ধর্মজ্ঞান নয়, কান্ডজ্ঞান চাই

ধর্মজ্ঞান নয়, কান্ডজ্ঞান চাই
---------------------
জন্মসূত্রে বংশানুক্রমিকভাবে প্রাপ্ত আমার ধর্মীয় ভাবনা এবং ধর্মীয় আচরণ বিধি আমাকে কি কি দিতে পেরেছে ?
------------------------------------

১ ।। আজীবন এবং বংশানুক্রমিকভাবে ___

ক ।। প্রয়োজনীয় খাদ্যের চাহিদা মেটানো ???

খ ।। ঋতু ভিত্তিক প্রয়োজনীয় পরনের কাপড়ের ব্যবস্থা ???

গ ।। সপরিবারে মাথা গোঁজার নিশ্চিত নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয় ???

ঘ ।। নিয়ম করে নিয়মিত ভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ ???

ঙ ।। সুলভে এবং স্বল্প খরচে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য পরিষেবা ???

চ ।। জীবিকা নির্বাহের জন্যে উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ???

ছ ।। বংশ পরম্পরায় নিশ্চিত ও নিরাপদ  কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি ???

জ ।। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির হাত ধরে সামগ্রিক মানব সভ্যতার অগ্রগতি ???

নাহ ____ !!!

A Big and Straight forward NO !!!!!

---------------------------------
তবে ধর্ম আমাকে প্রকৃত অর্থে কি দিয়েছে ?
---------------------------------

ক ।। নিজের ধর্মের ভিতরেও মত পার্থক্য ভিত্তিক অন্তর্কলহ ও হানাহানি

খ ।। অপরের ধর্মীয় ভাবনা নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ অসম্মান

গ ।। নিজের ধর্মকে বিজ্ঞানসম্মত ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে সূক্ষ্ম এবং স্থূলভাবে অপরকে ধর্মান্তরকরণের অপচেষ্টা

ঘ ।। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং অমানবিক আচরণ জনিত মানসিক, শারীরিক, অর্থনৈতিক ক্ষয় ক্ষতি

ঙ ।। লিঙ্গবৈষম্য জনিত কারণে নারীদের উপর নানারকম ভাবে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ

চ ।। প্রতিবাদী ব্যক্তিচেতনা সম্পন্ন মানবস্বত্ত্বাকে দমন পীড়ন অত্যাচার এবং প্রয়োজনে হত্যা

------------------------------------

এই রাজ্যের মূল সমস্যা হলো জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ । এর সাথে যুক্ত হয়েছে _

১ ।। নিয়মিত ভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি (Inflation),

২ ।। বেকারত্ব (Unemployment),

৩ ।। দারিদ্র্য (Poverty)

৪ ।। কলকারখানা, ভারী শিল্প (Industrial Growth Zero) আসেনি অনেক বছর

৫ ।। চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রচুর খরচ, অনেকেই ভিন্ রাজ্যে চলে যাচ্ছে জীবিকার টানে; চিকিৎসার প্রয়োজনে

পশ্চিমবঙ্গ আজ যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় আছে । মানুষকে বুঝতে হবে _ তাকে বাঁচতে হলে সবার প্রথমে কি করতে হবে ?

মানুষ না থাকলে, কোনও কিছুরই চর্চা সম্ভব নয় । ধর্ম শিল্প কলা সংস্কৃতি পরে । আগে চাই পেটে খাবার, গায়ের কাপড়, মাথার উপর ঘর ( এখনো কত মানুষ ফুটপাতে, স্টেশনে রাত কাটায় ), স্বল্প খরচে সুলভে চিকিৎসা, জীবিকা / কর্মসংস্থান এবং প্রতিটি মানুষের জন্যে উপযুক্ত সময় উপযোগী শিক্ষা । আর বাড়ির মহিলাদের সবার প্রথমে শিক্ষিত করা দরকার । নয়তো এই সমাজের এই দেশের উন্নতি অসম্ভব । যেই জাতি নারীকে অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখে, ধর্মের বেড়াজালে আর সামাজিক নিষেধের আগলে বেঁধে রাখতে চায়, তাদের উন্নতি অসম্ভব ।

মোদ্দা কথা হলো _ মানুষের (Basic Needs) । দেশ ভাগ ও স্বাধীনতার পরবর্তী এত গুলো বছর পার করেও আমরা সেই ধর্মের আগল ধরে বসে আছি । এই ধর্মের হানাহানি থেকে জন্ম নিয়েছে পারস্পরিক বিদ্বেষ, ঘৃণা, অবিশ্বাস । এই কাজগুলো যারা করায়, তারা মনেপ্রাণে চায় __ সাধারণ মানুষ যেন Basic Needs ( খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা ) এসব ভুলে অন্য বিষয় ( ক্রিকেট, দাঙ্গা, অন্য দেশের সমস্যা, পরনিন্দা পরচর্চা ) নিয়ে মেতে থাকে । আর মূল Basic Needs গুলো নিয়ে দাবী দাওয়া আন্দোলন না করে । কারণ ঐ Basic Needs গুলো যার মিটেছে, সে কি আর বাকী ফালতু বিষয় নিয়ে, ধর্মীয় ভেদাভেদ নিয়ে মাথা ঘামাবে ?

আমি সরকারী আধিকারিক । অবস্থাপন্ন । কোনও অভাব নেই আমার । আমি কোন মন্দিরে যাই না । পুরুতের কথা কানে নেই না । তাবিজ কবচ মাদুলি আংটি পাথর কিছুই ধারণ করিনা । সমস্যা এলে তার সমাধানও হয়ে যায় । কারণ আমি সংস্কার বা কুসংস্কার বা ধর্মের শেখানো বুলি মাথায় নিয়ে ঘুরি না । কারণ আমি জানি আমি মানুষ । পাবলিক কে সার্ভিস দেওয়াই আমার কাজ । সেখানে ভাষা ধর্ম বর্ণ জাত পাত দেখার প্রশ্ন নেই । আর আমার মন কখনো কারো ক্ষতি কামনা করে না । উপকার করতে না পারি, অপকারের চিন্তাও মাথায় আনি না । কোন গরীব মানুষের চোখের জল দেখতে পারি না । আইন মোতাবেক যতখানি সম্ভব, মানুষের কাজ করি, যতক্ষণ অফিসে থাকি ।

সুতরাং আমি জানি আমি কেমন । কিন্তু বাকি সকল কেও এটা ভাবতে হবে । পৃথিবীতে সবাই যদি এক ভাষা, এক বর্ণ, এক জাতি, এক ধর্ম হয়েও যায়, তবুও কি Basic Needs এর অভাব / সমস্যা মিটবে ?

সুতরাং Priority দিয়ে বুঝতে হবে __ কোনটা আমার আগে চাই _ কেন চাই ???

আমি চাই আমি এবং আমার চারপাশের মানুষ যেন Basic needs এর অভাবে কষ্ট না পায় । তাদের পেটের চুল্লীতে যেন প্রয়োজন মাফিক খাবার জোটে । তাদের পরনে যেন সারা বছর প্রয়োজনমাফিক কাপড় থাকে । তাদের যেন মাথার উপর একটা স্থায়ী ছাদ থাকে । তাদের কথা বার্তা আচার আচরণে যেন শিক্ষার এবং বুদ্ধিমত্তার ঝলক দেখা যায় । তারা যেন সহানুভূতিসম্পন্ন, সংবেদনশীল, মননশীল, সাংস্কৃতিক মনোভাবাপন্ন রুচিবোধসম্পন্ন হয় । তাদের চিকিৎসা যেন কম খরচে সুলভে হওয়ার ব্যবস্থা থাকে । তাদের ঘরে সকলেই যেন রোজগারে সক্ষম এবং আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল হয় । তারা যেন মানুষের মতো মানুষ হয় ।

মনে রাখা দরকার, মানুষ হতে গেলে ধর্মের আশ্রয় দরকার নেই । দরকার একটা সুন্দর মন । একটা পরোপকারী সহানুভূতিশীল দরদী হৃদয় । মানবিক গুণ ধর্মপুস্তক পড়ে আনা যায় না । এটা স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত ।

পৃথিবীতে মানুষের উদ্দেশ্য একটাই হওয়া উচিত । সেটা হল Basic Needs এর জন্য সংগ্রাম । আমার ধর্ম আমাকে বিভাজনের পথে ঠেলে দিতে পারে । কিন্তু আমার Basic Needs কি মেটাতে পারে ? জীবন ধারণের জন্য Basic Needs মেটানো জরুরী । ধর্মাচরণ নয় । মানুষের পাশে মানুষ হয়ে দাঁড়ানোতেই পূণ্য অর্জন সম্ভব । আর মানুষকে কোন কিছুর ভিত্তিতে ( অর্থ, শিক্ষা, মর্যাদা, ভাষা, বর্ণ, ধর্ম ) বিভেদ বিভাজনের পথে ঠেলে দেওয়া, ঘৃণা করাই পাপ ।

সুতরাং মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে । সহানুভূতির সাথে । আবেগ ও ভালোবাসার সাথে । ভাষা বর্ণ জাতি ধর্ম সংস্কৃতি গত বৈচিত্র্যকে একত্রীকরণের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে সকলকেই । হতে হবে যুক্তিনিষ্ঠ বিজ্ঞানমনস্ক ।

যে বা যাঁরা বিভেদের রাজনীতি করছেন, তাঁদেরকে প্রশ্ন করতে হবে সরাসরি _ ধর্মগ্রন্থের পাতায় লেখা ধর্মাচরণ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার এবং রীতি নীতি সমূহ কি আমাদের সকলের - অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার সংস্থান করে দেবে ?

যদি ধর্ম আমাদের সকলকে আর্থ সামাজিক নিরাপত্তা দিতে অক্ষম হয়, তবে কেন ধর্ম নিয়ে এত মাতামাতি, কেন এত অসহিষ্ণুতা ?

কেন সব কাজ বাদ দিয়ে প্রতি শুক্রবার মসজিদে জমায়েত হওয়া ? কেন প্রত্যেক শনিবারের সন্ধ্যায় শনি মহারাজের আঙিনায় মোমবাতি জ্বালানো ? কেন রবিবার চার্চে সমবেত হওয়া ?

কেন ??? কেন ??? কেন ???

এর চেয়ে কি কোনও সামাজিক কাজকর্মের সাথে লিপ্ত থাকা মঙ্গলজনক নয় ?

যত অর্থ আমরা ধর্মীয় কারণে অপব্যয় করি, সেই আর্থিক খরচ কি মানুষের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা যায় না ???

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন - Serve God in Man / শিব জ্ঞানে জীব সেবা ।

মানুষকে ঈশ্বর জ্ঞানে সেবা করলেই তো মুক্তি ।

তবে কেন মন্দিরে মসজিদে গীর্জায় অর্থের অপচয় করা ? ঐ অর্থে বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয় নির্মান করতে অসুবিধা কোথায় ?

প্রয়াত শ্রী ভূপেন হাজারিকা মহাশয়ের গাওয়া সেই গানের লাইন বারবার মনে পড়ছে _ "মানুষ মানুষেরই জন্যে" ।

কবির ভাষায় বললে,

" একবার মানুষের দিকে চাও
সে কিছু বলতে চায় "

------------------------------------

এবার আমার আপনার ভাববার পালা ? কাকে অগ্রাধিকার / Priority দেবেন ? কেন দেবেন ? কতখানি দেবেন ?

সকলে ভালো থাকুন । বাকি সকলকে ভালো রাখুন ।

@ রাজেন্দ্র

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি