জীবনানন্দ

জীবনানন্দকে কেউ বলেছেন নির্জনতম কবি , কেউ বলেছেন নিশ্চেতনার কবি , কেউ বলেছেন অবচেতনার কবি।  তিনি বিশ্বাস করতেন সময়ের অন্ধকার দূর করতে পারে কেবল প্রেমিকার স্বরূপ।  অদেখা কোনো এক বনলতাকে নিয়ে কবির অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কবিতায়;
আজ কবির মৃত্যু দিন , কলকাতার ইতিহাসে ট্রাম চাপা পড়ে আজ পর্যন্ত অন্য কারো মৃত্যু ঘটেনি মনে হয় । তাঁর দুই কাছের মানুষ সঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং ভূমেন্দ্র্র গুহ দুজনেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন   দুর্ঘটনা নয়   তাঁর মৃত্যু আসলে স্বেচ্ছামৃত্যু ছিল। সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিবরণ তাঁর আর এক বন্ধু সুবোধ রায়ের লেখা থেকে  পাওয়া যায় ।
জলখাবার" "জুয়েল হাউজের" সামনে দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করছিলেন জীবনানন্দ দাশ। শুধু অন্যমনস্ক নয়, কী এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন কবি। চলন্ত ডাউন বালিগঞ্জ ট্রাম স্পটিং স্টেশন থেকে তখনো প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে। অবিরাম ঘণ্টা বাজানো ছাড়াও বারংবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করছিল ট্রাম ড্রাইভার। যা অনিবার্য তাই ঘটলো। গাড়ি থামল তখন, প্রচণ্ড এক ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গেই কবির দেহ যখন ক্যাচারের ভিতর ঢুকে গেছে। ক্যাচারের কঠিন কবল থেকে অতি কষ্টে টেনে হিঁচড়ে বার করলেন সবাই কবির রক্তাপ্লুত, অচেতন দেহ। কেটে, ছিঁড়ে থেঁতলে গেছে এখানে সেখানে।।....... চুরমার হয়ে গেছে বুকের পাঁজরা, ডান দিকের কটা আর উরুর হাড়।"
এই অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডে। যেখানে তার আশে পাশে পুলিশ কেসের রোগীরা শুয়ে আছেন আর আবহ সঙ্গীতের মত শোনা যাচ্ছে খইনি টেপা দারোয়ানের গান।
‘সুখ আর শান্তি’ নয় অপরিসীম যন্ত্রণার মধ্যে কাটিয়েছেন ১৯৫৪ সালের ১৪ই অক্টোবর থেকে ২২শে অক্টোবর দিনটি পর্যন্ত। তার পর অনন্ত শান্তিকল্যাণ।

হাসপাতালে জীবনের শেষ কয়েকদিন তাঁর স্ত্রী তাঁকে দেখতে আসেন নি। তিনি নাকি ব্যস্ত ছিলেন টালিগঞ্জে সিনেমার কাজে। যখন তাঁর শবদাহ দাহ করার জন্যে প্রস্তুত হয়ে রাখা আছে , তখন কলকাতা কেন্দ্রিক অনেক কবি সাহিত্যিকরা এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে যাচ্ছেন ,
সেই সময় লাবণ্য দেবী জীবনানন্দের বন্ধু ভূমেন্দ্র্র গুহর কাছে জানতে চেয়েছেন – ‘অচিন্ত্য-বাবু এসেছেন , বুদ্ধ-বাবু এসেছেন , সজনী-কান্ত এসেছেন , তাহলে তোমাদের দাদা নিশ্চয় বড় মাপের সাহিত্যিক ছিলেন ; বাংলা সাহিত্যের জন্য তিনি অনেক কিছু রেখে গেলেন হয়তো , আমার জন্যে কি রেখে গেলেন বলো তো ? ’

প্রশ্নটি লাবণ্য দেবীর দিক দিয়ে খুব অসঙ্গত ছিল , এমন কথা বোধহয় বলা যায় না ।

কবির শ্রাদ্ধ বাসরে রাখবার জন্যে একটি ছবি অনেক সন্ধান করেও আয়োজকরা যোগাড় করতে পারেন নি । এমন কি তাঁর স্ত্রী ও দিতে পারেন নি ।

*********** ********** **********

নিঃসঙ্গতার একান্ত অবসরে
জীবন কাটুক জীবনানন্দ পড়ে

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

নগ্নতা নিয়ে কথোপকথন

মরণ vs যৌনতা