে বছর কেমন করে যেন হু হু করে গড়িয়ে চলে গেলো । এখানে আসার পর থেকে একের পর এক ঘটে চলা ঘটনার ঘনঘটায় কিছু কিছু স্মৃতি এখনো কিন্তু টাটকা ফুলের মতোই ঝরঝরে সতেজ । ছোটখাটো কিছু কিছু অভিজ্ঞতা বন্ধুদের সাথে ভাগ করে নিয়েছি এর আগেই । এখনো এখানে থাকবো আরো কিছু দিন । জানিনা, আর কী কী ঘটনার সাক্ষী হতে হবে আমাকে আগামী কয়েকটা দিন ।

তবে এবার আমি সকলের সাথে যেই অভিজ্ঞতার ঝুলি ভাগ করে নিতে চলেছি, তা কিন্তু বেশ অভিনব । আমরা যারা শহর বা মফস্বলের মানুষ, তারা এমনটা বোধহয় স্বপ্নেও কখনো ভাবতে পারবো না ।

আচ্ছা, এমন কোনও জায়গা কি জানা আছে আপনার, বা দেখা আছে, যেখানে এখনো মানুষ ধুতি পড়ে, খালি গায়ে, খালি পায়ে মাটির পথে হেঁটে চলে ? সেখানে না আছে একটাও পাকা রাস্তা, না আছে সেই রাস্তার উপর বিদ্যুৎ সংযোগ । যেখানে সূর্যদেব শুয়ে পড়ার সাথে সাথে গোটা জনজীবনটাই প্রায় শুয়ে পড়ে, আর জেগে থাকে শুধু আকাশ ভরা চিকচিক করে জ্বলতে থাকা অগুনতি তারা । যেখানে সাইকেল, বাইক, ট্র্যাক্টর আর গোটা কয়েক ট্রেকার ছাড়া আর কোনও যোগাযোগের মাধ্যমই নেই । সমগ্র এলাকাটাই কিন্তু গঙ্গার উপর জেগে ওঠা একটা সুবিশাল চর, যার ভিতরে জাঁকিয়ে বসে আছে তিন তিনটে গ্রাম পঞ্চায়েত ।

এখানে না আছে ভালো দোকানপাট, না আছে বাজারহাট । মানুষের এখানে মূল জীবিকা কৃষিকাজ । আর জমিহীনেরা এখানে হয় জনমজুর, নয়তো বিড়ি বাঁধা মহিলা আর শিশু শ্রমিক । আর আছে কিছু ট্র্যাক্টর ও ট্রেকার চালক । এছাড়া রয়েছে হাজার খানেক মাছমারা ছোটখাটো জেলে আর ভাগচাষীর দল । আর তেমন কিছুই নেই এখানে । বিনোদন আমোদ প্রমোদের কোনরকমের ব্যবস্থাও নেই এখানে । অথচ কিন্তু উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে বিস্তর । এক কথায় বলা চলে "ভার্জিন ল্যান্ড" ভূতনীর চর ।

এ হেন ভূতনীর চরে আমি শতাধিক বার আসা যাওয়া করেছি । কখনো পাট্টা অ্যানালমেন্ট কেসের তদন্ত করতে, কখনো রুটিনমাফিক ওখানকার রেভিনিউ ইন্সপেক্টার এর অফিস পরিদর্শন করতে । কখনো গেছি বাংলা ইঁটভাটা পরিদর্শন করে জরিমানা সহ রয়্যালটি সংগ্রহ করতে ।

আর নিজের জমি দ্প্তরের কাজে প্রতিবারই আমি মোটামুটি চলাফেরা করা করা যায় গোছের ভদ্র সভ্য টাইপের গাড়ি নিয়েই ওখানে আসা যাওয়া করেছি এতদিন যাবৎ ।

তবে ব্যতিক্রম ছিলো শুধুমাত্র গত বিধানসভা নির্বাচনের সময়কাল । ঐ সময় আমি ওখানে ছিলাম সেক্টর ম্যাজিস্ট্রেট । সেখানে আমার জন্যে একটা ভাঙাচোরা, আধমরা, ছারপোকা ভর্তি সীটের ছিবড়ে ওঠা জীপ গোছের ট্রেকার দিয়েছিলো মানিকচকের বিডিও অফিস ।

রাজ্য সিভিল সার্ভিস ক্যাডারে ব্লক অফিসের জয়েন্ট বিডিও আর আমার পে-স্কেল যেখানে সমান সমান, সেখানে আমার অধিকারকে বঞ্চিত করে কেমন করে পদাধিকারে আমার থেকেও অনেক আতিপাতি ছোটখাটো গোছের ব্লকের স্টাফেরা বিডিও অফিসকে ম্যানেজ করে ভালো ভালো জাতের গাড়ি বাগিয়ে নিয়েছিলো, তা ভেবে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম ।

বিডিও অফিসের এই রকমের নিন্দনীয় জঘন্য দ্বিচারিতামূলক মানসিকতার কারণে আমি বেশ ভালো রকমেরই আঘাত পেয়েছিলাম আমি মনে মনে ।

মে মাসের সেই প্রচন্ড দাবদাহ গরমে কেমন করে যে আমাকে সমস্ত বুথগুলোর তদারকি করে দেখতে হতো সুবিশাল এলাকা ঘুরে ঘুরে, ধূলো বালি আর ছারপোকার অসহ্য কামড় খেয়ে, গলা আর ঠোঁট শুকিয়ে, তা ভাবলে এখনো আমার মন প্রচন্ড রাগে চিড়বিড় করে ।

কিছু খচ্চর লোক আম জনগনের খরচে এবং তাদেরই দেওয়া ভোটে ক্ষমতা লাভ করে আবার সেই জনসাধারণকেই সুযোগ সুবিধামতো ঘাড় ভেঙে শোষণ করবে বলে এই সাংবিধানিক প্রহসন বছরের পর বছর ধরে হতে থাকবে ।

সে যাই হোক, আগামী দিনের ভাবী পর্যটকদের উদ্দেশ্যে বলি - মালদা শহর থেকে বত্রিশ কিলোমিটার দূরে মানিকচকের ব্লক অফিস । সেখান থেকে স্টেট হাইওয়ে ধরে আরও পাঁচ কিলোমিটার গেলে পড়বে মথুরাপুরের শঙ্করটোলা ঘাট । সেখান দিয়েই বয়ে চলেছে গঙ্গার একটা শাখানদী ফুলহার । আহা, কি অপরূপ রূপে রসময়ী আকর্ষণ তার । সূর্যাস্তের সোনা গলা জলের ঢেউয়ে মন ভেসে চলে বহুদূর অজানা পথের খোঁজে । সেই নদী পার হলে শুরু হয় ভূতনীর চর ।

দিনের বেলা বহু কাজে বহুবার ওখানে যেতে হলেও, একবারই সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে রাত্রিযাপন করেছিলাম । আর সেটা ঐ বিধানসভা নির্বাচনের আগের দিন রাতে । সেবার রাত কাটিয়েছিলাম উত্তর চন্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিসে । ইচ্ছা একটুও ছিলো না ঐ পরিবেশে রাত কাটানোর । কিন্তু উপায়ও ছিলো না তখন ।

এলাকার নেতা দাদা প্রধানেরা সকলেই কর্মসূত্রে আমার পূর্ব পরিচিত হলেও ইলেকশনের সময় প্রোটোকল জনিত কারণে তাদের আতিথ্য গ্রহণ করাও আমার পক্ষে সম্ভবপর ছিলো না একেবারেই ।

তবে এবারের ব্যাপারটা ছিলো একেবারেই অন্যরকম । লোকমুখে শুনলাম ভূতনীর উত্তর চন্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় একশো বছরেরও বেশী পুরানো আমলের একটি রাসের মেলা চলে টানা একটা মাস ধরে । আর সেই মেলায় যাওয়ার জন্যে অনেকের কাছ থেকেই অনেক অনুরোধ পেলাম ।

আমি ভেবে দেখলাম এমন কোট আনকোট আনএডিটেড আনকাট 'ভার্জিন' মাটির চরে ইঁটের দেওয়াল তোলা চারদেওয়ালের টালির চালের ঘরে রাত্রিযাপন করাটা আমাদের মত শহুরে মফস্বলী অহংকারীদের কাছে একটা বিরাট বড়ো অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার ব্যাপার ।

আর এমন বাড়িতে আমি এর আগেও রাত কাটিয়েছি উত্তর দিনাজপুড়ের করণদিঘী ব্লকের আদিবাসী সাঁওতাল পাড়ার নিকটবর্তী হাড়ভাঙা গ্রামে । সেই বারেও কিছু অভিনব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম । একটা গোটা সন্ধ্যা কাটিয়ে এসেছিলাম সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো গোছানো ঝকঝকে তকতকে নিকোনো মাটির বাড়ির ভিতরে, খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী আদিবাসী জোসেফ দাদার পরিবারের সাথে । ওদের পাশে ওদের সাথে বসে খেয়েছিলাম ভাত পচানো হান্ডি বা হাঁড়িয়া, যার আলোচনা অন্য কোনও একটা পরিসরে আবার করবো ।

যাই হোক, ভূতনীর চরের প্রত্যন্ত গভীর এলাকায় হাল্কা শীতের রাতে এমন শতাধিক বছরের পুরানো রাসের মেলার ভীড়ে সময় কাটানো আর কুয়াশা মাখা ভোরে উঠে জেলেদের সাথে মাছ ধরায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতায় ভরপুর হওয়ার চরম বাসনা জেগে উঠলো মনের ভিতর ।

যেমন ভাবা, তেমন কাজ । সটান ফোন লাগালাম অফিসের পাশেই নারায়ণপুরের এক ভাইকে । নাম আব্দুল । ওকে জানালাম আমার সাথে এমন করে আকস্মিক ভাবে চলার সঙ্গী হওয়ার জন্যে । এর আগেও আমরা দু'জনে একসাথে রায়গঞ্জে ঘুরে এসেছি । ঘুরে এসেছি দার্জিলিং । আর রাজমহলে তো গেছিই । এ সবের আগে আমার সাথে বিডিও অফিসের দেওয়া ঐ ভাঙাচোরা গাড়িতে চাপিয়ে ওকে ভূতনীর চরেও নিয়ে গেছি নির্বাচনের আগে এলাকা পরিদর্শনের সময় ।

বুধবার অফিসের কাজ সেরে সাড়ে পাঁচটার পরে আমরা দুইজনে বের হলাম । গন্তব্যস্থল থেকে বাইকে চেপে আমাকে নিতে এসেছিলো একজন । ঐ বাইকেই আরোহীসহ আমরা বাকী দুইজনে চেপে বসলাম ।

চালকের ডাক নাম রাণা । আমার পূর্ব-পরিচিত । ওর নিজের বাড়ি ধূলিয়ানে । আর ভূতনীতে ওর বোনের শ্বশুরবাড়ি । হতভাগী বোনটি বিগত বারো বছর ধরে তিন ছেলে মেয়ে আর অসুস্থ্য বৃদ্ধ শ্বশুরমশাইকে নিয়ে চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে বৈধব্যজীবন যাপন করছে ভূতনীর শ্বশুর বাড়ির ভিটে মাটিতে ।

ধূলিয়ান থেকে ইলিশ তুলে ফারাক্কা রেল স্টেশনে এসে রাতের গৌড় এক্সপ্রেসের কামরায় এক ব্যাগ মাছ দিয়ে গিয়েছিলো আমাকে এই বাইক চালক শ্রীমান রাণা । আজকেও ওকে দেখলাম বেশ সহজ অথচ সতর্ক ভাবেই বাইক চালাচ্ছে । আর মাঝে মাঝেই টুকটাক এটা সেটা রকমারী গল্পও চলছে ।

মানিকচক থেকে মথুরাপুরের মাঝামাঝি পথে একটা পেট্রল পাম্প থেকে বাইকে তেল ভরে নিয়ে আবার রওনা দিলাম আমরা তিনজন । সোজা চলে এলাম মথুরাপুর এর শঙ্করটোলা ঘাটের মুখে ।

এখানে ভটভটি বা ভুটভুটি মোটর চালিত নৌকোগুলো জোড়ায় জোড়ায় বাঁধা থাকে । আর ওদের উপরে বিছানো থাকে বিশালকায় বাঁশের মজবুত মাদুর । ফেরীঘাট কিন্তু মোটেই বাঁধানো নয় । অর্থাৎ ভাঙনের মুখে মুহূর্তের ভিতর সবকিছু খসে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে যে কোন সময় ।

ঐ কাঁচামাটির ফেরীঘাটের ডাঙা অংশ আর নৌকার সাথে সংযোগ রক্ষা করে বিশাল বিশাল কাঠনির্মিত মোটা আর মজবুত ভারী একজোড়া চওড়া পাটাতন । সেই পাটাতনের ভরসায় নৌকোতে উঠে পড়ে সাইকেল, বাইক, আর প্রায় যে কোন চার চাকার গাড়ি, এমনকি মাটি বালি পাথর বয়ে নিয়ে চলা বিশাল চাকার পাওয়ার টিলার ট্র্যাক্টর এমনকি ছোটখাটো চেহারার লরিও ।

আমরাও ভুটভুটিতে চেপে গেলাম । এখানে বয়স্ক কেউ কেউ শুকনো কাদামাখা বাঁশের মাদুরের উপর একটা ধার দেখে বসে পড়তে চান । মালদার মূল ভূখন্ড থেকে ভূতনীর চরে আসার এক এবং একমাত্র সংযোগস্থল হলো এই সব মেশিনচালিত নৌকো ।

আমরা যখন পূর্বদিকের শঙ্করটোলা ঘাটের পাড়ে নৌকায় চাপার অপেক্ষায় ছিলাম, তখন পশ্চিমের সূর্য প্রায় ডুবতে বসেছে ঝাড়খন্ডের ধার ঘেঁষে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা আধোঘুম ক্লান্ত পাহাড়ের মাথা আর হেলে থাকা একরোখা ঘাড়ের উপর ।

হাল্কা হাল্কা মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে চলেছে চারপাশ জুড়ে । ফুলহার নদীর জলে খেলছে ঢেউ । আর ঢেউএর তালে তালে নাচতে নাচতে ভেসে চলেছে শ্যাওলার দল, প্লাস্টিক এবং আর কত রকমের এদিক সেদিক ছুঁড়ে ফেলা আবর্জনা সামগ্রী ।

আর লাল টকটকে সূর্যের গলে পড়া আলোর ফোঁটা মিশে যাচ্ছে ফুলহারের ঢেউ ওঠা জলের খোলা পিঠ জুড়ে । মনে হচ্ছে যেন পুরো নদীটা জুড়েই বয়ে চলেছে সোনার জলধারা । মা গঙ্গার অযোনিসম্ভূতা এক অসামান্যা রূপবতী নারী তার শরীরি বিভঙ্গে আপন তালে আপনিই মাতোয়ারা । কাউকে কেয়ার নয়, কারো পরোয়া নয় । ইচ্ছে মতন সে পাড় ভাঙছে, চর জাগিয়ে তুলছে । ভূমিরূপের সৃষ্টি স্থিতি লয় নিয়েই তার এই ছেলেখেলা চলছে সেই কত বছর ধরে, কত পুরুষ ধরে । কতজন তার আগ্রাসনে হয়েছে নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত । আবার কত শত প্রাণকে সে তার আপন বুকে সযত্নে ধারণ করে আছে ।

আস্তে আস্তে আলো আরও কমে এলো । আমরা এপাড়ে চলে এলাম । ভূতনীর চরে । আমাদের ভাসমান বাহনটা এসে ক্যাঁচকুচ শব্দ করে ধাক্কা খেয়ে ঘষটে গেলো নদীর ভাঙা পাড় সংলগ্ন নোঙর গেঁথে আটকে রাখা নৌকোর পেটে । সবাই আমরা কম বেশী একবার দুলে উঠলাম । হুড়মুড় করে নামতে লাগলো সকলে পালে পালে । আমরাও ভীড় কম দেখে নেমে পড়লাম ।

এখানকার ভাঙা মাটির পাড় থেকে আরও দেড় কিলোমিটার উপরে চড়ে রিং বাঁধের উপর উঠবো আমরা । এই সমগ্র ভূতনীর চরকে গঙ্গার প্লাবন আর ধ্বংস থেকে বাঁচানোর লক্ষ্যে লালমাটির মোরাম আর পাথর ফেলে গড়ে তোলা হয়েছে সুবিশাল রিং বাঁধ । এই বাঁধটা কিন্তু কংক্রীটের ঢালাই করা নয় । রোদে জলে বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে এই বাঁধটাও বেশ ক্ষয়িষ্ণু । তার উপর রয়েছে ট্রাক্টর চলার অসহ্য উৎপাত । গোটা বাঁধের উপর দিয়ে দিনভর চলছে ঐ ভারী চাকার পাওয়ার টিলার । ফলে জায়গায় জায়গায় তৈরী হয়ে গেছে বিরাট বিরাট খাবলা খাবলা এবড়ো খেবড়ো বিভীষিকাময় গর্ত ।

রাতের অন্ধকারে বাইকে চেপে তিনজন যে কেমন করে ঐ পথ ধরে যাব, সেটাই ভাবছিলাম । রাণা বাইকে স্টার্ট দিলো । আমি মাঝখানে আর আব্দুল আমার পিছনে । বাইকের আলো জ্বলে উঠলো । চারপাশ জুড়ে গাঢ় ঘন নিকষ কালো গভীর অন্ধকার আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছিলো । চরের উপর বালি আর পলিমাটি মিলে মিশে একাকার । আমাদের আগে নামা ট্র্যাক্টর আর বাইক গুলো কিছু হাত সামনে এগিয়ে ছিলো । আমরা আরও একটু পরে যাওয়া স্থির করলাম । কারণ সামনের গাড়ি গুলোর পিছন পিছন গেলেই টন টন পলিমাটির পাউডার উড়বে চারপাশ জুড়ে । মনে হবে যেন ধূলোর ঝড় ।

আসলে এই গোটা চরটাই এমন । একটা গাড়ি চলে গেলেই ওর চারপাশ জুড়ে মিনিট খানেক ধূলোয় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে । আর সেই ধূলো ঠিক যেন পাউডার । সারা দেহের লোমকূপে আর মাথার চুলের গোড়ায় চিপকে বসে যায় । গা হাত পা মাথা চুলকায় । নাকে মুখে ধূলোর পাউডার ভরে যায় । চুলের উপর সাদা ধূলোর আস্তরণ জমে যায় । এই কারণে আমি ভূতনী থেকে ফেরার পথে প্রতিবার স্নান করি ।

এখান থেকে বাঁধের রাস্তা পর্যন্ত দেড় কিমি এই পথ কয়েক মানুষ জলে ডুবে থাকে বর্ষার সময় । গোটা এলাকা বানভাসি হয়ে থাকে । শুধুমাত্র ঐ রিং বাঁধের কল্যানে বেঁচে যায় ভূতনীর গরীব মানুষ । আর বর্ষার শেষে নদীর জল নেমে গেলে আবার এই পায়ে চলা গাড়ির চাকায় ক্লিষ্ট পথ নিজের থেকেই তৈরী হয়ে যায় । জমাট বেঁধে থাকা পলিমাটি বালির পলেস্তারা ভাঙতে ভাঙতে, চাকা আর পায়ের চাপে পিষতে পিষতে শেষমেষ ধূলোর পাউডারে পরিণত হয় ।

আমি এই ভয়ানক ধূলোর থেকে অনেক প্রোটেকশন নিয়েও কোনওবার রক্ষা পাইনি । জানি, এবারও পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই । তবুও উইন্ডচিটার জ্যাকেট, চশমা সহ নাকের উপর রুমাল আর মাথায় টুপি চড়ালাম । যতটা বাঁচা যায় আর কী ! গরমকাল হলে তো পরোয়াই ছিলো না । ঘরে ঢুকে সব জামাপ্যান্ট ঝেড়ে ধূলো ফেলে দিতাম । আর স্নান সেরে ঝরঝরে হয়ে যেতাম । এখন সেটা সম্ভব নয় । আসার পথে বেশ খানিকটা শীত শীত ভাব লাগছিলো ।

আমাদের বাইক সবার শেষে শেষে ধীর গতিতে চলতে শুরু করলো । ভাঙতে লাগলো পলি জমাট বেঁধে তৈরী হওয়া চড়াই উৎরাই । বন্ধুর এবড়ো খেবড়ো পায়ে চলা পথে ট্রাক্টরের দৌলতে তৈরী হওয়া বিশালকায় গাড্ডাগুলো একে একে পার হয়ে তিনজন মিলে একটা বাইকে চেপে বিভীষিকাময় রিঙ বাঁধের দিকে এগিয়ে চললাম । খালি হয় করছিলো - এই বুঝি অন্ধকারে কিছু একটা হয়ে গেলো ।

এতকাল দিনের বেলা করে অফিসের কাজের প্রয়োজনে এখানে এসেছি । আর ফিরে গেছি বিকেলের আগে আগেই । এলাকা গুলোর বেশ বদনাম । রাস্তাগুলোও খুব ভয়াবহ । যখন তখন একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতেই পারে ।

গত বিধানসভা নির্বাচনের সময় এখানে একজন নির্মান সহায়কের বুলেরো গাড়ি পুরো উল্টে ডিগবাজি খেয়ে গিয়েছিলো রিংবাঁধের রাস্তার উপর । সোজা পাল্টি খেতে খেতে গড়িয়ে গিয়ে পড়েছিলো একটু দূরের কলাই এর ক্ষেতের ভিতর । ড্রাইভার আর সেক্টর ম্যাজিস্ট্রেটের অবস্থা বেশ গুরুতর হয়ে গেছিলো ।

আর এই এলাকা এতটাই অনুন্নত, যে ভালো ডাক্তার বা ওষুধের দোকান, কোনটাই একেবারে নিকটবর্তী নয় । সবটাই ফুলহার নদী অতিক্রম করে মথুরাপুর বা মানিকচক ব্লক অফিস অঞ্চলের দিকে । আর রাজমহল থেকে আসা অবাঙালী হিন্দিভাষী খোট্টা খুনী ডাকাতদের কথা তো না হয় বাদই দিলাম ।

আমাদের তিনজনের মিলিত ওজনে আর পথের গাড্ডায় ধূলোর পাউডারে নিমজ্জিত বাইকের চাকা টালমাটাল হয়ে গড়গড়িয়ে চলতে লাগলো । চারপাশ জুড়ে সবকিছু ব্ল্যাক্ আউট । অন্ধকারের আস্তরণ ছিঁড়ে রাণার বাইক চলতে লাগলো । প্রায় মিনিট দশেক এভাবে চলার পরে আমরা রিং বাঁধের মাথায় চড়লাম ।

এবার আমাদের বাইক বাঁধের উপর দিয়ে ঐ ভাঙাচোরা মোরামের কাঁকর ওঠা ট্রাক্টর চলা রাস্তা দিয়ে গতি সামান্য বাড়িয়ে দিয়ে চলতে লাগলো । এই সব পথ দিয়ে আর নীচ দিয়ে চলে যাওয়া মাটির রাস্তা দিয়ে ট্রাক্টরের পাশাপাশি মোষের টানা গাড়িও অনেক চলাফেরা করে । ফলে বাঁধের উপর মোরাম ফেলে বানানো রাস্তার হাল একেবারেই জঘন্য গোছের ।

প্রশাসন এই সব এলাকায় খুব একটা নজর কখনোই দেয়নি । স্বাধীনতার পর থেকে নেতা মন্ত্রীরাও এখানকার আধপেটা আধামরা লোকেদের নিয়ে কখনো কিছু ভাবেনি । না বানিয়েছে ভালো রাস্তাঘাট । না দিয়েছে বৈদ্যুতিক বাতি ।

হাতে গোনা কয়েকটা প্রাইমারি বিদ্যালয় আছে এখানে তিনটে গ্রাম পঞ্চায়েত জুড়ে । আর আছে উত্তর চন্ডীপুর উচ্চ বিদ্যালয় । স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল অত্যন্ত বেহাল । রাতবিরেতে কিছু একটা হলে তাকে ঘরের বিছানায় ফেলে কষ্ট পেয়ে মরতে দেখা ছাড়া আর কোন উপায় জানা নেই এলাকার অর্ধশিক্ষিত অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষদের । এরা আমাদের মতন মূল স্রোতের সবকিছু পাওয়া শহুরে সাজুগুজুদের থেকে এখনো কমপক্ষে একশ' বছর পিছিয়ে ।

বাঁধের উপর দিয়ে চলমান বাইকের উপর বসে থাকাটা খুব কষ্টসাপেক্ষ বলে মনে হচ্ছিলো আমার । ভীষণ রকম ভাবে কোমর আর নীচের অংশ ধরে গিয়েছিলো । বরাবরই আমার জিনসের প্যান্ট পড়ে থাকা আর চলাফেরা করবার অভ্যাস । আজ অবদি কখনো ফরম্যাল্ পোষাকে আমি অফিস বা মিটিং করিনি । এমনকি জেলার হর্তা কর্তা বিধাতা জেলাশাসকের ডাকা মিটিং এও নয় ।

এ হেন টাইট জিন্সের প্যান্ট আর অন্তর্বাসের চাপে পড়ে যাওয়া আমার অন্ডকোষ আর পায়ের কুঁচকিতে যেন ঝিঁঝিপোকা ভর করে বসলো । দুইদিক থেকে লাগা চাপে আর প্রবল ঝাঁকুনিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে গেল তাদের । অবশেষে একটা আধমরা আধো আলো অন্ধকার মাখা শুকদেবটোলা বাজারের উপর এসে থামলো আমাদের সবেধন নীলমনি বাইকখানা ।

নেমেই প্রথমে কোমরখানা বার কয়েক টুইস্ট ড্যান্স করালাম । তারপর একটু ওঠবোস । পাশ দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ করে একটা ট্র্যাক্টর চলে গেল একরাশ লালরঙা ধূলো উড়িয়ে । আমরা বাঁধের ধারের ঢাল বেয়ে খুব সন্তর্পণে পা টিপে টিপে নীচের প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া হাটের কাছে উপস্থিত হলাম ।

এলাকা প্রায় ফাঁকা । মোবাইলে এখন সবেমাত্র পৌনে সাতটা বাজে । এর মধ্যেই প্রায় সবকিছু বন্ধ । অথচ এই সময় মথুরাপুর বা মানিকচকেও সব দোকানপাট বাজার হাট খোলা । আর জমজমাট মালদা শহরের কথা না হয় বাদই দিলাম । সেখানে এখনো শিশু উদ্যান পার্ক খোলা । আর মহানন্দার উপর বসানো সোলার ল্যাম্পবাতির কোলে জোড়ায় জোড়ায় চুপচাপ বসে প্রেম করে চলেছে স্কুল কলেজের পড়ুয়ারা । বড়ো আর অতি বয়স্করাও থেমে নেই । তারাও এইসময় নদীর পাড়ে বেঞ্চে বসে আড্ডা দিচ্ছেন বা সান্ধ্যভ্রমণে বের হয়েছেন অনেকেই ।

আমরা একজন তেলেভাজা ওয়ালার কাছে গেলাম । বিনা তেলে ভেজা ছোলা নুন কাঁচালঙ্কা আর পেঁয়াজ সহ লোকাল চালের মুড়ি খেলাম । এই চালের মুড়ির স্বাদ একবার খেলেই জিভে লেগে যাবে । মোটা কড়কড়ে নোনতা ইউরিয়ামুক্ত অসাধারণ মুড়ি । সাথে দুটো করে প্রায় ঠান্ডা পেঁয়াজিও খেয়ে ফেললাম খিদের চোটে । অফিসে কাজের ফাঁকে দুপুরে রোজ আড়াইশো গ্রাম টকদই, একটা শাঁসওয়ালা ডাব আর একটা টাটকা মিষ্টি খাওয়ার অভ্যেস আমার । মাঝে মাঝে অন্যান্য ফলও খাই । তাও সেটা খেয়েছিলাম আড়াইটে নাগাদ । তারপর থেকে এতক্ষণ অবধি আর কিছু মুখে ওঠেনি । আর যে পরিমাণ ঝাঁকানির চোটে নাকানি চোবানি খেয়ে লাফাতে লাফাতে এতদূর চলে এলাম, তাতে খিদে না পাওয়াটাই খুব অস্বাভাবিক ।

প্রাথমিক টিফিন সেরে আমরা আবার বাইকে চড়ে বসলাম । রাস্তা ক্রমশঃ খারাপ থেকে খারাপতর হতে লাগলো । এখানকার মানুষজন যে কেমনতর কে জানে ! এত অভাব, এত রকমের দীর্ঘকালীন নাগরিক সুবিধা না পাওয়াগত সমস্যা নিয়ে এদের কারও কোনও মাথাব্যাথাই নেই । সবাই যেন এতেই খুব সুখী এবং সন্তুষ্ট । কোথাও যেন কারো কোনও অভিযোগ নেই ।

সত্যিই তো ! যদি অভিযোগের উপর অভিযোগের বারুদ জমে উঠতো সত্তর বছর ধরে, তবে কি রাজনৈতিক দলগুলো চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারতো । না কংগ্রেস, না বামফ্রন্ট - কেউ কিচ্ছুটি এখানে করেনি এতকাল ধরে । আর মিডিয়া গোষ্ঠীও এই সব প্রান্তিক এলাকায় আসেনা । তাদেরও কোনও মাথাব্যথা নেই । অথচ কলকাতা শহরের কোথাও একটু বৃষ্টি হয়ে জল দাঁড়িয়ে পড়লেই তাদের হৈ চৈ চিল চিৎকার শুরু । সত্যিই আজব এই ভারতবর্ষ । তেলা মাথায় তেল দিয়েই দেশটা দিব্যি চলে যাচ্ছে ।

শুকদেবটোলার হাট ছেড়ে আরো মিনিট কুড়ি চলার পর বাইকটা বাঁধের বাইরের দিকের ঢালু পথ বেয়ে ধীরগতিতে নামতে শুরু করলো । রাস্তার অবস্থা বেদম খারাপ এবং জায়গায় জায়গায় প্রায় ভেঙে পড়া অবস্থায় হাফ ঝুলন্ত ।

এই সব রুটে যদি ছোট চাকার গাড়ি আসতো, তবে তা আর ফেরীঘাট অতিক্রম করে রিং বাঁধের উপর বানানো মোরামের পথ অবদি টেনে আসতেই পারতো না । একবার আমিই চরম ফাঁসা ফেঁসে গিয়েছিলাম বছর দেড়েক আগে ।

সেই বার আমার সাথে ছিলো দপ্তর থেকে পাওয়া একটা সাদা অ্যাম্বাস্যাডার গাড়ি । এখানে একটু বলে রাখি, আমাদের ব্লকের ভূমি রাজস্ব দপ্তরের অফিসটি বিগত দুই বছর ধরে বছরের শেষ তিন মাস বা নব্বই দিনের জন্যে গাড়ি পাচ্ছে । উদ্দেশ্য রাজস্ব আদায়ের জন্যে গাড়ির মাথায় মাইক বেঁধে জনমানসে প্রচার ও সচেতনতা বৃদ্ধি । পাশাপাশি বেআইনীভাবে মাটি কেটে ব্যবসা করা বাংলা ইঁটভাঁটার মালিক এবং সড়কপথে চলা মাটি বালি ও পাথর বহনকারী গাড়িকে আটক করে বা আচমকা ধড়পাকড় করে বিনা অনুমতিতে বালি পাথর মাটি বহন করবার জন্যে উপযুক্ত জরিমানা বাবদ রয়্যালটি আদায় করা ।

আমাদের পাওয়া ঐ অ্যাম্বাস্যাডর গাড়িটা বেশ মজবুত হলেও তার পিছনের চাকা দুটো চরের ভিতরে প্রাকৃতিক নিয়মে তৈরী হওয়া পাউডার টাইপের ধূলো মাটির ভিতরে ফেঁসে বসে গিয়েছিল । চাকাগুলোর চারভাগের তিনভাগ ধূলোর পাউডারে ঢেকে ছিলো । অভিজ্ঞ ড্রাইভার অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও ঐ গাড়ির চাকা তুলতে পারলো না ।

শেষ পর্যন্ত আমরা সকলেই নেমে পড়ে হাত লাগালাম । জোর কদমে ঠেলাঠিলি করে ঐ শীতের বিকেলেও ঘর্মাক্ত কলেবর হলাম । তবুও ঐ অ্যাম্বাস্যাডরটিকে সামনের দিকে এক ইঞ্চিও ওঠানো গেলো না । অবশেষে জনা দশেক জন মজুরকে পেলাম ।

ওরা মাঠ থেকে হাঁটাপথে বাড়ি ফিরছিল । আমাদের মত শহুরে বাবু আর সাহেবদের দেখে না জানি কেন ওদের মনে ঈষৎ দয়ার উদ্রেক হলো । তারপর একটু দূরের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে আনলো ওদের ভিতর থেকে জনা দুই লোক । অনেক চাড় দিয়ে, প্রচুর ঠেলা আর গুঁতো মেরে ঘন্টাখানেক কাটিয়ে অবশেষে উদ্ধার করা গেলো ঐ চাকা দুটি'কে ।

ঐ দিনের বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে পর্যন্ত আটক হয়ে থাকার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার শিক্ষাটা মগজে গেঁথে ছিলো আমার এতদিন । আজ তা সময় সুযোগ করে বের হয়ে এলো ।

আমরা যেই দিকের ঢালে নামলাম, সেই দিকটা হলো নদী অভিমুখী । অর্থাৎ বন্যা হলে এই সব এলাকা গুলো সম্পূর্ণভাবে বানভাসি হয়ে যায় । শুধু দুই এক টুকরো জমি এখানে সেখানে ইতস্ততঃ ভাবে মুখ উঁচিয়ে জেগে থাকে ।

আমাদের গন্তব্যস্থলও ছিলো ঐ রকমেরই একটা আপাতঃ উঁচু জায়গা । যেখানে রাসের মেলা চলছে, তার থেকে বাইকপথে মিনিট পনের দূরে অবস্থিত লুটিহারা প্রাথমিক বিদ্যালয় অঞ্চল সংলগ্ন গ্রাম অঞ্চল ।

সত্যি কথা বলতে এই সব এলাকার প্রায় সবটুকুই পায়ে পায়ে চলে তৈরী । আর এর উপর দিয়ে চলা মোষ আর ট্রাক্টর টানা গাড়ির চাকা গিয়ে পথের সৌন্দর্য্যকে আগাপাশতলা ধর্ষণ করেছে বছরের পর বছর । এ নিয়ে কারো কোন আপত্তি বা অনুযোগও নেই । সবাই সবকিছু শান্তভাবে নীরব ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছে ।

এই পথে যেতে যেতে রীতিমতন ভয় করছিলো আমার । আব্দুল বা রাণার মনের কথা বলতে পারবো না বটে, তবে আমার কিন্তু বেশ আতঙ্ক হচ্ছিলো । আর সেটা হওয়াই খুব স্বাভাবিক ছিলো আমার মত শহুরে মানুষের পক্ষে ।

এ নিয়ে হাসাহাসি বা ব্যঙ্গ বিদ্রূপের কোন কারণ আমি দেখিনা । যদি আমার মত শহরে বড়ো হয়ে ওঠা কেউ এই পথে আসেন আগামী দিনে, তখন তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে মনে মনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেখতে পারেন, কেমন লেগেছিলো তাঁর নিজস্ব অনুভূতি ।

আরও মিনিট পনের একইভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে চললো আমাদের বাইকখানা । আর মাঝে মাঝেই নামতে হলো আমাদেরকে বাইক থেকে । রাস্তার অবস্থা সেখানে এতটাই খারাপ, যে সেখানে একজনের বেশী অতিরিক্ত কাউকে বহন করাই অসম্ভব ব্যাপার ।

আরও খানিকটা চলার পরে একটা এমন সরু মাটির পথ এলো, যার দুই পাশেই কচুরিপানায় ভরাপুর ডোবা আর খানাখন্দ । এদিকে ওদিকে অন্ধকার চিরে কখনো ভেসে আসছে ঝিঁঝিপোকার ডাক । কখনো ব্যাঙেরআ দলবেঁধে মকমক করছে । কখনো 'ম্যা ম্যা' করে পাশের বাড়ির উঠোন থেকে ডেকে উঠছে ছাগলছানা ।

চালক রাণা এরপর নিজেই বাইক থেকে নেমে ঐ সংকীর্ণ পথ ধরে ধীর সন্তর্পণে পা চালালো । ঐখানকার মাটি এমন পিচ্ছিল আর নরম,যে সামান্য অতিরিক্ত চাপ পড়লেই ঐ মাটি খসে কচুরিপানা ভরা ডোবায় চালকসহ বাইক গড়িয়ে নেমে যাবে ।

আমরা তিনজনেই পায়ে হেঁটে ডোবা পার হলাম । তারপর আরো একবার আমাদের দুই জনকেই নামতে হয়েছিলো । সেখানে আসলে কোন রাস্তাই ছিলো না চলার । আর যেটা ছিলো, তা হলো পাশাপাশি প্রায় একে অন্যের গায়ে গায়ে লাগানো দুই ভাইয়ের বাড়ির মাঝখান দিয়ে একখানা অতীব সরু পায়ে চলা পথ । সাইকেল আর বাইক ছাড়া আর কিছুই গলতে পারবে না ঐ ফাঁক দিয়ে ।

এখানে রাণা একাই বাইক চালিয়ে ঐ সরু ফাঁকা অংশ দিয়ে গলে গেলো । আমি আর আব্দুলও হেঁটে চললাম পিছনে । সবার নজর পায়ে চলা পথের দিকে । সাপখোপের ভয়ও ছিলো । পেছনের বাঁশবন থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে শিয়ালের ডাক ভেসে ভেসে আসছিলো । আর পাড়ার কুকুরগুলোও বিচ্ছিরি ভাবে চিৎকার করছিলো ।

(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি